শতক পেরিয়ে ভাষার ‘হ য ব র ল’ ও একটি নাটক

অনিন্দ্য বর্মন

১৯৮৭ সালে সত্যজিৎ রায় নিজের পিতৃদেবকে উৎসর্গ করে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সুকুমার রায়ের জীবন, তাঁর বংশ পরিচয় এবং তাঁর লেখা মূলত তিনটি বই― আবোল তাবোল, এবং হেঁশোরাম হুঁশিয়ারের ডাইরি–র বর্ণনা এই তথ্যচিত্রে করা হয়েছে। মানুষ সুকুমারকে আমরা চিনি। কবি সুকুমারও আমাদের অজানা নয়। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি যে কতটা ভবিষ্যৎদ্রষ্টের অধিকারী, তা জানার জন্য প্রয়োজন বর্তমান সময়। আনুমানিক ১৯২১ সালে হযবরল রচনা করেন সুকুমার। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই আবোলতাবোল প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৩৭ সালে, মৃত্যুর ৯ দিন পরে। আবোল তাবোল-এর মতোই -এর স্কেচ করেছিলেন সত্যজিৎ।

আজ শতক পেরিয়ে -এর প্রাসঙ্গিকতা এখনও অম্লান। সুকুমার-এর অ্যাবসার্ড আইডিয়ার বাস্তব এবং সুচারু মঞ্চায়ন ঘটল ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১-এ সরস্বতী পুজোয়। সেই উপলক্ষ্যেই কলকাতার ডানলপ মোড়ের সন্নিকটে সাকেত নগর ফেজ ২ আবাসনে মঞ্চস্থ হল সুকুমার রায়ের -এর একটি নাট্যরূপ।

আরও পড়ুন: ভাষার মাস কেন নয় ফাল্গুন

নাট্যরূপটি নিতান্তই ছোট। এতে দেখানো হয়েছে আসল -এর বালক, হিজবিজবিজ, ব্যাকরণ শিং এবং ন্যাড়ার চরিত্রগুলি। অংশগ্রহণ করে আবাসনেরই কিছু কচিকাঁচা। নাটকের ভাষায় বলা হয়― মঞ্চে আলো পড়লে, আবহে সংগীতের রণন উঠলে অনেকাংশেই চরিত্র ফুটে ওঠে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। অথচ -এর একটি অংশকে নাটক হিসাবে মঞ্চস্থ করাটা ছিল খুবই কঠিন। বিশেষ করে এই অস্থায়ী মঞ্চে। কারণ এতে অভিনয় করা কুশীলব শিশুদের কেউই সেভাবে বাংলা জানে না, তারা অধিকাংশই ছিল অবাঙালি। নাটকটির মূল চরিত্র সংখ্যা ছিল ৯। প্রথমেই আসি রিহার্সাল অথবা মহড়ার ক্ষেত্রে। মাত্র ১৪ দিন সময় হাতে নিয়ে নেমেছিল কুশীলবরা।

আরও পড়ুন: ‘দেশভাগ: ঐতিহাসিকতা, চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাটক’ বিষয়ে ওয়েবিনার, আয়োজনে চিত্তরঞ্জন কলেজ

এবার আসি মূল নাটকে। কচিকাঁচারা সম্ভবত এই প্রথম একটি নাটক মঞ্চস্থ করল। ব্যপ্তি ১৫-২০ মিনিট। সঙ্গে আলো এবং আবহের যথাযথ সঙ্গত। অভিনেতারা কেউই স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। কিন্তু এইরকম আবহে নাটক মঞ্চস্থ করতে তারা প্রাণপণ খেটেছে। ভাষ্য, শরীরী ব্যাবহার এবং মঞ্চে নিজেকে উপস্থাপন করা― এই সমস্তই তারা করেছে প্রবল ফুর্তি এবং যৎসামান্য অনুশীলনের মাধ্যমে। আশ্চর্যের বিষয় হল এই শিশুদের অনেকেই বাঙালি নয়। সংলাপে তাদের ভাষা সমস্যা ধরা পড়েছে। কিন্তু তাকে যুযবার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টাও করেছে। নাটকটি ছিল এইরকম― বালক পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ে। মঞ্চে একের পর এক উপস্থিত হয় হিজবিজবিজ, ব্যাকরণ শিং এবং ন্যাড়া। সমাপ্তিতে বালক ঘুম থেকে উঠে উপলব্ধি করে যে, সে স্বপ্ন দেখছিল।

আরও পড়ুন: বীণাপাণির হিরণকিরণ ছবিখানি…

নাটকের প্রয়োজনেই নির্দেশক সামান্য বদল করেন। প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় যে, মানুষ স্বপ্ন খুঁজছে। স্বপ্ন― যা সুকুমার রায়ের ভাষায় এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে অ্যাবসার্ড। এই ড্রিম সিকোয়েন্সের সমাপ্তি ঘটে আবহে নির্দেশকের বলিষ্ঠ কণ্ঠে। তিনি ‘বাদুর বলে ওরে ও ভাই সজারু’ কবিতাটির শেষাংশ আবৃত্তি করেন নেপথ্যে। শিশুরা তখন মঞ্চে স্লেটে লেখা হযবরল-এর অর্থ তুলে ধরেছে দর্শকদের সামনে।

আজ ২১ ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস। এই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন বহু মানুষ। আর এখানেই এই নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা। বিভিন্ন ভাষ্যের শিশুরা একটি বাংলাভাষার নাটক উপস্থাপন করতে পিছপা হয়নি। দৃঢ়ভাবেই তারা নাটকটি মঞ্চে তুলে ধরেছে। ভাষার সমস্যা মুছে দিয়েছে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা এবং উদ্দীপনায়। আর এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন সুকুমার রায় এবং ভাষা। বর্ণে বর্ণে কুশীলবরা বেঁধেছে নাটকটিকে। ভারতবর্ষ নানা মত, নানা সহবস্থানের দেশ। ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি। শিশুরা তাদের মাতৃভাষাকে আপন করে নিয়েছে। অথবা বিজাতীয় ভাষার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়েছে। নাটকটি ভাষা, ভাষ্য এবং হযবরল-কে একটি সুতোয় বেঁধেছে যা তারিফযোগ্য।

পরিচয় করাতেই হবে সেই মানুষগুলির সঙ্গে যারা এই অসাধ্য সাধন করেছে। নাটকটির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছে বালক– সৌম্যদীপ বারিক, হিজবিজবিজ– দিলজ্যোৎ সিং বোপারাই, ব্যাকরণ শিং– ঈশানিকা সাঁতরা এবং ন্যাড়া– আয়ুশি কাপাড়ি। অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছে শিনিয়া ভট্টাচার্য, আর্য মাইতি, শ্রেয়ন্তন ঘোষ, হরসিরাৎ সিং এবং হরসিমরন কৌর। প্রত্যেকেই নিজের সেরাটা দিয়েছে। বালক, হজবিজবিজ, ব্যাকরণ এবং ন্যাড়া-র ভূমিকায় নজর কেড়েছে সৌম্যদীপ, দিলজ্যোৎ, ঈশানিকা এবং আয়ুশি। বোঝাই যায় যে দিলজ্যোৎ বাঙালি না হয়েও সুন্দরভাবে হিজবিজবিজ-কে মঞ্চে উপস্থাপন করেছে। পার্শ্বচরিত্রে তারিফযোগ্য ছিল শিনিয়া, হরসিরাৎ এবং হরসিমরন। বাঙালি না হয়েও বাংলা সংলাপ তাদের মতো করেই বলেছে। এখানেই আরও বেশি প্রসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন সুকুমার এবং তার হযবরল। নাটকটির আলোক নির্মাণ এবং প্রক্ষেপণে ছিলেন বাবলু রায়। আবহ নির্মাণ এবং প্রক্ষেপণে অনিন্দ্য। নির্দেশনায় অগ্নিজিৎ।

ছবি নিজস্ব

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *