আবার মুসোলিনি: বংশপরিচয়ের টানাপোড়েনে ইতালির ফুটবল

শুভ্রাংশু রায় ও ইন্দ্রজিৎ মেঘ

মাত্র ৮ দিন আগে ১৮ বছরে পড়েছেন এই তরুণ ফুটবলার। তবে, যত বিপত্তি বেঁধেছে তাঁর নাম এবং বংশপরিচয়কে ঘিরে। কারণ তিনি ইতালির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনিতো মুসোলিনির প্রপৌত্র। তাঁর নাম? রোমানো বেনিতো ফ্লোরিয়ানি মুসোলিনি। ইতালিয়ান মিডিয়া তাঁকে ‘জুনিয়র মুসোলিনি’ নামে ডাকে। ২৭ জানুয়ারি, ২০০৩-এ জন্মানো এই ফুটবলার ডিফেন্ডার হিসাবে লাৎসিওতে সুযোগ পেয়েছেন। তিনি রাজনীতিবিদ আলেসান্দ্রো মুসোলিনির পুত্র এবং একইসঙ্গে ইতালিয়ান ফ্যাসিবাদী স্বৈরাশাসক বেনিতো মুসোলিনির নাতি।

বিপত্তি হল, লাৎসিওর জুনিয়র দলে তিনি সুযোগ পাওয়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কেন সুযোগ পাবেন স্বৈরাশাসকের নাতি, এই নিয়ে চলছে বিক্ষোভ। দক্ষিণপন্থী ক্লাব হিসাবে পরিচিত লাৎসিওর অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে ইতিমধ্যেই তিনটি ম্যাচে অংশ নিলেও দ্বিতীয় ম্যাচের পরেই বিক্ষোভের মধ্যে পড়েছেন এই তরুণ ফুটবলার। যদিও ফ্লোরিয়ানি মনে করেন যে, তাঁর নাম বংশপরিচয় দিয়ে বিচার করা হবে না। তিনি সংবাদপত্র ‘ইল মেসেগ্রেগ্রো’কে বলেন― ‘‘লাৎসিওতে আমি কেবলমাত্র খেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছে, পদবি মুসোলিনি বলে নয়। আশা করি, একদিন আমি সিনিয়র দলের হয়েও অভিষেক ঘটাব।”

এদিকে যুবদলের কোচ মাউরো বিয়ানচেসিও তাঁর দলের এই তরুণ ফুটবলারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মুসোলিনির বংশপরিচয়কে নিয়ে বিতর্ককে ডজ মেরে তিনি বলেছেন, ‘‘ওর মধ্যে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সিরিএ খেলার স্বপ্ন দেখছে। ফুটবলই ওর আসল পরিচয়।”

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ১৯২২-১৯৪৩ এই সময়কালে ফ্যাসিবাদী অভ্যুত্থানের সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফ্লোরিয়ানির ঠাকুরদা বেনিতো মুসোলিনি। যাঁর কর্মপদ্ধতি বিশ্বজুড়ে নিন্দিত হয়েছিল। মুসোলিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান একনায়ক এডলফ হিটলারের একান্ত বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁকে প্রভাবিতও করেছিলেন। মুসোলিনি ১৯৪০ সালে অক্ষশক্তির পক্ষে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যোগদান করেন। তিন বছর পর মিত্রবাহিনী ইতালি আক্রমণ করে। ১৯৪৫ সালে সুইৎজারল্যান্ডে পালাবার সময় তিনি কমিউনিস্ট প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং পরে তাঁকে দেশের মাটিতেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বযুদ্ধে মুসোলিনি এবং তাঁর অক্ষশক্তি পরাজিত হয়। কিন্তু মৃত্যুর পরেও বিড়ম্বনা কমেনি মুসোলিনি এবং তাঁর অনুগামী ফ্যাসীবাদী দলের। বিশ্বের সর্বত্র এমনকী খেলার মাঠেও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয় ফ্যাসিস্ট কোনও স্লোগান, ছবি, পতাকা, প্রতীক এমনকী স্টিকারও। ফ্যাসিস্ট শব্দটি আজ পৃথিবীজুড়ে একটি নিন্দাসূচক প্রায় গালাগালির সমার্থক একটি শব্দে পরিণত। বিশেষত ইতালির অধিকাংশ মানুষ সেই ফ্যাসিস্ট সরকারের দিনগুলির কথা মনে করলে শিউরে ওঠেন। লজ্জিতও হন। ফিফার তরফেও এ বিষয়ে কঠোর আইন বলবৎ আছে। তবে এই ক্ষেত্রে বিতর্কের অন্য একটি ক্ষেত্র রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, পিতৃপুরুষদের কৃতকর্মের দায় ফ্লোরিয়ানি নেবেন কেন?

এই প্রসঙ্গে আকর্ষণীয় দিক হল ফ্লোরিয়ানির বাবা আলেসান্দ্রো ফোরজা ইতালিয়া (Forza Italia)-র ইউরোপীয় সংসদের প্রাক্তন সদস্য। ডিফেন্ডার
ফ্লোরিয়ানি রোমের সেন্ট জর্জ ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বছরটি শেষ করেছেন। এই স্কুলটি আবার লাৎসিওর প্র্যাকটিস মাঠের কাছাকাছিই অবস্থিত। আলেসান্দ্রোর ছেলে যুবদলে সুযোগ পাওয়ার পর টানাপোড়েন চরমে ওঠে। তাঁর বাবা অবশ্য বলেছেন, ‘‘বির্তকের মধ্যে প্রবেশ করতে চাই না। ও ফুটবল খেলতে ভালোবাসে। ফুটবলই ওর পরিচয়। কিচ্ছু এসে যায় না পদবিতে।” তবে আর যাই হোক না কেন, একনায়ক মুসোলিনির প্রতি ইতালিবাসীর মনোভাব যে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাড়ে সাত দশক পরেও তেমন বদলায়নি, তা এই ঘটনার পর আরও স্পষ্ট।

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Facebook Twitter Email Whatsapp

3 comments

  • Amrita Basu Roy Chowdhury

    Itihaas mone koriye dilo ei anabadya prabandho.

  • Debashis Majumder

    Benito Mussolini r Kritokormer day bohn korte hochhe tar next generation ke. Tobe Floriani r mulyayon hoya uchit footballer hisabe tar purbopurusher porichoy diye noi.

  • দুর্দ্দান্ত আর্টিকেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *