মুর্শিদাবাদের বন্যা ও নদী ভাঙন: ফরাক্কা ব্যারেজের প্রভাব

সাইদুর রহমান

‘নদীর এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা’। মুর্শিদাবাদ জেলার ক্ষেত্রে কথাটি নির্মম সত্য। স্বাধীনতার আগে থেকেই প্রতিবছর নিয়ম করে এই জেলার কোনও না কোনও অংশে ভাঙন আসে। নিয়মমতো কিছুদিনের জন্য সরকারি ব্যস্ততা চোখে পড়ে। তারপর সব চুপ করে যায়। আবার সবহারাদের দলে নতুন করে কিছু মানুষ নাম লেখায় প্রতিবছর। কিন্তু, ভাঙন বন্ধ হয় না।

গঙ্গা ও পদ্মা

মুর্শিদাবাদ জেলার ভৌগোলিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করে আছে দু’টি নদী— গঙ্গা ও পদ্মা। মূল গঙ্গা নদী ফরাক্কা পেরিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলার কিছুটা ভেতরে এসে জঙ্গিপুরের বেশ কিছুটা উত্তরে ছাপঘাটির কাছে দুই অংশে ভাগ হয়ে গেছে। দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত অংশটি ভাগীরথী (বা মূল গঙ্গা) নামে পরিচিত। এই ভাগীরথী নদীই মুর্শিদাবাদ জেলাকে সমান দু’টি অংশে ভাগ করেছে। আর উত্তর দিকে প্রবাহিত বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত অংশটি পদ্মা। এই পদ্মা নদী মুর্শিদাবাদ জেলার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রচনা করেছে। ফরাক্কা থেকে মুর্শিদাবাদ জেলার শেষ সীমান্ত জলঙ্গি পর্যন্ত পদ্মা নদী কখনও বাংলাদেশে কখনও মুর্শিদাবাদের ভেতর দিয়ে এঁকে-বেঁকে এগিয়ে গেছে। ডাচ, পর্তুগিজদের আঁকা মানচিত্র ও নদী বিশেষজ্ঞদের অভিমতানুযায়ী— ‘প্রথমত, গঙ্গা নদীর মূলধারা দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ভাগীরথীর পথেই প্রবাহিত হত। তখন হয় পদ্মাপথের অস্তিত্বই ছিলনা, অথবা থাকলেও, তা ছিল গঙ্গা-ভাগীরথীরই উপচে পড়া প্রবাহ (Spill channel) অথবা বিচ্ছিন্ন একটি ছোট নদী হিসাবে। দ্বিতীয়ত, দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত গঙ্গার মূলধারা কোনোবার ভাগীরথীর পথে কোনোবার পদ্মাপথে প্রবাহিত হত। তৃতীয়ত, ষোড়শ শতাব্দী থেকে গঙ্গার জলধারার প্রধান অংশই পদ্মাপথেই প্রবাহিত হয়ে আসছে’। (পদ্মাপথের ইতিকথা— সৌম্যেন্দ্রকুমার গুপ্ত, ঝড়)।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা আন্দোলনে মুর্শিদাবাদ

ছবি সংগৃহীত

গঙ্গা নদীর পদ্মাপথে প্রবাহিত হওয়ার কয়েকটি কারণ ছিল। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে কোশী নদী বিহারের রাজমহল পাহাড়ের কাছে এসে গঙ্গা নদীর সঙ্গে মেশে। এরফলে বিপুল জলরাশি কোশী নদীর মাধ্যমে গঙ্গায় এসে পড়ে। ফলে উত্তর ভারত থেকে মূলগঙ্গা দিয়ে বয়ে আসা বিপুল জলস্রোত ও কোশী নদীর প্রবল গতিসম্পন্ন জলধারা রাজমহলের কাছে একসঙ্গে মিলিত হয়ে রাজমহল পাহাড়ে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারে জলপ্রবাহকে প্রভাবিত করে উত্তরমুখী করে তোলে। এরফলে মূলগঙ্গা ধীরে পদ্মার অভিমুখে ধাবিত হয় এবং মুর্শিদাবাদ ও মালদহের নদী ভাঙনের প্রবণতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ জেলার সংবাদ-সাময়িক পত্রের দু’শো বছর

দ্বাদশ শতাব্দীতে গঙ্গা-সহ বাংলার নদনদী। ছবি সৌজন্য: ঝড় পত্রিকা

ফারাক্কা ব্যারেজ পরিকল্পনা ও নির্মাণ

বর্ষাকাল বাদ দিলে বছরের বেশিরভাগ সময়, বিশেষ করে শুখা মরশুমে ভাগীরথী নদীতে জলপ্রবাহ থাকত না। ভৌগোলিক মতে, পদ্মার খাতটি ভাগীরথীর তুলনায় প্রায় এক মিটার নিচে অবস্থিত। তাই ভাগীরথী নদী বছরে প্রায় ৯ মাস জলবিচ্ছিন্ন থাকত। সেই অষ্টাদশ শতকেই জেমস রেনেল লিখে গেছেন, ‘The Cossimbazar river is almost dry from October to May’। তখন গঙ্গা থেকে ভাগীরথী নদীতে জাহাজ ঢুকতে পারত না। উত্তর ভারত থেকে সমস্ত পণ্যদ্রব্য জাহাজ থেকে মুর্শিদাবাদের সূতির কাছে নামিয়ে দেওয়া হত। তারপর স্থলপথে সেগুলো জঙ্গিপুরে নিয়ে এসে ছোট ডিঙিতে বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হত কাশিমবাজার। আর পূর্ববঙ্গ ও অসম থেকে জাহাজ ও স্টিমারগুলো জলঙ্গি-মাথাভাঙা দিয়ে যাতায়াত করত। উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে এই নদীপথও পরিত্যক্ত হয়।

গঙ্গা নদীর জল ভাগীরথী দিয়ে প্রবাহের কথা প্রথম চিন্তা করেছিলেন ব্রিটিশ সরকার। উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চেম্বার অব কমার্সের প্রস্তাব অনুসারে, ব্রিটিশ সরকার মুর্শিদাবাদের ভাগীরথীর উৎসমুখ কেটে জল আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরপর ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা ধীরে তীব্র হতে শুরু করলে ব্রিটিশ সরকার বিষয়টি নিয়ে আর এগোয়নি। স্বাধীনতার পর স্বাধীন সরকার কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করতে ভাগীরথী নদীতে পর্যাপ্ত জলের প্রবাহ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ এবং চার বাঙালি যুগপুরুষ

গঙ্গা ও পদ্মা যেভাবে মুর্শিদাবাদের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ছবি গুগল

আবার ডিভিসি ও দুর্গাপুর ব্যারেজ নির্মাণের আগে দামোদর, ময়ূরাক্ষী, দ্বারকা, বাবলা ইত্যাদি নদীর জল বর্ষা ও শুখা মরশুমেও হুগলি নদীতে গিয়ে পড়ত। ১৯৪৮ ও ১৯৫৫’তে যথাক্রমে ডিভিসি ও দুর্গাপুর ব্যারেজ নির্মাণের পর শুধু বর্ষার সময়ের কয়েকটি দিন ছাড়া হুগলি নদী বেশি জল পেল না। হুগলি নদীর নাব্যতা কমতে শুরু করল। এরফলে ফরাক্কা থেকে আহিরণ পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিমি ফিডার ক্যানেল তৈরি করে গঙ্গার জল নিয়ে এসে ভাগীরথী নদীতে ফেলার কথা চিন্তা করা হল। তৈরি হল ফরাক্কা ব্যারেজ পরিকল্পনা। ১৯৬১ সালে ফরাক্কা ব্যারাজের কাজ শুরু হয়। আর কাজ শেষ হয়ে চালু হয় ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল। ফরাক্কা থেকে জঙ্গিপুর, প্রায় চল্লিশ কিমি ফিডার ক্যানেল তৈরি করে গঙ্গা থেকে জল ভাগীরথীতে নিয়ে এসে ফেলা হয়।

বন্যা ও নদী ভাঙন

মুর্শিদাবাদ জেলার ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি ব্লকই পদ্মা নদীর পাড়ে। এরমধ্যে রয়েছে ফরাক্কা, ধূলিয়ান, জঙ্গিপুর, লালগোলা, ভগবানগোলা, আখরিগঞ্জ ও জলঙ্গির মতো শহর। বর্ষার মরশুমে বন্যা এখানে নিয়তি নির্ধারিত। ফলে এই সমস্ত অঞ্চলে ভাঙন লেগেই থাকে। তবে মুর্শিদাবাদের নদী ভাঙনের ইতিহাস নতুন নয়। স্বাধীনতার আগেও মুর্শিদাবাদের এইসব অঞ্চলে মাঝেমাঝেই বন্যা হয়েছে ও নদীতে ভাঙন হয়েছে। স্বাধীনতার পরেও বন্যা হয়েছে ও ধারাবাহিকভাবে ভাঙন চলেছে এবং সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে ভাঙনের কেন্দ্রস্থলও। গত একশো বছরের এই সমস্ত অঞ্চলের মানচিত্র দেখলে ভাঙনের ভয়াবহ রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৪২ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে গঙ্গার ভাঙনে সাকোপাড়া থেকে লোহাপুর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার বিচ্ছিন্ন রেলপথ নতুন করে তৈরি করতে হয়েছিল। আহিরণ থেকে ধূলিয়ান পর্যন্ত ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক আরও পশ্চিমে সরিয়ে নির্মাণ করতে হয়েছে। আর ধূলিয়ান শহরটি অন্তত ছ’বার ভেঙে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে নতুন করে গড়ে তুলতে হয়েছে।

আরও পড়ন: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ

ছবি সৌজন্য: তন্ময় ভাদুড়ি, science the wire

তবে ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরি হওয়ার পর মুর্শিদাবাদের ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। বেড়েছে বন্যার প্রবণতাও। আশির দশকে ধূলিয়ান অঞ্চলের গিরিয়া, খেজুরতলা, মিঠিপুর সেখালিপুর, ফাজিলপুর অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হয়। এরফলে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে পদ্মায় ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকে। এই সময় ভগবানগোলা ২নং ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মাগর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। জেলার মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যায় আখরিগঞ্জ, হনুমন্তনগর, টিকলিচর, চরকেষ্টপুর, চিলমারি, হাসানপুর, গিরিধারীপুর, রাজাপুর সহ আরও বহু গ্রাম। ভাঙনে তলিয়ে যায় আখরিগঞ্জের ২৭৬৪টি বাড়ি, স্থানীয় বাজার, স্কুল, ব্যাঙ্ক। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় জলঙ্গিগামী পাকা সড়ক। আর সরকারি হিসাবে গৃহহীনের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩,৩৯৪ জন। বেসরকারি মতে সংখ্যাটা আর অনেক বেশি। এই সময়ের পর থেকেই মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত নির্মল চরের উৎপত্তি।

আখরিগঞ্জের ভাঙন কিছুটা স্থিতিশীল হলে ১৯৯৪ সালে আক্রান্ত হয় জলঙ্গি শহর। বাজার ও এলাকার অর্ধেক এবং করিমপুরগামী ১১ নম্বর রাজ্য সড়কের খানিক অংশ পদ্মা গ্রাস করে। ২০০০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত সমশেসেরগঞ্জ ব্লকের প্রতাপগঞ্জ, চাচন্ড, নিমতিতা অঞ্চলের গঙ্গা তীরস্থ ধানঘরা, হীরানন্দপুর, নতুন শিবপুর, ধুসুরি পাড়া, কামালপুর ইত্যাদি গ্রামে নদীবক্ষে বিলীন হয়ে যায়। তিনটি গ্রামের তিন শতাধিক বাড়ির আর কোনও চিহ্নেরই অস্তিত্ব নেই। এভাবে চললে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কাটাখালি, নাড়ুখাকি, মিথিপুর, বাজিতপুর জেলার মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে বলেই আশঙ্কা। বর্তমানে এই বছর নির্মল চর সহ ভগবানগোলা, জলঙ্গি এলাকার বহু অঞ্চল বন্যা প্লাবিত হয়ে আছে। গঙ্গার সঙ্গে পদ্মারও জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক দিনে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও হালকা ভাঙন দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

বন্যার তোড়ে সেতুর মতো ঝুলছে রেললাইন। ছবি সৌজন্য: ঝড় সাপ্তাহিক

জেলার দক্ষিণ অংশে ময়ূরাক্ষী, ব্রাহ্মণী, কুইয়ে, দ্বারকা ইত্যাদি নদী ও তাদের শাখা নদীগুলি প্রচুর জল বহন করে নিয়ে এসে কান্দির কাছে হিজল বিলে পড়েছে ও সেখান থেকে বাবলা নদী হয়ে ভাগীরথীতে গিয়ে পড়েছে। এইসব নদীর আশপাশের এলাকা যেমন খড়গ্রাম, নবগ্রাম, কান্দি, ভরতপুর, বড়ঞা, সাগরদিঘি ইতাদি এলাকায় বর্ষার মরশুমে প্রায় বছর প্রচুর বন্যা হয়। ১৯৯৮ এবং ২০০০ সালের বন্যা এই এলাকার স্মরণীয় বন্যা।

কেন এই বন্যা, কেন এই ভাঙন

মুর্শিদাবাদ জেলার ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙনের পেছনে কিছু কারণ আছে। ১) জল নিকাশি ব্যবস্থার অভাব: যারফলে প্রচুর বৃষ্টিপাতের জল একটি নির্দিষ্ট এলাকায় দাঁড়িয়ে যায়। ) নদীর জল: যা দু’কূল ছাপিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে। বিশেষ করে দক্ষিণ মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই দু’টি কারণে বেশি বন্যা দেখা যায়। ৩) হুগলি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াও একটি বিশেষ কারণ। আগেই বলেছি, ডিভিসি ও দুর্গাপুর ব্যারাজ নির্মাণের ফলে হুগলি নদীর নাব্যতা অনেক কমে গেছে। কারণ, বর্ষাকালে দামোদর বা ময়ূরাক্ষীর ঢাল বেয়ে যে জল সরবরাহ হয়, তাতে হুগলির বুকে সারাবছর ধরে পলি জমে যে চড়া পড়ে, তাকে সরানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে হুগলি নদীর নিম্নাংশে ভাগীরথী ও অন্যান্য নদীর মিলিত প্রবাহ নিকাশের পথ না পেয়ে উজানে বইতে থাকে। অন্যদিকে, ময়ূরাক্ষী, অজয়, বাবলা ইত্যাদি নদীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। ঠিক এই কারণেই ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল ও কালুখালির বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা লন্ডভন্ড করেছিল।

৪। ফরাক্কা ব্যারাজের প্রভাব: ফরাক্কা ব্যারাজে স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাগীরথী ও হুগলি নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করে কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করা। আর ভাগীরথী-হুগলি নদীতে ব্যারাজের উজানে ৪০ কিলোমিটার এবং ভাটিতে ৮০ কিলোমিটার অংশে ভাঙন এবং ভূমিক্ষয় রোধের দায়িত্বও ছিল ফরাক্কা কর্তৃপক্ষের উপর। 

ব্যারাজ চালু হলে দেখা যায়, গঙ্গার প্রধান খাত ব্যারাজের উজানে বামতীরে এবং ভাটিতে ডান তীরে প্রবাহিত হচ্ছে। এরফলে নদীর মরফোলজি অনুযায়ী নদীর ডান তীরে নদীখাত গভীর হতে থাকে। আর বাম তীরে সঞ্চিত হতে থাকে পাহাড় সমান পলি। ফলে ধূলিয়ান, অরঙ্গাবাদ, বিশ্বনাথপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় চিরস্থায়ী ভাঙনের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে জঙ্গিপুরের কাছে পদ্মার পাড় ভেঙে ভাগীরথীকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। আর জেলার তেরোটি ব্লক থেকে হারিয়ে গেছে কয়েক হাজার একর কৃষিজমি ও বসতি এলাকা। গঙ্গা-পদ্মার ভাঙন রোধ করতে না পারলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।

আরও পড়ুন: জনঅরণ্যে সম্প্রীতির বার্তা

২০০০ সালের ১৭ জুলাই ‘বন্যা ভাঙন প্রতিরোধ কমিটি’র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন নহিরুদ্দীন। ছবি সৌজন্য: বিষয় মুর্শিদাবাদ। ঝড়। ডিসেম্বর, ২০০৭

অন্যদিকে, ফরাক্কা ব্যারাজ তৈরি হওয়ার পর দীর্ঘ গতিপথে গঙ্গা নদী রাজমহল পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে জোরে প্রবাহিত হয়ে আবার ফরাক্কায় ধাক্কা মারে। এরফলে ফরাক্কা ব্যারাজের উত্তর থেকে দক্ষিণ-পূর্বে সুবিশাল এলাকাজুড়ে অববাহিকার সৃষ্টি হয়েছে। এরফলে মালদহ জেলাতেও প্রতি বছর বন্যা আর ভাঙন লেগেই থাকে। ভূতনীর চর থেকে ফরাক্কার মধ্যে গঙ্গা ক্রমাগত বাম পাড় ভেঙে সৃষ্টি হয়েছে এক বিরাট বাঁক।

ফরাক্কার বাঁধ নির্মাণের ফলে ভাগীরথী নদীর জন্য প্রয়োজন ছিল ৪০ হাজার কিউসেক জলের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বর্ষাকাল ছাড়া শুখা মরশুমে ওই পরিমাণ জল পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে চার দশক পরেও আজও কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের নাব্যতার সমস্যার সমাধান হয়নি। পরিবর্তে জল স্বল্প প্রবাহের জন্য হুগলি নদীর মোহনায় জমে যায় প্রায় দুই হাজার কোটি ঘনমিটার পলির পাহাড়। ঠিক যে, নদী ভাঙন সহজাত। স্বাভাবিক তার গতিপ্রবাহ। কিন্তু, নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ যেকোনও কারণে রুদ্ধ হলে নানান বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সেদিক থেকে ফরাক্কা ব্যারাজ ভাঙন বিপর্যয়কেই ত্বরান্বিত করেছে। ক্রমাগত ভাঙনে গঙ্গার তীরে বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের জীবনযাপন আজ ঘোর সংশয় আর অনিশ্চয়তার পথে দাঁড়িয়ে আছে। 

আরও পড়ুন: শ্রমিকের সামান্য ‘পান্তা ভাতে’ একটু লবণের ব্যবস্থার হোক

ছবি সৌজন্য: তন্ময় ভাদুড়ি, science the wire

অথচ ফরাক্কা ব্যারাজের উজান-ভাটিতে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাঙন প্রতিরোধের দায়িত্ব ব্যারাজ কর্তৃপক্ষের। প্রতিবছর ভাঙন প্রতিরোধের নামে মালদহ-মুর্শিদাবাদের কোটি টাকা ব্যয় করে বোল্ডার দিয়ে নদীর পাড় বাঁধানো হয় বর্ষার শুরুতে। তৈরি করা হয় স্পার। আর ভারী বর্ষণে সব ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যায়। বাস্তুচ্যুত মানুষ হন্যে হয়ে আশ্রয় খোঁজে। জলে ভেসে যায় গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি। কিন্তু, মানুষ কতই বা সহ্য করবে। ২০০০ সালের ১৭ জুলাই, ‘মুর্শিদাবাদ জেলা বন্যা ভাঙন প্রতিরোধ কমিটি’ প্রতিরোধ আন্দোলনে শামিল হয়। সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন নহীরুদ্দিন নামে এক সর্বহারা ক্ষেতমজুর। তারপর আন্দোলন এক বিশেষ মাত্রায় পৌঁছলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আজও বছর আসে, বছর যায়। বন্যা আর ভাঙনে ঘরছাড়া হয় বহু মানুষ। পরিযায়ী হন অনেকেই। যেমন এখন ভাসছে নির্মল চর।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *