নীলাঞ্জন হাজরার কবিতা: ‘অস্বীকার করেছি মানচিত্রের কঠোর সীমানা’

রাহুল দাশগুপ্ত

নীলাঞ্জন হাজরা একজন সংবেদনশীল, মরমী হৃদয়ের রোমান্টিক কবি। চারপাশে সন্ত্রাসের বাতাবরণ তাঁকে পীড়িত ও ব্যথিত করে। তিনি আশ্রয় খোঁজেন কোমল নারী হৃদয়ের কাছে। তাঁর ‘না থাকা থাকার কিনারে’ যেন এক দীর্ঘ অকপট স্বীকারোক্তি। এই কাব্যগ্রন্থের একের পর এক কবিতায় নিজের হৃদয়কে তিনি ঢেলে দিয়েছেন, উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। স্পষ্ট জানিয়েছেন, “কবিতার গোলোকধাঁধায় যারা পথ হারায়/ আমি জেনেছি/ ভীষণ বিপজ্জনক তাদের হৃদয়।” কারণ, “এরা নিজেদের ক্ষতগুলো/ পেশাদারী ক্ষিপ্রতায় ব্যবহার/ করে গ্রেনেডের মতো।”

আরও পড়ুন: শঙ্খ ঘোষ: ‘আমার চলা ছিল আমার নিজস্ব’

সাম্প্রতিক কালের বাংলা কবিতায় নিঃসন্দেহে এ এক অমোঘ উচ্চারণ। নীলাঞ্জনের কবিতা এমন এক হৃদয়ের কথা বলতে চায়, যা ভীষণ বিপজ্জনক এবং যা নিজের ক্ষতগুলোকে গ্রেনেডের মতো ব্যবহার করতে জানে। ক্ষতগুলো তখন হয়ে ওঠে ‘বারুদগর্ভ’। অক্ষরের দারুণ স্পর্ধায় কবি লিখতে থাকেন তাঁর সময়ের কথা। তাঁর ভালোবাসার কথা। তাঁর ক্ষতগুলোর কথা। এইসবই তাঁর কবিতা ছড়াতে থাকে। আর এভাবেই যেন প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠেন তিনি। নীলাঞ্জন তাই লিখতে পারেন সেই অমোঘ লাইন, “এখন আমি যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্রে সুনিশ্চিত জানি/ আমার অবস্থান।”

যুদ্ধক্ষেত্রে, নিজের সুনিশ্চিত অবস্থানে দাঁড়িয়ে, এই বইতে আগাগোড়া নীলাঞ্জন আসলে লিখতে চেয়েছেন ভালোবাসারই কবিতা। বুকের দগদগে ক্ষতগুলোতেও তিনি পেতে থাকেন নরম, কোমল ঠোঁটের স্পর্শ। বেপরোয়া করতলরেখাচিত্রে দেখতে পান দুলতে থাকা প্রিয় নারীর মুখ, যে আনখশির রাত্রির পোশাকে মির্জা গালিবের কবিতার সামনে নতজানু হয়। তাঁর হৃদয়ের ধ্বংসস্তূপে লুকিয়ে আছে ভাঙাচোরা কাহিনি। সাফল্যের মসৃণ অ্যাসফল্ট পথ তিনি চেনেন না এমন নয়। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় প্রিয়তমার মুখ। প্রিয়তমার কপালে তিনি দেখতে পান, ঘরপাড়া শিশুদের নিবিড় শিবির, আশ্রয়। এই মুখ তাঁর কাছে হয়ে ওঠে চূড়ান্ত গন্তব্য।

আরও পড়ুন: প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

এই নারীর সঙ্গে তাঁর মিলনের কোনও সম্ভাবনা নেই। কবি জানেন, “তার ভালোবাসার উদ্ভ্রান্ত পথে পথে/ কোনও সন্ধ্যা নামেনি আমার/ কোনও তারা ডোবেনি, ওঠেনি তার ইশারায়।” তাদের মধ্যে কোনও বিনিময় নেই। কবি যেন এক ভূতুড়ে জাহাজের বাসিন্দা, যে জাহাজ অসম্ভব সফরের কাহিনিতে ঠাসা। তবু সেখানেও কান্নার আওয়াজ জুড়ে জুড়ে তার বুকের ভিতরে তৈরি হয়ে যায় এক অনিবর্চনীয় সুর। আশাহত মানুষদের মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে কবি পৌঁছে যান রাষ্ট্রবিহীন ভালোবাসার গোপন ডেরায়। এভাবেই বারবার নারীর কাছে, নারীর ভালোবাসার কাছে পৌঁছতে চান কবি।

এই ভালোবাসার খোঁজেই তিনি যেন তাঁর ভেতরের মানুষটাকে, তাঁর অলটার ইগোকে খুঁজে চলেন। নীলাঞ্জন লেখেন, “সেই ভীষণ সহমর্মী মানুষটার মুখ/ পাগলের মতো যে মুখ আমি/ আশৈশব/ সর্বত্র খুঁজে বেড়িয়েছি”, সেই মুখের কাছে পৌঁছতে চান তিনি। মনে করতে চান, “ছোটো ছোটো দেওয়া-নেওয়ার স্মৃতি।” তাঁর লেখায় এভাবেই ফিরে ফিরে আসে সহমর্মিতার কথা। এক দীর্ঘ স্বীকারোক্তির মতো এগিয়ে চলে নামহীন কবিতাগুলি, একটা যেন আর একটাকে টেনে নিয়ে চলে, আর ক্রমেই নিবিড়তর হতে থাকে আমি ও তুমির সম্পর্ক। কবি তাঁর নিজের ভিতরের রোমান্টিকতাকে স্পর্শ করে থাকেন, কিন্তু সমসময়ের সন্ত্রাসকেও ভুলতে পারেন না।

আরও পড়ুন: ‘বনলতা সেন’ আসলে মৃত্যু, জন্ম থেকে জন্মান্তরে যাবার বিশ্রাম

সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় যাঁদের লেখায় আন্তর্জাতিকতার স্পর্শ আছে, নীলাঞ্জন তাঁদের অন্যতম। তাই তো তিনি লিখতে পারেন, “কবিতার গোলকধাঁধায় একবার পথ হারালে/ সীমান্ত-বোধটাই/ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায় চেতনার মানচিত্র থেকে।” পূর্ব ইরানের পর্বতমালা বিনালুদ থেকে পশ্চিম রাঢ়ের হা-হা আকাশ, বুরুংবাবা থেকে ইসফাহানি সন্ধ্যা অনায়াসে আসে তাঁর কবিতায়। নীলাঞ্জন লেখেন, “অস্বীকার করেছি মানচিত্রের কঠোর সীমানা।”

মানচিত্রকে অস্বীকার করার এই বাসনা ও প্রেরণা থেকেই বোধহয় লেখা হয়ে ওঠে, ‘অনাথ দূরত্বেরা: করাচির কবিতা’। ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকারিভাবে ঘোষিত শত্রুর দেশ তথা দুনিয়ার সবথেকে বিপজ্জনক শহর করাচিতে পা রাখেন এই ভারতীয়। তাঁকে ঘিরে থাকা পাকিস্তানিদের সঙ্গে সাঁকো গড়তে চান তিনি, কিন্তু বারবার তাঁর ওপর হামলা চালাতে থাকে দূরত্বেরা। কিন্তু সেই দূরত্বেরা কি সত্যিই তাঁকে কাবু করতে পেরেছিল? না, তিনি মানচিত্রের কঠোর সীমানাকে অস্বীকার করতে পেরেছিলেন? আর তা সম্ভব হয়েছিল, তাঁর বুক ভরা ভালোবাসার জন্যই।

আরও পড়ুন: রঙের গাঁ খোয়াবগাঁ

May be an image of 1 person

নীলাঞ্জন লিখেছেন, “একে অপরের আঙুল আঁকড়ে/ ভীষণ বিপদসঙ্কুল এক সীমান্ত পেরোনোর সফরে/ বেরিয়ে পড়েছে এই দূরত্বেরা।” তিনি একইসঙ্গে দেখেছেন ভালোবাসা ও ঘৃণা, রবীন্দ্রনাথ ও যুদ্ধের ট্যাঙ্ক। পেশোয়ারের মৃত শিশুদের যেমন দেখেছেন, তেমনই দেখেছেন, “গাছ, নদী, তোমার চুমু, ভ্যাটে পচতে থাকা জঞ্জাল/ কিংবা মৃত জরায়ু থেকেও কীভাবে/ মুনাফা ছেঁকে নেওয়া যেতে পারে।” কিন্তু তবু তিনি সেই ভালোবাসার কথা ভুলতে পারেননি, যার আঘ্রাণ ‘কবি ও হরিণকে লক্ষ্যহীন ছুটিয়েছে/ চিরদিন।’ যদিও তিনি জানেন, ‘কোনো চুমু/ কান্নার মতো নয় এমন নিখাদ।’
নীলাঞ্জন হাজরা মূলত ভালোবাসার কবি। ভালোবাসা, তার মিলন ও বিচ্ছেদের কথাই তিনি একের পর এক কবিতায় বলতে থাকেন। ঝুঁকিপূর্ণ, বিপজ্জনক পরিসরের কথা তিনি বলেন ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসাই তাঁর অন্তিম গন্তব্য। তাই তিনি লেখেন, “পাড়ি দিই/ শহর থেকে শহরে শহরে/ যেখানে যেখানে তুমি।” ভালোবাসার ক্ষতবিক্ষত কিন্তু অনাবৃত অক্ষরগুলিকেই খুঁজে চলেন তিনি। তিনি সেই হৃদয়ের কথা বলেন, যেখান থেকে রক্তপাত হয়, কিন্তু কোনও সীমান্ত তাকে আটকাতে পারে না। এই কবির বুকের মধ্যে বসে থাকেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, মির্জা গালিব এবং শঙ্খ ঘোষ। তিনি আমাদের টেনে নিয়ে যান দমচাপা পরিবেশে, কিন্তু সেখানে গিয়েও বুক ভরে টেনে নেন অক্সিজেন। এই কবি গতিশীল, সাঁকোর পর সাঁকো পেরিয়ে যান, নীচে পড়ে থাকে রক্তাক্ত কাঁটাতার, তিনি তাকিয়ে থাকেন এমন এক দিকে, যেখানে ছড়িয়ে রয়েছে নক্ষত্র, আকাশ আর প্রিয়তম নারীর মুখ…

না-থাকা-থাকার কিনারে
কলিকাতা লেটার প্রেস
১২৫ টাকা

অনাথ দূরত্বেরা: করাচির কবিতা
ধানসিড়ি
১০০ টাকা

লেখক রাহুল দাশগুপ্ত ইউনিভার্সিটি গ্লান্টস কমিশনের স্কলারশিপ নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট। পড়িয়েছেন যাদবপুর ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক। কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির সঙ্গেও। কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন ও গবেষণা কেন্দ্রের ‘তরুণ প্রাবন্ধিক সম্মাননা’র প্রথম প্রাপক। ২০১৭ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার। বাংলা উপন্যাসের প্রথম অভিধান ‘উপন্যাসকোশ’ গ্রন্থটির জন্য পান ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘কবিপত্র’ সম্মান, ‘মানুষ দাশগুপ্ত স্মৃতি সম্মাননা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় ভারতীয় কবি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মনিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন সাহিত্য অকাদেমির আমন্ত্রণে কবিতা অনুবাদের ওয়ার্কশপে। বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এক সময় সম্পাদনা করেছেন ‘এবং সমুদ্র’ পত্রিকা, এখন করেন ‘চিন্তা’ পত্রিকা। পোস্ট ডক্টরেট করেছেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের ইন্দোলজি বিভাগে। কর্মসূত্রে গার্ডেন হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত। ভালবাসেন বই পড়তে, সিনেমা দেখতে এবং মেয়ে উপাসনার সঙ্গে সময় কাটাতে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *