নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (২য় অংশ)

ফিওদর দস্তয়েভস্কি

আমি সরাসরি ইভান ইভানোভিচকে গোরিয়ানচিকভের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। জানতে পারলাম, তিনি অত্যন্ত নীতিবান ও নিষ্কলঙ্ক মনের মানুষ (না হলে ইভান ইভানোভিচ তাকে মেয়েদের পড়াতে বলতেন না)। পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত অন্তর্মুখী স্বভাবের, প্রায় কারো সঙ্গে মেশেন না, দারুণ শিক্ষিত, অনেক বই পড়েন কিন্তু কথা কম বলেন, এমনকী তার সঙ্গে আলাপচারিতা করাও বেশ কঠিন। অনেকে অবশ্য তাকে পাগলাটে বলে, কিন্তু সেটা বড় ব্যাপার নয়। সমাজের অনেক সম্মানীয় ব্যক্তিরা আলেক্সান্দার পেত্রোভিচকে দানধ্যান করে থাকেন। মনে করা হয়, রাশিয়াতে তার অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন, কিন্তু সাজা পাওয়ার পর তিনি স্বেচ্ছায় তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন। আমাদের শহরের প্রায় সকলেই আলেক্সান্দার। পেত্রোভিচের কথা জানত। সবাই জানত, সে বিয়ের প্রথম বছরেই ঈর্ষায় নিজের স্ত্রীকে খুন করে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। ফলে তার অপেক্ষাকৃত কম শাস্তি হয়। এখানে তার অপরাধকে অনিচ্ছকৃত হিসেবেই ধরা হয়, অনেকে তাকে করুণাও করে। কিন্তু ইভান পেত্রোভিচ সবাইকে এড়িয়ে চলে, শুধু পড়ানোর জন্যই সে কারো বাড়িতে যায়।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (১ম অংশ)

প্রথমে আমি তাকে অত খেয়াল করিনি, পড়ে কেন জানি না ধীরে ধীরে ওকে দেখে বেশ কৌতূহল হয়। লোকটার মধ্যে যেন কোনও রহস্য রয়েছে। তার। সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে অবশ্য সেটা বোঝার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। সে আমার প্রতিটা কথার উত্তর দিত, যেন এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু এরপরই সে আর নিজে থেকে এগাত না, ইতস্তত করতে লাগত। মনে আছে, একটা সুন্দর সন্ধ্যায় তার সঙ্গে ইভান ইভানোভিচের বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ আমি তাকে আমার বাড়িতে এসে একটা সিগারেট খাবার জন্য বললাম। তার চোখেমুখে যে আতঙ্ক ফুটে উঠল, সে ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। উদ্‌ভ্রান্তের মতো সে কিছু বিড়বিড় করতে লাগল, এরপর আমার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে হঠাৎ উল্টো পথে হাঁটা লাগাল। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর যখনই আমার সঙ্গে দেখা হত, সে ভয়ে ভয়ে থাকত। যদিও আমি হাল ছাড়িনি, ওর মধ্যে এমন কিছু ছিল যেটা আমায় টানত। এক মাস পর, কোনও কারণ ছাড়াই আমি তাকে ডাকতে গেলাম। আমি খুবই বোকাবোকা, অপরিকল্পিত কাজ করেছিলাম। শহরের এককোণে এক বয়স্ক দরিদ্র মহিলা ও তার মেয়ের বাড়িতে সে থাকত। সেই মেয়েটির একটি অবৈধ সন্তানও ছিল, হাসিখুশি বছর দশেকের একটি মেয়ে। আমি যখন ওদের বাড়ি পৌঁছলাম তখন আলেক্সান্দার পেত্রোভিচ ওই ছোট মেয়েটির পাশে বসে তাকে পড়াচ্ছিল। আমায় দেখে সে এতটাই হতচকিয়ে গেল, যেন আমি ওকে কোনও অপরাধ করতে দেখে ফেলেছি। সে পুরো ঘাবড়ে গিয়েছিল, চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে বিস্ফারিত চোখে। তাকিয়ে রইল। তরপর আমরা দু’জনেই বসলাম। সে আমায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। বুঝলাম ওর সন্দেহবাতিক ব্যাপারটা পাগলামির পর্যায়ে। চরম বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিতে সে আমায় দেখছিল। আমি শহরের হালচাল, নানা ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। সে কোনও কথা না বলে, ধূর্ত হাসি ঠোঁটে। ঝুলিয়ে রাখল। বুঝতে পারলাম, শহরের যেকোনো সাধারণ খবরাখবর সে জানে না, আর জানতে আগ্রহীও নয়। তখন আমি এই অঞ্চল, তার চাহিদার বিষয়ে কথাবার্তা শুরু করলাম। সে আমার কথা চুপ করে শুনছিল, আর এমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যে আমিই লজ্জিত হয়ে থেমে গেলাম। তারপর আমি পোস্টঅফিস থেকে কেনা বইপত্রের কথা বলতে লাগলাম, তাতে সে সামান্য আগ্রহ দেখাল। আমার হাতের নতুন বইগুলো তাকে দেখতে দিলাম। প্রথমে লোভীর মতো হাত বাড়ালেও মুহূর্তেই সে আবার গুটিয়ে নিল। সাফাই দিল, ওর হাতে একদম সময় নেই। অবশেষে তাকে ‘শুভরাত্রি জানিয়ে উঠলাম। দরজা দিয়ে বাইরে এসে মনে হল আমার বুক থেকে কোনও বোঝা নেমে গেছে। যে লোকটা গোটা বিশ্বের থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে মরিয়া তাকে এভাবে বিব্রত করে নিজেরই লজ্জা লাগল। খেয়াল হল, তার ঘরে কোনও বইপত্র দেখিনি, তাই সে যে সারাদিন পড়ে এই কথা ভুল। এরপর যতবারই অনেক রাত করে তার বাড়ির পাশ দিয়ে যাতায়াত করেছি, তার ঘরে মোমের আলো জ্বলতে দেখেছি। তাহলে এত রাত জেগে সে করে কী? সে কি কিছু লেখে? যদি তাই হয়, তাহলে কী লেখে?

আরও পড়ুন: বাঁক বদলকারী সাহিত্যস্রষ্টা মানিক

এরপর নানা কারণে প্রায় ৩ মাস আমি শহরের বাইরে ছিলাম। যখন ফিরলাম, শীত দোরগোড়ায়। শুনলাম শরতেই আলেক্সান্দার পেত্রোভিচ মারা গিয়েছে। একা একা, এমনকী ডাক্তারকেও ডাকেনি। ততদিনে শহরের সবাই তাকে। ভুলতে বসেছে। তার বাড়িটা খালি পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি তার বাড়িতে গিয়ে বাড়িওয়ালি মহিলার সঙ্গে দেখা করলাম। আমার জানতে প্রচণ্ড ইচ্ছা করছিল সারাদিন সে কী করত? সে কি কিছু লেখালিখি করত? কুড়ি। কোপেকের বিনিময়ে তিনি প্রয়াত মানুষটির লেখা এক বাক্স কাগজপত্র আমায় দিলেন। তিনি স্বীকার করলেন, ইতিমধ্যে দু’টি নোটবই তিনি ফেলে দিয়েছেন। শান্ত, মিতভাষী ওই মহিলার মুখ থেকে কিছু বের করা সহজ নয়। তার প্রাক্তন ভাড়াটে সম্পর্কে নতুন কিছুই বললেন না। তার বক্তব্য, আলেক্সান্দার পেত্রোভিচ সারাদিন প্রায় কিছুই করতেন না। মাসের পর মাস তিনি কোনো বইয়ের পাতা ওল্টাতেন না বা কাগজে আঁচড় কাটতেন না। সারারাত তিনি ঘরে পায়চারি করতেন যেন উনি আকাশপাতাল কিছু ভাবতেন, মাঝেমধ্যে নিজের মনেই কথা বলতেন। তার নাতনিকে বড্ড ভালোবাসতেন, ওর নাম কাতিয়া জানার পর থেকেই ওর সঙ্গে মিষ্টি ব্যবহার করতেন। সেন্ট ক্যাথরিন ডে-তে প্রতিবার তিনি গির্জায় যেতেন, কারো স্মরণে গান গাইতেন। তার কাছে কেউ আসত না, শুধু পড়ানোর জন্যই তিনি বাড়ির বাইরে বেরোতেন। সপ্তাহে একদিন যদি ঘর গোছানোর জন্য বয়স্ক মহিলাটি যেত, তাকেও সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখতেন। গত তিন বছরে তাদের মধ্যে হাতেগোনা কিছু কথা হয়েছে। আমি কাতিয়াকে তার স্যারের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। সে কোনও কথা বলল না, দেওয়ালে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ল। অন্তত একটা মানুষের মনে লোকটা ভালোবাসা জাগাতে পেরেছিল।

ভাষান্তর: শময়িতা চক্রবর্তী

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *