আমার কালীপুজো

দেবব্রত তরফদার

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের নামটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে? অধিকাংশই জানেন না বোধহয়। তাহলে একটু পিছনে ফেরা যাক।

চামুণ্ডাচর্চিকা কালীর পূজা, বাংলা ও বহিরবঙ্গের প্রাচীন উৎসব হলেও বর্তমানের কালীপূজা আধুনিক কালের। ষোড়শ শতকে নবদ্বীপ প্রসিদ্ধ স্মার্ত পণ্ডিত তথা নব্যস্মৃতির স্রষ্টা রঘুনন্দন, দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষ্মীপূজার বিধান দিলেও কালীপুজোর উল্লেখ করেননি। ১৭৬৮ সালে রচিত ‘কালীমায়ের কালী সপর্যাসবিধি’ গ্রন্থে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজার বিধান পাওয়া যায়। ড. শশীভূষণ দাশগুপ্তের মতে, “কাশীনাথ এই গ্রন্থে কালীপূজার পক্ষে যেভাবে যুক্তিতর্কের অবতারণা করিয়াছেন তাহা দেখিলেই মনে হয় ততদিন পর্যন্ত কালীপূজা বাংলাদেশে সুগৃহীত ছিল না।”

আরও পড়ুন: শান্তিপুরের প্রথম বারোয়ারি ডাকাত কালী পূজা

সপ্তদশ শতকের নবদ্বীপের প্রথিতযশা তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে বাংলার কালীমূর্তি ও কালীপুজোর প্রবর্তক মনে করা হয়। এর আগে কালীর উপাসকগণ তাম্রটাটে ইষ্টদেবীর যন্ত্র এঁকে বা খোদাই করে পূজা করতেন। পাঁচকড়ি বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, “কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ স্বয়ং কালীমূর্তি গড়িয়া পূজা করিতেন। তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া বাংলার সাধক সমাজ অনেকদিন চলেন নাই, লোকে আগমবাগিশী কাণ্ড বলিয়া তাঁহার পদ্ধতিকে উপেক্ষা করিত।”

অষ্টাদশ শতকে নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় এই পুজোকে জনপ্রিয় করে তোলেন। ঊনবিংশ শতকে তাঁর পৌত্র ঈশানচন্দ্র রায় ও বাংলার ধনী ও প্রভাবশালী জমিদারগণের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং সর্বোপরি সাধক রামপ্রসাদ, বামাক্ষ্যাপা আর রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রভাবে এই পুজোর জনপ্রিয়তা।

আরও পড়ুন: প্রায় তিন শতাব্দী ধরে শক্তির আরাধনা চলছে বনহুগলির ঘোষবাড়িতে

বিশেষ ধরনের চাঁদ মালা, মূলত এই ধরনের চাঁদমালা আগমেশ্বরী মাতার পুজোর জন্য ব্যবহার হয়।

কালী বা কালিকার অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি, তন্ত্র অনুসারে দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত। তবে ইনি আরও অনেক নামে পূজিত হয়ে থাকেন  যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, রক্ষাকালী, চামুণ্ডাকালী, চণ্ডিকাকালী, সংহারকালী, রক্তকালী, যমকালী, মার্তণ্ডকালী, সৃষ্টিকালী স্থিতিকালী, রুদ্রকালী, ডম্বরকালী, জীবকালী প্রজ্ঞাকালী, বীর্যকালী আরো কত শত। করালবদনী, মুণ্ডমালিনী রূপ দেখে ভক্তগণ মাকে সমীহ করে চলে। এই পুজোয় বলিপ্রথা আছে নর, মহিষ, ছাগ কিছুই বাদ থাকে না। ইনি আবার ডাকাতদের আরাধ্য দেবতা তাই এনারা মাকে তুষ্ট করে নরবলি দিয়ে কাজে বেরোতেন।

অনেক হল, এবার আমার পুজোয় আসি। কালীপুজোর আগের রাত ভূত চতুর্দশীর। এইদিন পূর্বপুরুষের আত্মারা মর্ত্যে নেমে আসেন। তাই  চৌদ্দ শাক ভাজা খেয়ে, ওই শাক ধোয়া জল বাড়ির চারিদিকে ছড়িয়ে, চৌদ্দ প্রদীপ জ্বালিয়ে পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তি কামনায় দিনটি পালিত হত। সকাল থেকেই দুই বাড়ির দিদিদের শাক তোলার ধুম লেগে যেত। শাক খাওয়ার চাইতে চৌদ্দশাক সংগ্রহের মধ্যে অনেক বেশি অ্যাডভেঞ্চার ছিল। নদীর ধারে শাকের অভাব নেই তবে চৌদ্দ না পুজলে গরুখোঁজা করে শাক খোঁজা হত। আর চৌদ্দ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত একটা উত্তেজনা থাকত। দুপুরবেলায় মেজোদি প্রদীপ তৈরি করত। বড়মা আবার আতপচাল, সন্দেশ-টন্দেশ দিয়ে প্রদীপ বানিয়ে ঘি দিয়ে জ্বালাতেন, পরে সেই প্রদীপ খাওয়া হত। আমাদের অবশ্য সে ব্যবস্থা ছিল না।

মোমবাতি জ্বালানো হত খুব সাবধানে কারন তখন  চারিদিকে পাটকাঠির গাদা। বনমালি মামা আবার গাছের ডালে ডালে তার দিয়ে মোমবাতি বেঁধে দিত আর তা জ্বালানো হলে অপরূপ সেই দৃশ্য। আর আমরা বালককুল মেতে থাকতাম ক্যাপ বন্দুক, কালিপটকা, চকোলেট বোম নিয়ে। চকোলেট বোম ফাটাতে পারলে তার ক্রেডিটই আলাদা। বন্দুক হাতে পেলেই আমরা চোর ডাকাত, পুলিশ খেলতাম আর ক্যাপ ফুরিয়ে গেলেই বুদ্ধি শেষ। ক্যাপের জন্য সারাদিন মাকে জ্বালাতাম।  নিজেদের দোকানে অঢেল ক্যাপ কিন্তু বাবার কাছে চাইবে কে। হাফেজকাকা থাকলে সুবিধা হতো কিছুটা। না হলে বিষ্টু ঘোষের দোকান ভরসা। সেখানে না থাকলে পচা গড়াইয়ের দোকান, সেটা আবার আমাদের দোকানের সামনে দিয়ে যেতে হত তাই অন্য কাউকে ঘুস দিয়ে নিজেদের দোকান থেকে কিনতে হত। রংমশাল ফুলঝুরি তারাবাজির ব্যাপারে ছিল খুব কড়াকড়ি আগুন জ্বলে যাবার জন্য।  হাউই ছাড়ত দাদারা নদীর দিকে মুখ করে। বাঁশের কাবারির ধনুক তৈরি করে পাটকাঠির তীরের ডগায় তারাকাঠি গুজে নদীর দিকে মুখ করে ছোড়ার মধ্যে ছিল চরম উত্তেজনা।

আরও পড়ুন: মালঞ্চের ৩০০ বছরের দক্ষিণা কালীর টেরাকোটার মন্দির এখন বয়সের ভারে জীর্ণ

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমার বাজির ভাণ্ডার আগেই শেষ হয়ে যেত। মায়ের কাছে অনুনয়-বিনয় করে যা পেতাম তা আমার সর্বগ্রাসী খিদের কাছে কিঞ্চিৎ মাত্র। এইদিন ভালো ভালো খাবার দাবার হতো। লুচি ভাজার গন্ধে ম-ম করত চারদিক সঙ্গে থাকত ক্ষীর, মিষ্টি, নাড়ু। সেদিন আর ওসব কিছু টানত না আমায়, আমি বারুদের গন্ধ খুঁজে ফিরতাম। একবার সন্ধে ঘনিয়ে আসতে আসতেই ভাণ্ডার সব শেষ এমনকী না ফোটা কালীপটকার বারুদ বার করে ছুঁচোবাজি পর্যন্ত করা হয়ে গেছে। মায়ের কাছে খেয়ে গেছি দু-ঘা, নিজেই বুঝে গেছি বায়না করার সময় শেষ। দিদিরা রংমশাল আর ফুলঝুরি ধরিয়েছে, আমি ভিখারির মতো দাঁড়িয়ে। আমার চিরশত্রু জ্যাঠতুতো  বোন রুপি রং মশাল জ্বালিয়ে বার বার আমার সামনে এসে অঙ্গভঙ্গি করছে, মায়ের ভয়ে কিছু বলতে পারছি না। জ্বলে যাচ্ছে শরীর, কিছু করার জন্য ছটফট করছি। আর থাকতে না পেরে চুপিচুপি অন্ধকারের মধ্যে নেমে গিয়ে ধরিয়ে দিলাম এক পাটকাঠির গাদা। নিচের অংশ ভিজে থাকায় আগুন তত জোরালো নয়। আর সেখানে কে থাকে। দু’মিনিট পর দাউ দাউ আগুন। চারদিকে হইচই পড়ে গেল। লোকজন এসে আগুন না নেভালে সারা পাড়া জ্বলে যেত। খুব খারাপ লাগছিল তখন। চোর কিন্তু ধরা পড়ল না, তবে সেই রাতে কিছু না খাবার কারণে মা হয়তো কিছু আন্দাজ করেছিল।

এরপর কৃষ্ণনগর চলে আসলাম। পুজোর জাঁকজমক অনেক কিন্তু সিক্স সেভেন এইট নাইন এই ক’বছর খুব খারাপ গেছে আমাদের। বাবার শরীর মন দুইই ভেঙে পড়ে। সংসারের আয় কমে, খরচ বাড়ে। ছোটদেরও এই লড়াইয়ে শামিল হতে হত বাধ্য হয়ে। দিওয়ালির আতশবাজি স্বপ্নই হয়ে গেল আর আমরা ভাইবোনেরা খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে গেলাম। পুজোর আনন্দ আর স্পর্শ না করতে শুরু করল। ঠাকুর দেখাও বন্ধ করে দিলাম। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে। সে সময়ের দিওয়ালিগুলো পাশের বাড়ি বাস ব্যবসায়ী অনন্ত ঘোষের বাড়িতে কাটিয়েছি। প্রচুর বাজি ফাটাত ওরা, আমরা দেখতাম লাইন দিয়ে আর  হঠাৎ চোখ পড়লে কিছু একটা এগিয়ে দিত। আমরা না নিলেও ছোট বোনটা ছিল অবুঝ সে, একটা তারাবাজির দিকে হাত বাড়িয়ে দিত। এক টাকার মোমবাতি, দু-টাকার ডালডা, দু-টাকার বোঁদেতেই জমে উঠত দিওয়ালি।

আরও পড়ুন: নৃসিংহবন্দিতা দেবী বংশবাটী-বিলাসিনী

এরপর আর বলার মতো কিছু নেই। কলকাতায় পড়ার সময় ক্লাবের টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে একটি ছেলে চোট পায় আর  সঙ্গে সঙ্গেই তার অপারেশন হয়। আমরা ক্লাবে শুরু করি কালীপুজো, ছোট্ট করে। পাড়ার কয়েকজন উপোস থাকে, কিন্তু ক্লাবের একজনেরও থাকা উচিত নাহলে কেমন দেখায়, আবার ক্লাবের ছেলেদের জলটল খাবার ব্যাপার আছে অগত্যা মধুসূদন। তা পনেরো ষোলো বছর উপোস করেছি। চারদিকে পুজোর ধুমধাম আর আমরা কয়েকজন নিশিরাতে বসে আছি আমাদের অনাড়ম্বর প্রতিমা ঘিরে। দারুণ লাগত। এই পুজোর পুরোহিতের আকাল পড়ে। একবার কালো রোগা শুড্ডা টাইপের এক পুরোহিত আসলেন। প্রথমেই ভোগ রান্না করতে গিয়ে কাঁচা তেলে সবজি ছেড়ে ব্যাপারটা ল্যাডাব্যাডা করে ফেলেছে। আপত্তিকর গন্ধ পাচ্ছিলাম যেন। একটা বাচ্চা চুপিচুপি এসে বলল— দেবুদা ঠাকুরমশাই ঠাকুরের কাছে দেওয়া মদটা খেয়ে নিয়েছে। সারাদিনের উপোসে গলা শুকিয়ে কাঠ। খুব কষ্ট করে রাগ সামলালাম। আর যেই সরস্বতী পুজোর মন্ত্র বলতে শুরু করেছে অমনি চুলের মুঠি ধরে বাইরে টেনে নিয়ে এসে দিলাম দুই লাথি। আর তারপর অন্য পুজোমণ্ডপ থেকে ছোট্ট সহকারী এক ব্রাহ্মণকে দিয়ে পুজো সারলাম। কিন্তু পরদিন ওই মাতাল বামুনকে কিছু দিতে হল, নাহলে বামনি নাকি আস্ত রাখবে না। অগত্যা কি আর করা। আর একবার পুজোর গোছগাছ  করছি। ক্লাবের  সামনে  কদমগাছের নীচে  বাঁধানো জায়গায় বসে আছে কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল, কাছেই কোনও গণ্ডগোল হয়েছিল বোধহয়। আর ক্লাবের পিছনে কাঁকড়ার ঝাল দিয়ে বাংলার আসর বসিয়েছে ক্লাবের ছেলেরা সন্দীপের নেতৃত্বে। এক জনকে চেঁচিয়ে বললাম, ‘বসে থাকা মামাদের খাওয়া।’

‘‌চেঁচিও না দেবুদা, ঝামেলা বাড়বে।’

‘‌রাখ তোর ঝামেলা ও শালাদের গায়ের চামড়া শুকিয়ে গেছে’, আমি বলি।

‌তারপর পুলিশগুলোর উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলি, ‘এই যে মামারা, মাল টাল চলবে নাকি কাঁকড়ার ঝাল দিয়ে?’

‌প্রাপ্তির আশায় দু-একজন উসখুস করতে লাগল। একজন উঠে দাঁড়াতেই বললাম, ‘ক্লাবের পিছনে চলে যান দু-গ্লাস করে মেরে চলে আসুন। এর বেশি না, তাহলে চকোলেট বোমের সঙ্গে আমার অনেককিছু ফাটাবে।’

পুলিশগুলো জমে যায়। অন ডিউটিতেই চলল মেহেফিল কাঁকড়ার ঝাল চচ্চড়ি দিয়ে। অনেক পরে তাদের মধ্যে থেকে  এক বৃদ্ধ এসে বলল (তিনি কিঞ্চিৎ টলটলায়মান) ‘সত্যিই ভাগ্নে বটে তুই, মামাদের দুঃখ শালা কেউ বোঝেনি রে।’ আর তার নেতৃত্বে পুলিশের   মাতাল    বাহিনীর আশীর্বাদ বর্ষিত হয় অধমের মাথায় মায়ের আশীর্বাদের আগেই।

‌আর একবার পুজো করতে আসলেন কলকাতা পুলিশের এক অবসরপ্রাপ্ত অফিসার। অমায়িক এবং পণ্ডিত মানুষ। অনেক কথা হল। উনি আমায় বললেন, ‘তোমার উপর মায়ের অনেক কৃপা, তোমার বিশ্বাস যেন অটুট থাকে।’

‌আমি হেসে বলি, ‘ঠাকুরমশাই ওই একটা ব্যাপারে আমার কোনও  বিশ্বাস নেই, আমি বিশ্বাস করতে চাই কিন্তু বিশ্বাস জন্মায়নি। আমি কাজে আর জীবজগতে বিশ্বাসী।’

‌পুজোর পর অনেক কথা বলেছিলেন শেষে বললেন, ‘তুমি  আসলে মায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত।’ আমি মনে মনে হাসলাম।

আরও পড়ুন: মালঞ্চের ৩০০ বছরের দক্ষিণা কালীর টেরাকোটার মন্দির এখন বয়সের ভারে জীর্ণ

‌বহুদিন পর প্রসেনজিৎ বল নামে এক ছাত্র যারা সাতপুরুষের কৃষ্ণভক্ত এবং ইসকনে দীক্ষিত সে আমার কাছে পড়া ছেড়ে দিল। আমি মনে করলাম, আমার মতো মাস্টার বলে বোধহয়! না, সে এক বন্ধুকে বলেছে, ‘দাদার কথা শুনে আমার বিশ্বাসই টলে যাচ্ছিল, ভয়ানক কিছু হবার আগেই ছেড়ে দিলাম।’ আবার চৈতন্যমঠের এক প্রভু আসেন মাধুকরীতে। তাঁর সঙ্গে একদিন অনেক তর্ক-বিতর্ক হল। উনিও ঠাকুরমশাইয়ের মতো একই কথা বললেন, ‘ঈশ্বরে নাকি আমার ভক্তি অটুট।’ এবারেও হেসেছি। তবে বহুদিন পর এবারও উপোস আছি, আছি অপেক্ষাতেও।

‌সংগৃহীত ছবিগুলি নবদ্বীপের আগমেশ্বরী মাতার, প্রায় চারশো বছরের পুরাতন বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন কালীপূজা

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *