চূর্ণী নদীর তীরে…

সম্পা গাঙ্গুলি

চূর্ণী হল পদ্মার শাখানদী। এই নদী নদিয়া জেলার অন্তর্গত মাথাভাঙা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে তারপর প্রায় ৫৬ কিমি প্রবাহিত হয়ে পায়রাডাঙা ও চাকদহের কাছে হুগলি বা ভাগীরথী নদীতে হরধামের কাছে গিয়ে মিশেছে। জানা যায়, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে বর্গি আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি তাঁর রাজধানী কৃষ্ণনগর থেকে মাজদিয়ার শিব নিবাসে স্থানান্তরিত করেন। এই রাজধানী স্থানান্তরকরণের বিষয়ে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন মতবাদ পাওয়া যায়। কেউ কেউ মনে করেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর রাজধানীর সুরক্ষার জন্য রাজধানীর চারিদিকে পরিখা খনন করে দেন। এই পরিখাটি হাওলি নদীর মাথা থেকে তৈরি করা হয়। যেহেতু এই খালটি হাওলি নদীর মাথা চূর্ণ করে খনন করা হয়েছিল, তাই এই খালটির নাম দেন ‘চূর্ণী’। এর আরেকটি শাখা ইছামতী নদী নাম নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় পদ্মা নদীতে মিশেছে।

আরও পড়ুন: বীরদের নগর আর উলার মেলা

চূর্ণী নদী

১৭৮০ সালের পর থেকেই নাকি এই খাল চূর্ণী নদী নামে পরিচিতি লাভ করে, এটাই জানা যায়। এই চূর্ণী রানাঘাট শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পূর্বপাড়ে রানাঘাট শহর আর পশ্চিম পাড়ে আছে আইসতলা নামে গ্রাম পঞ্চায়েত। সেই সময়কালে কোনও রেলপথ না থাকার কারণে নদীপথেই মানুষ যাতায়াত করত। চূর্ণী নদীর পূর্বপাড়ে ছোটবাজার নামে একটি জমজমাট বাজার ছিল আর ছিল জমিদার পালচৌধুরীদের একটি বাজার, যেটাকে বড়বাজার বলা হয়। যদিও বাজার দু’টি এখনও বর্তমান আছে, কিন্তু তার সেই ঔজ্জ্বল্য আর তেমন নেই। এই নদীর নাব্যতাও অনেক কমে গিয়েছে। জলও প্রায় দূষিত হয়ে গেছে। বছর কয়েক আগেও ছোট বাজার ঘাট থেকে নৌকো করে মানুষ এপার-ওপার করত। কিন্তু বেশ কয়েক বছর আগে এই নদীর ওপর দিয়ে একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, এখন মানুষ সেই সেতুর মধ্য দিয়েই দুই পাড়ের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।

আরও পড়ুন: গড়িয়ার রথবাড়ি

চূর্ণী নদীর উপর ঝুলন্ত সেতু

কথিত আছে যে, এই চূর্ণী নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। এই অঞ্চলের পূর্বনাম ছিল ‘ব্রহ্মডাঙ্গা’। নদীমাতৃক বঙ্গ দেশে এই চূর্ণী নদীই ছিল একমাত্র চলাচলের মাধ্যম। রানাঘাট নামকরণের কারণ হিসেবে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত আছে যে, এই অঞ্চলে রানা নামে এক ভয়ংকর দুর্বৃত্ত ডাকাত ও তার দলবলদের আখড়া ছিল এই চূর্ণী নদী তীরবর্তী অঞ্চলে। সেইসময় রানা ডাকাতের নামে মানুষ ভয়ে কাঁপত। রানা ডাকাতের কবলে পড়লে মানুষের আর নিস্তার ছিল না। যাত্রীবাহী নৌকায় হোক বা কোনও পণ্যবাহী নৌকো, দেখলেই এই রানা ডাকাত ও তার দলবল যাত্রীদের সমস্ত সম্পদ লুট করত, এমনকী কখনও প্রাণেও মেরে ফেলত। রানা ডাকাত ছিল মাতৃসাধক। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে সে কালীপুজো করে ডাকাতি করতে যেত। যাত্রীদের অনেক দূর থেকে লক্ষ রাখার জন্য রণপা ব্যবহার করত আর এর মাধ্যমেই ওরা ডাকাতি করতে যেত। তখন মানুষ এই রানা ডাকাতের ভয়ে ব্রহ্মডাঙ্গাকে রানাঘাট বা রানা ডাকাতের ঘাট বলতে শুরু করে। যতদূর জানা যায় রানা ডাকাতের সময়কাল ছিল ১৭১৫ থেকে ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এরপর রানা ডাকাতের বংশ কীভাবে বিলুপ্ত হয়েছে, তা জানা যায় না।

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

চূর্ণী নদী, চিত্র ২

এছাড়া অনেকে মনে করেন, রানিদের ঘাট থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে রানাঘাট বা রানির ঘাট। আবার অনেকে মনে করেন, ‘রনা’ অর্থাৎ ইট বালি সুরকি দিয়ে বাঁধানো ঘাট থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে রানাঘাট। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই রানা ডাকাতের নাম অনুসারে রানাঘাট নাম হয়েছে, এই মতটিকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তখন ছিল কৃষ্ণনগরের রাজা রাঘবেন্দ্র রায়ের শাসনকাল। রানা ডাকাত মাটির তৈরি মা কালীর মূর্তি পূজা করত। সেই মূর্তির সামনে ছিল বলি দেবার জন্য হাড়িকাঠ। রানা ডাকাত মায়ের পুজোর উদ্দেশ্যে পশু বলি দিত, আর সেই বলি প্রদত্ত পশু কালীকে নিবেদন করত। রানা ডাকাতের সেই হাড়িকাঠ অক্ষত অবস্থায় নবনির্মিত সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মন্দিরের সামনে আজও বর্তমান। কিন্তু বেশ কয়েক বছর যাবৎ এখানে বলি প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: বদ্যিনাথের সংসার: মতি নন্দীর একটি অগ্রন্থিত গল্প

রানা ডাকাতের হাঁড়ি কাঠ

এরপর এলো নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের শাসনকাল। জানা যায় যে, একদিন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নৌকো করে মুর্শিদাবাদের নবাবের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়তে যাচ্ছিলেন এই চূর্ণী নদীর মধ্যে দিয়ে। পথিমধ্যে তিনি স্বপ্নাদেশ পান যে, এই নদী তীরবর্তী অঞ্চলের জঙ্গলের মধ্যে মা সিদ্ধেশ্বরী পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। সেই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই জঙ্গল থেকে কালীর মূর্তি উদ্ধার করেন আর একটি আটচালা নির্মাণ করে সেখানে নিত্যপূজার ব্যবস্থা করেন। বর্ধমান নিবাসী এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী শ্রীমত্যা কুসুমকুমারী দেব্যাকে এনে এই মন্দিরের পুজোর দায়িত্ব অর্পণ করেন। এছাড়া রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় ও তার পরিবারকে প্রচুর অর্থ ও দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে নিষ্কর সম্পত্তি দান করেন। কিন্তু এই ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন নিঃসন্তান। পরে তিনি তার শ্যালিকার পুত্র প্রমথনাথ গাঙ্গুলিকে দত্তক নেন। প্রমথ গাঙ্গুলির পিতা ছিলেন অবিভক্ত বাংলাদেশের যশোর জেলার মাঝারি মাপের জমিদার।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)

সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের প্রবেশদ্বার

তখন ছিল ব্রিটিশ শাসনকাল। জানা যায়, দু’জন ইংরেজ দুর্বৃত্তদের তাড়া খেয়ে এই আটচালা ঠাকুর মন্দিরে মায়ের মূর্তির পেছনে প্রাণের ভয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তখনকার সমাজব্যবস্থা ছিল অন্ধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এই ঘটনার পর সমাজপতি ও পণ্ডিতবর্গ নিদান দেন যে, যেহেতু বিধর্মী মানুষ এই মন্দির স্পর্শ করেছে, তাই এই মূর্তিতে আর পুজো করা সম্ভব নয়। তখন এই সমাজপতি ও পণ্ডিতদের নির্দেশে কালীর মূর্তি চূর্ণী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর সেই সময় ইচ্ছাময়ী দেবীর অর্থানুকূল্যে ও জমিদার পালচৌধুরীদের সহায়তায় বেনারস থেকে কষ্টি পাথরের মূর্তি নির্মাণ করে বিশেষ প্রমোদতরণী করে জলপথে এই সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মূর্তি রানাঘাটে নিয়ে আসা হয়। সেই সময়ে নতুন করে দালাল ও নতুন মন্দির নির্মিত হয়। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়ের গুরুদেব বালানন্দ ব্রহ্মচারী স্বয়ং তিন দিন ধরে উপস্থিত থেকে এই সিদ্ধেশ্বরী মায়ের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্তমান আসনে বসে। এছাড়া এই মন্দিরে শ্রীশ্রীঠাকুর মোহনানন্দ ব্রহ্মচারী, ওঙ্কারনাথ ঠাকুর, আনন্দময়ী মা সহ বহু সাধকের পদার্পণ ঘটেছে।

আরও পড়ুন: বাংলাভাষাকে সঙ্গে নিয়ে হিল্লিদিল্লি

নাট মন্দির

বর্তমানে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি নাটমন্দির। এই নাটমন্দির পেরিয়েই মূলমন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। প্রচলিত রীতি অনুসারে, রানাঘাট মহকুমার সমস্ত শ্রেণির মানুষ তাদের যেকোনও শুভ অনুষ্ঠান শুরুর আগে এই সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মন্দিরে পুজো দিয়ে তবে শুভ মহরত করেন। বিশেষ বিশেষ তিথিতে এই মন্দিরে প্রচুর ভক্ত সমাগম ঘটে। এমনিতে নিত্যপুজো ও সন্ধ্যারতি হয় মন্দিরে। আর এই প্রমথনাথ গাঙ্গুলির বংশধররাই বংশপরম্পরায় সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের মালিকানা স্বত্ব ভোগ করে আসছেন, এবং মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে যুগ যুগ ধরে।

সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মূর্তি

বিঃদ্রঃ অনেকে এই সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মন্দির নিয়ে অনেক অলৌকিক ঘটনা বা অলৌকিক কাহিনি প্রচার করে থাকেনকিন্তু আমি এই পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে বলছি যে, এই সব কাল্পনিক কাহিনি বা অলৌকিক ঘটনার কোন ভিত্তি বা যৌক্তিকতা নেই।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • আমার দাদুর ছোট বাজারে দোকান এবং বাড়ি ছিল। তিনি তাঁর বাবার নামে মতিলাল ঢাল বা মতিলাল চ্যালেঞ্জ শীল্ড প্রবর্তন করেন। যা এখনও চালু আছে।সিদ্ধেশ্বরী তলায় আমার বন্ধু অমিতাভ কুন্ডুর বাড়ি। জনপ্রিয় লোকশিল্পী সৌরভ মনির সঙ্গে ২০১৮ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি চূর্ণীর ওপর নদীতে ভাটিয়ালি শুনি।

    আপনার তথ্য বহুল লেখা আমায় মুগ্ধ করল। আমি গত ১৫ বছর যাবৎ মেলবোর্নে থাকি। আমি একটি কাব্য উপন্যাস প্রকাশ করেছি ‘একুশে উদযাপন ‘, যার মূল উপজীব্য নদী। নদী জল জীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *