নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (১ম অংশ)

ফিওদর দস্তয়েভস্কি

সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্তেপ, পাহাড় আর দুর্ভেদ্য জঙ্গলের মধ্যে মাঝেমধ্যে কয়েকটা ছোটো কাটখোট্টা মফস্‌সল এলাকা নজরে পড়ে। ততে বড়জোর হাজার দু’য়েক বাসিন্দা, দু’টো গির্জা― একটা শহরে, আরেকটা সমাধিস্থলে। সাধারণ মফস্‌সলের তুলনায় এর সঙ্গে মস্কোর শহরতলির কোনও বড় গ্রামের মিল রয়েছে। এখানে অনেক পুলিশ, স্থানীয় আদালতের সদস্য ও অধস্তন সরকারি কর্মচারী রয়েছেন। প্রবল ঠান্ডা সত্ত্বেও সাইবেরিয়ার সরকারি কর্মীদের ব্যবহার কিন্তু বেশ উষ্ণ। এখানকার বাসিন্দারা সাধাসিধা ও রক্ষণশীল― তাদের জীবনযাত্রাও শতাব্দী-প্রাচীন সনাতন ধারার। সাইবেরিয়ার অভিজাতরা বেশিরভাগই এই সরকারি আধিকারিকরা। তারা হয় এখানকার ভূমিপুত্র, এখানেই তাদের জন্মকর্ম, না হলে রাশিয়া (বিশেষত রাজধানী)। থেকে আসা লোকজন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই দ্বিগুণ বেতন, আকর্ষণীয় ভ্রমণ ভাতা ও ভবিষ্যতে প্রমোশনের লোভে এখানে এসেছিল। এই দ্বিতীয় শ্রেণির লোকেরা জীবনের জটিল ধাঁধার সমাধান করতে পেরে পাকাপাকিভাবে এখানেই শিকড় গেড়ে বসেছে এবং ডালপালা বিস্তার করেছে। আর যারা সেই ধাঁধার সমাধান করতে পারেনি, তারা সাইবেরিয়ায় থেকে বিরক্ত হয়ে গিয়েছে। তারা বলে, এত জায়গা থাকতে এখানেই কেন তাদের পাঠানো হল। সরকারি নিয়ম মেনে অধৈৰ্য হয়ে তারা ৩ মাস অপেক্ষা করে আর মেয়াদ শেষ হতেই সাইবেরিয়াকে দুষে বদলির আবেদন করতে থাকে। কিন্তু তারা ভুল। সাইবেরিয়াতেও অসীম আনন্দে বসবাস করা যায়। শুধু পেশার দিক থেকেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনেক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এখানকার জলবায়ু অসাধারণ। বাসিন্দাদের মধ্যে অনেক ধনী ও অতিথি বৎসল রুশ রয়েছেন, আবার যাঁরা রুশ নাগরিক নন সেই ভূমিপুত্ররাও বেশ ভালো কাজ করেন। এখানকার মেয়েরা গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত ও নৈতিক আদর্শবতী। ভালো শিকার মেলে। বালতি বালতি শ্যাম্পেন খাওয়া যায়। এখানকার ক্যাভিয়েরও দুর্দান্ত। হাজারগুণ বেশি শস্য উৎপাদিত হয়। এক কথায় বলতে গেলে, সত্যিই আশীর্বাদধন্য দেশ। শুধু জানতে হবে এখানে কীভাবে সোনা ফলাতে হবে। আর সাইবেরিয়ার বাসিন্দারা তা জানেও।

আরও পড়ুন: ‘চোখের বালি’ই বাংলা সাহিত্যে ঘটিয়েছিল যুগান্তকারী ঘটনা

এই প্রাণবন্ত ও আত্মতৃপ্ত ছোট্ট শহরেই (এখানকার অধিকাংশ সুন্দর বাসিন্দাদের সুখস্মৃতি আমার হৃদয়ে চিরতরে আঁকা থাকবে) আমার সঙ্গে আলেক্সান্দার পেত্রোভিচ গোরিয়ানচিকভের প্রথম পরিচয় হয়। তিনি রাশিয়ার অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এখন এই ‘ক’ শহরে নীরবে। নিভৃতে নির্বাসনে দিন কাটাচ্ছেন। স্ত্রীকে খুনের অপরাধে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের পর এখানে নির্বাসন দেওয়া হয় তাকে। আসলে আশপাশের কোনও অঞ্চলে তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি ছোটোদের পড়িয়ে কোনওমতে জীবনধারণের জন্য এই শহরেই বসবাস করতেন। সাইবেরিয়ায় নির্বাসিতদের অনেকেই গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হতেন, তাদের নিয়োগ করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনও দ্বিধাও ছিল না। তারা সাধারণত ফরাসি শেখাতেন, আধুনিক জীবনে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তারা না জানালে এই কথাও সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দারা জানতে পারত না। ইভান ইভানোভিচ গভোজডিকভের বাড়িতে আমার সঙ্গে আলেক্সান্দার পেত্রোভিচের প্রথম দেখা হয়। ইভান এখানকার বহুদিনের বাসিন্দা, অত্যন্ত সম্মানীয় ও অতিথিবৎসর সরকারি আধিকারিক। তার ৫ কন্যাও সম্ভাবনাময়। আলেক্সান্দার পেত্রোভিচ তাদের সপ্তাহে চারদিন পড়াতেন, প্রতি পাঠের জন্য তিনি ৩০ রৌপ্য কোপেক পেতেন। তাকে দেখেই আমার কৌতূহল হল। তিনি অত্যন্ত রোগা ও ম্লান। বয়স বেশি নয়― পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি, ছোটোখাটো চেহারার। তিনি ইউরোপীয় কায়দায় সবসময় পরিপাটি করে পোশাক। পরতেন। তাঁর সঙ্গে কথা বললে তিনি স্থির ও মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন, অতিরিক্ত বিনয়ের সঙ্গে প্রতিটি শব্দ শুনতেন, যেন ওর ভেতর থেকে কোনও গোপন কথা জেনে ফেলা হচ্ছে। তারপর তিনি উত্তর দেওয়ার সময় স্পষ্ট ও কাটাকাটা ভাবে, প্রতিটি শব্দে জোর দিয়ে এমনভাবে কথা। বলতেন যাতে হঠাৎ কোনও কারণে অস্বস্তি লাগত।

ক্রমশ…

ভাষান্তর: শময়িতা চক্রবর্তী

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • নবনীতা বসু হক

    মূল উপন্যাস টি বড়ো।
    আর একটু বেশি অংশ অনুবাদ দিলে ভালো।
    মজা আসছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *