নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (৩য় অংশ)

ফিওদর দস্তয়েভস্কি

আমি ওর কাগজপত্রগুলো নিয়ে এসেছিলাম, সারাদিন ধরে ঝাড়াই-বাছাই করলাম। এর মধ্যে তিন ভাগই খাপছাড়া লেখা, অথবা ছাত্রছাত্রীদের হাতের লেখা প্র্যাকটিসের লেখা। একটা মোটা নোটবই সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা, কিন্তু। সেটা দেখলাম অসমাপ্ত। হয়তো লেখক নিজেই অবহেলায় ভুলে গিয়েছেন। আলেক্সান্দার পেত্রোভিচের দশ বছরের সাজা কাটানোর বর্ণনা রয়েছে এতে। এই বর্ণনার মাঝেমাঝে ঢুকে গিয়েছে অন্য কোনো কাহিনি, অদ্ভুত-ভয়ংকর কোনো স্মৃতিচারণা, উদ্বেলিত হৃদয় থেকে উঠে আসা কিছু কথা। আমি। বারবার এই খাপছাড়া অংশগুলো পড়লাম, বুঝতে পারলাম এই লেখাগুলো প্রায় পাগলামির ঘোরে লেখা। অন্যদিকে ওর জেলের ডায়েরি, যাকে একটা জায়গায় সে লিখেছে, ‘ডেড হাউসের দৃশ্যাবলি’ সেটাও কম আকর্ষক নয়। একটা সম্পূর্ণ অজানা জগৎ, কিছু রহস্যময় তথ্য, ভেঙে পড়া মানুষের কিছু বিশেষ নোট আমায় আকৃষ্ট করেছিল, তাই আমি বেশ কিছুটা উৎসাহে পড়ে ফেললাম। অবশ্য আমার ভুলও হতে পারে। তাই দু-তিনটে অধ্যায় বেছে নিলাম, এবার পাঠকরা বিচার করুন।

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

বন্দি, নিকোলাই আলেকজান্দ্রোভিচ ইয়ারোশেঙ্কোর আঁকা

ডেড হাউস

আমাদের জেলখানাটা দুর্গ থেকে অনেকটা দূরে, কেল্লার পাঁচিলের গায়ে। মাঝেমধ্যে বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে বাইরের ধন্য দুনিয়ার কিছু দেখা যায়। সেখানে কি কিছু দেখার আছে? না, শুধু একফালি আকাশ আর কেল্লার মারি পাঁচিলে গজিয়ে ওঠা লতাপাতা। দিনরাত সেই প্রাচীরে সিপাইরা পায়চারি করছে। ভাবলে অবাক লাগে, বছরের পর বছর কেটে গেলেও এই বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারলে দেখা যাবে সেই একই পাঁচিল, একই সিপাই আর সেই একই একফালি আকাশ। এই আকাশ জেলখানার আকাশ নয়, দূরের এক অন্য আকাশ, মুক্ত। ভাবুন, একটা বড় জায়গা, লম্বায় প্রায় দু’শো পা, চওড়ায় দেড়শো- প্রায় পঞ্চভূজাকৃতি জায়গাটা সম্পূর্ণ খুঁটি দিয়ে ঘেরা, গা ঘেঁষাঘেষি করে কোনো ফাঁক নেই, মাঝেমাঝে বড় তক্তার ওপর পেরেক পোঁতা। খুঁটিগুলোর মাথা সুচাল। এই দৃশ্য কল্পনা করলেই মোটামুটি বুঝতে পারবেন আমাদের জেলখানার বাইরের অংশটা কেমন। বেড়ার একদিকে শক্তপোক্ত দরজা, সবসময় তালাবন্ধ আর সবসময় সিপাইরা পাহারা দিচ্ছে। যখন কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখনই দরজাটা খোলে। এই দরজার বাইরেই এক আলোক জগৎ, মুক্তির দুনিয়া যেখানে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। বেড়ার মধ্যে থাকা মানুষগুলোর কাছে সেই জগৎটা মনে হয় রূপকথার মতো। পাঁচিলের এপারেও অবশ্য একটা আলাদা জগৎ আছে, সেখানে সম্পূর্ণ আলাদা ধরন, নিজস্ব আইন, নিজস্ব পোশাক-আশাক, নিজস্ব রীতিনীতি— একটা মৃত্যুপুরী। জীবন্ত কিন্তু এখানকার মানুষের জীবন দুনিয়ার বাকিদের মতো নয়। দুনিয়ার এই কোনার বর্ণনাই এখন আমি দিতে বসেছি।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (১ম অংশ)

আ প্রিসনর অফ দ্য স্টেট, ১৮৭৪ সালে ইস্টম্যান জনসনের আঁকা ছবি

জেলখানার ভেতরে ঢুকলেই দেখা যাবে অনেকগুলো বাড়ি। ভেতরের চওড়া উঠোনোর একদিকে দু’টো লম্বা একটানা একতলা কেবিন। ওটা ব্যরাক, ওখানে জেলবন্দিদের বিভাগ অনুযায়ী রাখা হয়। কম্পাউন্ডের অন্য প্রান্তে। আরও একটা কাঠের কেবিন, এটা রান্নাঘর। সেটা দুই ভাগে বিভক্ত। পাশের একটা বাড়িতে এক ছাদের তলায় মজুত করা হয় শস্য ও ভাড়ার। উঠোনের মাঝখানটা ফাকা। এখানে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় বন্দিদের লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে রোল নম্বর অনুযায়ী ডেকে মেলানো হয়। গার্ডরা ভরসাযোগ্য না হলে আরও অনেকবারই এই মেলানোর কাজ চলে। বাড়িগুলোর পেছনে ও বেড়ার মাঝে আরও খানিকটা চওড়া জায়গা আছে। সেখানে একাকী, বিষণ্ণ বন্দিরা তাদের ফাকা সময়ে সকলের দৃষ্টির আড়ালে হাঁটে আর দুঃখের কথা ভাবে। ওদের কুৎসিত, দাগি মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি ভাবার চেষ্টা করি ওরা কী ভাবছে। এক বন্দি আছে যে অবসর সময়ে বেড়া গুনতে পছন্দ করে। প্রায় দেড় হাজার খুঁটি রয়েছে। প্রতিটা খুঁটির দিকে তাকিয়ে সে একেক দিন গোনে, যাতে যে বুঝতে পারে এই জেলখানায় আর কতদিন তাকে থাকতে হবে। এভাবে একদিকের বেড়া গোনা শেষ হয়ে গেলেই সে খুশি হয়। এখানে তার অনেক বছর কাটানো বাকি। জেলে ধৈৰ্য ধরা শেখানোর মতো অফুরন্ত সময়। একবার এক বন্দিকে দেখেছিলাম কুড়ি বছর সশ্রম কারাদণ্ড কাটানোর পর মুক্তির সময় সে তার সহবন্দিদের বিদায় জানাচ্ছে। যারা তাকে প্রথম দিন দেখেছিল তারা বলছিল, আগে সে কেমন ছিল। প্রথম দিকে সে তরুণ আর বেপরোয়া ছিল। তার অপরাধ বা শাস্তি নিয়ে মাথা ঘামাত না। আর এখন এখান থেকে যাওয়ার সময় সে পাকাচুলের বৃদ্ধ, তার মুখ বিষণ্ণ ও দুখী। মুক্তির দিন সে নিঃশব্দে ছ’টা ব্যারাকে গেল। প্রতিটা ব্যারাকে ঢোকার মুখে সামনে ঝোলানো আইকনের সামনে নত হয়ে বুকে ক্রস আঁকল। তার বন্ধুদের সামনে ঝুঁকে সে বলছিল, যেন তারা তাকে ভুলে না যায়। আমার মনে আছে। একদিন এক বন্দির ডাক পড়ল দরজার সামনে। সে সাইবেরিয়ার সম্ভ্রান্ত কৃষক ছিল। ছয় মাস আগেই সে খবর পেয়েছিল তার স্ত্রী অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছে, এই খবর পেয়ে সে হতাশায় ভেঙে পড়েছিল। সেদিন তার স্ত্রী জেলের দরজায় এসেছিল। সে বন্দিকে ডেকে হাতে কিছু খাবার তুলে দিল।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (২য় অংশ)

১৮৮২ সালে ভ্লাদিমির মাকোভস্কি

তারা একসঙ্গে কয়েক মুহূর্ত কাটাল, একসঙ্গে চোখের জল ফেলল। তারপর চিরদিনের জন্য বিদায় জানিয়ে চলে গেল। ওই বন্দি যখন ব্যারাকে ফিরছিল আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সত্যিই এই জায়গাটা থেকে যে কেউ শিখতে পারে ধৈৰ্য।

অন্ধকার নেমে এলে আমাদের প্রত্যেকের ব্যারাকে ঢুকে যেতে হয়, সেখানে সারারাত আমাদের তালাবন্ধ করে রাখা হয়। আমার এই সময়টা খুব কষ্ট হত, খোলা বাতাসে যাওয়ার জন্য ছটফট করতাম। লম্বা দমবন্ধ করা ঘরটার ছাদটা নিচু, চর্বির মোমের আধো অন্ধকারে ভারী, দমচাপা গন্ধ। এখনও আমি বুঝতে পারি না, ওই ঘরটাতে দশ বছর কীভাবে বেঁচে রইলাম। তিনটে তক্তা। বিছিয়ে বিছানায় আমায় শুতে হত। ওই ঘরে ওরকম বিছানায় আরও প্রায়। তিরিশ জন শুত। শীতকালে আমাদের তাড়াতাড়ি ঢুকিয়ে তালাবন্ধ করে দেওয়া হত। প্রায় চারঘণ্টা পর সকলে ঘুমাত। তার আগে পর্যন্ত চিৎকার, কর্কশ। হাসি, গালাগালি, শিকলের ঝনঝনানি, ধোঁয়ায় ভারী বাতাস, ন্যাড়া মাথা, দাগি মুখ, জোরাতালি দেওয়া কাপড়ের পোশাক, সবকিছুই কদর্যহীন।

মানুষের জীবন কত কঠিন! তারা সব পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারে।

ক্রমশ…

ভাষান্তর: শময়িতা চক্রবর্তী

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *