এই টুম্পা, ব্রিগেড চল!

শান্তনু চক্রবর্তী

অয়ি টুম্পা সোনা, বাঙালির বুড়ো-চিমসে কিন্তু হেব্বি কালচারড গালে দু’‌খানা হাম্পি খেয়ে কী যে ক্যাওড়া করলি!‌ সেটাও আবার ২১শে ফেব্রুয়ারির গায়ে গায়ে‌!‌ এই ২১ তারিখটায় আবার বাঙালির কী সব সেন্টু কেস আছে!‌ গোটা year‌-ভর বাংলাভাষার পেছন চটকে চাটনি বানালেও এই একটা দিন ভাষার চারদিকে গত্ত খুঁড়ে, পেরেক পুঁতে, য়্যাব্বড় লোহার দেওয়াল-ফেওয়াল গেঁথে সে কী পোটেকশন!‌ বাংলাভাষার পেসাদে হিন্দি-ইংলিসের এঁটো শকড়ির ছোঁয়া চলবে না!‌ ওদিকে তোদের দিল্লির চৌকিদারজি রোজ রোজ কবিতা আউড়ে আউড়ে গউরউদেব রাবীন্দরনাথজির দাঁড়ি ছিঁড়ে আঁটি বাঁধছেন, তাতে কিছু যায় আসে না!‌ এক পলিটিক্যাল দাদা, অন্য পাট্টির আরেক ডনকে টেলিভিশনের তরজায় খুল্লমখুল্লা বলে দিচ্ছেন— ‘‌তোর বাবা তো চুল্লু বেচত’‌ আর সেই হিরো দাদার সঙ্গে বাংলা ফিলিমের এক ঝিঙ্কু মামনি একই ডায়েসে দাঁড়িয়ে খিল্লি করছেন— ‘‌দাদা বাংলার ক্রাশ’‌!‌ ও লাভলি!‌ তবে বাংলার ক্রাশ না বাংলাভাষার ত্রাস কে বলবে!‌ চাদ্দিকে সবাই তো দেদার বাংলা ছিটকোচ্ছেন। দিদি তো ধন্বাত্মক অব্যয়ের একেবারে ৩৬৫ ডেসিবেল!‌ নাড্ডা-চাড্ডা-আড্ডা-গাড্ডা‌!‌ কিংবা নাদুস-নুদুস, ফানুস-ফুনুস-ফুটুস-ফাটুস!‌ শব্দব্রহ্ম ফাটতে ফাটতে একেবারে ব্রেহ্মতালুতে হিট করছে। আর অপসংসকিতির যত দোষ আমার টুম্পা সোনার ঘাড়ে‌!‌

আরও পড়ুন: মাতৃভাষা দিবসে ‘ভাইরাল’ উত্তম-কিশোর স্মৃতিমাখা গানের দৃশ্য প্রসঙ্গে

তবে এখানে একটা খিটকেল কিচাইন হয়েছে। ক্যাঁচালও বলা যায়। মানে টুম্পা সোনাকে জড়িয়ে অন্যরাও কেস খাচ্ছে। প্রথম কেসটা যথারীতি টিএমসিপি খেলো। বাঙালির দেবী ভ্যালেন্টাইন শ্রীশ্রী সরস্বতী মাঈকির পুজোর রাতে ক্যাল-ইউয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসে টুম্পার সঙ্গে উদুম নাচ। ভিডিয়ো ভাইরাল। ফলে ভিসির প্রেসটিজে ইয়া আছোলা!‌ তিনি রেগে টং। বেয়াড়া বাচ্চদেরই ডিজওন করছেন। সোজা সাসপেন্ড। পার্থবাবুর কাছে আবার এরা দলের সম্পদ। ফেলে তো দিতে পারেন না। কিন্তু তিনিও বলেছেন— কেস কেলো!‌ শুক্লা পঞ্চমীর পুণ্য রাতে কলি-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে (‌‌বা উঠোনে)‌‌ টুম্পা সোনার অপসংসকিতি ভাঙা ঠিক হয়নি। কেন বড়দা?‌ কেলোটা কোথায় হল?‌ বাঙালি হিন্দি গান বাজিয়ে ভাসানের পসেশনে ডিস্কো নাচে!‌ পোশাসন কিছু বলে না!‌ আর ওয়েব সিরিজ ‘‌RIP REST IN‌ প্রেম’-এর এই আইটেম নম্বরটা বাঙালিকে প্রথমবার একটা খাঁটি বাংলা ‘‌ভাসানগীতি’‌ দিতে গেল, তাই নিয়ে ইতনা বাওয়াল?‌

আরও পড়ুন: শতক পেরিয়ে ভাষার ‘হ য ব র ল’ ও একটি নাটক

আসলে সবটাই পেটরোগা বাঙালির ‘কনস্টিপেটেড কালচারাল’‌ চোঁয়া ঢেঁকুর। ইহজীবনে এদের কাছে পটিখানাই কেবল সত্য আর তো সবই ভুসি!‌ তাই প্রাণপণ ইসবগুলের ভুসি গিলে, ঢলঢলে পাঞ্জাবি পরা রোগা রোগা হাতে হারমোনিয়ামের বেলো টিপে, মুখ ভেটকে, দাঁত ছিরকুটে দু’‌পিস রবীন্দ্রগান পরিবেশন না করতে পারলে এদের হিসেবে বাঙালির নাগরিক সংস্কৃতির যেন full ‌মস্তি হল না। এরা অবশ্য বাউল-লালন-ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া শোনেন। ‘‌কেন কী’‌ ফোক-লোক ব্যাপারটা শহুরে আঁতেল আঙিনায় দিব্বি সেটিং হয়ে যায়। এসব পাবলিক ঝুমুর-আলকাপ-গম্ভীরাতভরা-ভাদুটুসুকে ‘অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্ট’-এর নেকনজরে দেখে নেয়। কিন্তু শহরের পাতালঘরের আঁধার লোকের পাবলিক-কৃষ্টির ইতিউতি অনাছিষ্টি দেখলেই এরা ‘‌সফি-সফি’‌খিস্তি করে ভূত ভাগায়। কারণ এই ‘কৃষ্টি’ কোথাও মিনমিনে মোলায়েম মিষ্টি শোনায় না। শহরের আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের নর্দমা ঘাঁটা কাচড়া বাঙালি ভদ্দরবাবুর শান্ত-সাদা-সুবোধ পাজামা পাঞ্জাবির গায়ে ছ্যাপ করে লেগে যেতে পারে। কিন্তু শহরবাসের ইতিকথায় ‘‌ভালগার’‌, ‘‌লুম্পেন’‌ব্যাপার-স্যাপারগুলো একেবারে মাখামাখি হয়ে আছে, নগরের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও তার ছাপছোপ তো লাগবেই। এই শহর কলকেতার রাস্তায় বাজারে একদা জেলেপাড়ার সঙ বা রূপচাঁদ পক্ষীর গায়ক-পাখির দল কম, ধামাকা মাচায়নমি।

আরও পড়ুন: ভাষার মাস কেন নয় ফাল্গুন

তথাকথিত ‘‌ভালগার’‌-এর হাতবোমা ছুড়েই বাবু কালচারের ভালগারিটি-র পুটকি মেরেছে। টুম্পা সোনার যে মিউজিক ভিডিয়োটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল, গাম্ভীর্য মারিয়ে বলতে গেলে সেটারও একটা আপাত নিম্নবর্গীয় ন্যারেটিভ আছে। একটা গরিব, ছোটলোকি, বস্তি গোছের ব্যাপার। অবশ্যই সিন্থেটিক। ভিজ্যুয়ালে কার্টুন, অ্যানিমেশন, গ্রুপ থিয়েটার— সাউন্ড ক্র‌্যাকের বোজপুরি গান-মার্কা বৈদ্যুতিন ডিসটরশন— এই সবটা দিয়েই টুম্পা সোনার ছায়া শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তবে এই মিউজিক ভিডিয়োর আসলি জান এর লিরিক। তাতে লঙ্কা-আদা-নুন-ছোলার চাট হল এর গায়কি। লিরিসিস্ট, গায়ক আরব দে চৌধুরি গানটার কথায় আর পরিবেশনায় এমন একটা আলগা লুম্পেনপনা টাঙিয়ে দিয়েছেন, সেটাকে কেউই এড়াতে পারছেন না। যাঁরা তাল দুইয়ে গুনগুন করছেন, তাঁরা তো ননই— আর যাঁরা তেলে বেগুনে জ্বলে-পুড়ে সাসপেন্ড করছেন, তাঁরাও নন। আসলে আরব টুম্পার গায়ে কথাগুলো যেভাবে লাগিয়েছেন, আর গাইবার সময় কথাগুলোর গায়ে যেমন একটা রগুড়ে-সেক্সি চ্যাংড়ামো বুলিয়ে দিয়েছেন, তাতেই কারোর পা নাচছে, কারোর ঝাঁট জ্বলছে!‌ কিন্তু টুম্পার পাশ কাটানো যাচ্ছে না তো। এমনকী সিপিএম-ও পারেনি।

আরও পড়ুন: ‘দেশভাগ: ঐতিহাসিকতা, চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাটক’ বিষয়ে ওয়েবিনার, আয়োজনে চিত্তরঞ্জন কলেজ

আরব যে ‘‌বস্তির বাদশা’ ‘‌লুম্পেন প্রোলেতারিয়েত’‌ সাবঅলটার্ন রোমান্সের কিস্‌সা শুনিয়েছেন, সিপিএম তাকে দিয়েই ২৮শে ব্রিগেড চলোর আওয়াজ তুলিয়েছে। আরবের বস্তির নায়ক নির্ভেজাল ভালোবাসায় তার ডার্লিং-সোনমের কাছে ‘‌আর খৈনি খাব না’ ‌দিব্যি কাটে। তাকে নিয়ে দিঘা যাবার প্রমিস করে। আর কোনও এক মধুরাতে বস্তির টালির ছাদে টুম্পাকে পাশে বসিয়ে বাদাম খাওয়ার স্বপ্ন দেখে। নির্ভুল নাগরিক নিম্নবর্গের লুম্পেন খোয়াব। আর সেই ইচ্ছাপূরণের রানওয়েতে আচমকাই ল্যান্ড করে যান আমাদের জনপ্রিয় সংস্কৃতির অনেক কালের ব্র্যান্ড আইকন জোড়াবাগান উত্তর কলকাতার মিঠুনদা— মানে মিঠুন চক্রবর্তী।

টুম্পাকে নিয়ে তার যাবতীয় প্যাশন-অবসেশন এভাবেই বুক বাজিয়ে পাবলিক করে দেওয়া মিঠুনদা-ভক্ত, নগরের নিচের তলার এহেন হিরো-হীরালালটিকে ব্রিগেডের মিছিলে হাঁটাতে গিয়ে টিএমসিপি-র পরের কেসটা খেয়েছে সিপিএম। যে সিপিএম-এর ব্রিগেডে-মিটিং-হবে মানেই লাল পতাকায় চারপাশ মুড়ে ‘শহিদের খুনে রাঙা পথে’‌ বা ‘‌পথে এবার নামো সাথী’‌র মতো গণসঙ্গীসংগীত, সেখানে ‘‌টুম্পা সোনা’‌র প্যারোডিতে ব্রিগেড প্রচার‌!‌ ভাবা যায়?‌ পার্টিটা নামতে নামতে কোন পাতালে নামল যে টুম্পার মতো অমন একটা ‘‌অশ্লীল’‌ গানের প্যারোডি বানাতে হচ্ছে!‌ ঘোর সিপিএম বিরোধীরাও রাগে ঘেন্নায় ফোঁস ফোঁস নিশ্বাস ফেলছেন!‌ যে ব্রাত্য বসু মঞ্চে বারবার জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা এলিমেন্ট খুব চোখা-স্মার্ট মুন্সিয়ানায় ব্যবহার করেছেন, তিনিও পার্টির এই ‘‌দেউলিয়াপনা’‌ সহ্য করতে পারছেন না।

সিপিএম-এর এই এক ট্র্যাজেডি। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বলেও গাল খায়— আবার তাল মেলাতে গেলেও গাল‌!‌ কী ঝকমারি!‌ অথচ প্যারোডি তো বরাবরই রাজনীতির হাতিয়ার। ভারী-ভারী কথা, মার্কসবাদী বুকুনির বদলে ‘তোকে নিয়ে ব্রিগেড যাব, টুম্পা’‌র ডাক অন্তত বেশি লোক শুনবে। বস্তাপচা ‘‌স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক’‌-এর বদলে ‘‌মোদি দিদি সব ভোগে যাক’‌, অনেক বেশি পার্টি লাইনের গা-ঘেঁষে যায় কিনা?‌ আসলে গোমড়ামুখে দিনরাত সিরিয়াস সব তাত্ত্বিক ইট খেয়ে খেয়ে বাঙালির ব্রহ্মতালু এতটাই বেরসিক শক্ত হয়ে গেছে যে, ‘‌আরবান ফোকলোর’‌-এর মজা আর সেখানে ঢুকবে না। তুই আর কী করবি, কমরেড টুম্পা?‌

লেখক দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণারত এবং এ-বিষয়ে একাধিক গ্রন্থের প্রণেতা। এছাড়াও বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে নিয়মিত কলাম লেখেন এবং একটি জনপ্রিয় অনলাইন চ্যানেলের নিয়মিত হোস্ট।

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়

    শান্তনু, জবাব নেই। হাল্কা রসিকতা ব‍্যঙ্গ বিদ্রুপের মধ‍্যে চুপকে চুপকে অনেক গভীর কথা বলেছেন। অনেক, অনেক অভিবাদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *