আমার মহাশ্বেতা: একটি নির্বাচিত সাক্ষাৎকার

রাহুল দাশগুপ্ত

মহাশ্বেতা দেবী তখন গলফ গ্রিনে থাকেন। ২০০৬ সাল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছি। জীবনে প্রথম ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছি। গবেষণার ব্যাপারেই।

আমি পাশে গিয়ে বসতেই বললেন, তুমি তাহলে আমার ‘বসাই টুডু’ নিয়ে গবেষণা করছ?

বললাম, আমি উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলা উপন্যাস নিয়ে গবেষণা করছি। যে কয়েকটি উপন্যাস বেছেছি, তার মধ্যে ‘বসাই টুডু’ একটা।

হ্যাঁ, ওটা আমার একটা মেজর লেখা। ‘চোট্টি মুণ্ডা’ আর ‘বন্দ্যঘাটী গাঞী’র মতোই। লোকে ‘হাজার চুরাশির মা’ আর ‘অরণ্যের অধিকার’-এর কথা বলে। কিন্তু ওগুলোর চেয়ে এগুলো অনেক বেশি ইমপরট্যান্ট।

আপনার আরও একটা উপন্যাসও আমার খুব প্রিয়। ‘টেরোড্যাকটিল, পূরণ সহায় ও পিরথা’।

হ্যাঁ, ওটাও মেজর।

আপনার প্রিয় লেখক কারা?

তুর্গেনেভ আমার খুব প্রিয়। তুমি নোবেলজয়ী পোলিশ লেখক রেমন্টের ‘দি পেজেন্টস’ পড়েছ? অসাধারণ লেখা! জ্যোতির্ময়ী দেবীর লেখা পড়ো। মগজ দিয়ে লেখা। ভাবায়। সুলেখা সান্যাল আর অসীম রায়ও উল্লেখযোগ্য লেখক ছিলেন। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ, মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর আর সতীনাথ তো বারবার পড়বে। অদ্বৈতের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ও। আমার বাবা মণীশ ঘটকের একটা মস্ত লাইব্রেরি ছিল। কত যে দুর্লভ বই সংগ্রহ করে আনতেন! কোনওদিন যদি আত্মজীবনী লিখি, পড়ে দেখো।

ঋত্বিক ঘটক আর বিজন ভট্টাচার্যের কথা কিছু বলুন না!

ওরা দু’জনেই বই পড়তে খুব ভালোবাসত। আমার মতোই, হাতের কাছে যা পেত, তাই পড়ত। আর খেতেও। তুমি হেমেন গোহাঞী আর কুরুতুলেইন হায়দারের লেখা পড়েছ?

এরকমই কথাবার্তা হয়েছিল সেদিন। যথেষ্ট তেজ তখন। প্রথমদিকে ঝাঁঝটা টের পাওয়া যাচ্ছিল। পরে অসম্ভব আন্তরিক হয়ে উঠলেন। তখনও জানি না, তাঁর কত ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসব একদিন। দিনের পর দিন নানা বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হবে। বহু অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় কাটবে কত বিকেল আর সন্ধ্যা। শুধু আমি নয়, আমার স্ত্রী দেবস্মিতা এবং মেয়ে উপাসনাও কতবার গিয়েছে তাঁর কাছে! মহাশ্বেতা দেবীর উষ্ণ, সস্নেহ সান্নিধ্য তাদেরও জীবনের সম্পদ।

কাজ করতে করতে সেদিন তিনি বারবারই ডেকে উঠছিলেন— জয়, জয়। জয় ভদ্র তাঁর ব্যক্তিগত সচিব। মহাশ্বেতা তখন জয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। যেকোনও ব্যাপারে প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর জয়কে ডেকে পাঠান, নানা কিছু জানতে চান, তাঁরই আগ্রহে ও উৎসাহে জয়ের সঙ্গে আমার আলাপ। জয় তখন ‘বর্তিকা’র দেখভাল করছে। আমি ‘বর্তিকা’য় লিখতে শুরু করলাম। পরে কিছুদিন ওই পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বেও ছিলাম। সেই সূত্রে প্রায় নিয়মিতই মহাশ্বেতার বাড়ি গেছি, তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলেছি। ইতিমধ্যে মহাশ্বেতার একটি উপন্যাসের সংকলনের সম্পাদনাও করেছি। গবেষণা শেষ করেছি, যার অনেকটা অংশ জুড়েই মহাশ্বেতা দেবী। প্রসঙ্গত, আমার গবেষণার সুবিধার জন্য তিনি আমাকে তাঁর রচনাবলির কুড়ি খণ্ড উপহার দিয়েছিলেন। তাঁর এই উদারতা ভোলার নয়।

রাহুল দাশগুপ্তের সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবী

এভাবেই তিনি আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। সৌজন্যে, জয় ভদ্র, শোভন তরফদার এবং অমরেন্দ্র চক্রবর্তী। এই তিন সম্পাদকের অবিরাম তাড়ায় ও প্রেরণায় যথাক্রমে ‘বর্তিকা’, ‘এই সময়’ এবং ‘নারীযুগ’ পত্রিকার জন্য নিয়মিত তাঁর কাছে গেছি, নানা বিষয়ে কথা বলেছি, সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তাঁর স্মৃতি ও ভাবনার বহু দিকের সন্ধান পেয়েছি। ঠিক এই একইভাবে সেইসময় আমাকে খুব যেতে হত সুকুমারী ভট্টাচার্যের কাছেও। সুকুমারী ও মহাশ্বেতা, এ যুগের দুই বিরল মনীষীর শেষ জীবনে তাদের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার যে দুর্লভ সৌভাগ্য আমার হয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু জানার ও শেখার সুযোগ যে আমি পেয়েছি, তার জন্য এই তিন সম্পাদকের কাছে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। মহাশ্বেতা দেবী প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর যে সাক্ষাৎকারটি এখানে প্রকাশিত হল, তা আসলে বিভিন্ন সময়ে তাঁর যেসব সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তারই নানা টুকরোর যোগফল। ফলে একে একটি একক সাক্ষাৎকার হিসাবে মনে করা ভুল হবে। টুকরো অংশগুলির মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বের নিরিখে বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই লেখকের জীবনের বিচিত্র দিক উঠে এসেছে বলেই মনে হয়।

সাক্ষাৎকার

প্রঃ আপনার ঠাকুরদার কথা যদি একটু বলেন।

উঃ আমার বাবাকে আমি ‘তুতুল’ বলেই ডাকতাম। তাঁর আসল নাম ছিল, মণীশ ঘটক। তুতুলের ঠাকুরদা শ্যামাচরণ ঘটকের তিন ছেলে, এক মেয়ে। তিন ছেলে গোপাল, বিনোদ, সুরেশ, বোন সর্বজয়া। এই সুরেশচন্দ্রই আমার পিতামহ। শ্যামাচরণ ঘটক আদি সূত্রেই পাবনা জেলার ভারেঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। পদ্মাপারে ভারেঙ্গা গ্রাম বারবার ভেঙেছে ও জায়গা বদলের সময় ধুলজানা ভারেঙ্গা হয়েছে পুরনো ভারেঙ্গা, পুরনো ভারেঙ্গা ভেঙে নতুন ভারেঙ্গা, আমাদের গ্রাম।

শ্যামাচরণ ছিলেন পণ্ডিত ও গৃহস্থ। অল্প বয়সেই তিনি মারা যান। ঠাকুরদা এবং আমার মাতামহ নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন। এবং এ বন্ধুত্ব শৈশবের। তুতুলের লেখাতে বোঝা যায়, নতুন ভারেঙ্গা নয়, বৃহত্তর অর্থে দেশের মাটিতে তার মনের শিকড় প্রোথিত ছিল। ভারেঙ্গা এবং ও অঞ্চলের প্রতিবেশী গ্রামগুলো ছিল বারেন্দ্র-প্রধান। ভারেঙ্গার বারেন্দ্ররা ছিল পরস্পরের আত্মীয়, সমবয়সিরা বন্ধু। শিক্ষা, বিদ্যোৎসাহিতা ও স্বদেশপ্রীতির ঐতিহ্য গ্রামের হাওয়ায় ছিল।

এই পরিবেশের সন্তান হয়েও সুরেশচন্দ্র সরকারি চাকরি নেন অনন্যোপায় হয়ে প্রয়োজনে। সুরেশচন্দ্র অতীব মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং ইংরিজি ও ইতিহাসে অত্যন্ত উচ্চ স্থান পেয়ে ডবল এম এ হন। লেখাপড়া আগাগোড়া তিনি স্কলারশিপের টাকাতেই করেন। যদুনাথ সরকার ও প্রাক্তন রাজ্যপাল হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সুরেশচন্দ্রের সমসাময়িক ছাত্র। সুরেশচন্দ্র প্রথমে পাটনা কলেজে অধ্যাপনা করেন। কিন্তু তাঁর বড়দাদা গোপাল ঘটক পাঁচ মেয়ে ও স্ত্রী রেখে অকালে মারা যান। মেজদাদা বিনোদ ছিলেন উদাসীন প্রকৃতির। সুরেশচন্দ্রকে নিজের স্ত্রী, দুই ছেলের সঙ্গে মা, দুই বউদি ও তাঁদের ছেলে-মেয়ের ভার নিতে হয়।

সুরেশচন্দ্র জীবনে বড় অভিভাবকশূন্য, নিঃসহায় ও একাকী ছিলেন। রাজশাহির লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যবহারজীবী মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় মেয়ে ইন্দুবালাকে তিনি বিয়ে করেন। শ্বশুর জামাতার শুভানুধ্যায়ী ছিলেন। উদ্যোগ করে তিনিই সুরেশচন্দ্রকে দিয়ে রাজশাহী শহরে এক বাড়ি কেনান। সুরেশচন্দ্র বড় দাদার মেয়েদের বিয়ে দেন, মেজো দাদার ছেলেকে লেখাপড়া শেখান। বস্তুত, তাঁর ওপর সংসারের চাপ বড় বেশি ছিল। ভাষা-শিক্ষার দিকে। প্রবণতা তাঁর ছিলই। আর চাকরি জীবনে আরবি, ফারসি, উর্দু, অসমিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষায় পরীক্ষা দিয়ে তিনি যে টাকা পান, প্রথম জীবনে তাও সংসারের দায়দায়িত্বে খরচ করতে হয়।

ছবিঋণ: হেমন্ত পাদালকর / হিন্দুস্তান টাইমস

সুরেশচন্দ্রের ছিল প্রবল বিদ্যানুরাগ। রাজশাহীতে ও অন্যত্র, সাহিত্য-সংস্থার সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল। তাঁর নিজের সংগ্রহে ছিল একাধিক ভাষার বই এবং সংস্কৃত তিনি খুব ভালো জানতেন। লেখার বাতিকও যথেষ্ট ছিল এবং কয়েকটি বইও লিখেছিলেন। নানা আঞ্চলিক ও হিন্দি ভাষা খুব ভালো জানতেন। কৌতুকপ্রদ একটি ঘটনা মনে পড়ে। ব্রজবুলিতে ‘ব্রজবিপধী’ নামে এক কাব্যগ্রন্থ লিখে তিনি তখনকার সাহিত্যপুরুষদের, যেমন, ন্যুট হামসুন, জোসেফ কনরাড, এইচ জি ওয়েলশ, আরও যেন কাদের পাঠান। তাঁরা ব্রজবুলিতে লেখা অবসরপ্রাপ্ত হাকিমের বই পেয়ে কী ভেবেছিলেন, কে জানে! তবে দু-এক লাইন লিখে জানিয়েছিলেন।

সুরেশচন্দ্রের আসল অনুরাগ ছিল ইতিহাসে এবং তাঁর ইতিহাস সংগ্রহ ছিল ঈর্ষনীয়। তিনি ছিলেন উজ্জ্বল, গৌরবর্ণ, নাতিদীর্ঘ, অতীব সুপুরুষ। ইন্দুবালা ছিলেন গৌরাঙ্গী, একটু মোটা আর অত্যন্ত ব্যক্তিত্বময়ী। চোখ ছিল উজ্জ্বল ও একাগ্র। ঠাকুরদা ছিলেন বিদ্যানুরাগী, তবে তাঁর লেখাগুলি যে সবসময়ে খুব উতরেছে সাহিত্য হিসাবে, তা বলা কঠিন। সৃজনশীল প্রতিভা তার কমই ছিল। চারুকলা তো ছিলই না আয়ত্তে। ঠাকুমা বই পড়তে, গান শুনতে ভালোবাসতেন।

পরিবারে যে সবই করে, সে সুনাম পায় না। ঠাকুরদাকে আমৃত্যু বহু তিক্ততা সহ্য করতে হয়েছিল। তিনি ছিলেন ভোজনপ্রিয়, আনন্দময় মানুষ। চুরোট, কফি, চা ছাড়া অন্য নেশা করেননি জীবনে। আর ছিলেন অভিযোগহীন, তিক্ততাহীন। ভাগ্যবিপর্যয়ের পরও এ-সব চারিত্রগুণ তাঁর অটুট ছিল। জখমি বাঘের মতো তিনি দুঃখের সময় আরও নিঃসঙ্গে চলে যেতেন, নিজেদের আরও ভিতর।

আমার যখন বছর দেড়েক, ঠাকুরদা যখন মেদিনীপুরে হাকিমি করছেন, তখন তুতুল এক বাঘ মারলেন। বাঘেরও বোধ করি অন্তিম ঘনিয়েছিল, ফলে সে বিশাল চৌহদ্দি পেরিয়ে বাড়ির পেছন দিকের এক স্নানের ঘরে ঢুকে জিরোচ্ছিল। বাঘ রেগে ঝাঁপিয়ে বেরোতে বাবা মারলেন। ঠাকুরদা খুশি হননি। নাবালকের হাতে বন্দুক! আমার ছেলে নবারুণ যখন বছর দু’য়েকের, তুতুল যখন মাতামহ, তখনও ঠাকুরদা তুতুলকে সাবালক মনে করতেন। ঠাকুরদা অত্যন্ত আইন মেনে চলা লোক ছিলেন। ওইরকমই ছিলেন তুতুল। বেজায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র নিয়ে চলতেন, কিন্তু কখনও উদ্ধত হতেন না। ঠাকুমা বললেন, যা বলেছি সব শুনে যেত। যা নিজে করবার তাই করত। আমি যখন ছোট, দিনাজপুরে তুতুল আরেকটি বাঘ মারেন নদীর চরে। চাষিদের গোয়ালে ঢুকেছিল বাঘ। সে শিকার আমার দেখা। বড় জানোয়ার মারতে আর দেখিনি।

ঠাকুরদা আর মাতামহ বাল্যবন্ধু ছিলেন। ঠাকুরদা কাজের কারণে ঢাকা এলে এ বাড়ি উঠতেন। দাদু তখন মাকে ও মায়ের পরের বোনকে ঠাকুরদার কাছে এনে বলতেন, সুরেশ, তুমি এদের ইংরেজি কবিতাগুলো পড়িয়ে দাও তো। ঠাকুরদা পাঠশালায় মা ছিলেন বাধ্য ছাত্রী। তিনি মাকে খুবই পছন্দ করতেন। ফলে বিয়ের কথা হয়।

ঠাকুরদা তখন চট্টগ্রামে। বিয়ের কথা ঠিক করতে বড়মামা গেলেন চট্টগ্রামে। গিয়েই তুতুলকে দিয়ে টমাস হুডের ‘লাইট অফ আদার ডেজ অনুবাদ করিয়ে মা’কে পাঠালেন। আমার এক বন্ধুর লেখা, নির্মম সমালোচনা করে পাঠাও। ১৯২৩ সালে মায়ের বয়স পনেরো। তবু সাধ্যমতো সমালোচনা করে পাঠিয়েছিলেন। তুতুল মন্তব্য লিখলেন, সমালোচনা মোটেও নির্মম হয়নি। আমাদের পরিবারে এই কবিতা কেন যেন সকলেই এক সময়ে অনুবাদ করেছে। আমিও করেছি…

ছবিঋণ: হেমন্ত পাদালকর / হিন্দুস্তান টাইমস

প্রঃ আপনার দিদিমা আর মায়ের কথা কিছু বলুন।

জন্মেছি ১৯২৬ সালে। দিদিমার বাবা একদা কোচবিহারের রাজার স্টেট কর্মী ছিলেন। জজ বলেই মনে হয়। এঁর নাম শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখায় পাওয়া যায়। নাম ছিল যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী। এঁর উৎসাহে কেশবচন্দ্র সেনের মেয়ের সঙ্গে কোচবিহারের রাজকুমারের বিয়ে হয়। দিদিমার ভাইপো কবি অমিয় চক্রবর্তী। দাদা এবং দিদিমা, দুই বেয়াইবেয়ানের বন্ধুদের মূলে ছিল সাহিত্যপ্রেম। দাদা তিনবার এমএ পাশ করেন (ইংরেজি, ইতিহাস ও সংস্কৃত), দু’বার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হন।

দিদিমা এগারো বছরে বিবাহিতা। কুড়ি বছর বয়সে জননী। বাংলার ভিত্তি খুব পোক্ত ছিল। চল্লিশ বছর বয়েসে ইংরেজি শিখে সাহিত্য পড়তে শুরু করেন। ১৯৩৫ সাল থেকে ওঁদের সাহিত্য আর সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছি। তার বাংলা বইয়ের সংগ্রহ ছিল খুব ঋদ্ধ। দিদিমা তাঁর আদুরে নাতনিকে নিয়ে গাড়ি চড়তে ভালোবাসতেন। চৌষট্টি পয়সায় এক টাকা তখন। এক পয়সার ক্রয়মূল্য বা ক্ষমতা অনেক। আমার ফ্রকের কেঁচড় বোঝাই বাদাম হত। ঢাকায় মামাবাড়িতে যাওয়ার চল ছিল। সেটা আমার কাছে ছিল মস্ত পাওনা। মাকে মায়ের পরের দিকের ছেলেমেয়েরা, নাতি-নাতনিরা সবটুকু দেখেনি। প্রথম চারজন দেখেছি। চিরকালই সুন্দরী তবে চোখ একটু ছোট। ছোটবেলা থেকেই ব্যক্তিত্ব ছিল। আমার দিদিমা ছিলেন স্বভাবে সম্রাজ্ঞী। মেয়েদের কারুক্কে পাঠাননি ইস্কুলে, আর ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো, সব তিনিই করেছেন। মায়ের মেজমামিমা অনিন্দিতা দেবী, কবি অমিয় চক্রবর্তীর মা, তাঁর ছেলেমেয়েদের পড়া হলে ভালো ভালো বই মাদের পাঠাতেন।

ইস্কুলের চেয়েও কড়া নিয়ম ছিল বাড়ির। ভোরে ওঠা ছিল বাধ্যতামূলক। দেশের বাড়ির সঙ্গে মায়ের আত্মিক যোগাযোগ খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। এমন এক পরিবেশে মা মানুষ হন, যেখানে গ্রামের বাড়িতেও থাকে লাইব্রেরি ঘর। গ্রামের পরিবেশ যথেষ্ট স্বদেশ-সচেতন। ঢাকাতে দাদামশাই সাধারণ উকিল, কিন্তু অত্যন্ত উচ্চমানের ত্রৈমাসিক ‘প্রতিভা’ কাগজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, লেখেন উচ্চমানের প্রবন্ধ। দিদিমা শুধু যে অগাধ পড়াশোনা করেন তাই নয়, ভাওয়ালের কবি গোবিন্দ দাসকেও শ্রদ্ধা ও সাহায্য করেন। ফলে মায়ের মনে সাহিত্য ও স্বদেশপ্রেমের বীজ তখনি রোপিত হয়। বিয়ে করে মা যে পরিবারে এলেন, সেখানেও বইয়ের সাম্রাজ্য। ঠাকুরদা সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন বিদ্বান, বিদ্যোৎসাহী। বাবার সাহচর্যে মায়ের জীবনে আরেক নতুন দিগন্ত খুলেছিল। বাবা মাকে দিতেন সবুজ সিল্কে বাঁধানো

খেয়ালখাতা। ওপরে সোনালি জলে লেখা, ‘খেয়ালখাতা-ধরিত্রী দেবী। অনেক খাতা ছিল মায়ের। কোনও খাতার কোনও পাতাই সাদা ছিল না। মায়ের সাহিত্যরুচি রবীন্দ্রনাথ প্রভাবিত, ধ্রুপদি সাহিত্য-পাঠের ঋজুতায় গঠিত। লেখাতেও ছিল তার ছাপ। আর তাঁর ছিল অদম্য জীবনীশক্তি, অস্বাভাবিক মনের জোর, আনন্দময়তা।

ওঁর আঠারো বছর বয়সে, বাবার তেইশে আমি জন্মাই। তারপর একে একে মা দশটি সন্তানের জননী হন। মা-বাবার গভীর বন্ধুত্ব দীর্ঘকাল আমিই দেখেছি। দিনাজপুর, ফরিদপুর, ঢাকা আর ময়মনসিংহে বাবা বদলি হচ্ছেন। মেদিনীপুরের দোতলা বাড়িটি মা ছবির মতো করে সাজিয়েছিলেন। বিকেলে বাবা আপিস থেকে ফেরার আগেই মা গা ধুয়ে চুল বেঁধে একটি টিপ পরে চা-খাবার সাজিয়ে অপেক্ষা করতেন। আর এই সম্পতি সব ছেলেমেয়েকে নিয়ে এই গোপে চললেন পিকনিকে, চললেন কর্ণগড় দেখতে। বাস ভাড়া করে জঙ্গুলে পথ ধরে বেলপাহাড়ি, ঝাড়গ্রাম, শালবনি।

১৯৩৬-এ মা অফিসারদের নিয়ন্ত্রিত জীবনাভ্যাসকে চমকে দেন। পঞ্চম জর্জের রাজত্বের রৌপ্যজয়ন্তীতে মায়ের কথার সম্মানে, আমার বাবা, যিনি ছিলেন এক জুনিয়র ইনকমট্যাক্স অফিসার, সরকারি হুকুমত অমান্য করেন। বাড়ি সাজাননি আলোয়, আমাদের পরাননি নতুন জামা, নিয়ে যাননি সেই জমায়েতে যেখানে ব্যান্ডে বাজছে, ‘গড় সেভ দ্য কিং। সরকার বাবার ওপর খুশি হননি। মার মাথা অনেক উঁচু হয়েছিল সেদিন। সেদিনের আমলাগিন্নিরা তা বোঝেননি।

পঞ্চাশের মন্বন্তরে আমার দুর্ভিক্ষত্রাণ কাজে মেতে ওঠার সময় মায়ের ছিল পূর্ণ সম্মতি। দেশের দুর্ভিক্ষে, বন্যায়, দুর্গতিতে মা পরিধেয় দু’খানি কাপড় রেখে সব কাপড় দিয়ে দিতেন। শেষবারের মতো নিজেকে জড়ান বাংলাদেশ থেকে আগত উদ্বাস্তু শিবিরের সহায়তায়। কলকাতায় আসা হয় ১৯৩৯ সালে। বহুদিন পর্যন্ত বাবা-মা খুব একসঙ্গে ইংরিজি ছবি দেখতেন। ফিটনে বেড়িয়ে ফিরতেন। রঙিন সিল্কের শাড়ি পরনে মা, কাঁধে ব্রোচ, চুল সামান্য কান ঢেকে সুঠাম ঘাড়ের একটু ওপরে তুলে বাঁধা খোঁপা, কপালে টিপ, সে চেহারা আমার খুব মনে পড়ে।

এমন একজন মা পেয়েছিলাম, যিনি গয়না গড়াননি কখনও, দামি শাড়ি কেনেননি নিজের জন্য। আমাদের মা বই কিনেছেন, পড়েছেন, পড়িয়েছেন। আগেই বলেছি যে, মায়ের সাহিত্যরুচি ছিল রবীন্দ্রনাথ প্রভাবিত। আমাদের মা বই কিনেছেন, পড়েছেন, পড়িয়েছেন। বাংলার সব ধ্রুপদি উপন্যাস ও প্রবন্ধ মা বারবার পড়েছেন। তাঁর সাহিত্যরুচি ছিল কঠোর ও ঋজু মানের। তরল ভাব, অশিক্ষিত প্রকাশভঙ্গি, অসত্য মূল্য পরিবেশন মা সহ্য করতে পারতেন না। মায়ের কাছে প্রতিবেশিনী কী রকম, তার মাপকাঠি একটাই, বাড়িতে বই আছে না নেই। দুর্ভাগ্য, ‘বই নেই’ পরিবেশেই জীবনের বহু সময় গিয়েছে ওঁর। তখন লাইব্রেরি ভরসা! মায়ের লেখা প্রথম কবিতা ছাপা হয় ওঁর সতেরো বছরে, ১৯২৫ সালে। অশেষ সৌভাগ্য আমাদের।

প্রঃ আর আপনার বাবা?

উঃ মৃত্যুর ঠিক আটাশ দিন আগে, ২৯.১১.৭৯ তারিখে, কোনও দুপুরে তিনি একলা ঘরে টেনে নিলেন হাতের কাছের ‘উত্তরসূরি’ পত্রিকা, বিজ্ঞাপনের ওপর দিয়ে লিখলেন, ‘এক কালে এই লোকটি পদ্য লিখত পরিপাটি।/ এখন বয়স গেছে বেড়ে/ লেখার জলুষ গেছে ছেড়ে/ এখন খাওয়াদাওয়ার পরে মেজাজ হলে একটু ধরে/ দু-চার লাইন আঁকিবুকি কেটে ঘুমে পড়ে ঝুঁকি/ নামটা তাহার মণীশ ঘটক/ তাই লেখাতে থাকেই চটক।’ জীবনে ‘বাবা’ বলিনি, ‘তুতুল’ বলেছি।

আমি খুব ভাবতে পারি দুপুরে বাবার ঘর। শীত পড়েছে। বাতাসে ইউক্যালিপটাস, বকুল, নারকোল, বাতাবিলেবু গাছের পাতায় কখনও ঝড়ের শব্দ, কখনও ঢেউয়ের মৃদু গুঞ্জরণ। ঠিক দুপুরে চড়াই পাখিদের কিচিরমিচির, প্রত্যেকটি হরফ বাবা জোর করে লিখছেন, ‘নামটি তাহার মণীশ ঘটক।’ তারিখ দিতে কোনও দিন, কোনও অবস্থায় ভুল হয়নি। শরীর ভাঙছিল সেই কবে থেকে। ডাক্তারদের মতে, শেষ দু’বছর বেঁচেছিলেন শুধু অপরিমেয় জীবনেচ্ছার জোরে। ১৯৭৯ সালে একবারও যেতে পারিনি তাঁর কাছে, নিজের অসুস্থতার কারণে, চোখের গণ্ডগোলে, সে অনুশোচনা আমাকে বিদ্ধ করুক বাকি জীবন। ব্যবস্থা করতে পারিনি তাঁর বই প্রকাশের, সে পাপবোধ আমার একার।

মৃত্যুর সামান্য আগে পর্যন্ত সংগ্রামী মানুষে অবিচল আস্থা রেখে কবিতা লিখে গেছেন তিনি। সেই জন্যই আমার চোখে তিনি খুব বড় মানুষ। বিশাল গাছ। প্রভঞ্জন হার মানে। কত দুঃখ আর আঘাত, অপমান আর অবিচার সেই সাধারণের চেয়ে অনেক বড় মানুষকে আজীবন সইতে হয়েছে। কে তার খবর রেখেছে? প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য-জগৎ যত কার্পণ্য করুক তাঁকে স্বস্থান দিতে, তিনি জানতেন, তিনি সত্যিই শক্তিমান, অমিতবীর্য। আবার স্নেহকাতরতা, মমত্বই বাবার চরিত্রে ছিল সবচেয়ে বড় জিনিস।

কী রকম যে জীবন্ত আর আকর্ষণীয় মানুষ ছিলেন। ১৯২৬ সাল। কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা চলছে। শার্ট ও লুঙি পরে এক বন্ধুকে এগিয়ে দিতে গেলেন, আর ফিরলেন না। বোধহয় একমাস কাটল। সব রকমের খোঁজ চলছে। তারপর গয়া শহরে বড়মাসির বাড়ি থেকে বাবার চিঠি পেলেন ঠাকুরদা। দাঙ্গাসন্ত্রস্ত অঞ্চল দিয়ে বন্ধুকে এগোতে এগোতে হাওড়া এবং তখন সিদ্ধান্ত, যে পথ দিয়ে ফিরব সে পথে দাঙ্গার ভয়, অতএব গয়া যাওয়াই সুবুদ্ধির কাজ। ঠাকুরদা দুশ্চিন্তা করছিলেন জেনে বাবা বেজায় অবাক হন। তিনি তো অত্যন্ত স্বাভাবিক সুবুদ্ধির কাজই করেছেন।

এই দুরন্ত ছেলেমানুষিও চিরকালের। এর বশেই সদ্য বিয়ের পর মাকে গিরিডি না কোথায় কোনও বন্ধুর বাড়ি নিয়ে যান মায়ের মামাবাড়ি দেওঘর থেকে এবং মা কিছু বলতে পারবেন না লজ্জায়, সংকোচে, তা জেনেই বলেন, এ আমার স্ত্রী নয়, আমার এক সম্পর্কিত বোন। তাঁদের কয়েক ঘণ্টা বাদেই মনে হয়েছিল, মণীশের আচরণ ঠিক দাদার মতো হচ্ছে না। তারা আবার কট্টর ব্রাহ্ম। সে কি গণ্ডগোল!

বিয়ের পর চট্টগ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বাবার নিজের বাবার নজর এড়িয়ে চট করে মাকে ধরে একটা আলমারির ওপর বসিয়ে দিয়ে সরে পড়তেন। মা নামতে পারতেন না, বসে বসে কাঁদতেন। ঠাকুরদা তাই বাবাকে সর্বদা নজরে রাখতেন, যাতে মায়ের কাছে যেতে না পারেন। একবার অন্ধকারে ‘এইবার? কোথায় যাবে?’ বলে বাবা যাঁকে জাপটে ধরেন, তিনি বাবার জ্যাঠতুতো ভগ্নিপতি। বারান্দায় নির্দোষ হাওয়া খাচ্ছিলেন।

বহরমপুরের ‘ধরিত্রী’ বাড়িটি ছিল তাঁর বড় প্রিয়। ছেলেরা থাকবে, মেয়েরা আসবে, এই চেয়েছিলেন। বাড়িটা, ওই বাড়িটা কিন্তু ইট-কাঠ নয়, বাড়িটা এখন আমার বাবা। ওই একটা বাড়ি ইটে-কাঠে তৈরি হয় নি। বাবার ভালোবাসায়, মায়ের সযত্ন তত্ত্বাবধানে বাড়িটার একটা ব্যক্তিত্ব এসেছে। তার বিশাল সমুদ্রোপম হৃদয়ে শেষদিন পর্যন্ত গভীর ভালোবাসা ছিল, যদিও বহির্জগতের একাংশ তাঁর মাপ বোঝেনি, অমন মানুষকে শুধু আঘাতই করেছে। তবে শেষে পৌঁছে, যা ছিল অন্তর্লীন ও গোপন, তা হল সোচ্চার।

এর আগে ছেলেমেয়েদের ভালোবেসেছেন, ভালোবাসা পেয়েছেন। কিন্তু ওঁর নিজের জীবনও ছিল। শেষে পৌঁছে। মুখেই বলতেন, যা জীবনে শুনিনি আমরা কেউ। বড় বলতেন, একটু থাক, আর ক’দিন থাক, কোথায় গেলি? যে কাছে থাকত, তাকে একটু না দেখলে অস্থির, কাতর হয়ে পড়তেন। একাকীত্বে ভয় পেতেন। অবশ্য ওঁর মনের ভেতর আমাদের সাহচর্যের জন্য যে বুভুক্ষা আছে, তা ১৯৭৮ সালের মে মাসের আগে জানতে দেননি। হঠাৎ হৃদ্‌রোগে যেদিন বিছানা নিলেন, সেদিন আকাশে দুর্যোগ। বহরমপুরে কোথাও পাচ্ছি না অক্সিজেন সিলিন্ডার, অথচ বাবার দরকার অক্সিজেন। কিন্তু তিনি যে যুবনাশ্ব, সকল আঘাত উপেক্ষা করে যে লড়ে যায়!

প্র আপনার প্রথম বইটি প্রকাশের অভিজ্ঞতা নিয়ে যদি বলেন।

উঃ আমার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ, ঝাঁসির রানি। প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। তার আগে লেখাটি ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার কথা, তখন নিদারুণ দারিদ্র্য। মুম্বই থেকে কলকাতায় ফিরে আমি তো বেকার। ওখানে বিজন গেছিলেন সিনেমার গল্প লিখতে। সেই সময় মরাঠা বিশেষজ্ঞ ড. প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত তাঁর অমূল্য বইয়ের সংগ্রহ আমাকে উদার সহানুভূতিতে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। প্রতুলবাবুর দেওয়া বইপত্র পড়ি, নোট করি। ভরদুপুরে পদ্মপুকুর থেকে হেঁটে যাই জাতীয় গ্রন্থাগারে। বিকেল নাগাদ ফিরি যখন, গরমকালে নরম পিচে জুতো বসে যায়। কেমন করে যে সব কাজ করি, বাপ্পা তো এতটুকুন একরত্তি, আর লাগামছাড়া দুরন্ত! বই লেখার জন্য যে খাটাখাটনি করব, তাতে বিজন খুব সাহায্য করেছিলেন। বোধহয় তিন-চারশো পাতা লিখেছি, মনে হল, কিছুই হচ্ছে না। সে সময়েই ড. গুপ্ত জানালেন, এবার ইতিহাস কংগ্রেস হবে আহমদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে আসবেন রানির আপন ভাইপো গোবিন্দ চিন্তামনি তাম্বে। কঁসির রানি ১৮৫৮ সালে নিহত। আমার খুব সৌভাগ্য যে তাম্বের কাছে স্নেহ, সাহচর্য ও সাহায্য এবং রানির পোষ্যপুত্র দামোদর রাওয়ের ছেলে স্বৰ্গত লক্ষ্মণ রাও ঝাঁসিওয়ালের সহৃদয় সাহায্য পেয়েছিলাম।

তারপর গোয়ালিয়র, ঝাঁসি ও কাছাকাছি অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করে লোকবৃত্তের উপাদান সংগ্রহ শুরু হল। ‘ঝাঁসি’ নামটি মানচিত্রে দেখে ছোট্ট বাপ্পাকে বিজনের কাছে রেখে চলে যাই একলা। কষ্ট এবং চেষ্টা করে চারশো টাকা ধার নিলাম, সাহায্যও নিলাম। শুনছি শীতের জায়গা, গরম জামাও উক্ত উপায়েই জোগাড় হল। বিজন বললেন, নিশ্চিন্ত মনে চলে যাও। বাপ্পাকে আমি দেখব। তাই হয়েছিল। শুনেছিলাম, ড. মহাদেবপ্রসাদ সাহা ঝাঁসির মানুষজনকে জানেন, যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। তিনি যাঁদের লিখে দেন, সবাই সাহায্য করেছিলেন প্রাণপণে। যথেষ্ট বোকা ও দুর্দান্ত বা টারবুলেন্ট ছিলাম। নইলে ২৬-২৭ বছর বয়েসে ছোট্ট বাপ্পাকে রেখে অত দূরে চলে যাই? গোয়ালিয়রে ডাকাতের হাতে পড়েছিলাম। একটি বাঙালি মেয়ে এমন একটা কাজ করতে এসেছে বলে সবাই কত সহায়তা করেছেন সাধ্যমতো। বুন্দেলখণ্ডের সাধারণ কিষান, গঞ্জীওয়ালা বা ঘাসবিক্রেতা, সকলে কত সহজে আমাকে গ্রহণ করেছিলেন। তাদের সঙ্গে কাটানো সময়গুলো বড় দামি। তখন তো ও অঞ্চলে দস্যুসম্রাট মানসিংয়ের রাজত্ব চলছে। আগ্রা স্টেশনেই ঘোষণা চলত, ‘একলা কোনও খালি গাড়িতে উঠবেন না, অচেনা লোককে বিশ্বাস করবেন না, লাইসেন্সপ্রাপ্ত ভেন্ডার ছাড়া কারও কাছ থেকে পান ও লেমোনেড কিনবেন না।’

অবশেষে সব পয়সা ফুরোতে তবে ফিরলাম। ছোট্ট বাপ্পা আমার আঁচল ধরেছে আর ওর বাবার দিকে ফিরে বলছে, বাবা, আজ মা রান্না করবে! সে কথা এখনও মনে পড়ে।

প্র আপনার প্রিয় গল্প কোনটি?

উঃ জীবনে তো অনেক গল্পই লিখেছি। তবে হ্যাঁ, সবচেয়ে প্রিয় গল্পের কথা বলতে গেলে ‘স্তনদায়িনী’র কথাই বলতে হবে। আমার আরেকটি প্রিয় গল্প, ‘দ্রৌপদী’। তবে দু’টি গল্পের মধ্যে প্রথমটিকেই আমি আগে রাখব। ১৯৭৭ সালে শারদীয়া এক্ষণে গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সেই সময় অনেক ঘোরাঘুরি করেছি। তবে শুধু অভিজ্ঞতা অর্জনই নয়, নিজের চিকিৎসার জন্যই ওই সময়টায় হাসপাতালের আউটডোরে অনেকবার যেতে হয়েছিল। ওখানেই স্তনে ক্যানসারগ্রস্ত একটি মেয়েকে দেখেছিলাম। দিনের পর দিন মেয়েটিকে দেখি। তিরিশেরও কম বয়স। শ্যামবর্ণ। চোখদু’টো যেন কথা বলছে, এত প্যাশনেট। মেয়েটি শেষপর্যন্ত বাঁচেনি। কিন্তু কেন মারা গেল মেয়েটি? সে মারা গেছিল অতিরিক্ত স্তন্যপান করাতে গিয়ে। অনেকগুলি সন্তানের মা ছিল সে। তার উপর দেওর-ননদ এদেরও সন্তানদের দুধ খাওয়াতে হত। ওর বুকে দুধ ছিল। অত্যধিক স্তন্যদানই হয়তো বুকে ক্যানসারের কারণ নয়। কিন্তু স্তনে ক্যানসার অত্যধিক স্তন্যদান ক্ষেত্রেও দেখা যায়। আমাকে যেটা স্পর্শ করেছিল, তা হল মেয়েটি একদম বিশ্রাম পেত না। কাউকে না কাউকে ওকে ক্রমাগত বুকের দুধ খাইয়ে যেতে হত। আর ভেতরে ভেতরে ও যে শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে যেন কারোরই খেয়াল ছিল না। ও যে এভাবে অবহেলিত হয়েছিল, সেটাই আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। যে স্তনদুটিকে যশোদা খুব মহার্ঘ বলে ভাবত, সেই দু’টিই শেষপর্যন্ত তার মৃত্যুবাণে পরিণত হয়। যার দুধে প্রতিপালিত হয়েছিল কত কত শিশু, মৃত্যুর সময় তারই কোনও পরিচর্যা হল না। যন্ত্রণায়, অবহেলায় তার জীবন নিভে যায়।

এই বিষয়টিই আমার মাথায় ঘুরছিল। আমি এ বিষয়ে কিছু পড়াশোনা করলাম। ডাক্তারদের সঙ্গেও কথা বললাম। সাধারণত আমি গল্পটা আগেই মাথায় ভেবে নিই। প্রথম লাইনটাও যখন মাথায় চলে আসে, তখনই লিখতে শুরু করি। লিখতে খুব একটা সময় লাগে না। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। খুব দ্রুত লিখে ফেলেছিলাম। আজও ওই মেয়েটির কথা আমি ভুলতে পারিনি। অতিরিক্ত বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে একটি মেয়ে প্রাণ দিয়েছিল। কত শিশুসন্তানকে সে বাঁচিয়েছে। কিন্তু তার কথা ভাবার কেউ ছিল না। তাকে যত্ন করার কেউ ছিল না। এই যে এক্সপ্লয়টেশন, এটাই ছিল আমার গল্পের প্রেরণা।

প্রঃ আপনার বই পড়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।

উঃ তখন বয়স হয়তো দশ। বই পড়ার বিষয়ে আশ্চর্য আকর্ষণ তার আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। পড়ার নেশাই অত্যাধিক ছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’, ‘শিশু’, একটু বড় হয়ে ‘কথা ও কাহিনি’ শৈশব থেকে পড়েছি। খুব দ্রুত পড়তাম, মা বিশ্বাস করতেন না আমি সত্যিই পড়ছি। কিছু জিজ্ঞেস করলে পটাপট বলেও দিতাম। দিদিমা এগারো বছরে বিবাহিতা। কুড়ি বছর বয়সে জননী। বাংলার ভিত্তি খুব পোক্ত ছিল। চল্লিশ বছর বয়েসে ইংরেজি শিখে সাহিত্য পড়তে শুরু করেন। ১৯৩৫ সাল থেকে ওঁদের সাহিত্য আর সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছি। তাঁর বাংলা বইয়ের সংগ্রহ ছিল খুব ঋদ্ধ। পড়তে পড়তে লিখতে এসেছি বলেই মনে করি। প্রায় সব লেখকই বই পড়ার নেশায় ডুবে থেকেছেন কোনও না কোনও সময়ে।

মহাশ্বেতা দেবীর ৯২তম জন্মবার্ষিকীতে Google Doodle এভাবেই তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়েছিল

আমার সেজকাকা ছিলেন ভালোমানুষ, স্বল্পভাষী। গান শুনতে ভালোবাসতেন। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মণ— এঁদের গান সেজকাকা রেকর্ড কিনে শোনাতেন। গ্রামোফোনটি যত্ন করে রাখাও ছিল তাঁরই কাজ। ক্লাস এইট থেকে নাইনে ওঠার সময়ে হঠাৎ বাবা বললেন, ‘ইংরিজি পড়ো। সে সময়েই আমাকে কিনে দিলেন তুর্গেনেভের ‘অন দি ইভ’ আর ‘ফাদার অ্যান্ড সানস। আর সেজকাকা আনল, ‘টেলস ফ্রম শেকসপিয়র’। বলল, এই বইটা দিয়ে শুরু করবি। সেজকাকা বলত, খুকু, তোর হবে না, মিতুলের হবে। সেজকাকাই শেকসপিয়রের নাটকের গল্পগুলো বই ধরে পড়া ধরত। এতে বেশ মানসিক ব্যায়াম হয়েছিল। ওই বইটি পড়েই শেকসপিয়রের নাটকগুলির গল্পংশ পড়ে ফেলি। মনে হয়, সেটা ভালোই হয়েছিল। তারপর থেকে একটু একটু করে ইংরিজি বই পড়াও অভ্যেস হয়ে যায়। ডিকেন্স থেকে গলসওয়ার্দি, যা পেয়েছি তাই পড়েছি। অন্য দেশের সাহিত্যের মধ্যে তুর্গেনেভ ছাড়াও পড়েছি দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেকভ, মোপাসা, প্রস্ত। ডিটেকটিভের বইয়ের মধ্যে পড়েছি, এডগার অ্যালান পো, আর্থার কোনান ডয়েল, আগাথা ক্রিস্টি। অরণ্য ও আরণ্যক জীবন নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল অন্তহীন। জিম করবেটের বইগুলো সেইজন্যই বারবার পড়েছি। সর্বভুক পাঠক ছিলাম বললে মিছে বলা হবে না।

ছোটবেলাতেই শিখেছিলাম, পড়তেও শিখতে হয়। শেখাতে চেষ্টা করেছিলেন দিদিমা। দিদিমার পাঠানুরাগ এমন ছিল যে, এখন ভাবলে অবাকই লাগে। শুধু গল্প-উপন্যাস পড়তেন না, সবরকমের বই-ই পড়তেন। আমি মূলত গল্প-উপন্যাসই পড়েছি। সাহিত্য, নারীজগৎ, দেশের কথা— এসব বিষয়ে প্রবন্ধও পড়তেন। বাড়িতে মাসিক প্রবাসী, বিচিত্রা ও ভারতবর্ষ রাখতেন। সন-তারিখ মিলিয়ে সেগুলি বাঁধাতেন, আলমারিতে সাজানো থাকত। দোতলায় চারটি ঘর ছিল। তিনটিতেই বইয়ের আলমারি থাকত। বের করি আর পড়ি। দিদিমা বলতেন, “রাজর্ষি’ পড়ো। ওই যে রাতের বর্ণনাটা? জয়সিংহ ছুরিতে শান দিচ্ছেন…

সত্যিই অসামান্য বর্ণনা! কবে রাজর্ষি পড়েছি! ২০০৫-র আগস্ট মাসে জীবনে প্রথম ত্রিপুরা গেলাম। প্রাচীন রাজধানী উদয়পুরে গিয়ে নদীর ওপারে সেই প্রতিমাহীন শূন্য মন্দির দেখে এলাম। খুব নির্জন জায়গাটি। দিদিমাই পড়িয়েছিলেন, রমেশচন্দ্র দত্তের ‘মাধবীকঙ্কন’, ‘রাজপুত জীবনসন্ধ্যা’ এবং মহারাষ্ট্র জীবনপ্রভাত। তাঁর লেখা ‘সংসার’ ও ‘সমাজ’ পড়ার ইচ্ছে পূর্ণ হল ১৯৩৬-৩৮ সালে শান্তিনিকেতনে এসে। শান্তিনিকেতনের অতি ঋদ্ধ গ্রন্থাগার রবীন্দ্রনাথের প্রদত্ত অজস্র বইয়ে পরিপূর্ণ।

সীতা দেবী, শান্তা দেবী এঁদের গল্প-উপন্যাস বিষয়ে দিদিমার অত ঝোঁক ছিল না। এঁরা দু’জনই ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে। ইতিহাসে দিদিমার গভীর অনুরাগ ছিল। বুঝি না বুঝি, পড়ে যেতাম। সেভাবেই পড়েছি সখারাম গণেশ দেউস্করের ‘দেশের কথা’। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’র ‘সিরাজদ্দৌলা’ ও ‘ফিরিঙ্গি বণিক। তাঁর লেখা ‘আঁসির রানী’ বইটি আমাকে পড়তে দেন বিনয় ঘোষ। তখন বই বুড়ো হলে নরম রোদে সেঁকে, তামাকপাতা বইয়ের ভাঁজে রেখে যত্নে তুলতে হত।

দিদিমার একটি আলমারি তৈরি করানো হয় নিমকাঠে। ওটি ছিল দামি অথচ জীর্ণ বইদের হাসপাতাল। একা আমারই অধিকার ছিল সব আলমারি ও শেলফের সব বই দেখবার, নেবার, পড়বার। সেইজন্যই ‘টমকাকার কুটির বইটিও পড়া হয়ে যায়। ছোটবেলা সকলের লেখাই পড়েছি। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, সুখলতা রাও, লীলা মজুমদার। মৌচাক, রামধনু, রংমশাল-ক্রমে ক্রমে পড়ি। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘আরব্যপোন্যাস ছোটদের মন কেড়ে নিতেই এসেছিল। খগেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘ভোম্বল সর্দার’ আমাদের হাতে হাতে ফিরত। ধীরেন্দ্রলাল ধরের ‘আবিসিনিয়ার ফ্রন্টে’ অথবা ‘কামানের মুখে নানকিং’ বড় আনন্দে পড়েছি। দীনেন্দ্রকুমার রায়ের ডিটেকটিভ উপন্যাস তখন খুব চলত। তবু বলব, দীনেন্দ্রকুমার রায়ের ‘পল্লীচিত্র’, ‘পল্লীচরিত্র’ এবং ‘পল্লীবৈচিত্র্য’— এই তিনটি বই পড়ে নেওয়া দরকার।

সি আর শশীকুমারের ইলাস্ট্রেশন/ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

এখন আর বেশি পড়তে পারি না। মনেও রাখতে পারি না অনেক কিছু। আগে যে বইগুলি পড়েছিলাম, সেগুলিই আবার করে পড়তে ইচ্ছে করে। ভেরিয়ার এলুইন আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। মাঝেমাঝেই ওই বইটা খুলে বসি। ঋত্বিকের কথা খুব মনে পড়ে। ও তো নিজেও বই পড়তে খুব ভালোবাসত। আমার মতোই হাতের কাছে যা পেত, তাই পড়ত। ঋত্বিককে নিয়ে যে সংকলনটি বেরিয়েছে, তাতে আমার দু’টো লেখা আছে। এছাড়া সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস সহ অনেকেই লিখেছেন। ঋত্বিকের বড় মেয়ে সংহিতা যে বইটি লিখেছে, সেটিও চমৎকার হয়েছে। মারোয়ার বইটি আমার খুবই প্রিয়। একটি বিখ্যাত কবিতার উদ্ধৃতি এই বইয়ের শিরোনাম। পরপর সাজালে এরকম দাঁড়াবে, ট্রাইবাল ওয়ার্ল্ড অব ভেরিয়ার এলুইন, প্রসঙ্গ ঋত্বিক (সংকলন), সংহিতা ঘটকের ‘ঋত্বিক এক নদীর নাম’, ইভান তুর্গেনেভের ‘অন দ্য ইভ’ এবং আর্সে মারোয়ার ‘ওয়াটএভার গডস মে বি’।

প্রঃ আপনার আগের সময়কার লেখকেরা, যাঁদের নিজের চোখে দেখেছেন…

উঃ মনে পড়ে, ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ একবার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বাংলা ক্লাস নিতে চাইলেন। শান্তিনিকেতনে আমি যাই ১৯৩৬ সালে, ১৯৩৮ শেষ করে ফিরে আসি। আমরা, সপ্তম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা নির্বাচিত হই। সে কি গর্ব আমাদের! উনি ক্লাশ নিলেন। পাঠ্য অংশ খুব গভীর মনোযোগে পড়ার ওপর খুব জোর দিয়েছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি এমন কাছ থেকে। সেটা যে কতবড় সৌভাগ্য তখন বুঝিনি, আজ সবসময় মনে হয়! রবীন্দ্রসাহিত্য বহু বছর ধরে অনেক পড়েছি। রবীন্দ্রনাথ মন্দিরে উপাসনায় যে ভাষণ দিতেন, তা তখন খণ্ডে খণ্ডে বের হত। এখন দুই খণ্ডে পাওয়া যায়। একবার ছাতিমতলার নিরালায় বসে মনোযোগে ‘শান্তিনিকেতন’ পড়লাম ক’দিন ধরে। পড়েছি, তাঁর সাহিত্য পড়েই একসময় বড় হয়েছি। শান্তিনিকেতনে থাকার সময় মা খুব বড় বড় চিঠি লেখেন। তুতুল লেখেন মাঝেমধ্যে। একটি বেজায় মূল্যবান বই পেলাম, ‘শান্তিনিকেতন সেকাল-মধ্যকাল ও একাল। লেখক ননীগোপাল শিকদার। শান্তিনিকেতনকে জানার জন্য এই বইটি খুবই মূল্যবান। সেইসময়ই কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের ‘দুরাকাঙ্খের বৃথাভ্রমণ’ বইটি পড়ে ফেলি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে কোনও বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। সন-তারিখ মনে নেই। চিন্মোহন সেহানবীশ তখন ছাত্র। উপস্থিত শ্রোতাদের কাছ থেকে কাগজে সই নিচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখেন, একটি নামের স্বাক্ষর, ‘কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য। চিন্মোহনবাবু তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। কৃষ্ণকমল নিজের ঠিকানাও লিখে দেন। তিনি বিরাবই বছর বয়েসে মারা যান। চিন্মোহনবাবু বলেছিলেন, শেষ জীবন অবধি চিরবিদ্রোহী সাহসিক মানুষই ছিলেন। ১৯৪৯ থেকে বছর দুই টালিগঞ্জে ছিলাম আমরা। নবারুণের জন্ম ১৯৪৮ সালে। টালিগঞ্জের বাড়িতেই আমার ছেলের এক বছর পূর্ণ হয়। সে-সময়ে শুনেছি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ওই অঞ্চলেই থাকতেন। অনেকদিন আগে আমাদের বাড়িতে একজন লম্বা, কালো, ধারালো চেহারার ভদ্রলোক এসেছিলেন। তিনি ছাতা ফেলে চলে গিয়েছিলেন। পরে বাবা বললেন, ওই যে ছাতা ফেলে গিয়েছিল, উনিই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওঁর ‘দিবারাত্রির কাব্য’ যখন ধারাবাহিক বের হত, তখনই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ে নিতাম। পরে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ আর ‘পদ্মানদীর মাঝি’ও গোগ্রাসে পড়ি। ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ আর ‘হারাণের নাতজামাই’ পড়েও মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গিয়েছিলাম খুব সমীহ নিয়ে। ওঁর বসার ঘরে ঢুকতেই বলেছিলেন, ‘‘এসো, মা এসো।” শুনে মন ভরে গিয়েছিল।

ওঁর ‘বেদেনী’ গল্প ইংরিজিতে অনুবাদ করেছিলাম। বুদ্ধদেব বসু আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তখন তিনি আমেরিকায়। আজও ভুলতে পারি না, ডাকে এসে পৌঁছলো দু’টি পেপারব্যাক বই। দু’টিই ছোটগল্পের সংকলন, তলস্তয় ও আন্তন চেকভের। সঙ্গে ছোট চিঠি। যা লিখেছিলেন তার মর্মার্থ, আমেরিকাতেই কোনও জায়গা থেকে অন্য কোনও জায়গায় যাওয়ার পথে কোনও স্টেশনে নেমেছিলেন, প্ল্যাটফর্মে এক বইয়ের দোকানে বইগুলি কেনেন। আর প্রেমেন্দ্র মিত্র? বয়ঃসন্ধিকালের এক কিশোরকে নিয়ে লেখা ‘উপনয়ন’ কেউ পড়েছেন তো বুঝবেন, কি আশ্চর্য কলমই না ছিল ওঁর। ‘মিছিল’ পড়েই কি কম মুগ্ধ ছিলাম অল্প বয়স থেকে! তাছাড়া অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘যতনবিবি’ ও অন্যান্য গল্পগুলি কে ভুলবে! অচিন্ত্যকুমার একবার তো ছোটদের জন্য এক অসামান্য উপন্যাস লেখেন, ‘ডাকাতের হাতে’। অতীব সুখপাঠ্য বই। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ পড়ে আমরা যখন চমকে গেছি, তখন তো অদ্বৈত চলে গেছেন। ঋত্বিক সেই বই নিয়ে ছবি করল। সেটা মনে করলেও গর্ব হয়। সাবিত্রী রায়কে দেখিনি, বরেন বসুকেও নয়, সুলেখা সান্যালকে দেখেছি। লীলা মজুমদারের বাড়িতে ইচ্ছে হলেই চলে যেতে পারতাম। পার্ক স্ট্রিট-চৌরঙ্গির মোড়ে এক পেল্লায় বাড়ির দোতলায় ওঁর স্বামীর চেম্বার ও বাড়ি। ও বাড়িতেই যেতাম। সবসময় খুশির মেজাজ, রান্নাবান্নায় খুব উৎসাহ! একদিন বললেন, ‘দাঁড়া, তোকে হাঁসের রোস্ট শিখিয়ে দিই। খুব বিশদভাবে শিক্ষা দিলেন। একটা আস্ত হাঁসের পেটে পেঁয়াজ, ফুলকপি, কত কি পুরতে হবে। তারপর সেটি সেলাই করতে হবে। আবার একদিন দেখি বাতাবি লেবুর জেলি বানিয়ে বয়ামে ভরছেন। কেমন করে বানাতে হবে, তা বিশদে বুঝিয়ে দিলেন। অবশ্যই আমি সে জেলি বানাইনি। আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন সম্পূর্ণ নিরামিষাশী। কি সুন্দর হেসে বলতেন, “আমাদের ছোট বয়সে বিয়ে। দু’জনায় ভারি ভাব গো।”

প্রঃ নববর্ষ নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?

উঃ নববর্ষ নিয়ে একটাই অনুভূতি খুব তীব্রভাবে এবং আশৈশব আমার হয়। আর সেটা হল, এবার সবকিছু বদলে যাবে। ভোরবেলা চোখ খুলেই দেখব, সব বদলে গেছে। পাল্টে গেছে। নতুন করে সবকিছু শুরু হয়েছে। কিন্তু তা তো আর হত না! সব যেমন থাকার তেমনই থাকত। কিন্তু ওই যে একটা আশা, একটা বিশ্বাস, একটা স্বপ্ন, ওটাই আমাদের উৎসাহে ভরিয়ে রাখত। ছোটবেলার কথা এ প্রসঙ্গে খুব মনে পড়ে। বড় পরিবার আমাদের। অনেক ভাই-বোন। নববর্ষ আসার কয়েকদিন আগে থেকেই উৎসাহে একদম ছটফট করতাম। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতাম, দেখিস, এবার সব বদলে যাবে। নতুন একটা বছর আসছে না? আমরা আশা করতাম, এবার একটা ম্যাজিক হবে। ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতাম। যদিও কোনও ম্যাজিক শেষপর্যন্ত হত না। কিন্তু দিনটি চমৎকার কাটত। লোকজন আসত। খাওয়া-দাওয়া হত। নতুন জামা-কাপড় পড়তাম। সবমিলিয়ে, জমজমাট একটা দিনের শেষে দেখতাম, কিছুই বদলায়নি। সব একই থেকে গেছে।

প্রঃ গার্সিয়া মার্কেজের ‘ক্রনিকল অব আ ডেথ ফোরটোল্ড’-এর সঙ্গে অনেকে তুলনা করেন আপনার ‘কবি বন্দ্যঘাটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’র। দুটি উপন্যাসেই মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত। এ বিষয়ে আপনার কী মত?

উঃ এই উপন্যাসটি লিখেছিলাম ষোড়শ শতকের পটভূমিতে। ষোড়শ শতক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার একশো বছর আগে ইউরোপে রেনেসাঁ এসে গিয়েছিল। আমি মনে করি, একদিকে শ্রীচৈতন্য, তারপর তুকারাম, নানক, মহারাষ্ট্রে একনাথ, এরা এবং আমাদের বাউল-বৈষ্ণবরা একটা মহান ভাবনা প্রতিষ্ঠা করলেন। কারো মন্দিরে বা মসজিদে যাওয়ার দরকার নেই। যে যেখানে আছে, সেখান থেকেই যদি ঈশ্বরের নাম করে, সেটা ঈশ্বরের কানে পৌঁছয়। কবি বন্দ্যঘাটী এমন একজনকে নিয়ে লেখা, সে যেভাবেই হোক কিছু লেখাপড়া লিখেছিল এবং তার কবি হওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল। ব্রাহ্মণ হিসেবে সে ইচ্ছে করেই মিথ্যা পরিচয় দেয়। কেন-না আরণ্যচুয়াড়ের বিদ্যার্জন সেদিনের সমাজ ক্ষমা করত না। সে সময়ে চৈতন্যের প্রবল প্রভাবে নির্যাতিত জাতিগুলি বৈষ্ণব হয়ে ব্রাহ্মণ্যশাসনের নির্দেশিত সীমারেখা মানছে না, এতেও রাজন্যকুল ও উচ্চবর্ণীয়রা অস্বস্তিতে ছিলেন। এখানে সে নিজেকে সেভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল কিন্তু তার পরিচয় জানার পর রাজা তাকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেন। কবিকঙ্কন মুকুন্দরামেরও তো দামিন্যা ত্যাগের কারণ ছিল নয়া শাসকের জুলুম-জবরদস্তি। এই উপন্যাস লেখার সময় মধ্যযুগের বাংলাকে গদ্যে ব্যবহার করে লাভবান হয়েছিলাম।

প্রঃ আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাচিভমেন্ট কী?

উঃ আমার সমস্ত জীবনের যদি কোনও অ্যাচিভমেন্ট থেকে থাকে কাজকর্মের তা হল, ট্রাইবাল অর্থাৎ আদিবাসী শব্দটা, এরা যে আছে, এ বিষয়ে মানুষকে অবহিত করা। সে বিষয়ে গল্প-উপন্যাস লিখে, সে বিষয়ে প্রতিবাদ করে, সে বিষয়ে অনেক কিছু করে তারা যে আছে সেটা প্রতিষ্ঠা করা। আদিবাসী কৃষকেরা মূলত নিরক্ষর ছিল। জমি-শস্য এসবের ভুল হিসাব দাখিল করে তাদের আদালতে তোলা হত। জমিজমা কেড়েও নেওয়া হত। তথাকথিত সভ্য সমাজে সবথেকে নিচু স্তরের মানুষ যাদের জানি আমরা, তাদের চেয়েও শোচনীয় অবস্থা আদিবাসীদের। কেউ ওদের মানুষ মনে করে না, ভাবে দু-পেয়ে জানোয়ার। সভ্য সমাজ, পুলিশ, প্রশাসন আর রাজনৈতিক দলগুলোর চোখে আদিবাসীরা কেবল শিকারের বস্তু। আমি আদিবাসী বিদ্রোহের কাহিনিগুলি পড়তে শুরু করেছিলাম। তারপর তো মেশামেশি ছিলই। নিজেই চলে গেছি সেই ভারতবর্ষে, যেখানে অনাহার, দারিদ্র্য, বঞ্চনা নিত্য সত্য, শিশুরাও শ্রমে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। ১৯৬৫ সালেই আমার যাতায়াত শুরু হয়েছিল ম্যাকলক্সিগঞ্জ আর পালামৌ। বছরে দু’বার তো যেতামই। ‘চোট্টি মুণ্ডা’র কাহিনিসূত্রও পেয়েছিলাম ওইভাবে। পালামৌ জেলার এক অখ্যাত আদিবাসী অঞ্চলে মেলা উপলক্ষে তির খেলা দেখতে গিয়ে। এটিই আজ পর্যন্ত আমার প্রিয়তম বই। আমার অভিজ্ঞতার আকরগ্রন্থ। তারপর তো পুরুলিয়ার আদিবাসীদের জন্য আমি পুরোপুরি সমর্পিত হয়ে গেলাম।

প্রঃ চোট্টির মতো অন্যান্য লেখাতেও সেই জীবনের অভিজ্ঞতা আসতে শুরু করল…

উঃ আমার ‘টেরোড্যাকটিল, পূরণ সহায় ও পিরথা’ উপন্যাসে আমি টেরোড্যাকটিলের মিথ নিয়ে ভারতের আদিবাসী সমাজের বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা-জাত সিদ্ধান্তটি বলতে চেয়েছি। এটি আমার সমগ্র আদিবাসী-অভিজ্ঞতার সারাংশ। উপন্যাসের পটভূমি মধ্যপ্রদেশের আদিবাসী-প্রধান গ্রাম পিরথা। যেভাবে ওরা বেঁচে থাকে, বেঁচে আছে, সমাজে রাষ্ট্রে অর্থনীতিতে কোথাও ওদের কোনও অস্তিত্বই স্বীকৃত হয় না তবু ওরা আছে, ওদের এই থাকাটাই আমার কাছে পরাবাস্তবতা বলে মনে হয়েছিল। তারপর ধরো, ‘বসাই টুডু’। এই লেখাটির প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল আমার প্রয়াত ভাই মৈত্রেয় ঘটকের লেখা একটা বই, ‘এগ্রিকালচারাল মিনিমাম ওয়েজ ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ প্রবন্ধটি খুব নাড়া দিয়েছিল। ওই প্রবন্ধে ক্ষেতমজুরদের ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সংগ্রাম লিপিবদ্ধ ছিল। ওটা প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ কারণ ওটার বিষয়ই হচ্ছে আদিবাসী ক্ষেতমজুরদের বঞ্চনা। তারা ১৮-২০ ঘণ্টা শ্রমের বিনিময়ে দু-পাঁচ টাকার মতো একটা হাস্যকর মূল্য পেত। ভারতবাসীকে নিরন্ন রেখে দেবার কাজে এই ঋণদাতা মহাজনদের ভূমিকা খুব বড়। বসাই টুডু মনের মধ্যে গড়ে উঠছে তখন, এবং আমাকে ভিতরে অস্থির করে রেখেছে। আমাকে এভাবে বারবার অস্থির করেছে কয়েকজন। বীরসা মুণ্ডা, বসাই টুডু, চোট্টি মুণ্ডা ও একটি হাতি। এই অস্থিরতা যে কত দরকার, কত প্রেরণাদায়ী, তা আমি বলে বোঝাতে পারব না। বীরসা তো আমার অন্যতম নিকটতম মানুষ। কেন-না তাঁর কাহিনি লিখেছি বলে আমি ভারতের আদিবাসীজনের ভালোবাসা পেয়েছি, তারা আমার ঘরের মানুষ হয়েছে।

প্র আপনার প্রিয় লেখক কারা? আর এই প্রিয় হওয়ার কারণ কী?

উঃ রবীন্দ্রনাথকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। শিল্পীদের মধ্যে রামকিঙ্কর বেইজ বা বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়কে দেখেছি। ঋত্বিক ঘটককে দেখেছি, শিল্পের জন্য যে বাঁচতেও পারত, মরতেও পারত। এদের মধ্যে আপোশ কখনও দেখিনি। ঋত্বিকের বিষয়ে এই কথাটা বিশেষ করে খুব মনে পড়ে। শিল্পী বলতে এদের কথাই আমার খুব বেশি মনে পড়ে। আর লেখকদের মধ্যে আমি মনে করি, সতীনাথ ভাদুড়ি ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নোবেল পুরস্কার পেতেই পারতেন। এছাড়া বিভূতিভূষণ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তো আছেনই। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও জ্যোতির্ময়ী দেবীও খুব বড় লেখক। জ্যোতির্ময়ী দেবীর বাল্যবিবাহ, বাইশ বছরে বিধবা। পাঁচটি সন্তান। জয়পুরে বাবা ছিলেন মহারাজের মন্ত্রী। তিনি সত্যিই অনন্যা ছিলেন। নিজের চেষ্টায় ইংরাজি শিখেছিলেন। কান্ট, হেগেল, ইবসেন, ভার্জিনিয়া উলফ পড়তেন। আবার আগাথা ক্রিস্টি, উডহাউসও সমান উপভোগ করতেন। ওঁর রাজস্থানের নারী সমাজ-আশ্রিত গল্পগুলো আমি আজও পড়ি। কী অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত, বৌদ্ধিক লেখা ছিল ওঁর! শৈলবালা ঘোষজায়ার ‘শেখ আন্দু’ এবং গুণময় মান্নার ‘লখিন্দর দিগার’ এবং শালবনী’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। অসীম রায় ও দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু লেখা। আর ছিলেন লীলা মজুমদার! তাছাড়া এক অর্থে মনে করি, আশাপূর্ণা দেবীও নোবেল পেতে পারতেন। তিনি একজন মহীয়সী রমণী। এক সময় টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ইতিহাসের কাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত, শ্রেষ্ঠ দশজন বাঙালি রমণী সম্বন্ধে লিখতে বলা হয়েছিল। আমি সেই দশজনের মধ্যে আশাপূর্ণা দেবীর কথা লিখেছিলাম। আমার মতে, তিনি একজন অসাধারণ মহিলা। শুধু বাংলাভাষার নয়, সারা ভারতের একজন প্রধান লেখিকা হিসেবেও তিনি সম্মানিত হয়েছেন। তার লেখার মধ্যে একটা বিশ্বমানবিকতা আছে, লেখার মধ্যে নারী-পুরুষের মধ্যেকার জটিলতা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি। চল্লিশের দশকের গদ্যকারেরা, অনেকেই ভালো ভালো কাজ করে গেছেন। তাঁরা অনেকেই সত্তর অতিক্রম করে আশির দশক পর্যন্তও ছিলেন। বিমল কর অত্যন্ত নাগরিক লেখক, ওঁর ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যের একটা সম্পদ। সমরেশ বসু সাধারণ মানুষকে ধরতে পারতেন। অমিয়ভূষণ মজুমদার ছিলেন সত্যিকারের শক্তিশালী লেখক। গুণময় মান্নার কথা মনে পড়ছে, জেনুইন ভালো লেখক। এইসব লেখকের প্রত্যেকেরই নিজস্বতা ছিল, এরা একে অপরের চেয়ে আলাদা। অন্য ভাষার লেখকদের মধ্যে ভৈকম মহম্মদ বশির, শিবশঙ্কর পিল্লাই এবং গোপীনাথ মহান্তি আমার খুব প্রিয়।

প্রঃ আপনার সমসাময়িক ও পরবর্তীকালের লেখকদের কথা কিছু বলুন।

উঃ অনেকেই তো আছেন! এঁরা মূলত ছোট কাগজ-নির্ভর, বড় কাগজেও লেখেন সুযোগ পেলে। আমি এঁদের কথা বলেছি অনেকবার। এঁদের আত্মপ্রকাশে আমার পক্ষে যতটা সম্ভব, করেছি। অনেকেই স্বাতন্ত্রের অধিকারী, জমি-মাটি-মানুষ এঁরা চেনেন নিবিড়ভাবে। সমসাময়িকদের মধ্যে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মতন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সর্বাংশে অবিক্রিত মানুষ আর কে-ই বা ছিল! বিশ্বসাহিত্যে এত প্রচণ্ড, জান্তব ও জৈবিক মৌলিক মানুষ ও লেখক কতজন আছেন, তা ভাবতেও প্রস্তুত নই, থাকবও না। জাত লেখক যাকে বলে, এক বিরল বনস্পতি, যার প্রজাতি আর নেই! ও ছিল প্রকৃতির মতোই আদিম ও নিজস্ব, প্রচণ্ড ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরেছিল জীবনকে, সেখানে কৌতুকও কিছু কম ছিল না। শ্যামল বেশি লেখেননি, কিন্তু মাটির অনেক কাছাকাছি গেছেন। দেশের ও দেশের মানুষের নাড়িটা শ্যামল অনেক ভালো বুঝতেন। আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা কী-ই বা বলব! বাংলাদেশে গিয়ে প্রায় পনেরোটা দিনই কিছু না কিছু সময় কাটিয়েছি ওঁর সঙ্গে। কী মনের জোর, আর কী লেখকই ছিল! ওঁর লেখা উপন্যাসগুলোর কোনও তুলনা হয়? মনে আছে, হাড্ডি খিজির যখন মারা যায়, তখন সন্ন্যাসী বিদ্রোহে যারা নিহত হয়েছিল তারা আসে, অন্যান্য বিদ্রোহে যারা নিহত হয় তারাও আসে, সবাই মিলে তাকে বরণ করে নেয়। মুক্তিযুদ্ধ না হলে এই উপন্যাস দু’টো লেখা সম্ভব হত? আমি জ্ঞানপীঠ পাওয়ার পর আখতার বলেছিলেন, “ওটা আসলে আমিই পেয়েছি।” ওঁর বাড়িতে গেছি, আমাকে আপ্যায়ন করে বলেছেন, “দিদি, আমার বাড়িতে এসেছেন, যেন গোটা বাংলাদেশ আজ আমার ঘরে এসেছে।” আর আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে অভিজিৎ সেনকেই আমার সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে হয়। ইলিয়াসের মতোই হয়তো বা! মতি নন্দী ছিলেন খুব ধারালো। আদ্যন্ত নাগরিক। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ভালো লেখক। দেবেশ রায় বুদ্ধিমান ও মার্কসিস্ট। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ইনটেলিজেন্ট। শীর্ষেন্দুর কিছু কিছু গল্প সত্যিই ভালো। আমার ছেলে হিসাবে বলছি না, নবারুণও অবশ্য অতি দক্ষ ও সেরিব্রাল লেখক। খুব পজিটিভ, সেরিব্রাল। সুনীলের লেখা সেই অর্থে সেরিব্রাল না হলেও, অনেক বেশি হার্দিক, মানে হৃদয় থেকে উৎসারিত।

প্রঃ সিনেমা, গান, নাচ, যাত্রা ইত্যাদি নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা যদি বলেন।

উঃ গ্রামের যাত্রা দেখেছি দু’বার। কেষ্টযাত্রায় দেখেছিলাম, যশোদা দুরন্ত বালক কৃষ্ণকে শাস্তি দিচ্ছেন আর বালক কৃষ্ণ কাঁদছেন। তেমন যাত্রা দেখা ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার। মাটির অঙ্গন, খড়ের চাল, কার্বাইডের আলো। দর্শকেরা মাটিতে বসে। ঢাকায় যে যাত্রা দেখি, সে রাধা-কৃষ্ণের পালা। দলটি কিন্তু বীরভূমের। মুকুন্দ দাসের যাত্রা দেখি পাঁচছয় বছর বয়েসে। ছিলাম ফরিদপুরে। স্বদেশি মেলা হচ্ছিল। এদিকে ইংরেজের পুলিশ। মুকুন্দ দাসের কালো, বলিষ্ঠ চেহারা। তার গলায় কালীর ছবি থাকত। হাতে ত্রিশুল। আমাদের বাড়িতে বোধহয় ১৯৪০-৪১ সাল নাগাদ রেডিয়ো কেনা হয়। গান শুনতে হলে আমরা কলের গানই শুনতাম। ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ কোম্পানির দম দেওয়া গ্রামাফোন। শচীন দেববর্মনের গানগুলি আমাদের হৃদয়-মন জয় করেছিল। এসব গান সুযোগ পেলেই গাইতাম। এছাড়া ছিলেন উমা বসু। ইনি হিমাংশু দত্ত সুরসাগরের দেওয়া সুরে গান গেয়েছেন। দিলীপকুমার রায়ের স্বকণ্ঠে গাওয়া বেশ কিছু রেকর্ড ছিল। মা অবশ্য রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া অন্য গান গাওয়ার বিরোধী ছিলেন। আমার সেজকাকা ছিলেন ভালোমানুষ, স্বল্পভাষী। গান শুনতে ভালোবাসতেন। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মণ— এঁদের গান সেজকাকা রেকর্ড কিনে শোনাতেন। গ্রামাফোনটি যত্ন করে রাখাও ছিল তাঁরই কাজ। মা ভালো ইংরিজি ছবি দেখাতেন। বলতেন, ভালো ছবি দেখে অনেক শেখা যায়। মেজকাকা নিউ থিয়েটার্সের ক্যামেরাম্যান। আমাকে চ্যাপলিনের ‘মর্ডান টাইমস’ দেখিয়েছিলেন। সে সময়ে মার্গারেট মিচেলের লেখা ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ বা পরে ‘হ্যামলেট’ দেখার অভিজ্ঞতাও দারুণ। বরঞ্চ বাংলা ছবি তুলনায় কম দেখেছি। হিন্দি ছবি তুলনায় সংখ্যায় খুব কম দেখেছি। শান্তারামের ‘দুনিয়া না মানে’ সমাজবাস্তবতার ছবি ছিল। বড় হবার সময় যত যা দেখেছি, তার সব নিশ্চয় নিখুঁত মনে নেই। বাবা মাঝেমাঝেই কলকাতা বদলি হয়েছেন, টানা থেকেছেন ১৯৩৯-৪৪। ওই সময়ের মধ্যে উদয়শঙ্কর, বালা সরস্বতী, রুকমিনী আরুডলে, এঁদের নাচ দেখেছি। বিয়ের পর অনেক ছবিই দেখেছি, নবারুণও দেখেছে। ও তখন বেশ ছোট। ওয়াল্ট ডিজনির ‘ফ্যান্টাসিয়া’ দেখতে দেখতে বলেছিল, সব আমি ভালো দেখতে পাইনি। একটা কথা আমার খুব মনে হয়। দুঃখের সঙ্গেই বলছি, বাংলায় খুব কমই ছবি হয়েছে যা মগজে নাড়া দেয়, মানুষকে ভাবায়, চিন্তা করায়। বিদেশি ছবিতে বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ খুব থাকে। এদেশে ক’টা ছবিতে তেমন পাওয়া যায়? হ্যাঁ, ঋত্বিক ঘটকের কথা বলা যায়। তাঁর ছবি সবসময়ই মাথাকে নাড়া দিত। সুচিত্রা সেনের আবেদন ছিল কিন্তু মূলত বাঙালির হৃদয়ে। তিনি খুব সুন্দরী ছিলেন, অসম্ভব ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর, কিন্তু যদি বলো সোফিয়া লোরেনের সঙ্গে তুলনা করুন, সেটা কি খুব যুক্তিসম্মত হবে? আর এর জন্য তো তিনি দায়ী নন। পরিচালকেরা তাঁকে নিটোল গল্প দিয়েছেন, আর সেইসব আবেগ-সর্বস্ব, ইচ্ছাপূরণের গল্পে তিনি অভিনয় করেছেন। বাংলা দর্শক যেভাবে তাঁকে চেয়েছে, সেভাবেই তিনি তাদের চাওয়া-পাওয়াকে পূর্ণ করেছেন। আমার মনে আছে, অল্প বয়সে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছবিটি দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। প্রমথেশের ছবিও কিন্তু মাথাকে বেশ নাড়া দিত।

প্র তরুণ লেখকদের প্রতি আপনার পরামর্শ?

উঃ আমি মনে করি, লেখকদের, বুদ্ধিজীবীদের সতর্ক, অতন্দ্র ও সংগ্রামী হওয়ার প্রয়োজন আছে। সমগ্র দেশের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে অবহিত থাকার দরকার আছে। যারা লেখক, তাদের মানসিক অবসাদ, শূন্যতা, পরাশ্রয়িতা ত্যাগ করে বারবার দেশের মাটিতে ফিরে গিয়ে বাঁচবার উৎস খুঁজতে হবে। তাতে আমাদের লেখালেখিরও কোনও মানে দাঁড়াবে। এই সময় দেশ যে সমস্ত সংকটে আক্রান্ত, এই সংকটে পড়ে তাঁরা অন্যরকম লিখতে বাধ্য হচ্ছেন, নিজেদের মতো করে পথ খুঁজে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সাহিত্য এমনই একটা ব্যাপার, যেখানে নিজের দেশকাল, সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে লেখকেরা চাইলেও নিজেদের লেখায় লুকিয়ে রাখতে পারেন না। কোন লেখককে সমর্থন করব, কাকে করব না, তা এর ওপরই নির্ভর করে। ভালো-খারাপ সাহিত্য বিচার করতে হয় তো এভাবেই! আজ যারা নতুন লেখক, তাদের মধ্যে সেই প্রতিশ্রুতি থাকলে তারাও টিকে থাকবেন। তরুণ লেখকদের মধ্যে জিজ্ঞাসা অনেক বেশি। তাদের লেখা আমি শ্রদ্ধা করি। বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ এইসব কম চেনা নতুন লেখক, তাদের জন্যই আমার অপেক্ষা। আমি একসময় অভিজিৎ সেন, সাধন চট্টোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্র, অমর মিত্র, শচীন দাশ, কিন্নর রায়, অর্থাৎ যাদের শক্তিশালী গল্পলেখক বলে মনে করতাম, এদের নিয়ে দিনের পর দিন বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে ঘুরেছি। সত্তর দশক সময়টাই অন্যরকম ছিল। মানুষের জন্য মানুষের অনুভূতি অনেক প্রগাঢ় ছিল। সেই তাগিদ থেকেই তরুণ লেখকদের প্রতি যতটা সহমর্মিতা আমার পক্ষে দেখানো সম্ভব, সাধ্যমতো দেখাতে চেয়েছি। সুনীলের মধ্যে এই ব্যাপারটা ছিল। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মধ্যেও ছিল। ওঁরা দু’জনেই তরুণ লেখকদের খুব উৎসাহিত করত। সেদিন যাদের উৎসাহ দিয়েছি, তাঁরা আজকের সব সিনিয়র লেখক। এইসব লেখক তরুণ প্রজন্মের প্রতি কতটা দায়িত্ব পালন করে, আমি জানি না। আমার লেখালেখির সময়ে সাহিত্যসমাজে একটা অন্য পরিবেশ ছিল। একজন লেখক লেখার জায়গা পেতেন। তাঁরও পাঠক তৈরি হত। তাঁর লেখা নিয়েও কিছু আলোচনা হত। পাঠকদের পড়ার ক্ষুধা ছিল। আজকের প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন তরুণ লেখকেরা কতটা সুযোগ পান, তা নিয়ে ভাবি!

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • খুব ভালো লাগলো। মহাশ্বেতা দেবীর মতো একজন ব্যক্তিত্বকে খুঁটে খুঁটে দেখলাম। তাঁকে শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই। তাঁর লেখার সঙ্গে গভীর পরিচয় হয়েছে। তাঁকে প্রণাম করার সৌভাগ্য হয়েছিল (২০০৯)। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার জেলাবইমেলাতে। মঞ্চে সঞ্চালক ছিলাম। আমার হাতের থেকে পেন চেয়ে লিখেছিলেন। বিভিন্ন কারণে সেই পরিচয় আরও কিছুটা ছড়িয়ে ছিল। আজ অনেক কিছু জানলাম, বিশেষ করে তাঁর বেশ কিছু মৌলিক অভিমত। তাঁর পরিবার পরিজনের কথা আগে থেকেই জানতাম। কিন্তু আজ আরও অনেক স্পষ্ট হলো।অন্তরের ধন্যবাদ, নিবন্ধ লেখকের লেখকের জন্য। চমৎকার একটি সাক্ষাৎকার। সংগ্রহে রাখলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *