নবমী নিশি

শুভ্র কিশোর বসু

বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী রায়ের শিডিউল পুজোর সময় পুরো বুকড। বিভিন্ন পুজোর উদ্বোধন, প্রোডাক্টের প্রমোশন এবং স্টেজ পারফরম্যান্সের জন্য মোটামুটি দুপুর থেকেই সোহিনীর ব্যস্ততা শুরু। বাড়ি ফিরতে ফিরতে গভীর রাত। নবমীতেও ফিরে ছিল, প্রায় মাঝ রাতে।

কোনও ক্রমে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় ফেলতেই দু’চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এল। কিন্তু সোহিনীর ঘুম পাতলা। সহজে আসার নয়। সময় লাগে। হঠাৎই বিছানায় কারোর নড়াচড়ার শব্দ শুনে পাশ ফিরল। দেখল, সিদ্ধার্থ বিছানায় বসে আছে! তার মানে ঘুমোয়নি! সোহিনী একটু অবাক হয়ে অন্ধকারেই প্রশ্ন করল,

— কি হল! এত রাত হয়ে গেলো! ঘুমোওনি…”

সিদ্ধার্থ প্রত্যুত্তর করল না। সোহিনীর একটু অস্বাভাবিক লাগল ঘটনাটা। সোহিনী শুয়ে শুয়েই হাত বোলাতে লাগল সিদ্ধার্থর পিঠে। সিদ্ধার্থ আজই ফিরেছে দিল্লি থেকে। প্রায় একমাস পরে, সিদ্ধার্থকে স্পর্শ করল ও।

সিদ্ধার্থ গম্ভীর মুখে, সোহিনীর দিকে ঘুরে বলল, “সোহি, তোমাকে বলা হয়নি। কিছুদিন ধরে একটা সমস্যায় পড়েছি। মনে হচ্ছে অনুশোচনার চোরাবলিতে ফেঁসে যাচ্ছি, ক্রমশ…”

সোহিনীর ঘুম ছুটে গেল। ধড়ফড় করে উঠে বসে বাঁ-দিকের বেড ল্যাম্পের সুইচটা অন করল— ”কী হয়েছে হানি!”

— একজন সুন্দরী মহিলা ক্রমাগত আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, প্রায় মাসখানেক হল…”

— হোয়াট ডু ইউ মিন বাই, সিডিউস করে যাচ্ছে…! তুমি কি বুড়ো খোকা সিড! যে তোমাকে কেউ সিডিউস করার চেষ্টা করল, আর তুমি হয়ে গেলে…! সোহিনীর অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে থাকল স্বামীর দিকে। সারাদিনের পরিশ্রমের চোটে মেজাজটা একটু কড়াই ছিল, তার ওপর এমন ভয়ংকর কথাবার্তা!

“না, না, প্লিজ ডোন্ট মিস আন্ডারস্টুড মি সুহি… আমি এখনও সিডিউসড হইনি, আই মিন কমপ্লিটলি… তবে উনি এমন সব ক্লজ দিচ্ছেন…! ” সিদ্ধার্থ অসহায়ের মতো উত্তর দিল।

— বোকার মতন কথা বোলো না, উনি ক্লজ দিচ্ছেন আর তুমি কট হয়ে যাচ্ছ! সোহিনী রায় তোমার ওয়াইফ। তুমি জানো, সোহিনীকে কত পুরুষ স্রেফ সিডিউস করার জন্য লাইন দিয়ে পড়ে থাকে, এটা জেনেও যে আমি ম্যারেড !!! আর তুমি… !!!

সোহিনী রাগে, ফেটে পড়ল।

— তুমি বৃথাই রাগ করছ, সোহি। আমি তোমার এই স্টেটমেন্টগুলোই তো মহিলাকে কনস্ট্যান্ট বলে যাচ্ছি… বোঝানোর চেষ্টা করছি যে সোহিনী রায়ের মতন, ড্যাম সুন্দরী, সাকসেসফুল অভিনেত্রী যেখানে আমার স্ত্রী, সেখানে আমি আপনার কাছে কেন যাব! কিন্তু ওনার ওই একই যুক্তি!”

— কী যুক্তি শুনি!
সোহিনী একটু চিন্তায় পড়ে গেল !

— ওনার বক্তব্য সিম্পল। উনি নিজেও বেশ সুন্দরী। সেক্সিও বলতে পারো!…”

— আমার থেকেও !
সোহিনীর মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল…

— তোমার থেকেও বেশি কী, সোহিনী!
সিদ্ধার্থ যেন কিছুই বোঝে নি, এমন একটা মুখ করে স্ত্রীর দিকে চেয়ে রইল।

সোহিনী বাকিটা শেষ করতে গিয়েও থমকে গেল। এই সিদ্ধার্থ ওর অচেনা ।

— ড্যাম শিট… ওসব ভাটের কথা আমাকে দিয়ে বলাবে না…
সোহিনী চোখ বড় বড় করে বলে উঠল।

“ভাটের কথা!” এই তো সেই পুরোনো সোহিনী— চেনা ছন্দে ফিরছে। এখন একটু সাবধানে খেলতে হবে। হেসে ফেললে চলবে না। সিদ্ধার্থ যতটা সম্ভব গম্ভীর মুখে বলল, “মহিলার সঙ্গে আমার কাজের সূত্রেই আলাপ। আমরা যে কোম্পানির সঙ্গে টাইআপে যাচ্ছি, তার কর্ণধার। অবিবাহিত। বয়স ধরো থার্টি প্লাস। এমনিতে, বেশ ফ্রেন্ডলি। তবে আটিটিউড বেশ প্রভোকিং। চোখ মুখে একটা কেমন যেন একটা আগুন আছে। সহজেই যেকোনও পুরুষকে আকৃষ্ট করবে। আমি অবশ্য নিজেকে সংযত করেই রেখেছি। একদম প্রফেশনালি মেশার চেষ্টা করি…”

— ওহ, তাহলে তো অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে, মনে হচ্ছে!—

আমি কি বললাম সেরকম কিছু?

— তোমারা পুরুষরা যা বলো, তার ঠিক উল্টোটা করো। ঠিক করে বলো, কতদূর এগিয়েছ। বিছানা …

— উফফ, সোহি তোমাদের মেয়েদের নিয়ে না এই এক মুশকিল। একজন মহিলা আর পুরুষের মধ্যে সম্পর্ককে যতক্ষণ না ওই বিছানা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারছ, তোমাদের শান্তির ষোলোকলা পূর্ণ হয় না।

সিদ্ধার্থর কথা শুনে, একটু স্বস্তি পেল সোহিনী। যাক বিপদ এখনও ওর মাথা ছাড়িয়ে যায়নি! আড়চোখে তাকিয়ে দেখল নিজের স্বামীর দিকে। প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল ওদের বিয়ের। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার জন্য লিটল ডার্ক-টল-হ্যান্ডসাম সিদ্ধার্থকে সারাবছর ঘুরে বেড়াতে হয় দেশে ও বিদেশে। একসঙ্গে সময় কাটানো হয় না বহুদিন। সোহিনীর শ্যুটিং শিডিউলের তো এমনিতেই কোনও ঠিক নেই। অথচ এত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের চেহারার যত্ন নিতে ভোলে না সিদ্ধার্থ। শরীর ওর কাছে মন্দির। নিয়মিত জিম, এক্সারসাইজ করে। মেদহীন, পেশি বহুল পেটাই চেহারা ওর। এমনকী শরীরের কারণে মদ পর্যন্ত ছোঁয় না। নেশা বলতে অল্পস্বল্প ধূমপান। সোহিনী কাছে থাকলে, সেটাও করতে দেয় না ওকে। মহিলারা ওকে দেখে আকৃষ্ট হতেই পারে। কিন্তু তা বলে ওর সিড ভেসে যাবে কেন?

অক্টোবরের শেষেই হালকা ঠান্ডা পড়েছে শহরে। বাইশ তলার ফ্ল্যাটে জানলার কাচ সরানো থাকলে এমনিতেই ঠান্ডা হয়ে যায় ঘর। এসি চালানোর দরকার পড়ে না।

আদুল গায়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকা সিদ্ধার্থর দিকে তাকিয়ে একটু— হর্নি ফিল করল সোহি। ইচ্ছে করছিল, নিজের ক্লান্তি ভুলে, সিডের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু না ওই পেত্নীকে শনাক্ত না করতে পারলে আজ ওর শান্তি নেই। এখনই নিজের আগল খোলা উচিত হবে না। এই নবমীর নিশিরাত ওর জন্য কী লেভেলের বিপর্যয় আনতে চলেছে, ঠিক অনুমান করতে পারছে না সোহিনী। ”ঠিক আছে বলো, ওই কামিনি পেত্নীর কী বক্তব্য।”

“কামিনী পেত্নী!” শুনেই পেট ফেটে হাসি পেল সিদ্ধার্থর কিন্তু হাসলে চলবে না। হেসে ফেললে পুরোটাই মাটি। তবে ওর আদরের সোহি ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছে বলে বেশ স্বস্তি লাগছিল।

কলেজ লাইফ থেকেই সোহিনী ওর ব্যাপারে বেশ পজেসিভ। অন্য যুবতীদের ওর কাছে ঘেঁষতে দিত না সচরাচর। ব্যাপারটা বেশ উপভোগই করত সিদ্ধার্থ। খুনসুঁটি করে কেটে যেত বেশ দিনগুলো। তারপর সোহিনীর মডেলিং জয়েন করা, সেখান থেকে ফিল্মের অফার, আর এখন টলিউডের অন্যতম সফল নায়িকা। খুব অল্প সময়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে দু’জনে। তারপর দুম করে বিয়ে। বিয়ের পর সিদ্ধার্থর ব্যবসাসূত্রে সারাদেশ ঘোরা আর সোহিনীর কাজের চাপ— ওর কাছ থেকে ক্রমশ দূরে নিয়ে চলে যাচ্ছিল, ওর আদরের উচ্ছল সেই কিশোরী সোহিকে। সম্পর্কটা কেমন যেন একটা ফরমাল শেপ নিচ্ছিল। আজ প্রায় মাস দু’য়েক হয়ে গেল, সোহিনীকে আদর করার কোনও সুযোগই পায়নি সিদ্ধার্থ। সোহিনীর স্টারডম, নিজের শরীর নিয়ে কনসাসনেস যেন ক্রমশ পাঁচিল তুলছিল, ওদের সম্পর্কের মধ্যে। কীভাবে এই পাঁচিল ভাঙা যাবে, সেই উপায়ই ভাবছিল সিদ্ধার্থ।

— মহিলা বলছিলেন, যে তোমার স্ত্রীর মধ্যে এমন কী আছে, যা আমার মধ্যে নেই!

দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সোহিনীকে একটু উসকে দিল, সিদ্ধার্থ।

— এসব ফিল্মি ডায়লগ, আমাকে শেখাতে এসো না, সিড!

সোহিনী হিসহিস করে উঠল। ”ফিল্মি ডায়লগ! তা হবে হয়তো, ফিল্মই তো তোমার আজকাল ধ্যানজ্ঞান। ফিল্মের বাইরের কোনও সাধারণ কথাও তোমার কাছে আজকাল একই রকম লাগে…”

সিদ্ধার্থর উদাস চোখে যেন বেদনার ছায়া দেখতে পেল সোহিনী। সিদ্ধার্থ যে হঠাৎই এতটা সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাবে, বুঝতে পারেনি সোহি। এত রাতে আর ওর মাথা কাজ করছে না। সহজেই টেম্পটেড হয়ে পড়ছে। নাহ, ওকে শান্ত হতে হবে। নাহলে, সিদ্ধার্থ যদি কিছু চেপে যায়! ”ওকে, তুমি কী উত্তর দিলে, বলো!” সোহিনী পাল্টা প্রশ্ন করল। শান্ত। ধীর কণ্ঠে।

— ছাড়ো, তুমি শুয়ে পড়ো। আমি ব্যালকনিতে গিয়ে বসি।

সিদ্ধার্থ উঠে পড়ল বিছানা থেকে। সোহিনীও উত্তেজিত হয়ে ওকে ফলো করল। বাইশ তলার ওপরে , ব্যালকনি সংলগ্ন ওপেন রুফ। বিভিন্ন রঙের ফুলের গাছ লাগানো টবে। সোহিনী ফুল খুব ভালোবাসে। তাই সিদ্ধার্থ এত রকম ফুল লাগিয়েছে ছাদে। একটা ছোট্ট কিন্তু কৃত্রিম ঝরনা! আর নীলাভ আলো, সবমিলিয়ে রাতের অন্ধকারে এই ওপেন রুফটুকু, সোহিনীর বড় প্রিয়। নিজের স্ট্রেস রিলিফের জায়গা। আশপাশে আর কোনও এত উঁচু বিল্ডিং নেই। পায়ের নিচে শহর, আর মাথার ওপরে তারা ভরা আকাশ। কিন্তু আজ সোহিনীর কোনও কিছুতেই যেন মন নেই।

আলগা রাত পোশাকের ওপর, গোলাপি সিল্কের গাউনটা পরে নিল সোহিনী। কেন পরল! আগে তো কোনও দিন, পরত না! তাহলে কি এই কয়েক মিনিটেই সিদ্ধার্থ দূরের মানুষ হয়ে গেল ওর কাছে? সোহিনীর অস্বস্তি হলেও মেনে নিল। বড় বিপদ ওর সামনে, ওদের সামনে।

— কী হল, তুমি বেরিয়ে এলে কেন? তুমি কি উত্তর দিলে বলো!
সিদ্ধার্থর সাদা পাঞ্জাবিটা খামচে ধরে উত্তর চাইল, সোহি।

— শান্ত হও। আমার পাশে এসে বোসো।

সিদ্ধার্থর আহ্বানের মধ্যে এমন একটা জোর ছিল যে, সোহিনী অস্বীকার করতে পারল না।

— কী উত্তর দিতে পারতাম বলো! শেষ কবে আমি তোমাকে ভালো করে ছুঁয়েছি, ভালো করে স্পর্শ করেছি, বলো! তোমার মধ্যে কী আছে, সে তো আমি ভুলেই গেছি সোহি! মনে পড়ছে না, জাস্ট মনে পড়ছে না। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড !

সোহিনী এবার সত্যিই কেঁদে ফেলল। কিশোরীর মতন। সেই কান্নায় সিদ্ধার্থ খুঁজে পাচ্ছিল, এক নায়িকার মৃত্যু, এক স্টারের মৃত্যু, এক মানবীর উত্থান, এক যুবতীর উত্থান, যে যুবতীকে সিদ্ধার্থ ভালোবেসে এসেছে এতদিন। মনে প্রাণে।

সোহিনীর পরের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল সিদ্ধার্থ।

— আমি তোমাকে এত বড় ভুল চিনলাম, সিড! তুমি শুধুমাত্র আমার শরীরের জন্য আমাকে বিয়ে করেছিলে! তোমাদের পুরুষদের কাছে, আমরা, মেয়েরা কি সবাই, স্রেফ— রক্ত মাংসের পিণ্ড! আর কিছুই নয় !

সোহিনীকে নিজের বুকের কাছে টানার চেষ্টা করল, সিদ্ধার্থ। বাঁ-হাত দিয়ে, ওর ঘাড়ে আলতো করে হাত বোলানোর চেষ্টা করল। স্পর্শে একটা ভরসা থাকে। প্রশ্রয় থাকে। সুখ থাকে।

সোহিনী চিবুকটা তুলে নিজের ঠোঁটের কাছে, আনল সিদ্ধার্থ। সামান্য হেসে বলল, ”তুমি তো আমার উত্তরটাই জানার চেষ্টা করলে না সোহি! যদি চেষ্টা করতে তাহলে বুঝতে পারতে, আমি আমার স্ত্রীর মধ্যে ঠিক কী হারিয়ে ফেলছি। আমি সত্যিই আর খুঁজে পাচ্ছি না, আমার সেই চঞ্চল, অভিমানী, আদুরে মিষ্টি সোহিকে, যে সব সময় আমাকে ঘিরে থাকত,আমার সঙ্গে ঝগড়া করত, আমার বুকে মুখ লুকোত, আমাকে আদরে আদরে ভরিয়ে তুলত! চেনা মানুষকে, অচেনা হতে দেখা খুব কষ্টের, সোহি! ব্যস্ততা কমাও। নিজের অতীতকে হারিও না। নিজের ভালোবাসাকে নিয়মিত পরিচর্যা করো। সেটাও একটা শিল্প! সম্পর্ককে বেঁচে আর বাঁচিয়ে রাখাও শিল্প।”

— বাজে লোক একটা…! শুধু আমাকে কষ্ট দেয়!

সিদ্ধার্থর বুকের ওপর কপট রাগে ঝাঁপিয়ে পড়ল সোহি। দু’জনের আদরের তীব্রতায়, বাঁধ ভাঙছিল সংযমের। নীচে, অনেক নীচে, শহরের বৃত্তাকার ক্যানভাসে, তখন মায়ের পুজো প্রায় শেষের দিকে। মৃদু ঢাক আর কাঁসরের ভেসে আসা শব্দ তরঙ্গে, ক্রমশ তারা ভরা নবমী নিশির মেয়াদ ফুরোচ্ছিল।

সকলের অগোচরে মুক্ত আকাশের নীচে পবিত্র ভালোবাসায় আবৃত, সঙ্গমরত যুগলের, এক হয়ে যাওয়ার তীব্রতায় জন্ম নিচ্ছিল— অন্য এক নতুন প্রাণ।

এক, নতুন দুর্গা।

অলংকরণ: আল নোমান, বাংলাদেশ

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *