আমার শিক্ষক দিবস: স্মৃতির সরণি বেয়ে

সৈয়দ মিনহাজ হোসেন

৫ সেপ্টেম্বর মানে সকাল থেকেই পুরনো ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসা বয়ে আনা দূরভাষ অথবা মুঠোফোনে আর সামাজিকমাধ্যমে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তা। আমাদের দেশের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণের জন্মদিন আজ। আজ শিক্ষক দিবস। ছাত্রছাত্রীদের আয়োজন করা অনুষ্ঠান-মাল্যদান-বক্তৃতা-গান-আবৃত্তির মাধ্যমে শ্রদ্ধা-স্নেহ দেওয়া-নেওয়ার পালা। তবে শিক্ষক দিবস আমার কাছে শিক্ষক হিসাবে যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকে অনেক বেশি নস্টালজিয়ার। বছরের এই দিনটি আমাকে নিয়ে যাবেই সেই ছোট্টবেলায় ফেলে আসা ইস্কুল চত্বরে।

ইস্কুলের গেট

খুব ছোটবেলায় আর সবার মতো আমার ও লেখাপড়া এক্কেবারে ভালো লাগত না। তাও বাংলা আর বিজ্ঞান বইতে কিছু ছবি টবি থাকত বলে উলটে-পালটে দেখতাম। অঙ্কটা একেবারেই পোষাত না। তবে যোগ-বিয়োগ মন্দ লাগত না। গুলি খেলা আর ক্রিকেটের রান গুনতে এইটুকু অঙ্ক খুবই জরুরি। তখন অবশ্য আমাদের ঠিকঠাক ব্যাট উইকেট ছিল না। তালপাতার ডেগোকে কাঠারি দিয়ে কেটে দু-তিনদিন চলার মতো ব্যাট আর বাঁশের কঞ্চি কেটে উইকেট বানিয়ে রাবারের বল দিয়ে দিব্বি চলে যেত। অঙ্কের প্রতি এই বিরাগের প্রথম কারণ ছিল ১-এ চন্দ্র, ২-এ পক্ষ, ৩-এ নেত্র… এসব কঠিন ‘হিব্রু’ মুখস্থ করা! চন্দ্র মানে চাঁদ এটা জানতাম চন্দ্রগ্রহণ থেকে কিন্তু পক্ষ মানে কী? আমার পিসি বাড়ি পাঁশকুড়াতে রামিজ মিঞা নামে এক ধুরন্ধর ছিলেন। তাঁর ছিল বেশ কয়েকজন স্ত্রী। আমিই তিনজনকে চিনতাম। এঁদের প্রসঙ্গ এলে লোকে এ পক্ষ, ও পক্ষ বলত। কিন্তু তাতে করে পক্ষের সংখ্যা কী করে যে দুই হল, এ আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ঢোকা সম্ভব ছিল না। পক্ষের আসল মানে জেনেছি বেশ কিছুদিন পরে। ফাইভে পড়ি পাঁশকুড়া ব্র্যাডলি বার্ট হাইস্কুলে। সরস্বতীপূজা-শুক্লা পঞ্চমী-কৃষ্ণ পক্ষে-কালী পূজা।

পাঁশকুড়া ব্র্যাডলি বার্ট হাইস্কুলে

ইস্কুলের কথা যখন এসেই গেল তখন জানিয়ে রাখি, আমাদের এই ইস্কুল কিন্তু ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো। ব্রিটিশ আমলে মেদিনীপুর জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ব্র্যাডলি বার্টের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল ১৯১৩ সালে। কাঁসাই নদীর পাড়ে। বম্বে রোডের ধারে। প্রতিষ্ঠা দিবস ৪ ফেব্রুয়ারি। তাই প্রায় পুরো জানুয়ারি মাস ধরে চলত বিভিন্ন খেলাধুলা আবৃত্তি গান প্রতিযোগিতা নাটক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। লেখা পড়ার চাপ প্রায় নেই বললেই চলে। শীতের হিমেল হাওয়ার ঘুড়ি উড়িয়ে, মিঠে রোদ পিঠে ফেলে ক্রিকেট খেলে সময় কাটিয়ে দিলেও খুব বেশি বকাঝকা খেতাম না। এর পরেই স্কুলজীবনের সবথেকে আকর্ষণীয় যে দিনটি ছিল, তা হল ৫ সেপ্টেম্বর। শিক্ষক দিবসে আমাদের স্কুলের নিয়ম ছিল যে, শিক্ষক মহাশয়রা সেদিন ক্লাস নিতেন না। ওনাদের ক্লাসগুলো নিত সব ক্লাসের ভালো ছেলেমেয়েরা। তখন কিন্তু ক্লাস ফাইভ থেকে এইট পর্যন্ত মেয়েরা পড়ত না আমাদের স্কুলে। আমি যখন পড়তাম, তখনও উচ্চমাধ্যমিক খোলেনি। তাই মেয়েরা আসত শুধু ক্লাস নাইন আর টেনে পড়ার জন্য।

ছোটবেলায় ফেলে আসা গ্রাম- মৈনান

তা যা বলছিলাম। এ দিন প্রথম চার পিরিয়ডের পঠন-পাঠনের দায়িত্ব পড়ত প্রধানত ক্লাস টেনের ছেলেমেয়েদের ওপর। তাদের মধ্যে থেকেই একজন হত হেড স্যার, একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যার। অন্যান্য সব ক্লাসের প্রথম দিকের ছেলেমেয়েরা সব শিক্ষক-শিক্ষিকার ভূমিকায় নেমে পড়ত এক বেলার জন্য। এমনকী স্কুলের শিক্ষাকর্মী দাদাদেরও সেদিন কোনও কাজ করতে দেওয়া হত না। নারাণদার কাজ ছিল স্কুলের ঘণ্টা বাজানো। এ দিন নারাণদারও ছুটি। ক্লাস নাইন-টেনের কোনও তাগড়াই ছেলের দায়িত্ব পড়ত সেদিন তাঁর ভূমিকা পালন করার। রেলের পাত কেটে তৈরি করা পেল্লাই ঘণ্টা। সেটা বাজানো হত যে হাতুড়ি দিয়ে, তা হাতে তুলে ঢং ঢং করে বাজানো কিন্তু যার তার কম্ম ছিল না। ওইটুকু ছোটখাট বুড়ো মানুষটার কবজিতে যে এত জোর, তা কিন্তু এমনিতে বোঝার উপায় ছিল না। আর ছিল অনন্তদা। তাঁরও সেদিন ছুটি। তাঁর হয়ে কেউ একজন সেদিন নোটিশ নিয়ে আসত— ‘‘এত দ্বারা ছাত্রছাত্রীদের জানানো যাইতেছে যে, আজ চতুর্থ পিরিয়ডের পর শিক্ষক দিবস পালন করা হইবে। তদুপলক্ষে সকলকে ৫নং ঘর সংলগ্ন বারান্দায় সমবেত হইতে অনুরোধ করা যাইতেছে।” আমরাও সে অনুরোধ রাখতে যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত ‘হইতাম’। উদ্বোধনী গান হত। স্কুলের ভালো ভালো ছেলেমেয়েরা সব দারুণ দারুণ বক্তৃতা করত। স্যারদের শ্রদ্ধা জানানো হত। স্যাররা ও সব ভালো ভালো কথা বলতেন। আমি থাকতাম পেছনের দিকে। মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আর ভাবতাম ইস যদি এই দাদাগুলোর মতো ভালো ছেলে হতাম! ক্লাস ফাইভ থেকে সেভেন পর্যন্ত শিক্ষক দিবসে ছাত্রদের ক্লাস নেওয়াটা আমার কাছে ছিল ‘বেল পাকলে কাকের কি’র মতো বিষয়। কারণ আমি ভালো ছেলে তো ছিলামই না বরং প্রতিবছর শিক্ষক দিবসের আগে আগে হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার খাতা বেরোত, যখন কোনও না কোনও বিষয়ে আমি ধেড়াতামই। বিশেষ করে অঙ্ক ছিল আমার জন্য বিভীষিকা। আর সে বিভীষিকার শুরু সেই একে চন্দ্র দুইয়ে পক্ষ তিনে নেত্র থেকে।

চন্দ্রগ্রহণ। ছবি: তুহিনশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায় (ছাত্র)

আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকত না নেত্র মানে যদি চোখ হয়, তা’লে তার সংখ্যা তিন হয় কি করে! অঙ্কের বই কি তাহলে তেচোখো মাছের কথা ভেবে লেখা? এ রহস্য ও উদ্‌ঘাটিত হয়েছিল দুর্গাঠাকুরের দর্শন পেয়ে। ক্লাস সেভেনের পুজোর ছুটিতে।

ত্রিনয়নী দেবী দুর্গা। ছবি: অভিজিৎ করগুপ্ত (আমাদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র)

তো এই সংখ্যাগত বোধের অভাব নিয়েই ক্লাস ওয়ান টু কোনও রকমে টেনেটুনে চালিয়ে দিতে পারলেও যেই না উঠেছি ক্লাস থ্রি কি ফোরে, পর পর শক্তি শেল। নামতা! তাও দশ-এগারো পর্যন্ত উদ্ধার হলেও সতেরো কী আঠেরোতে গিয়ে আর বিশল্য করণীতেও কাজ হত না। আর তার পরেই ভগ্নাংশ— ‘কম পক্ষে’-বেশি পক্ষের চক্করে আটকে যাওয়া লসাগু আর গসাগু। এই দুইখানা শব্দ যতটা না সংখ্যাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে ধারণা দিত, তার থেকে অনেক বেশি হাসির উদ্রেক করত ওই ছোট্ট গ্রাম্য হৃদয়ে। শক্তিশেলের ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই আমি পৌঁছে গেলাম ব্র্যাডলি বার্ট হাইস্কুলে আর টেনেটুনে উঠেও পড়লাম ক্লাস সেভেনে। শুরু হল বীজগণিত। এ যাকে বলে এক্কেবারে ব্রহ্মাস্ত্র! কীসে যে কী হয় কিছুতেই বোঝা যায় না! 2a + 3 b যে কীভাবে 5 ab-র থেকে আলাদা জিজ্ঞেস করায় অঙ্কের স্যার বললেন— ‘‘ওরে গাধা, দুটা গরু আর তিনটা ছাগল যোগ করলে কত হয়?” আমার সপ্রতিভ উত্তর পাঁচটা গরুছাগল। আর অমনি পিঠের ওপর ‘চারে বেত’! তখনও ‘বেদ’-এর থেকে ‘বেত’টাই আমার কাছে বেশি পরিচিত শব্দ ছিল কিনা! তাই তেচোখো মাছের পর এই শব্দবন্ধই মাথায় আসত। বেত্রাঘাত সামলে উঠতে না উঠতেই হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা আর আমি যথারীতি অঙ্কে ফেল!

ইস্কুল যাওয়ার পথ

এ দিকে তখন আমার ইচ্ছা বড় হয়ে মহাকাশচারী হব রাকেশ শর্মার মতো। আমাদের বাড়িতে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে একটা ম্যাগাজিন নেওয়া হত। ওখানেই প্রথম দেখি রাকেশ শর্মার ছবি। সেই সব রঙিন চকচকে কাগজে ছাপা লেখা-ছবির হাতছানি। ম্যাগাজিনগুলোর রঙিন মোটা কাগজ দিয়ে খুব সুন্দর মলাট ও দেওয়া যেত বই খাতার ওপর। ওগুলোর ছবির টানেই মন চলে যেত কল্পনার জগতে। এরোপ্লেন কিংবা রকেট চালাব, রোবট বানাব, বিজ্ঞানী হব— কতকিছু!

ইস্কুলের খেলার মাঠ

আমার গ্রামের বাড়ি মৈনান—  মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম— ওখানে একটা লাইব্রেরি ছিল। লাইব্রেরি থেকে একটা বই পেয়েছিলাম, যেসব আবিষ্কারে পৃথিবী বদলে গেছে— লেখকের নাম আজ আর মনে নেই। এই বই পড়ার পর আমি ঠিকই করে ফেললাম, বিজ্ঞানীই হতে হবে, একটা কিছু আবিষ্কার করতেই হবে! সঙ্গে ছিল কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞান পত্রিকার নিজে করো পাতা। আজ পেরিস্কোপ কাল কলিং বেল এইসব বানাতে গিয়ে এটা চাই ওটা চাই— একদিন ছোড়দি আপা আসল সত্যটি বলেই ফেলল শেষমেশ। যে ছেলে অঙ্কে ফেল করে তার পক্ষে আর যাই হোক বিজ্ঞানী হওয়া অসম্ভব। বাকি সব দাদা-দিদিদের জিজ্ঞেস করে যাচাইও করে দেখলাম যে, কথাটা ছোড়দি খুব একটা মন্দ কিছু বলেনি। আর আমি পড়লাম মহা ফাঁপরে! এখন কী করি? ইতিহাসে ইতি আমি ভূগোলেতে গোল—  একমাত্র বিজ্ঞানটাই যা ভালো লাগে। আবার অঙ্ক ছাড়া বিজ্ঞান হবে না! পাটিগণিত একটু পটিয়ে পাটিয়ে নিলেও বীজ গণিতের বাঁদরামো সামলাতে আমার যা হিমশিম খাওয়া অবস্থা, এ জীবনে বুঝি আমার আর কিছু হল না! আমার তো ভীষণ মনখারাপ। মামনি বুঝতে পেরে একদিন জিজ্ঞেস করল, বাবু তোর কী হয়েছে? সব কিছু খুলে বললাম। বললাম যে, আমি অঙ্কে টিউশন পড়তে চাই। আমি তখন মাম (আমার পিসি)-এর বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করি। আর মামের বাড়িতে টিউশন পড়ার খুব একটা চল ছিল না। কিন্তু আমার নাছোড়বান্দা অবস্থা দেখে সবাই রাজি হল। আর আমার ও সুযোগ হল শক্তিবাবুর কাছে অঙ্ক শেখার। ক্লাস সেভেন-হাফ ইয়ার্লি হয়ে গেছে— আমার প্রায় কিছুই শেখা হয়নি। এই অবস্থায় শক্তিবাবু আমাকে পড়াতে রাজি হয়েছিলেন, সে আমার পরম সৌভাগ্য। এর পর আলাদা করে সময় দিয়ে আমার যত প্রশ্নের ধৈর্য ধরে উত্তর দিতেন। ছুটির পর অথবা রবিবার পরম যত্নে আমার পিছিয়ে থাকার ঘাটতি পুষিয়ে দিতেন। ওনার কাছেই প্রথম বুঝতে পারি অঙ্ক আসলে ভয়ানক তো নয়ই, বরং ইচ্ছে করলে অঙ্ক নিয়ে খেলাধুলাও করা যায়।

শ্রদ্ধেয় শক্তিবাবু স্যার

সত্যি বলতে কী, এর পর থেকে কীভাবে কী হল অত গুছিয়ে বলতে পারব না। কিন্তু যখন ক্লাস টেনে পড়ি— ৫ সেপ্টেম্বর— আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়ল শিক্ষক দিবস পালন করার। আমিও তখন কীভাবে যেন ঢুকে পড়েছি, ওই ভালো ছেলেমেয়েদের দলে।

তেচোখো মাছ

প্রতিটি মানুষের বেড়ে ওঠার পেছনে সবথেকে বেশি ভূমিকা যদি কারও থেকে থাকে তা হল ইস্কুল— তার ক্লাসরুম থেকে শুরু করে বারন্দা, সিঁড়ি ঘর, কাঠের বেঞ্চি, খেলার মাঠ পর্যন্ত সবকিছুই যেন কোনও না কোনও ছাপ রেখে যায় জীবনের খাতায়। ক্লাসরুমের বাইরে শিক্ষা কর্মী দাদারা, সহপাঠী বন্ধুরা, দু-এক ক্লাস ওপরে নীচে পড়া ছাত্রছাত্রীরা এমনকী ইস্কুলের গেট এ বারোভাজা, শশা কিংবা কুলপি বিক্রেতা, সবাই প্রায়, জীবনে চলার পথে এমন কিছু না কিছু শিখিয়ে দিয়েছেন নিজের অজান্তেই, যা পাথেয় করে জীবনের চড়াই-উতরাই কাটিয়ে চলেছি আজও।

কাঁসাই নদীর তীরে…

আমাদের ইস্কুলে ছিলেন ৩০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা। সবাই কোনও না কোনওভাবে কিছু না কিছু জীবনের পাঠ দিয়েছেন। ক্লাসরুমের মধ্যে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, অঙ্ক, ভূগোল— এসব পাঠক্রমে থাকা বিষয় শেখানো তো শিক্ষক মহাশয়রা দায়িত্ব নিয়ে করতেনই। তাছাড়া তাঁরা কতবার ওই বয়স সন্ধির কাঁচা বয়সে পা পিছলানোর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন পরম স্নেহে নিজের হাত বাড়িয়ে— কখনও গল্প বলার ছলে কখনও মৃদু শাসনের মাধ্যমে। আর একটু একটু করে শেখানোর চেষ্টা করেছেন মানুষের মতো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে। এরকমই একজন মানুষ ছিলেন অসিতবাবু— অসিত বরণ সামন্ত। স্যারের বাংলার ক্লাস আমদের কাছে সিনেমার থেকে আকর্ষণীয় ছিল— রবি ঠাকুরের বর্ষা— জীবনানন্দের রূপসী বাংলা-কৃত্তিবাসের রামায়ণের অংশ এসব জীবন্ত হয়ে উঠত ক্লাসরুমের মধ্যে। কিন্তু সবথেকে ভালো লাগত যে বিষয়টা, তা হল আমাদের মতো ১৪/১৫ বছরের নবীন-কিশোরদের সঙ্গে স্যার যেভাবে বড়দের মতো করে আচরণ করতেন, যেন আমরা ওনার বন্ধু। নিজেকে বেশ বড় বড় বলে মনে হত— কীভাবে যেন বুঝিয়ে দিতেন— সবার আগে একজন দায়িত্ববান ভবিষ্যতের সুনাগরিক হওয়াই আমাদের প্রথম কর্তব্য।

Panskura Bradley Birt High School - Panskura Municipality, Purba Medinipur  - Reviews, Fee Structure, Admission Form, Address, Contact, Rating -  Directory
ইস্কুলবাড়ি। ছবি: ইন্টারনেট

আর ছিলেন ইংরেজির স্যার শশাঙ্কবাবু— শশাঙ্ক শেখর সামন্ত স্যার। শুধু ইংরেজি না, বাংলা ব্যাকরণ, ভূগোল আর ভৌত বিজ্ঞান, সব বিষয়ে তাঁর সমান পাণ্ডিত্য। দীর্ঘকায় ধুতি, পাঞ্জাবি আর সানগ্লাস পরা মানুষটির চলা ফেরার ধরন ছিল আমাদের অনেকের কাছেই অনুকরণীয়। ইস্কুল জীবন কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। সৌভাগ্য হয়েছে অনেক বিশ্বমানের অধ্যাপকের সান্নিধ্যে আসার। কিন্তু শিক্ষক দিবস মানে সেই ইস্কুল বেলার পুজোর ছুটির আগে বর্ষা-শরতের রোদ-বৃষ্টির খেলার মধ্যে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা স্যাররা হাতে চক ডাস্টার নিয়ে হেঁটে চলেছেন ইস্কুলের বারান্দায়— এই ছবিই বেশি বেশি করে ভেসে ওঠে চোখের সামনে।

শ্রদ্ধেয় অসিতবরণ সামন্ত স্যার। ছবি: অভিজিৎ রাণা (সহপাঠী)

আজ ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০! করোনার কারণে আজ স্যারদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ নেই। তবে কিছুদিন আগে প্রায় ২০ বছর পর শক্তিবাবু আর অসিতবাবুর সঙ্গে দেখা হল। আমার পরম ভাগ্য যে, স্যাররা আমায় চিনতে পেরেছেন। আপনাদের সান্নিধ্য না পেলে আমাদের অনেকেরই জীবনের ভীতটাই গড়ে উঠত না। এই শিক্ষক দিবসে আপনাদের সবার জন্য সশ্রদ্ধ প্রণাম আর শুভেচ্ছা। খুব ভালো থাকবেন স্যার!

Happy Teachers Day 2020 images Wallpaper Photo Poster Banner
ছবি: ইন্টারনেট

● উল্লিখিত ছবিগুলি ছাড়া বাকি সব ছবি লেখকের তোলা আলোকচিত্র।
● শুরুর ছবিটি এঁকেছেন আল নোমান (বাংলাদেশ)

লেখক পেশায় ভারতীয় প্রকৌশল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। কিন্তু সে তো কেবল সোম থেকে শুক্র। শনি হলেই মিনহাজের পায়ের তলায় সরষের নড়াচড়া শুরু। দু’দিনের ছুটি পেলেই ট্রেনে বাসে চড়ে কিংবা গাড়ি নিয়ে সে বেড়িয়ে পড়ে কখনও পাহাড় জঙ্গল-নদী সমুদ্র অথবা নতুন পাড়া-গাঁয়ের উদ্দেশ্যে। চেনা গণ্ডির বাইরে নতুন জায়গা নতুন মানুষজন, তাঁদের জীবনচর্যার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার নেশায়। আর সে ভালোবাসে পাখি দেখতে। তাই সঙ্গে থাকে ক্যামেরার ঝোলা। নানা রকমের পাখির ছবি ক্যামেরাবন্দি করাও তার শখ। আর তাই কোনও নতুন জায়গায় গেলেই সে লেগে পড়ে সেখানকার পাখপাখালির সুলুকসন্ধানে। এই সব টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা জুড়ে তৈরি হয় এক একটা বেড়ানোর গল্প। ওর সাবলীল লেখায় ধরাপড়ে চেনা জায়গার নানা অচেনা ছবি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • অভিজিৎ কর গুপ্ত

    অসাধারণ লাগলো মিনহাজ! পুরোনো দিন, সেই ব্রাডলি বার্ট স্কুলের জীবন, স্যারদের মুখ, ক্লাস রুম সব যেন এক লহমায় ফিরে এলো!!
    অনবদ্য লেখা, একেবারে ভিতর থেকে।
    যেন একটা টাইম ট্রাভেল হয়ে গেল।

  • Sudipta Chakrabarty

    Asadharon.

  • Dibyadyuti Pramanik

    “পুরোনো সেই দিনের কথা সেকি ভোলা যায়”, ইস্কুল জীবনের একরাশ স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। আমারও এক অংকের মাস্টারমসাইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো, বরুন দেব স্যার। তাঁর শিক্ষার আলো আমার উপর এসে না পড়লে জীবনের অনেক শিক্ষা থেকেই বঞ্চিত হতাম। শিক্ষক দিবস মানেই ইস্কুল জীবনের প্রাপ্তি গুলোর কথাই মনে হয়, বড্ড সুখকর, সবার সাথে ভাগ করে নিতে মন চায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *