Latest News

Popular Posts

মুর্শিদাবাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি: স্বাধীনতা পরবর্তী থেকে সাম্প্রতিক

মুর্শিদাবাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি: স্বাধীনতা পরবর্তী থেকে সাম্প্রতিক

সাইদুর রহমান

ঐতিহাসিক স্বাধীনতা লাভের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাত আজও উপমহাদেশের মানুষকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুর্শিদাবাদের সাহিত্য সংস্কৃতির জগতেও দেশবিভাগের যুগান্তকারী প্রভাব ছিল। এই সময়ে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যশালী ব্যক্তিত্ব মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পূর্ব বা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। আবার অনেক ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবার এপার বাংলায় চলে আসেন। তাই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের মুর্শিদাবাদ জেলার উল্লেখযোগ্য সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যেতে পারে। প্রথম ভাগে রয়েছেন সেই সমস্ত সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁদের জন্ম এই জেলার বাইরে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তাঁরা এই জেলায় এসেছেন, এই জেলায় থেকে গেছেন, এই জেলায় বসে সাহিত্যচর্চা করে জেলা তথা জেলার সীমানা ছাড়িয়ে গোটা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে স্থায়ী আসন রেখে গেছেন। এই স্তরে রয়েছেন রেজাউল করিম, মণীশ ঘটক, ঋত্বিক কুমার ঘটক, মহাশ্বতা দেবী, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজন ভট্টাচার্য, রামগতি ন্যায়রত্ন, সত্যেন সাহা, গুণময় মান্না, প্রাণরঞ্জন চৌধুরী, বিশ্বনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, সৌমেন্দ্রকুমার বাগচী, শক্তিনাথ ঝা, দীপঙ্কর চক্রবর্তী, দেবব্রত ধর, শ্যামল রায়, নারায়ণ সরকার, নারায়ণ ঘোষ, শুভ চট্টোপাধ্যায়, পুষ্পেন রায়, দেবী ঠাকুর, সুশীল ভৌমিক, মোহিনীমোহন রায়, সন্দীপ বিশ্বাস, দেবপ্রসাদ সরকার, আনন্দগোপাল বিশ্বাস, লক্ষ্মীনারায়ণ সেন, কানাইলাল বিশ্বাস প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি: স্বাধীনতা পূর্ব

স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা পরবর্তী মুর্শিদাবাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতির ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হলেন ড. রেজাউল করিম। তাঁর জন্ম বীরভূম জেলার মারগ্রামে। মামা জাতীয়তাবাদী নেতা আব্দুস সামাদের আহ্বানে তিনি মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। দীর্ঘদিন তিনি বহরমপুর গার্লস কলেজে অধ্যপনা করেন। কলেজে পড়াকালীন ‘সৌরভ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। মুক্তচিন্তা ও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার অন্যতম ব্যক্তিত্ব। কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা। কলকাতার বাইরে বহরমপুরে সর্বপ্রথম তাঁর সভাপতিত্বে এই সংঘের শাখা তৈরি হয়। তিনি ‘নবযুগ’ পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মহম্মদ আলি জিন্নাহর চৌদ্দ দফা দাবির বিরুদ্ধে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখে যান। এছাড়াও তিনি ‘কোহিনূর’ ও ‘নবনূর’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সমাজ’, ‘নয়া ভারতের ভিত্তি’, ‘জাতীয়তার পথে’, ‘তুর্কীবীর কামাল পাশা’, ‘সাধক দারা শিকোহ’, ‘মনীষী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ’, ‘সাম্প্রদায়িক সমস্যা ও গান্ধীজী’, ‘ফর ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইসলাম’, ‘মুসলিম অ্যান্ড দ্য কংগ্রেস’, ‘দি বুক অফ অ্যাওয়ারনেস’, ‘এনেকডোটস অফ হজরত মহম্মদ’ ইত্যাদি তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের বন্যা ও নদী ভাঙন: ফরাক্কা ব্যারেজের প্রভাব

মণীশ ঘটক

মণীশ ঘটক, বাংলা সাহিত্য জগতে যিনি ‘যুবনাশ্ব’ নামে পরিচিত, ১৯০২ সালে বর্তমান বাংলাদেশের পাবনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। দেশবিভাগের পর ঘটক পরিবার মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে মণীশ ঘটক জীবনের প্রায় শেষ পঁয়ত্রিশ বছর কাটিয়েছিলেন। ‘কল্লোলের প্রথম মশালচি’ মণীশ ঘটকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শিলালিপি’। কিন্তু তিনি ছোটগল্পকার হিসেবেই বাংলা সাহিত্যে বেশি পরিচিত। ‘পটলডাঙ্গার পাঁচালী’ তাঁর বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ। তিনি বহরমপুর থেকে ‘বর্তিকা’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন আমৃত্যু সম্পাদনা করে গেছেন।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা আন্দোলনে মুর্শিদাবাদ

ঋত্বিক কুমার

ঋত্বিক কুমার ঘটক জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকায়। তিনি ছিলেন মণীশ ঘটকের অনুজ। দেশবিভাগের পর পরিবার মুর্শিদাবাদে চলে এলে ঋত্বিক বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হন ও ১৯৪৮ সালে এই কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স-সহ বিএ পাশ করেন। এরপর তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়তে কলকাতা চলে যান। সেখনে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। নাটক আর চলচ্চিত্রের সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে তাঁর আর এমএ করা হয়নি। তাঁর পরিচালনায় একে একে মুক্তি পেতে থাকে বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’, ‘অযান্ত্রিক’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মতো সব ভুবন বিখ্যাত সিনেমা। ‘মুসাফির’, ‘মধুমতী’, ‘দ্বীপের নাম টিয়ারং’-এর মতো কাহিনি ও চিত্রনাট্যও রচনা করেন ঋত্বিক কুমার ঘটক।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ জেলার সংবাদ-সাময়িক পত্রের দু’শো বছর

মহাশ্বেতা দেবী

মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি, বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকায়। দেশবিভাগের পর তিনিও পরিবারের সঙ্গে মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। তাঁর জীবনের বেশ কিছুটা সময় মুর্শিদাবাদে কাটে। পিতা ছিলেন মণীশ ঘটক। ঋত্বিক ঘটক ছিলেন কাকা। তিনি শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে স্নাতক হন, পরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেন। ‘হাজার চুরাশির মা’, ‘অরণ্যের অধিকার’ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। ‘অগ্নিগর্ভ’, ‘স্তন্যদায়িনী’, ‘চোট্টি মুণ্ডা’ এবং ‘তার তীর’ বিখ্যাত ছোটগল্প সংকলন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন ও জনজাতিদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ এবং চার বাঙালি যুগপুরুষ

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর, বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার রাইনাদি গ্রামে। দেশভাগের পর ছিন্নমূল হয়ে তাঁর পরিবার চলে আসেন মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের বানজেটিয়ার কাছে গড়ে ওঠা মণীন্দ্র কলোনিতে পিতার সঙ্গে তাঁদের আশ্রয় হয়। এখান থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন তিনি। ১৯৫৬ সালে কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। এরপর যাযাবরের মতো কেটেছে তাঁর যৌবন। কখনও নাবিকরূপে সারা পৃথিবী পর্যটন, আবার কখনো বা ট্রাক-ক্লিনারের কাজ। কিছুদিন মুর্শিদাবাদ জেলার সাটুই সিনিয়র বেসিক স্কুলের প্রধানশিক্ষকও ছিলেন তিনি। তিন-চার বছর সাটুইয়ে থাকার পর ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাকাপাকিভাবে চলে যান কলকাতায়। কখনও কারখানার ম্যানেজার, কখনও প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টার পর ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেখান থেকেই তিনি কর্মে অবসর নেন। ‘অলৌকিক জলযান’, ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘ঈশ্বরের বাগান’, ‘সমুদ্রে বুনোফুলের গল্প’, ‘সমুদ্র মানুষ’ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস।

আরও পড়ন: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ

রবীন বিশ্বাস

বিজন ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯২৭ সালে বর্তমান বাংলাদেশে। দেশবিভাগের পর তিনিও মুর্শিদাবাদে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি ছিলেন কবি ও সাংবাদিক। মণীশ ঘটকের ‘বর্তিকা’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পুষ্পেন রায়ের জন্ম বর্ধমান জেলার কাটোয়ায়, ১৯৩০ সালে। পরে তিনি ডোমকলে চলে আসেন এবং সেখান থেকে ‘বিদিশা’ পরে ‘অন্যগাঙ’ নামে একটি কবিতা পত্রিকা প্রকাশ করেন। গুণময় মান্নার জন্ম মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল মহকুমার আড়গোড়া গ্রামে।  শৈশবে পিতৃহারা গুণময়ের মুর্শিদাবাদে আগমন চাকরিসূত্রে। তিনি ১৯৫৮-৯০ পর্যন্ত বহরমপুর গার্লস কলেজে অধ্যাপনা করেন। তাঁর ‘কটা ভানারি’, ‘জুনাপুর স্টিল’, ‘লখীন্দর দিগার’, ‘শালবনি’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তাঁর প্রবন্ধ ও গল্পগুলিও ভিন্নমাত্রার। ‘রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্র কাব্যরূপের বিবর্তন রেখা’, ‘গদ্যের সৌন্দর্য’, ‘বাংলা উপন্যাসের শিল্পাঙ্গিক’ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ গ্রন্থ। প্রাণরঞ্জন চৌধুরী ১৯২৭ সালে বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালিতে জন্মগ্রহণ করেন। দেশবিভাগের পর কলকাতা ও পরে মুর্শিদাবাদে আসেন। ১৯৭৭ সাল থেকে সাপ্তাহিক ‘গণকণ্ঠ’ প্রকাশ করেন ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখা বের করতে থাকেন। বিশ্বনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম অবিভক্ত বাংলার বরিশালে। আর শক্তিনাথ ঝা জন্মেছিলেন জলপাইগুড়ি জেলার বোদা থানার ভীমপুর গ্রামে। কৃষ্ণনাথ কলেজে চাকরি সূত্রে তিনি বহরমপুরের বাসিন্দা। বাউল, মুসলিম বিয়ের গান, লালন, নজরুল ইসলাম ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী লেখাগুলো এক বিরল সম্পদ। সৌমেন্দ্রকুমার গুপ্তের জন্ম নদিয়ার নবদ্বীপে মামার বাড়িতে হলেও তাঁর পিতৃভূমি ছিল মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলায়। মুর্শিদাবাদকে নিয়ে লেখা তাঁর অজস্র প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থ মুর্শিদাবাদের ইতিহাস চর্চার আকর গ্রন্থ।

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

শক্তিনাথ ঝা

দীপঙ্কর চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৪১ সালে বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মাদারপুর থানার নিসখি গ্রামে। তাঁর পড়াশোনা ও চাকরি মুর্শিদাবাদে। কৃষ্ণনাথ কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক চক্রবর্তী ‘বীক্ষণ’ ও ‘অনীক’ নামে দু’টি পত্রিকা দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদনা করে গেছেন। শ্যামল রায়েরও জন্ম বাংলাদেশের পাবনা শহরে ১৯৪৩ সালে। ১৯৭১ থেকে তিনি জিয়াগঞ্জ শ্রীপৎ সিং কলেজে অধ্যাপনা করেন। তাঁর লোকশিল্প ও সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক লেখাগুলো আজও অমূল্য সম্পদ। এছাড়াও রয়েছেন দেবব্রত ধর, নারায়ণ সরকার, নারায়ণ ঘোষ, শুভ চট্টোপাধ্যায়, দেবী ঠাকুর, সুশীল ভৌমিক, মোহিনীমোহন রায়, দেবপ্রদ সরকার, সন্দীপ বিশ্বাস, আনন্দগোপাল বিশ্বাস, লক্ষ্মীনারায়ণ সেন, কানাইলাল বিশ্বাস প্রমুখ ব্যক্তিত্ব— যাঁরা এই জেলার বাইরে থেকে এসেছেন, জেলায় থেকেছেন, এই জেলার বাসিন্দা হয়ে জেলার সাহিত্য সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

এবার আমরা আলোচনা করব সেইসব সাহিত্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে, যাঁদের জন্ম এই জেলাতেই। এই জেলাতেই তাঁদের বেড়ে ওঠা, এই জেলাতে বসেই সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মনন চর্চা করেছেন তাঁরা। কেউবা জেলার সীমানা অতিক্রম করে সমগ্র বাংলা সাহিত্যে নিজেদের স্থায়ী আসন তৈরি করেছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আবুল বাসার, সৈয়দ আব্দুর রহমান ফেরদৌসী, ফণীভূষণ সিংহ, বলরাম রায়য়চৌধুরী, ননী ভট্টচার্য, অতীন্দ্র মজুমদার, গোকুলেশ্বর ঘোষ, চিন্ময় মুখোপাধ্যায়, মনিরুল ইসলাম, ব্রজগোপাল রায়, পুলকেন্দু সিংহ, প্রণবকুমার বন্দ্যোপাধায়, অলোক সান্যাল, দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রদীপেন্দু মৈত্র, শম্ভুচরণ হাটুই, মঞ্জু গঙ্গোপাধ্যায়, মোহাম্মদ আব্দুল কাদের, দাউদ হোসেন, হাসনে আরা সিরাজ, শ্যামল সরকার, তাপস ঘোষ, কমলেন্দু ভট্টাচার্য, দীপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, রাজেন উপাধ্যায়, সুনীল সরকার, আব্দুস শুকুর সরকার, রবীন বিশ্বাস, পম্পু মজুমদার, হৃষিকেশ চক্রবর্তী, সৈয়দ আবদুল্লাহ মোল্লা, রকিবউদ্দিন ইউসুফ, শেখ মমতাজ, নাসের হোসেন, নিকষোপল, এবাদুল হক, তাপসী ভট্টচার্য, সৈয়দ খালেদ নৌমান, নজরুল ইসলাম, কুনালকান্তি দে, খাজিম আহমেদ, উৎপলকুমার গুপ্ত, খাদিজা বানু, সমরেন্দ্র রায়, জহর সেন, সন্ধিনী রায়চৌধুরী, বিষান কুমার গুপ্ত, রঞ্জিৎকুমার মুখোপাধ্যায়, সমীর ঘোষ, আরতি মজুমদার, সাদের আলি, কাজী কল্পনা ইসলাম, এম নাজিম, অরূপ চন্দ্র, সৈয়দ কাওসার জামাল, অমিতাভ মৈত্র, শান্তিময় মুখোপাধায়, সমীরণ ঘোষ, নুরুল আমিন বিশ্বাস, মবিনুল হক, সৈয়দ হাসমত জালাল, নিখিল কুমার সরকার, সাধনকুমার রক্ষিত, সাদের আলি, অমিতাভ মৈত্র প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।

আরও পড়ুন: জনঅরণ্যে সম্প্রীতির বার্তা

Syed Mustafa Siraj loved fishing - Anandabazar
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ জন্মগ্রহণ করেন মুর্শিদাবাদের খোশবাসপুর গ্রামে ১৯৩০ সালের অক্টোবর মাসে। প্রথম জীবনে বাড়ি থেকে পলাতক কিশোর সিরাজ ছিলেন রাঢ় বাংলার লোকনাট্য ‘আলকাপ’-এর সঙ্গে যুক্ত। আলকাপের দল নিয়ে ঘুরেছেন জেলা তথা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে। সেই পলাতক কিশোরের মন হারিয়ে ছিল মুর্শিদাবাদের রাখাল বালকের মাঠে, হিজলের বিলে, ঘাসবন ও উলুখড়ের জঙ্গলে। পাখির ঠোঁটে খড়কুটো আর হট্টিটির নীলাভ ডিমের মায়াময় আদিম স্যাঁতসেঁতে জগতে। তাই তিনি একদিন কান্দির এক বিশাল অঞ্চলকে নিয়ে লিখে ফেললেন ‘তৃণভূমি’, ‘হিজল কন্যা’, আর ‘আশমানতারা’। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নীলঘরের নটী’। তারপর একে একে প্রকাশ পেতে থাকল ‘প্রেমের প্রথম পাঠ, ‘বন্যা’, ‘নিশিমৃগয়া’, ‘কামনার সুখদুঃখ, ‘নিশিলতা’, ‘এক বোন পারুল, ‘কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি, ‘নৃশংস’, ‘রোডসাহেব’, ‘জানগুরু’-সহ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ‘অলীক মানুষ’। ‘অলীক মানুষ’ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজকে ভিন্নধারার লেখক হিসেবে খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি গল্প লেখা শুরু করেছিলেন ‘ইবলিস’ ছদ্মনামে। মুর্শিদাবাদের ‘কালান্তর’, ‘অবসর’, ‘বীথিকা’ ইত্যাদি পত্রিকায় ‘ইবলিস’ ছদ্মনামে অনেক গল্প প্রকাশিত হয়। সৈয়দ সিরাজের ‘ভারতবর্ষ’, ‘ইন্তি, পিসি ও ঘাটবাবু’, ‘ভালোবাসা ও ডাউনট্রেন’, ‘তরঙ্গিনীর চোখ’, ‘জল সাপ ভালোবাসা’, ‘হিজলবিলের রাখালেরা’, ‘রণভূমি’, ‘উড়োপাখির ছায়া, ‘রক্তের প্রত্যাশা’, ‘মৃত্যুর ঘোড়া’, ‘গোঘ্ন’, ‘রানীরঘাটের বৃত্তান্ত’, ইত্যাদি অসংখ্য ছোটগল্প অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর ‘রানীঘাটের বৃত্তান্ত’ অন্যতম একটি গল্প। ‘গোয়েন্দা কর্ণেল’ ছোটদের জন্য লেখা বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র। এখানে একটা কথা বলতেই হয় যে, বড় পত্রিকায় চাকরি করলেও ছোট পত্রিকা ও সম্পাদকের প্রতি মুস্তাফা সিরাজের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। তাঁর অনেক উপন্যাস ছোট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: শ্রমিকের সামান্য ‘পান্তা ভাতে’ একটু লবণের ব্যবস্থার হোক

আবুল বাশার (লেখক) - উইকিপিডিয়া
আবুল বাসার

আবুল বাসার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫১ সালে মুর্শিদাবাদের ইসলামপুর থানার হাসানপুর গ্রামে। তাঁর শৈশব ও যৌবন কেটেছে ইসলামপুরের টেকারাইপুর গ্রামে। প্রথম দিকে তিনি কবিতা লিখতেন। বহরমপুরে পড়াকালীন তিনি বহরমপুরের ‘রৌরব’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময় থেকে কবিতার পাশাপাশি গল্পও লিখতে শুরু করেন তিনি। মুর্শিদাবাদে থাকাকালীন প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফুলবউ’। মুসলিম সমাজের অন্তর্লীন চিত্র নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে তাঁর এই বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফুলবউ’তে। তারপর তিনি ‘দেশ’-এ চাকরি নিয়ে কলকাতা চলে যান। সাধারণ মানুষ ও রাজনীতি হয়ে উঠে তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলির মধ্যে ‘ফুল বউ’, ‘ভোরের প্রসূতি’, ‘সুরের সম্পান’, ‘জল মাটি আগুনের উপাখ্যান’, ‘ধর্মের গ্রহণ’, ‘অগ্নিবলাকা’ অন্যতম। মুর্শিদাবাদের অন্যতম প্রাবন্ধিক ও গবেষক ছিলেন পুলকেন্দু সিংহ। মুর্শিদাবাদের আনাচে-কানাচে ঘুরে ঘুরে তিনি লোকায়ত মানুষের জীবনকথাকে ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরেন। ‘লোকায়ত মুর্শিদাবাদ’, ‘ফিরে চল মাটির টানে’, ‘পঞ্চায়েত ও লোকসংস্কৃতি’ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থ। উৎপল কুমার গুপ্তের প্রধান পরিচিতি কবি হিসেবে। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ‘সময়’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তাঁর কিছু মননশীল প্রবন্ধও আছে। আর বিষাণকুমার গুপ্ত হলেন একাধারে অধ্যাপক, আইনজীবী, ঐতিহাসিক। তাঁর বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ ‘Political movements in Murshidabad – 1920 – 1947। ‘মুর্শিদাবাদ বীক্ষণ’, ‘কালান্তর’, ‘গণকণ্ঠ’, ‘কর্ণসুবর্ণ’ প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর অনেকগুলি রাজনৈতিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক রবীন বিশ্বাস ছিলেন ‘ঝড়’ সাপ্তাহিকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক। তাঁর সম্পাদনায় ‘ঝড়ে’র মুর্শিদাবাদ বিষয়ক বিশেষ সংখ্যাগুলি মুর্শিদাবাদ জেলার সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ইতিহাস গবেষণার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে উঠে এসেছে। অরূপ চন্দ্র, খাজিম আহমেদ, প্রকাশ দাস বিশ্বাস, চন্দ্রপ্রকাশ সরকার প্রমুখ নিরবচ্ছিন্নভাবে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস চর্চা করে চলেছেন। নজরুল ইসলাম, মঈনুল হাসান প্রমুখও ধারাবাহিকভাবে ইতিহাস ও গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখে চলেছেন।

নাসের হোসেন

সৈয়দ খালেদ নৌমান আজন্ম কবিতা চর্চার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগন্থের মধ্যে ‘ক্রান্তিকালের চেতনা’, ‘ভালোবাসার শতবর্ষ’ অন্যতম। তাঁর ‘অর্কেষ্ট্রা’ জেলার একটি অন্যতম কবিতার পত্রিকা। কবি শান্তিময় মুখোপাধ্যায় ‘রৌরব’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘শীতের মাতৃসদন’, ‘অনুশীলন পর্ব’ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। কবি সমীরণ ঘোষও ‘রৌরব’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জেলার সীমানা ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেক পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। ‘হে বদ্ধ কাপালিক’, ‘তলোয়ার পোহাচ্ছে রোদ’, ‘পর্যটকের ডানা’, ‘কবিতা সংগ্রহ’, ‘চাঁদলাগা চৌষট্টি আশমান’, ‘অন্তর্বর্তীরেখা’, ‘মরচে গোধূলির পাঠ’, ‘হাড়ের দূরবীন’, ‘হাতআয়নার ঘুম’ তাঁর প্রকাশিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। কবি নাসের হোসেন ছিলেন শক্তিশালী কবি। তিনি কলকাতার ‘কবিতা পাক্ষিক’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘অপারেশন থিয়েটার’, ‘প্রেম পদাবলী’, ‘নির্বাসিত কবিতা’ তাঁর বিখ্যাত সব কাব্যগ্রন্থ। এবাদুল হকের প্রধান পরিচয় সম্পাদক হিসেবে। তিনি ‘আবার এসেছি ফিরে’ ও ‘এবং পুনশ্চ’ নামে দু’টি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সূর্যাস্তের আগে ও পরে’।

নীহারুল ইসলাম মুর্শিদাবাদ জেলার সীমানা পেরিয়ে দুই বাংলায় পরিচিত সাহিত্যিকের মর্যাদা পেয়েছেন। কবিতা দিয়ে লেখা শুরু করলেও কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তাঁর সমধিক পরিচিতি। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘পঞ্চব্যাধের শিকার পর্ব’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। তারপরে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে ‘জেনা, ‘আগুনদৃষ্টি ও কাঠবেড়াল’, ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’, ‘ঘাত আঘাটের বৃত্তান্ত’, ‘নসরুদ্দিন খোজার কিসসা’, ‘জমিন আসমান’ ইত্যাদি গল্পগ্রন্থ। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘জনম দৌড়’ প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। ‘পিরনানার জ্বিন’, ‘ইচ্ছাপুতুল’, ‘পরিকথা’ তাঁর অন্যন্য উপন্যাস। এ সময়ের প্রতিভাধর কবি দেবাশিস সাহা। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘মা, আমি তোতন বলছি’, ‘কুড়িয়ে পাওয়া অক্ষর গুম’, খুবই পরিচিত। কবিরুল ইসলাম কঙ্কোর কবিতা চর্চা শৈশব থেকেই। ‘স্পর্ধিত উচ্চারণ’, ‘একা আছি নির্বাসনে’ ইত্যাদি তাঁর কাব্যগ্রন্থ।

এছাড়াও বর্তমানে একগুচ্ছ তরুণ ও প্রবীণের দল মুর্শিদাবাদে ধারাবিহিকভাবে সাহিত্য চর্চা করে চলেছেন। নীলিমা সাহা, গীতা কর্মকার, প্রদীপ অধিকারী, সেঁজুতি ভট্টাচার্য, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়, কবি স্বপন দত্ত, কবি গোকুলেশ্বর ঘোষ, তরুণ মুখোপাধ্যায়, সুদীপ আচার্য, সীমা সরকার, তুষার ভট্টাচার্য, তাপস সরখেল, মানবেন্দ্র সাহা, অপরেশ চট্টোপাধ্যায়, অনল আবেদিন, শাখী ভট্টাচার্য, কৃষ্ণেন্দু ঘোষ, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়, কুশলকুমার বাগচী, সুজাতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলাঞ্জন সাহা, শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, অংশুমান রায়, বিশ্বজিৎ মণ্ডল, রাজন গঙ্গোপাধ্যায়, সমিত মণ্ডল, কুশলকুমার বাগচী, অর্ণব রায়, নবিউল ইসলাম, অরিত্র সান্যাল, লিপিকা ঘোষ, সৌরভ হোসেন, অনুপম মুখোপাধ্যায়, অভিজিৎ রায়, মণিরুদ্দিন খান, সাইদুর রহমান, হাসিবুর রহমান, কৌশিক গুড়িয়া, মহম্মদ জিকরাউল হক, দেবজ্যোতি ঘোষ, জয় সিং, জিনাত রেহেনা ইসলাম, ইন্দুলেখা চক্রবর্তী, নির্মলেন্দু কুন্ডু, মহম্মদ আলামিন-সহ আরও অনেক নবীন-প্রবীণের দল নিয়মিত ভাবে ছোট ও বড় পত্রিকায় লিখে চলেছেন ও মুর্শিদাবাদ জেলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।   

ক্রমশ…

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *