‘মাই ক্লায়েন্ট’স ওয়াইফ’ যেন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের নেল বাইটিং ফিনিশের মতো

ডাঃ অরিন্দম পাত্র

একটা ভালো মিস্ট্রি থ্রিলার ফিল্মের সম্ভবত সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত একদম শেষ অবধি guesswork চালিয়ে যাওয়া। কে অপরাধী হতে পারে বা কে অপরাধ করেছে? কিন্তু সেরকম কোনও সংগঠিত অপরাধ না ঘটা সত্ত্বেও যদি কোনও ফিল্ম দেখতে গিয়ে একদম শেষ অবধি রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করতে হয়, তখন? যদি বার্সা-রিয়াল বা ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচের মতো নেল বাইটিং ফিনিশের মতো অনুভূতি হয়, তখন? অনেকটা এরকমই রোমাঞ্চকর অনুভূতি হল হিন্দি ছবি ‘My Client’s wife’ দেখতে গিয়ে।

এ এক ঘরোয়া হিংসাত্মক ঘটনার কাহিনি। স্বামী-স্ত্রী একে-অপরের বিরুদ্ধে দু’জনে দু’রকম অভিযোগ এনেছেন। বিল্ডিং কন্ট্র‍্যাক্টর রঘুরাম সিং ও তাঁর স্ত্রী সিন্দুরা সিং এই ছবির দুই মুখ্য পাত্রপাত্রী। রঘুরামের সন্দেহ তাঁর স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত। অন্যদিকে,সিন্দুরার অভিযোগ, স্বামী মারধর করে তাঁর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছেন। এমতাবস্থায় পুলিশ এই কেসের তদন্তভার তুলে নিয়ে স্বামী রঘুরামকে গ্রেপ্তার করে। রঘুরামের উকিল মানস বর্মা চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন, মক্কেলের জামিনের জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে অন্য কিছু সত্য যেন প্রকাশ পেতে থাকে। আদতে সিন্দুরা কীরকম চরিত্রের মহিলা? স্বামী রঘুরামের বয়ান কি সত্যি? নিরপেক্ষভাবে নিজে উদ্যোগী হয়ে তদন্ত চালাতে গিয়ে উকিল মানস বর্মা যা সব তথ্য পেতে থাকেন, তাতে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। রাতের অন্ধকারে সিং বাড়িতে নানান অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। কী সেইসব ঘটনা? কে সত্যি বলছে রঘুরাম নাকি তাঁর স্ত্রী? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে শেষ অবধি দেখুন ‘My Client’s wife’।

My Clients Wife Review: A sluggish thriller with a mind of its own.

থ্রিলার ফিল্ম অথচ তাতে না আছে খুনজখম, না আছে সুপারন্যাচারাল এলিমেন্টস। আপনি ভাবতেই পারেন এ আবার কেমন ধারা থ্রিলার! এখানেই পরিচালকের সার্থকতা। আমার মতে, তথাকথিত বহু ক্রাইম বা মার্ডার মিস্ট্রি থ্রিলার ফিল্মকে ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দেবে এই ছবি। আর টুইস্ট? সেরকম বিশেষ টুইস্ট পরতে পরতে না থাকলেও একদম শেষের ঝটকাটা সামলাতে পারলে বুঝব, আপনি পাকাপোক্ত থ্রিলার দর্শক। এ যেন সেই মিরিন্দা-র অ্যাডের ক্যাচলাইনের কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘জোর কা ঝটকা, ধীরে সে নেহি জোর সে হি লাগা!’ একটু পাল্টে নিয়ে লিখলাম। এই ফিল্মের প্লাসপয়েন্ট, গল্প আর চিত্রনাট্যের বাঁধুনি। এক সেকেন্ডও আলগা দিতে পারবেন না। আর হ্যাঁ, পরিচালকের সাফল্য এখানেই যে, তিনি আপনাকে বার্সা না রিয়াল, এই তর্কে ভুলিয়ে রেখেছেন আগাগোড়া; কখনও ম্যাচ এদিকে ঝুঁকে যাচ্ছে তো কখনও ওদিকে। কিন্তু শেষমেশ কখন যে রেফারি তাঁর একটা সিদ্ধান্তে ম্যাচের ফয়সালা করে বেরিয়ে যাবেন, ধরতে পারবেন না।

অভিনয়ে সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সিন্দুরা সিংয়ের চরিত্রাভিনেত্রী অঞ্জলি পাতিল। সমস্ত ফ্ল্যাশলাইট নিজের দিকে স্বচ্ছন্দে টেনে নিয়েছেন অভিনেত্রী। দর্শক কখনো তাঁর প্রতি সন্দেহ করেছেন তো কখনও তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছেন। রঘুরামের চরিত্রে স্বল্প উপস্থিতিতে ভয় পাইয়েছেন ভিলেন চরিত্রের রেগ্যুলার অভিনেতা অভিমন্যু সিং। উকিল মানস বর্মার চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন ফ্যামিলি ম্যানের অ্যাসিস্ট্যান্ট শরিব হাসমি। এখানে তিনিই মূল তদন্তকারী হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছেন। মূলত ইন্ডোর শ্যুটিংয়ের মাধ্যমে কাজ সেরেছেন পরিচালক। কিন্তু কখনও একঘেয়ে লাগে না দেখতে। ভারতীয় সিনেমায় অল্প বাজেটে স্বল্প চেনা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে কাজ করেও যে অন্যরকম ও ভিন্ন স্বাদের থ্রিলার ফিল্ম বানানো যায়, সেকথা প্রমাণ করেছেন পরিচালক প্রভাকর পন্থ।

সবশেষে একটা কথাই বলি, চোখ কান খোলা রেখে এই ছবিটা দেখুন। ভালো লাগবে। একটা অন্যরকম থ্রিলারের স্বাদ পাবেন। আর হ্যাঁ, ‘বাইশে শ্রাবণ’ সিনেমার একটা ডায়লগ ধার করে শেষমেশ বলি, “কাউকে বিশ্বাস করবেন না সেটা রঘুরাম হোক কিংবা সিন্দুরা।”

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *