মুর্শিদাবাদ জেলার সংবাদ-সাময়িক পত্রের দু’শো বছর

সাইদুর রহমান

যেকোনও সাহিত্য ও সাহিত্যিকের আঁতুড়ঘর হল লিটল ম্যাগাজিন। সেদিক থেকে লিটল ম্যাগাজিন একটি বিপ্লব, একটি আন্দোলন। নতুন চিন্তা, নতুন স্বর, নতুন লেখদের তুলে আনা এর প্রধান কাজ। ফলে এর দায়িত্ব অনেক বেশি। তাই লিটল ম্যাগাজিনকে হতে হয় ১. প্রথাবিরোধী ২. প্রতিবাদী। যা এতদিন ধরে চলে আসছে— লিটল ম্যাগাজিনের অবস্থান সম্পূর্ণ তার বিপরীত দিকে। লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিবাদ সকল প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে, চলমান ধারার বিরুদ্ধে। বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে এই কাজটি যোগ্যতার সঙ্গে করে এসেছে প্রথমদিকে ‘সবুজ পত্র’ (১৯১৪), ‘কল্লোল’ (১৯২৩), ‘শনিবারের চিঠি’ (১৯২৪), ‘কালি ও কলম’ (১৯২৭), ‘প্রগতি’ (১৯২৭), ‘পরিচয়’ (১৯৩১), ‘কবিতা’ (১৯৩৫), ‘চতুরঙ্গ’ (১৯৩৮) ইত্যাদি প্রথম শ্রেণির লিটল সাহিত্য পত্রপত্রিকা। বাংলাভাষায় লিটল ম্যাগাজিন এবং সংবাদ ও সাময়িকপত্র প্রকাশের ইতিহাসের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার নাম প্রথম থেকেই জড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ এবং চার বাঙালি যুগপুরুষ

উনবিংশ শতাব্দী (১৮০১ থেকে ১৯০০)

জন মার্শম্যানের সম্পাদনায় ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয় বাংলাভাষার প্রথম মাসিক পত্রিকা ‘দিগদর্শন’। আর বাঙালি পরিচালিত বাংলাভাষায় প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয় হরচন্দ্র রায় ও গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ১৮১৮ সালের ১৪ মে। পত্রিকাটির নাম ‘বঙ্গাল গেজেট’। তা ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা। ১৮৩১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ‘সংবাদ প্রভাকর’, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায়। ১৮৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে রাজা কৃষ্ণনাথ রায়ের উদ্যোগে এবং তাঁর গৃহশিক্ষক উয়লিয়ম ল্যামব্রিকের সম্পাদনায় মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রথম প্রকাশিত হয় সংবাদ পত্রিকা ‘মুর্শিদাবাদ নিউজ’। এর আগে কলকাতার বাইরে সমগ্র বাংলা তথা উত্তর-পূর্ব ভারতে শহর বা মফস্‌সল থেকে সংবাদ সাময়িকপত্র বের হয়নি। সেদিক থেকে এই গৌরব মুর্শিদাবাদের। রাজা কৃষ্ণনাথ রায়ের অর্থানুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৪০ সালেও প্রকাশিত হয় গুরদয়াল চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মুর্শিদাবাদ সম্বাদপত্রী’। ব্রিটিশ রাজশক্তির রোষে সম্পূর্ণ উদার এই পত্রিকা দু’টির প্রকাশনা এক বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়।

১৮৪১-এর পর ১৮৬২ পর্যন্ত প্রায় কুড়ি বছর মুর্শিদাবাদে আর কোনও পত্রিকা প্রকাশের কথা জানা যায়নি। ১৮৬২-এর জানুয়ারি মাসে আজিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বিশ্ব মনোরঞ্জন’। সম্পাদক ছিলেন নবকিশোর সেন। আবার ১৮৬৩ সালের জানুয়ারিতে নবকুমার সেনের সম্পাদনায় আজিমগঞ্জ থেকে ‘সংবাদ ভারত’ নামে আরেকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। দু’টো পত্রিকায় ছিল স্বল্পায়ু। ১৮৬৪ সালে বহরমপুর থেকে প্রকাশিত হয় ‘ভারত রঞ্জন’। অনেকে মনে করেন ‘বিশ্ব মনোরঞ্জন’ ও ‘সংবাদ ভারত’ পত্রিকা দু’টি ভেঙে বহরমপুর থেকে একসঙ্গে ‘ভারত রঞ্জন’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৬৬ সালে বহরমপুর থেকে ‘ধনসিন্ধু যন্ত্রালয়’ থেকে ‘মুর্শিদাবাদ সংবাদসার’ নামে একটি পত্রিকা বের হয়েছিল। তবে পত্রিকার সম্পাদকের নাম জানা যায়নি। বহরমপুর থেকে প্রথম সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয় ১৮৬৮ সালে ‘সমালোচনী’ নামে। এই পত্রিকারও সম্পাদকের নাম জানা যায়নি। তবে এটি প্রকাশিত হয়েছিল সত্যরত্ন প্রেস থেকে। এরপর ১৮৭০ সালের জানুয়ারী মাসে প্রকাশিত হয় ‘মাধুকরী’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা।

আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ

মুর্শিদাবাদের সংবাদ সাময়িকপত্রের ইতিহাসে ১৮৭২ সাল ছিল একটি যুগান্তকারী বছর। চাকরি সূত্রে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদ জেলায় ছিলেন প্রায় সাড়ে চার বছর। ১৮৬৯-এর নভেম্বর থেকে ১৮৭৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত।  বহরমপুরে থাকার সময়েই ১৮৭২ সালের ১২ এপ্রিল (বাংলা ১২৭৯ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ) তাঁর সম্পাদনায় বের হয় বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা ‘বঙ্গদর্শন’। ছাপা হয় কলকাতার ভবানীপুরের এক নম্বর পিপুলপটি লেনের ‘সাপ্তাহিক সংবাদযন্ত্র’ থেকে। কলকাতা থেকে ছাপা হলেও পত্রিকার লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনার সমস্ত কাজই বঙ্কিমচন্দ্র করেছেন বহরমপুরে বসে। ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রথম সংখ্যা থেকে ১৮৭৪-এর এপ্রিল পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’, ‘ইন্দিরা’, ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ এবং ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাস ‘বঙ্গদর্শনে’ প্রকাশিত হয়। এই সব উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের বহরমপুর অবস্থান কালে প্রকাশিত হয়েছিল।

১৮৭৪ সালে গঙ্গাচরণ বেদান্তবাগীশের সম্পাদনায় আজিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয় ‘উচিত বক্তা’। ওই বছরেই ধুলিয়া থেকে প্রকাশিত হয় ‘সহোদর’ নামে মাসিক পত্রিকা। সম্পাদক ছিলেন অনুকূলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত হয় থাকমনি দেবী সম্পাদিত মাসিক পত্রিকা ‘অনাথিনী’। গবেষকদের মতে, এটিই ছিল মুর্শিদাবাদ থেকে প্রকাশিত মহিলা সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা। ১৮৭৬ সালে বহরমপুরের সৈদাবাদ থেকে কামাখ্যানাথ গাঙ্গুলির সম্পানায় প্রকাশিত হয় ‘প্রতিকার’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এই পত্রিকায় বিশেষ করে ইংরেজদের অত্যাচারের কথাই বেশি করে তুলে ধরা হত। তবে এতদিন ধরে পত্রিকাগুলিতে খবর আর প্রতিবেদন বেশি থাকত। সেদিক থেকে গল্প, কবিতা, রম্য রচনার মতো বিষয়গুলিকে তুলে ধরে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘খেয়াল’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা। সম্পাদক ছিলেন নন্দলাল রায়। ‘সৎসঙ্গ’ ছিল জেলার আর একটি উল্লেখযোগ্য মাসিক পত্রিকা। প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ সালে। সম্পাদক ছিলেন সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮৯৩ সালে বৈকুণ্ঠনাথ সেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মুর্শিদাবাদ হিতৈষী’। পরে এই পত্রিকার সম্পাদক হন বিশিষ্ট আইনজীবী বনোয়ারীলাল গোস্বামী। মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট গবেষক প্রকাশ দাস বিশ্বাস লিখেছেন, ‘মুর্শিদাবাদের প্রথম পত্রিকা হিসাবে এই পত্রিকাটি শতবর্ষের চৌকাঠ পেরোয়। বনোয়ারীলাল গোস্বামীর পর নানা সময়ে এ পত্রিকা সম্পাদনা করেন মণীন্দ্রলাল গোস্বামী, ননীগোপাল চক্রবর্তী, অশোকলাল গোস্বামী প্রমুখ। ২০০০ সালের প্রেস ইন ইন্ডিয়া থেকে জানা যাচ্ছে যে, এটিই ছিল বাংলাভাষার প্রাচীতম পত্রিকা যা তখনও পর্যন্ত জীবিত ছিল। বর্তমানে এ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে।’ (মুর্শিদাবাদ ইতিবৃত্ত (চতুর্থ খণ্ড), সম্পাদনা- অরূপ চন্দ্র) ১৮৯৪ থেকে ১৮৯৬ পর্যন্ত বহরমপুরের সৈদাবাদ থেকে তিনখানি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। অযোধ্যানাথ বন্দ্যোপাধায়ের সম্পাদনায় ‘নদী’ (১৮৯৪), বামাচরণ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় পত্রিকা ‘জননী’ (১৮৯৫) এবং বিপিনবিহারী দাশগুপ্তের সম্পাদনায় চিকিৎসা বিষয়ক পত্রিকা ‘কিউরোপ্যাথিক চিকিৎসা’ (১৮৯৬)।

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

নিরীক্ষা পত্রিকার নামপত্র

বিংশ শতাব্দী (১৯০১ থেকে প্রাক্‌ স্বাধীনতা)

১৯০১ থেকে স্বাধীনতালাভের আগে পর্যন্ত মুর্শিদবাদে বেশকিছু পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র সম্পাদিত ‘সুধা’ প্রকাশিত হয় ১৯০১ সালে, লালবাগ থেকে। এরপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে শশীভূষণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘অভিষেক’ (১৯০২), চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘উপাসনা’ (১৯০৪), হরেন্দ্রচন্দ্র সম্পাদিত ‘চন্দ্রমা’ (১৯০৬), বামন দাস মল্লিক সম্পাদিত ডিটেকটিভ পত্রিকা ‘গোয়েন্দা কাহিনী’ (১৯০৯), ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাসবিহারী সাংখ্যতীর্থ সম্পাদিত ‘গোরাঙ্গ সেবক’ (১৯১২), অবিনাশ্চন্দ্র কাব্য পুরাণতীর্থ সম্পাদিত ‘শ্রী নিত্যানন্দ সেবক’ (১৯১৩), দাদা ঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত সম্পাদিত ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ (১৯১৪) ও ‘বিদূষক’ (১৯২৩), জ্যোতিষচন্দ্র সেনগুপ্ত সম্পাদিত ‘মুর্শিদাবাদ প্রতিনিধি’ (১৯২১), গোপালচন্দ্র সিংহের সম্পাদিত ‘কান্দি বান্ধব’ (১৯২১), রেজাউল করিম সম্পাদিত ‘সৌরভ’ (১৯২৫), প্রভাতকুমার চোধুরী সম্পাদিত ‘অরুণা’ (১৯২৬), মৌলবী আবদুল বারী সম্পাদিত ‘ইসলাম জ্যোতি’ (১৯৩১), শোভেন্দ্রমোহন সেন সম্পাদিত ‘মর্ম্মবাণী’ (১৯৪০), রবীন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘নিরীক্ষা’ (১৯৪১) ও ‘পূর্ণিমা’ (১৯৪৩)।

আরও পড়ুন: জনঅরণ্যে সম্প্রীতির বার্তা

এদের মধ্যে ‘উপাসনা’, ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’, ‘কান্দি বান্ধব’, ‘বিদুষক’, ‘সৌরভ’, ‘নিরীক্ষা’ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পত্রিকা। কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর আর্থিক সহযোগিতায় প্রকাশিত হত ‘উপাসনা’। তাই এই পত্রিকা অনেকদিন পর্যন্ত চলেছিল। এই পত্রিকা ক্রমান্বয়ে সম্পাদনা করেছেন যজ্ঞেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ মুর্শিদাবাদের সংবাদ সাময়িকীর ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে গেছে। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর, এই পত্রিকার শেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। প্রায় একশো বছর এই পত্রিকাটি আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল থেকেছে। সত্তরের আগুনঝরা দশকে দাদাঠাকুর পুত্র অনুত্তম পণ্ডিতের সম্পাদনায় ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’  রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক দৃঢ় প্রতিবাদ হয়ে উঠেছিল। ১৯৭৫-৭৬ সালে জঙ্গীপুর সংবাদের শারদ সংকলনের প্রচ্ছদটি হয়ে উঠেছিল সত্তর দশকের মূর্ত প্রতিচ্ছবি।

‘কান্দি বান্ধব’ মুর্শিদাবাদ জেলার অন্যতম পত্রিকা। ১৯২১-এ শুরু হয়ে আজও নিয়মিতভাবে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়ে চলেছে। বর্তমানে পত্রিকাটির সম্পাদক হলেন নবকুমার মুখোপাধ্যায়। ‘বিদুষক’ পত্রিকার লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক এবং বিক্রেতা— সবই ছিলেন দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। জেলার সীমানা পেরিয়ে দাদাঠাকুরের ‘বিদুষক’ সমগ্র বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে উল্লেখযোগ্যভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

মুর্শিদাবাদ জেলার প্রথম সার্থক সাহিত্য পত্রিকা ‘নিরীক্ষা’। এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন কবীর, শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সনৎ রাহা, শৌরীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, নিরুপমা দেবী, বিভূতিভূষণ ভট্ট, শশাঙ্ক শেখর সান্যাল, মৌলভী আব্দুস সামাদ, রেজাউল করিম, বিমলচন্দ্র সিংহ প্রমুখ। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন জেলা তথা তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মুখ। বহরমপুর থেকে প্রকাশিত রেজাউল করিমের ‘সৌরভ’ পত্রিকাও এই জেলার সাময়িকপত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী

১৯৪৭ সাল, স্বাধীনতা লাভের পর বহরমপুর থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘গণরাজ’। রেজাউল করিম, বিজয় গুপ্ত, শোভেন সেন, উমানাথ সিংহ, কমল বাঁড়ুজ্জে  ও কিছু কংগ্রেসি তরুণ এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এরপর কমল বন্দোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘মুর্শিদাবাদ সমাচার’ ও শশাঙ্কশেখর সান্যালের সম্পাদনায় ‘পদাতিক’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। ১৯৪৯ সালে প্রভাস বন্দোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘তীর্থবিতান’। ১৯৫০ সালে অমলেন্দু সরকার ও বীরেন্দ্রকুমার মুখার্জীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বিশিষ্ট সাহিত্যপত্র ‘তরুণ’। ওই বছরই চিন্ময় মুখোপাধ্যায়ের সম্পদনায় কান্দি থেকে প্রকাশিত হয় ‘বোধিক্রম’ সাহিত্যপত্র। এইভাবে ১৯৬০ পর্যন্ত একে একে প্রকাশিত হতে থাকে উমানাথ সিংহের সম্পাদনায় ‘পরিক্রমা’ (১৯৫১), গঙ্গাধর সিংহ রায়ের সম্পাদনায় ‘ভারতী’ (১৯৫১), শোভেন্দ্রমোহন সেনের সম্পাদনায় ‘মুর্শিদাবাদ সংবাদ’ (১৯৫২), রেজাউল করিমের সম্পাদনায় ‘মুর্শিদাবাদ পত্রিকা’ (১৯৫৩*), প্রফুল্লকুমার গুপ্ত সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘নির্দেশ’ (১৯৫৩), পাঁচুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় কান্দি থেকে ‘পাঞ্চজন্য’ (১৯৫৩), শশধর কুণ্ডুর সম্পাদনায় বহররমপুর থেকে সাপ্তাহিক ‘ভাগীরথী’ (১৯৫৪), নীরদকুমার সরকারের সম্পাদনায় ‘মুর্শিদাবাদ দর্পণ’ (১৯৫৪), সাধনারঞ্জন চৌধুরী সম্পাদিত ‘অবসর’ (১৯৫৪), পাঁচথুপি থেকে কানুহরি রাহা সম্পাদিত ‘বাণী’ (১৯৫৪), রঘুনাথগঞ্জ থেকে বরুণ রায়ের সম্পাদনায় পাক্ষিক পত্রিকা ‘দেহাত’ (১৯৫৫), গুরুদাস ভট্টাচার্য ও জগন্নাথ বিশ্বাসের সম্পাদনায় ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র ‘অর্চ্চনা’ (১৯৫৫), তরুণ চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বর্তিকা’ (১৯৫৫), প্রশান্ত বসু সম্পাদিত ‘সুপ্রভাত’ (১৯৫৬), শঙ্খ ঘোষের সম্পাদনায় ‘জনমত’ (১৯৫৭), সত্যেন সাহা সম্পাদিত ‘একলব্য’ (১৯৫৮), সুরেশভদ্র সম্পাদিত বেলডাঙা থেকে ত্রৈমাসিক ‘বালার্ক’ (১৯৫৯), তোফাজ্জল হেসেন সম্পাদিত মহালন্দি থেকে ‘মূর্চ্ছনা’ (১৯৫৯) এবং রেজাউল করিম ও পুলক কুমার সরকার সম্পাদিত ‘শুভম’ (১৯৬০), গৌরীচরণ ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘মুর্শিদাবাদ বার্তা’ (১৯৬০)। 

আরও পড়ুন: শ্রমিকের সামান্য ‘পান্তা ভাতে’ একটু লবণের ব্যবস্থার হোক

এরমধ্যে ‘অবসর’ ‘বর্তিকা’ ও ‘সুপ্রভাত’-এর কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ‘অবসর’ প্রকাশিত হত বহরমপুর গোরাবাজার থেকে। এর সহকারী সম্পাদক ছিলেন দেবব্রত সিংহ। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক অতীন বন্দোপাধায়ের প্রথম গল্প ‘কার্ডিফের রাজপথ’ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘বর্তিকা’ ছিল বহরমপুর ভ্রাতৃসঙ্ঘ ক্লাবের সাংস্কৃতিক বিভাগের সাহিত্য পত্রিকা। ১৯৫৪ সালে এই পত্রিকার যাত্রা শুরু হলেও মুদ্রিত আকারে এই পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। প্রথম সম্পাদক তরুণ চক্রবর্তী হলেও পরবর্তীতে দীর্ঘদিন এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন কবি মণীশ ঘটক। মণীশ ঘটকের মৃত্যুর পর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন মহাশ্বেতা দেবী। ২০১৬ সালে মহাশ্বেতা দেবীর মৃত্যুর পর এই পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ হয়ে আছে। কেবল মুর্শিদাবাদ নয়, কলকাতাতেও ‘বর্তিকা’র জনপ্রিয়তা ছিল অসীম। ‘সুপ্রভাত’ ছিল মুর্শিদাবাদ জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির মুখপত্র। এই পত্রিকায় বাংলা সাহিত্যের আর এক শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ ‘ইবলিশ’ ছদ্মনামে লিখতেন। এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘কাঁচি’। ‘জনমত’ প্রথম দিকে শঙ্খ ঘোষ সম্পাদনা করলেও পরে এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন রাধারঞ্জন গুপ্ত (গোষ্ঠ)। দীর্ঘ প্রায় বিয়াল্লিশ বছর পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়ে ২০০০ সালে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ‘মুর্শিদাবাদ বার্তা’ ছিল কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র। এখনও পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়ে চলেছে। বর্তমানে পত্রিকাটির সম্পাদক শেখর সাহা। 

আরও পড়ুন: অন্যধারার লিটল ম্যাগাজিন চিন্তায় এগিয়ে ‘চিন্তা’

ঝড়-এর প্রথম সংখ্যার নামপত্র, ১৯৬৮

‘ষাট ও সত্তর দশকের উত্তাল সময়’ স্বাধীনতা উত্তর ভারতে ষাট ও সত্তরের দশক এক গুরুত্বপূর্ণ দশক। ষাটের দশকে ঘটে গিয়েছিল কয়েকটি বেশ  গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৬২’র ভারত-চীন যুদ্ধ, ১৯৬৫’র ভারত-পাক যুদ্ধ, ১৯৬৬’তে খাদ্য আন্দোলন, আর সত্তরের শুরু থেকেই সামন্ত ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে নকশালবাড়ি আন্দোলন। এর পাশেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ। এইসব ঘটনা একদিকে ভারতের রাজনীতিতে যেমন গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তেমনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্য-শিল্প জীবনেও নিয়ে এলো নানান পরিবর্তন। এর প্রভাব এসে পড়ল সাহিত্যে, শিল্পে, গল্পে, কবিতায়, নাটকে। যা কিছু পুরাতন, যা কিছু জীর্ণ তাকে ভেঙে নতুন করে নির্মাণের সংকল্পে এগিয়ে এসেছিল সর্বস্তরের মানুষ। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব এসে পড়ল সাময়িক পত্রপত্রিকার, লিটল ম্যাগাজিনের উপরে। ফলে  প্রকাশিত হতে থাকল বিভিন্ন চিন্তা ও মতের লিটল ম্যাগাজিন। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে মুর্শিদাবাদ জেলাও পিছিয়ে থাকল না। এখানেও একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকল ছোট-বড় নানা ধরনের, বিভিন্ন মতের পত্রাণু, লিটল ম্যাগাজিন, সংবাদ সাহিত্য সাময়িকী। 

ষাট থেকে সত্তরের দশকে যে সমস্ত পত্রপত্রিকা বেরিয়েছিল, সেগুলি হল— দ্বীপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘নমামি’ (১৯৬১), হরেন্দ্রকুমার সরকারের সম্পাদনায় ‘শুভশ্রী’ (১৯৬২), লালগোলা থেকে জ্ঞানেন্দ্রনারায়ন রায়ের সম্পাদনায় ‘মিঠেকড়া’ (১৯৬৩), কান্দি থাকে মৃন্ময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পল্লীবার্তা’ (১৯৬৩), পুনশ্চ সংস্কৃতি পরিষদের পত্রিকা ‘পুনশ্চ’ (১৯৬৪), (১৯৬৬ থেকে এর নাম পাল্টে হয় ‘অনীক’। পরে বিস্তারিত আলোচনা আছে।) প্রদ্যোৎকুমার দে সম্পাদিত ‘মিত্রম’ (১৯৬৬), অনিলকুমার দত্ত সম্পাদিত ‘রূপশিল্পী’ নাট্যগোষ্ঠীর মুখপত্র ‘ললিতা’ (১৯৬৬), বিশিষ্ট কবি নারায়ণ ঘোষের (ডাক নাম নানু ঘোষ) সম্পাদনায় ‘ঐক্যতান’ (১৯৬৮), কবি উৎপল কুমার সম্পাদিত ‘সময়’ (১৯৬৮), শিশির সাহার সম্পাদনায় পাক্ষিক ‘ঝড়’ (১৯৬৮), (ঝড়ের প্রথম দু’টি সংখ্যা বের হবার পর নতুন সম্পাদক হন অচিন্ত্য সিংহ।) কান্দি থেকে সুখেন্দু সিংহ সম্পাদিত ‘পল্লব’ (১৯৬৯), অলোক সেন ও বিমল বসু সম্পাদিত বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা ‘বিজ্ঞান জিজ্ঞাসা’ (১৯৬৯), বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক অরূপরতন চন্দ্র সম্পাদিত ‘রক্তপত্র’ (১৯৭০), বিশ্বনাথ রায় ও আরও কয়েকজন মিলিয়ে ত্রৈমাসিক ‘দিশারী’ (১৯৭১), সৈয়দ হাসমৎ জালাল সম্পাদিত ‘উৎস’ (১৯৭১), কানন দাস সম্পাদিত মাসিক পত্র ‘অঙ্কুর; (১৯৭১), পীযূষচন্দ্র সম্পাদিত ‘কর্ণসুবর্ণ’ (১৯৭১), (রেজিস্ট্রেশন নং ১৮৪৮০/৭১), শম্ভুগোপাল দাস সম্পাদিত ‘সংক্রান্তি’ (১৯৭২), শান্তি সরকার সম্পাদিত ‘চলন্তিকা’ (১৯৭২), উমাপদ কর ও জমিল সৈয়দ সম্পাদিত ‘শ্রাবন্তী’ (১৯৭২), মণিক্রান্ত হালদার সম্পাদিত ‘বাতায়ন’ (১৯৭২), দুলালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘জলসিড়ি’ (১৯৭২), অমলেন্দু সরকার সম্পাদিত ‘ইদানিং’ (১৯৭৩), সত্যরঞ্জন বকসী সম্পাদিত ‘মুর্শিদাবাদ সন্দেশ’ (১০৭৩), সত্যেন সাহা সম্পাদিত ‘মুর্শিদাবাদের খবর’ (১৯৭৩), অতুলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘চেতনিক’ (১৯৭৩), পম্পু মজুমদার সম্পাদিত ‘চৌপর’ (১৯৭৩), শম্ভু ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘রোদ’ (১৯৭৩), ডোমকল থেকে পুস্পেন রায় সম্পাদিত ‘অন্যগাঙ’ (১৯৭৪), জিয়াগঞ্জ থেকে সুবীর বোখরা সম্পাদিত পাক্ষিক ‘বালুচর’ (১৯৭৮), কান্দি থেকে শিবনারায়ন রায় সম্পাদিত ‘কান্দি সমাচার’ (১৯৭৬), বহরমপুর থেকে জয়ন্ত রায় সম্পাদিত ‘জাহানকোষা’ (১৯৭৬), বহরমপুর থেকে পার্থসারথী সিংহ সম্পাদিত সাহিত্যপত্র ‘প্রত্যয়’ (১৯৭৫), নেপাল সরকার সম্পাদিত বেলডাঙ্গা থেকে ‘কিংশুক’ (১৯৭৫) সমীরণ ঘোষ সম্পাদিত ‘স্বয়ম্বর’ (১৯৭৫), খাগড়া থেকে অচিন্ত্য বসু সম্পাদিত ‘তমোঘ্ন’ (১৯৭৬), সৈয়দ খালেদ নৌমান সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘ফসল’ (১৯৭৬), শান্তিময় মুখোপাধায় ও শুভ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘রৌরব’ (১৯৭৭), আনন্দগোপাল দে সম্পাদিত ‘পথিক’ (১৯৭৭), ভগবানগোলা থেকে এবাদুল হক সম্পাদিত ‘রঙধনু’ (১৯৭৭) (পরে এটি ‘আবার এসেছি ফিরে’ নামে প্রকাশিত হয়।) প্রাণরঞ্জন চৌধুরী সম্পাদিত পাক্ষিক ‘গণকন্ঠ’ (১৯৭৭), কান্দি থেকে মানিক বসু ও তুলসি দাস সম্পাদিত ‘অরণি’ (১৯৭৮), সত্যরঞ্জন বকসী সম্পাদিত প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ‘দৈনিক নতুন বাজার’ (১৯৭৮*), অশোক দে ও বিপ্লব সম্পাদিত ‘সংশপ্তক’ (১৯৭৯), কানাপুকুর, ভগবানগোলা থেকে এবাদুল হক সম্পাদিত ‘আবার এসেছি ফিরে’ (১৯৭৯), অরূপ চন্দ্র সম্পাদিত ‘বাসভূমি’ (১৯৮০), রঞ্জন চৌধুরী সম্পাদিত ‘রাইটার্স গিল্ড’ (১৯৮০), লালগোলা থেকে সুকুমার সাহা সম্পাদিত ‘আগ্রহী’ (১৯৮০), ষাট ও সত্তর দশকের উত্তাল সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে নতুন নির্মাণের সংকল্প নিয়ে রাষ্ট্র ও সকল প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরতে ১৯৬৬ সালে দীপংকর চক্রবর্তীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘অনীক’। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই পত্রিকাটি সরকারের বিষ নজরে পড়ে। কিছুদিন পরেই গ্রেপ্তার হন দীপংকর চক্রবর্তী ও সুকান্ত রাহা। এই সময় কিছুদিনের জন্য ‘অনীকে’র সম্পাদনা বন্ধ ছিল। জেল থেকে মুক্তির পর পুনরায় ‘অনীকে’র প্রকাশনা শুরু হয়। ২০০৩ সালে সম্পাদক দীপংকর চক্রবর্তী কলকাতা চলে গেলে পত্রিকার দপ্তরও কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। এখনও ‘অনীক’ যোগ্যতার সঙ্গে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। ‘ঝড়’ প্রথম থেকেই মুর্শিদাবাদের সংবাদ ও সাহিত্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে গেছে। এখনও পত্রিকাটি নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়ে এই জেলার সংবাদ ও সাহিত্যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে। ১৯৭০ এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয় অরূপ চন্দ্রের ‘রক্তপত্র’। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সম্পাদক প্রশাসনের রক্তচক্ষুর সামনে পড়েন। আত্মগোপন করতে বাধ্য হন অরূপ চন্দ্র। রক্তপত্রে লিখতেন শক্তিনাথ ঝা, অরূপ চন্দ্র, অমিতাভ মৈত্র, প্রশান্ত মজুমদার, দাউদ হোসেন, মিহির কুমার দত্ত প্রমুখ। এই সময়কালের মধ্যেই ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় শুভ চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘রৌরব’। সমীরণ ঘোষের ‘সয়ম্বর’ পরে সাহিত্যের বৃহত্তর অঙ্গনে নিজেদের ছড়িয়ে দিতে নাম পাল্টে ‘রৌরব’ হয়েছিল বলে ‘সয়ম্বর’ পত্রিকার সম্পাদক সমীরণ ঘোষের অভিমত। ‘রৌরবে’ লিখতেন নারায়ন ঘোষ, তাপস ঘোষ, আবুল বাসার, শুভ চট্টোপাধ্যায়, সমীরণ ঘোষ, শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়ের মতো  ব্যক্তিত্বরা। ‘রৌরব’কে বলা হত ‘মুর্শিদাবাদের কল্লোল’। এছাড়াও উৎপল গুপ্তের সম্পাদনায় ‘সময়’, নারায়ণ ঘোষ ও তাপস ঘোষের সম্পাদনায় ‘নরকের তাপ’, মণীশ ঘটকের সম্পাদনায় ‘বর্তিকা’, রাজেন উপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘অনম’, সমীরণ ঘোষের সম্পাদনায় ‘সয়ম্বর’, অচিন্ত্য বসুর সম্পাদনায় ‘তমোঘ্ন’ ইত্যাদি ছিল ষাট-সত্তর দশকের প্রথম শ্রেণির সাময়িক পত্রিকা। এই সমস্ত পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবুল বাসার, দ্বীপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, গুনময় মান্না, অজিত বাঈরি, সৈয়দ খালেদ নৌমান, সমীরণ ঘোষ, উৎপল গুপ্ত, বিজয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, পুলকেন্দু সিংহ, শক্তিনাথ ঝা, সৌমেন্দ্রকুমার গুপ্ত, নিহারুল ইসলাম, প্রকাশ দাস বিশ্বাস প্রমুখ, চন্দ্রপ্রকাশ সরকারের মতো ব্যক্তিত্বরা। এঁদের মধ্যে সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবুল বাসার, গুণময় মান্না, অজিত বাঈরি বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। মুর্শিদাবাদের এই সমস্ত পত্রপত্রিকায় পুরাতত্ত্ব অনুসন্ধান করেছেন বিজয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, নৃতাত্ত্বিক ও আদিবাসী লোকসংস্কৃতির অনুসন্ধান করেছেন পুলকেন্দু সিংহ, বাউল সংস্কৃতির গবেষণা করেছেন শক্তিনাথ ঝা এবং কৃষক ও নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষের গবেষনা করেছেন সৌমেন্দ্রকুমার গুপ্ত।  

আরও পড়ুন: বাড়ছে তাপমাত্রা, জ্বলছে ইউরোপ

‘আসলে সত্তর দশকের রক্তঝরা সময় অনিবার্যভাবেই লেখক শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অধিকাংশকেই রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে কলম চালনায় এগিয়ে দিয়েছিল, কিছুটা মাটির গন্ধ গায়ে মাখতে সাহায্য করেছিল। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রত্ন অনুসন্ধানে নব পুনর্মূল্যায়নে উদ্যোগী করে তুলেছিল। অতীতের রাজনৈতিক, মনীষী, লেখক-শিল্পীদের শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মূল্যায়ন করার সাহস জুগিয়েছিল। তাই গতানুগতিক সাহিত্যের খোলস ছিঁড়ে বিষয় ও আঙ্গিককে ভেঙে উঠে আসছিল মানুষের দুঃখ, কষ্ট আর লড়াইয়ের কথা। নাটক, যাত্রা, সিনেমা সর্বত্রই এই নবচেতনার স্ফুলিঙ্গ মাঝেমাঝেই ঝলসে উঠছিল কখনও প্রকটভাবে কখনও প্রতীকী মোড়কে। আর সেই সাহিত্যের প্রধান মাধ্যমই ছিল লিটল ম্যাগাজিন। মুর্শিদাবাদের লিটল ম্যাগাজিন এবং মুর্শিদাবাদের কবি সাহিত্যিকরাও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন না।’ (সত্তর দশকের মুর্শিদাবাদের লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্য: অরূপ চন্দ্র। অতঃপর…, বাংলা সাময়িক পত্রের  দুশো বছর: সম্পাদনা – সাইদুর রহমান।)

আশির দশক পরবর্তী সময়

সত্তর দশকের মতো না হলেও আশির দশকের প্রকাশিত পত্রিকাগুলোও এই জেলার সাময়িকপত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল স্বাক্ষ্য বহন করে যাচ্ছে। এই সময় বেরিয়েছিল বেলডাঙা থেকে প্রদীপ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কিংশুক’ (১৯৮১), রাকিবুদ্দিন ইউসুফ ও হাতেমূল ইসলাম সম্পাদিত ‘জঙ্গম’ (১৯৮২), জঙ্গিপুর থেকে অপূর্বকুমার সেন সম্পাদিত ‘জঙ্গীপুর বার্ত্তা’ (১৯৮২), কান্দি থেকে নন্দিতা হাটুই সম্পাদিত ‘রাঢ় দর্পণ’ (১৯৮২), খড়গ্রাম থেকে প্রবীর দে সম্পাদিত ‘মহীরুহ’ (১৯৮৩), দীপঙ্কর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘মুর্শিদাবাদ সমীক্ষা’ (১৯৮৩), অপূর্ব ব্যানার্জি সম্পাদিত ছাত্রছাত্রীদের পত্রিকা ‘আয়ূধ’ (১৯৮৪), রোহিণী দাস সম্পাদিত পাক্ষিক ‘নাগরিক কণ্ঠ’ (১৯৮৪), দীপঙ্কর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘মুর্শিদাবাদ বীক্ষণ’ (১৯৮৪), চন্দন বিশ্বাস সম্পাদিত ‘শমীবৃক্ষ’ (১৯৮৫), (পরে এই পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন রবীন বিশ্বাস), প্রকাশ দাস বিশ্বাসের সম্পাদনায় ত্রৈমাসিক বিজ্ঞান পত্রিকা ‘এবং কী কে ও কেন’ (১৯৮৬), বিমান হাজরা সম্পাদিত ‘জঙ্গীপুরের চিঠি’ (১৯৮৬), লালগোলা থেকে জয়নুল আবেদিন সম্পাদিত পাক্ষিক ‘মৌসুমী’ (১৯৮৬) (পরে ১৯৮৭ সাল থেকে ‘রঙ্গধনু’ নামে নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে), ডোমকল থেকে সদর আলি ও সামশুল আলম সম্পাদিত ‘চাতক’ (১৯৮৬), গণকর থেকে নুরুল আমিন বিশ্বাস সম্পাদিত ‘শাব্দিক’ (১৯৮৭), কান্দি থেকে শান্তনু বিশ্বাস ও সোমনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘উৎসব’ (১৯৮৮) (পরে এই পত্রিকার নাম পাল্টে হয় অমলকান্তি।), লালবাগ থেকে অপূর্বকুমার সেন সম্পাদিত ‘মুর্শিদাবাদের গ্রামীণ সংবাদ’ (১৯৮৯), সৈয়দ খালেদ নৌমান সম্পাদিত ‘অর্কেষ্ট্রা’ (১৯৮৯), ডিহিপাড়া থেকে নবিউল ইসলাম সম্পাদিত ‘প্রদর্শিকা’ (১৯৯০), লালগোলা থেকে সুকুমার সাহা সম্পাদিত ‘ভালমন্দ’ (১৯৯১), অভিজিৎ রায় সম্পাদিত ‘আকাশ’ (১৯৯২), জলঙ্গি থেকে গণপতি ভৌমিক সম্পাদিত ‘উদয়ণ’ (১৯৯৩), সুকুমার সিংহ সম্পাদিত বহরমপুর নাগরিক সমিতির মুখপত্র ‘নাগরিক’ (১৯৯৬), বিপ্লব বিশ্বাস সম্পাদিত ‘বোধোদয়’ (১৯৯৭), আলপনা রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘জঙ্গীপুর নারীকণ্ঠ’ (১৯৯৭), ডোমকল থেকে হজরত আলি ও তৌহিদুল ইসলাম সম্পাদিত ‘চোখ’ (১৯৯৮), মিঠু সাহা সম্পাদিত ‘সংবাদ সেবিকা’ (১৯৯৯), কাঞ্চনকুমার সিংহ চৌধুরী সম্পাদিত ‘রাঢ় সন্দেশ’ (২০০০), নুরুল আমিন বিশ্বাস সম্পাদিত ‘ঐক্যতান; (২০০০), এবং নীহারুল ইসলাম সম্পাদিত ‘খোঁজ’ (২০০০)। এই সময়কালের মধ্যের কিছু পত্রপত্রিকা এখনও যোগ্যতার সঙ্গে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। 

আরও পড়ুন: ‘অবন ও রবি’ স্বয়ং

শূন্য দশক পরবর্তী (সাম্প্রতিক কাল)

শূন্য দশক পরবর্তী সময়ে মুর্শিদাবাদ জেলায় বেশকিছু পত্রপত্রিকা নতুনভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তারমধ্যে বড়ঞা থেকে কালিকুমার দাস সম্পাদিত ‘শিলোঞ্চ’ (২০০০), চালতিয়া থেকে রাহুল ঘোষের সম্পাদনায় ‘ভাষা’ (২০০২), হরবিলাস সরকারের সম্পাদনায় ‘সৃজনী’ (২০০২) (পরবর্তীতে এই পত্রিকা ‘মুর্শিদাবাদ সৃজনী’ নামে খাদিজা বানুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে), শুভংকর চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘রোদ রং’ (২০০৩), দেবাশিস সাহা সম্পাদিত আলোচনার কাগজ ‘ছাপাখানার গলি’ (২০০৪), লক্ষ্মীনারায়ণ সেন সম্পাদিত মুর্শিদাবাদ জেলা কবিতা অ্যাকাডেমির মুখপত্র ‘শব্দমৈলী’ (২০০৪), (পরে এই পত্রিকা কুশলকুমার বাগচীর সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে), দিলীপ দাস সম্পাদিত বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা ‘বিজ্ঞান ভাবনা’ (২০০৫), অনুপমা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘ইচ্ছে ফড়ি’ (২০০৭), মামুন হাসান নির্ঝর সম্পাদিত ‘অথচ’ (২০০৭), সমীর ঘোষ সম্পাদিত ‘অনুভব’ (২০০৮), তাপস সরখেল সম্পাদিত ‘পথ’ (২০০৯) (বর্তমানে ‘পথ’ সম্পাদনা করেন সুগত সেন), মৌসুমী হালদার সম্পাদিত ‘মহার্ণব’ (২০১০), নীলিমা সাহা ও নিখিল কুমার সরকার সম্পাদিত ‘নিনি’ (২০১৩) মহম্মদ জিকরাউল হক সম্পাদিত ‘পাসওয়ার্ড’ (২০১৩) সাইদুর রহমান সম্পাদিত সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘অতঃপর…’ (২০১৪), গোপাল বাইন সম্পাদিত ‘ঘাট পেরিয়ে’ (২০১৪), এমদাদুল হক সম্পাদিত ‘পরি’ (২০১৬), এবাদুল হক সম্পাদিত ‘এবং পুনশ্চ’ (২০১৮), সুগত সেন সম্পাদিত প্যাপিলিও পেন্টার্সের মুখপত্র ‘প্রাহ্ণ’ (২০২০)।    

আরও পড়ুন: সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর

বারোবছরের বাছাই সংকলন। প্রচ্ছদ: গণেশ পাইন

মুর্শিদাবাদ থেকে প্রকাশিত এই সমস্ত পত্রপত্রিকায় একদিকে যেমন জেলার সংবাদকে সাবলীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি এই সমস্ত পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে লিখে পরবর্তীতে অনেকেই সাহিত্য জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। এখনও বেশকিছু পত্রপত্রিকা যোগ্যতার সঙ্গে সুন্দরভাবে নিয়মিত প্রকাশ হয়ে চলেছে। কিছু পত্রপত্রিকা আছে অনিয়মিত। হয়তো পত্রপত্রিকা সম্বন্ধে তাঁদের অভিজ্ঞতার অভাব, অর্থের অভাব, দায়বদ্ধতার অভাব ও পেশাদারিত্বের অভাবের জন্য ধীরে ধীরে এই পত্রিকাগুলো অনিয়মিতভাবে প্রকাশ হচ্ছে। তবুও যে প্রকাশ হচ্ছে, এটাই এই সময়ের সবথেকে ইতিবাচক দিক।

ঋণস্বীকার
১। মুর্শিদাবাদ ইতিবৃত্ত (চতুর্থ খণ্ড), সম্পাদনা – অরূপ চন্দ্র।
২। মুর্শিদাবাদের সংবাদ ও সাময়িকপত্র: প্রকাশ দাস বিশ্বাস।
৩। মুর্শিদাবাদ জেলার সাময়িকপত্র: একটি পর্যালোচনা – নারায়ণ সরকার
৪। বাংলা সাময়িকপত্রের  দুশো বছর, সম্পাদনা – সাইদুর রহমান।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *