নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (৪র্থ অংশ)

ফিওদর দস্তয়েভস্কি

সবাই বলত, আমাদের জেলখানায় আড়াইশো বন্দি রয়েছে। এই সংখ্যাটা মোটামুটি একই থাকত। একদল আসত, আরেক দল সাজার মেয়াদ কাটিয়ে মুক্তি পেত, অন্যরা মারা যেত। আর মজার ব্যাপার, মানুষগুলোই প্রায় সবই একরকম। রাশিয়ার সব প্রদেশ থেকে বন্দিরা আসত, আমার মনে হয় রাশিয়ার বাইরের বন্দিরাও থাকত। ককেশীয় অপরাধীদের এখানে রাখা হত। বন্দিদের অপরাধের ধরন ও গুরুত্ব অনুযায়ী ভাগ করা হত, সেইমতো তাদের শাস্তি নির্ধারিত হত। তাই বলতে পারি, হেন কোনও অপরাধ নেই, যা তারা করেনি। বন্দিদের মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল সাধারণ নাগরিক। তাদের সব রকমের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হত। সমাজ বিচ্ছিন্ন করে চিরকালের মতো দাগিয়ে দেওয়া হত। আট থেকে বারো বছর পর্যন্ত কঠোর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হত, মেয়াদ শেষ হলে সাইবেরিয়ার কোনও জেলায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হত। সামরিক বন্দিদের মধ্যে অবশ্য এত কনাকড়ি ছিল না। তাদের মৌলিক অধিকার, আইন থেকে বঞ্চিত করা হত না। অল্প সময়ের সাজা দিয়ে তাদের আবার ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে, বিশেষ করে সাইবেরিয়ার কোনও যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হত। এদের মধ্যে আবার অনেকে দ্বিতীয়বার অপরাধ করে ফিরে আসত। এইবার তাদের সাজা মোটেও কম হত না, প্রায় কুড়ি বছর জেল খাটতে হত। এদের যাবজ্জীবন আসামি বলা হয়, যদিও এই যাবজ্জীবন আসামিদেরও সাধারণ অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হত না। এছাড়াও ছিল একটা বিশেষ বিভাগ। এই বিভাগের বন্দিদের বেশিরভাগই ছিল সেনা, যারা সবথেকে ঘৃণ্য অপরাধ করত। রাশিয়ার প্রায় সব অঞ্চল থেকে এই ধরনের বন্দিদের এখানে পাঠানো হত। এদের বলা হত ‘চিরস্থায়ী’। এদের শাস্তির মেয়াদ কতদিনের, তা নির্ধারিত নয়। আইন অনুযায়ী, এদের দ্বিগুণ বা তিন গুণ সংশোধনের মেয়াদ বাড়ানো হত। সাইবেরিয়ায় নতুন কোনও লেবার ক্যাম্প তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এদের এই জেলেই থাকতে হত। অন্যান্য বন্দিদের তারা বলত— ‘তোমরা তো এখানে কিছুদিনের জন্য এসেছ, আমরা পাকাপাকিভাবে থাকব।’ পরে শুনেছিলাম, আমাদের জেলে এই বিভাগ বিলোপ করে দেওয়া হয়। সাধারণ বন্দিদের বিভাগও তুলে দেওয়া হয়। পরে শুধু সামরিক বন্দিদেরই এখানে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জেল কর্তৃপক্ষেরও পরিবর্তন হয়। আমি অবশ্য যে সময়ের কথা বলছি, তা আগের…

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (৩য় অংশ)

অনেক দিন আগের কথা এসব। এখন মনে হয় যেন স্বপ্ন। আমার মনে আছে, ওই জেলে প্রথম যেদিন আমি এসেছিলাম। ডিসেম্বরের এক সন্ধ্যায়, ততক্ষণে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে, বন্দিরা সবাই যে যার কুঠুরিতে ফিরবে, নাম ডাকার প্রস্তুতি চলছে। গোঁফওয়ালা এক সার্জেন্ট আমায় অদ্ভুত সেই ঘরটায় ঢুকিয়ে দিল। ওই ঘরটায় এতগুলো বছর কাটাতে হল, এতরকম আবেগ-অনুভূতি জড়িয়ে গেল, হয়তো এখানে না থাকলে সেই অভিজ্ঞতা কোনওদিন হত না। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, এখানে না থাকলে কখনও জানতে পারতাম না ১০ বছরে এক মুহূর্তও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা না থাকা কি মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। কাজের সময়, নিরাপত্তাকর্মীদের নজরদারিতে থাকা, ব্যারাকে ২০০ সহ বন্দিদের সঙ্গে থাকা। এক মুহূর্তের জন্যও একা নয়! সে যাই হোক, যদি শুধু এটাই একমাত্র খারাপ হত, তাহলেও মানিয়ে নিতে পারতাম।

বন্দিদের মধ্যে দু’ধরনের খুনি ছিল। এক ধরনের যারা ভুলবশত হত্যা করে বসেছে, আর আরেক ধরন পেশাদার খুনি। ডাকাত, ডাকাত দলের সর্দার ছিল। এছাড়া তো সাধারণ চোর-ছিনতাইবাজ ছিলই। এছাড়াও এমন কিছু বন্দি ছিল, যাদের বোঝা কঠিন। ভগবান জানেন কেন তাদের এই জেলে আসতে হয়েছে। তবুও তাদের সকলেরই অপরাধের অতীত রয়েছে, গতরাতের মদ্যপানের পর যেমন ঝাপসা স্মৃতি থাকে, তেমনই তাদের অতীতও ঝাপসা। সাধারণভাবে তারা তাদের অতীত নিয়ে কিছু বলা পছন্দ করত না, এমনকী এই নিয়ে চিন্তাও করত না। আমি এমন খুনিদের দেখেছি— যারা সারাদিন খোশমেজাজে থাকত, তাদের দেখলে বোঝা যেত মনের গভীরে কোনও গ্লানির খোঁচা অনুভব করত না তারা। আবার কয়েকজন এতই বিষণ্ণ হয়ে থাকত, তারা সারাদিনে সামান্যই কথা বলত। মনে আছে, একবার এক ডাকাত মদের নেশার তাড়নায় (কারণ জেলে কালেভদ্রে মদ মিলত) বলতে শুরু করেছিল, কীভাবে সে একটা পাঁচ বছরের বাচ্চাকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে মেরেছিল। প্রথমে সে ওই বাচ্চাটিকে একটা খেলনা-টেলনার লোভ দেখিয়ে কাছে টেনেছিল, তারপর একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে শেষ করে দিয়েছিল। ব্যারাকের অন্য বন্দিরা, যারা অন্যসময় তারসঙ্গে হাসিঠাট্টা করে তারা চেঁচিয়ে উঠেছিল। ওই বন্দিকে তারা চুপ করিয়ে দিয়েছিল। কারণ ‘ওসব’ কথা কখনও বলতে নেই। আমি বলব, ওই মানুষগুলো শিক্ষিত, হয়তো কাগজে-কলমে নয়, কিন্তু বাস্তব জীবনের শিক্ষায় শিক্ষিত। বন্দিদের মধ্যে অর্ধেকে হয়তো লিখতে পড়তে পারত। রাশিয়ার জনসংখ্যার মধ্যে থেকে আড়াইশো মানুষকে এখানে রাখা হয়েছে, তাদের মধ্যে অর্ধেক সাক্ষর?

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (২য় অংশ)

পরে আমি কোনও একটা সমীক্ষা পড়েছিলাম, সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার একটা ক্ষতিকারক দিক রয়েছে। কিন্তু এটা ঠিক নয়। শিক্ষা সাধারণ মানুষের মনে আত্মসমীক্ষা বোধ জাগায়। সে যাই হোক, বিভিন্ন ধরনের বন্দিদের আলাদা আলাদাভাবে চেনা যেত তাদের পোশাক দেখে। কয়েকজন বন্দি যে জ্যাকেট পরত তার একদিকের রং গাঢ় বাদামি, অন্যদিক ধূসর। তাদের প্যান্টও একরকম। একটা পা গাঢ় বাদামি, অন্যটা ধূসর। একবার আমরা যখন কাজ করছিলাম, পাউরুটি সরবরাহ করতে আসা একটা মেয়ে আমায় খুঁটিয়ে দেখছিল। তারপর হঠাৎ হাসতে শুরু করল। চেঁচিয়ে টিপ্পনি কাটল— ‘দেখো দেখো! কি কিম্ভূতকিমাকার ওরা! ওদের কি ধূসর কাপড়, কালো কাপড় ফুরিয়ে গেছিল!’ অনেক বন্দিদের পোশাক পুরো ধূসর, হাতাগুলো গাঢ় বাদামি। অনেকের মাথা সামনে থেকে অর্ধেক কামানো। আবার অনেকের চুল পাশাপাশি ন্যাড়া করে দেওয়া হত।

বন্দিদের দেখলে যে কেউ তাদের মধ্যে একটা সাযুজ্য অনুভব করতে পারবে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে একটা বিষয়ে মিল ছিল।

ক্রমশ…

ভাষান্তর: শময়িতা চক্রবর্তী

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *