Latest News

Popular Posts

অক্সিজেন সংবেদন

অক্সিজেন সংবেদন

সৌমিত্র চৌধুরী

“কে বাঁচিত এ সংসারে, আমার বিহনে?/ আমি না থাকিলে ভুবনে?/

আমিই জীবের প্রাণ/ দেহে করি অধিষ্ঠান,/ নিশ্বাস বহনে…।”

‘বায়ু’ নামের দীর্ঘ কবিতায় লিখেছেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র। লিখেছেন আরও অনেক কথা। সত্যিই তো বায়ু বিনা ‘কে বাঁচিত এ সংসারে…’। বায়ু বিনা প্রাণ বাঁচে না, সবাই তো জানি।  কিন্তু বহু উপাদানে ঠাসা প্রকৃতির ঐশ্বর্য বায়ু, তার কোন উপাদান এত অপরিহার্য?

সেই উপাদনটি অম্লজান। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই অক্সিজেন। শুধু অক্সিজেনের অভাবে ঝরে গেল পৃথিবী জুড়ে কত প্রাণ! প্রাণ বাঁচানোর প্রকৃতিদত্ত উপাদানটি অকস্মাৎ অতি মহার্ঘ হয়ে উঠল অধুনা বিশ্বে। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর শরীরে অক্সিজেন ঘাটতি হতে থাকল। প্রাণ বাঁচানোর ত্রাহি ত্রাহি রব দুনিয়া জুড়ে। চড়া দামে বিক্রি হতে লাগল অক্সিজেন, অতিমারি জর্জরিত অধুনা বিশ্ব বাজারে।

আরও পড়ুন: অমরত্বের অন্বেষণ

কোষের অভ্যন্তর

বাজার মুনাফা দরদাম, স্টক সাপ্লাই লজিস্টিক্স সবেতেই জড়িয়ে রাজনীতি এবং অর্থনীতি। সে আলোচনা নিবন্ধ বহির্ভূত। বর্তমান রচনা শুধু একটি প্রশ্ন ঘিরে। কেন শরীরে অক্সিজেনের এত চাহিদা! অক্সিজেন বিহনে কয়েক মিনিটও প্রাণ বাঁচে না?

অক্সিজেন দরকার তো শুধু হৃৎপিণ্ড, শ্বাসযন্ত্র বা মস্তিষ্কে নয়। শরীরের সবখানে। প্রত্যেকটি কোষে। শ-দু’য়েক হাড় আর কয়েক রকম মেদ-মজ্জা-মাংস দিয়ে তৈরি মানব শরীর। রহস্যময় এক যন্ত্র। টিকিয়ে রাখতে খাদ্য চাই, জল চাই আর চাই অক্সিজেন। শরীরের প্রত্যেকটি কোষে অক্সিজেনের জোগান চাই। অক্সিজেন পৌঁছে দিতে হয় শরীরের সর্বত্র, লক্ষ কোটি কোষে। নইলে অসুখ-বিসুখ, রোগ ব্যাধি, বিপর্যয় এমনকী মৃত্যু।

কোন্ কোষে কখন কম পড়ছে অক্সিজেন? অক্সিজেন-ঘাটতি জানা যাবেই বা কেমন করে? কে জানবে? কাকে জানাবে? জানবার পর কে, কোন্‌ উপায়ে সরবরাহ করবে অক্সিজেন? বড় জটিল কিন্তু অতি স্বাভাবিক সব প্রশ্ন অক্সিজেন সংবেদন ঘিরে।

‘সংবেদন’ (sensation) আদতে উদ্দীপনার জন্য তৈরি হওয়া প্রাথমিক অনুভূতি। সংবেদন সৃষ্টি করে প্রতিক্রিয়া। তার মাধ্যমে জগৎ সম্পর্কে অবহিত হই। অন্য কথায়, কোনও উদ্দীপক ইন্দ্রিয়ে আঘাত করলে যে অনুভূতি বা চেতনতার সৃষ্টি হয়, তাই-ই সংবেদন।

অক্সিজেন সংবেদন সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছের উত্তর অধরা ছিল এতদিন। বহু অন্বেষণের পর একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষ খুঁজে পেল উত্তর। সে-প্রসঙ্গে যাবার আগে অক্সিজেন প্রসঙ্গে সাধারণ কয়েকটি কথা।

বাতাসে মিশে থাকে অক্সিজেন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল জুড়ে বাতাস, কুড়ি শতাংশই তার অক্সিজেন। জীবন ধারণে বড়ই প্রয়োজনীয় মৌল। সাধারণ তাপমাত্রায় গ্যাস, তাপমাত্রা খুব কমিয়ে দিলে (-183°C) তরল। 

অক্সিজেন যদি না থাকে বাতাসে? আগুনই জ্বলবে না। রন্ধন ক্রিয়া বন্ধ। শ্বাস ক্রিয়া বন্ধ হেতু ভয়ংকর পরিণাম। অবধারিত মৃত্যু। 

বিনা অক্সিজেনে বেঁচে থাকা অসম্ভব। মানুষ এবং প্রায় সমস্ত প্রাণীর (কয়েক ধরনের ব্যক্টেরিয়া বাদে) জীবন ধারনের অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেন। দ্বি-পারমাণবিক এক গ্যাস। তিন দিন জল ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা সম্ভব। খাদ্য বিহীন অবস্থায় তিন সপ্তাহ। আর অক্সিজেন বিনা? তিন মিনিটও মানুষ বাঁচতে পারবে না।

আরও পড়ুন: সূর্যে নাকি লকডাউন

করোনিল হেইম্যাম

অক্সিজেনের মাত্রা খানিক হ্রাস পেলে জীবদেহের যন্ত্র সেটা বুঝে নিয়ে অন্যভাবে বেঁচে থকাবার চেষ্টা করে (Adaptation)। দীর্ঘ কালের বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রাণীদেহে এমন কৌশল তৈরি হয়েছে। ঘাড়ের পাশে থাকে ক্যারোটিড বডি। ক্যারোটিড বডির অনেক কোষ বুঝতে পারে রক্তের মধ্যে অক্সিজেনের মাত্রা (Partial pressure of oxygen) কমে গেল কিনা। অক্সিজেনের ঘাটতি হলে বিকল্প প্রক্রিয়ায় জীবদেহ টিকে থাকতে চেষ্টা করে। করোনিল হেইম্যাম (Corneille Heymans), আমেরিকার এক বৈজ্ঞানিক, অনেক দিন আগে এই তত্ত্ব আবিষ্কার করে (“for the discovery of the role played by the sinus and aortic mechanisms in the regulation of respiration.”) নোবেল সম্মানে ভূষিত হইয়েছিলেন (১৯৩৮)।

অক্সিজেনের অভাব ঘটলে প্রাণ ধারণের প্রয়োজনীয় শক্তিই তৈরি হবে না। শক্তি তৈরি হয় প্রাণীদেহের কোষের মধ্যে। মাইটোকন্ড্রিয়া নামের এক যন্ত্র অক্সিজেনকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য থেকে তৈরি করে শক্তি [গ্লুকোজ, অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট (ATP)]।

প্রাণ ধারণ প্রক্রিয়ায় অন্যতম শর্ত শক্তি উৎপাদন। এর জন্য দরকার প্রাণীদেহের প্রতিটি কোষে যথেষ্ট মাত্রার অক্সিজেনের উপস্থিতি। প্রসঙ্গক্রমে, ক্যানসার কোষে অক্সিজেন কমে যায়। তবুও, টিকে থাকবার প্রয়োজনে স্বল্প অক্সিজেন মাত্রায় বিশেষ উপায়ে ক্যানসার কোষ তৈরি করে নিতে পারে শক্তি (গ্লুকোজ)। কীভাবে করে? এর বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন জার্মান বৈজ্ঞানিক অটো হেনরিচ ওয়ারবার্গ (Otto Heinrich Warburg) এবং তাঁর কাজের স্বীকৃতিতে নোবেল পুরস্কারও পান (১৯৩১)। 

আরও পড়ুন: মেডেল জয়ের নেপথ্য নায়ক ‘ওয়ারেবল টেকনলজি’

অটো ওয়ারবার্গ

অক্সিজেন ঘাটতি (Hypoxia) কম মাত্রার হলে কোষ সেটাকে মানিয়ে নিতে পারে। মানিয়ে নেবার কৌশল, কলকব্জা থাকে কোষের ভিতর। কিন্তু প্রশ্ন, অক্সিজেন-ঘাটতি জানা যাবে কেমন করে? কোন্ কোষে কখন কম পড়ছে অক্সিজেন? জানবার পর কে সরবরাহ করবে অক্সিজেন? কীভাবে?

বড় জটিল কিন্তু স্বাভাবিক সব প্রশ্ন। উত্তর ইদানীংকালে আমরা জানতে পেরেছি। কয়েক দশকের পরিশ্রমসাধ্য গবেষণার ফল হিসাবে উঠে এসেছে উত্তর। জানতে পেরেছি কোষের ভিতর ঘটে চলা অত্যন্ত সূক্ষ্ম জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ। যেমন, অক্সিজেন কমে গেলেই কোষের মধ্যে বেড়ে যায় এক হরমোনের মাত্রা। হরমোনটির নাম ইরিথ্রোপয়েটিন (Erythropoetin), সংক্ষেপে ইপিও (EPO)। কী এই ইরিথ্রোপয়েটিন? এক এনজাইম (Enzyme)। এর ক্রিয়াতেই লোহিত রক্ত কণার (Red blood cell, RBC) জন্ম হয়, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।  

ইরিথ্রোপয়েসিস নামের এই প্রক্রিয়ায় (গ্রিক শব্দ, ইরিথ্রো মানে লাল, আর পয়েসিস-এর অর্থ, তৈরি হওয়া) হাড়ের মজ্জার (bone marrow) ভিতর তৈরি হয় ইরিথ্রোসাইট বা লোহিত রক্ত কণিকা। উৎপন্ন লোহিত কণিকা রক্তনালীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেহের সব খানে, টিসু এবং কোষে, পৌঁছে দেয় অক্সিজেন। রক্তনালীতে অক্সিজেনের ঘাটতি হলেই কিডনি সেটা বুঝে নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। রক্ত তৈরির উপাদান ইরিথ্রোপয়েটিন হরমোন তৈরি (Secrete) শুরু করে দেয়। 

কীভাবে বুঝতে পারে? কেমন করে এবং কার নির্দেশেই বা তৈরি করে? জানা ছিল না এত দিন। জানলাম সদ্য, বছর দু’য়েক আগে।

লোহিত রক্ত কণা (RBC) তৈরিতে EPO-র যে বিশেষ ভূমিকা আছে, তথ্যটি বিংশ শতাব্দীতেই গোচরে এসেছিল। কিন্তু কীভাবে EPO কাজটি করে? দীর্ঘ কালের অজানা প্রশ্নের উত্তর জানা সম্ভব হল একবিংশ শতাব্দীতে। কয়েকজন বৈজ্ঞানিকের দীর্ঘকালীন এবং অক্লান্ত গবেষণায় আবিষ্কৃত হল বহু অজানা তথ্য। বছর দু’য়েক আগে (২০১৯) এই বিষয়ে কাজ করে নোবেল সম্মানে ভূষিত হন তাঁরা। উইলিয়াম কেলিন, পিটার র‍্যাডক্লিফ এবং গ্রেগ সেমেঞ্জা (William G. Kaelin Jr, Sir Peter J. Ratcliffe and Gregg L. Semenza)।  

আরও পড়ুন: দিনরাত্রির কাব্য

বিজ্ঞানী গ্রেগ সেমেঞ্জার কাজের কথা দিয়েই শুরু হোক। রক্ত নালীতে অক্সিজেনের ঘাটতি ঘটলে কার নির্দেশে ইরিথ্রোপয়েটিন হরমোন তৈরি (secrete) হয়? কে এবং কীভাবে অক্সিজেনের অভাব বুঝতে পারে? কার নির্দেশেই বা তৈরি হয় EPO নামের প্রোটিন?

অধ্যাপক গ্রেগ সেমেঞ্জা, আমেরিকার জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক, দীর্ঘ সময় ধরে এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন। EPO জিন সংক্রান্ত গবেষণায় কয়েক দশকের চেষ্টায় গোচরে আনলেন সম্পূর্ণ নতুন এক তত্ত্ব। বললেন, EPO নামের এই জিনটির কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করে অক্সিজেন। অর্থাৎ অক্সিজেনের মাত্রার উপর নিভর করে EPO জিনের কাজকর্ম। কথাটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও তাৎপর্য খুবই গভীর।

ইপিও বস্তুটি তো আদতে হরমোন, এক ধরনের প্রোটিন। প্রোটিন তৈরি হয় জিনের নির্দেশে। জিনের কোন এক স্থানে ডিএনএ-র মধ্যে লেখা থাকে প্রোটিন তৈরির নির্দেশ। সেই নির্দেশ মেনে সক্রিয় হয়ে ওঠা জিন কীভাবে তৈরি করে এই প্রোটিন? কেমন তার কাজকর্মের ধরন? এ সব আলোচনার শুরুতেই জেনে নিই ‘জিন’ কী।

মানুষ এবং জীবজন্তুর দেহে, কোষের ভিতর থাকা অতি সূক্ষ্ম অংশের নাম জিন। কোষ বদ্ধ থাকে লিপিড (Lipid) পর্দার আবরণে (চিত্র ১, কোষের গঠন)। আবরণের ভিতর মূলত দু’টো অংশ, নিউক্লিউয়াস আর সাইটোপ্লাজম। সাইটোপ্লাজমের মধ্যে থাকে অসংখ্য ছোট যন্ত্রপাতি। আর নিউক্লিয়াসে থাকে মূলত, ক্রোমোজোম। ক্রোমোজোমের অভ্যন্তরে অবস্থান করে বংশগতির ধারক, জিন (Gene) (চিত্র. 2)। জিনের পরিচয় তো সংক্ষিপ্ত নয়। মানব শরীরে আছে ২০,০০০-২৫,০০০ জিন। জিনের প্রধান উপাদান ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA)। আর ডিএনএ তৈরির মূল উপাদান নিউক্লিওটাইড নামের কয়েকটা জৈব যৌগ। ডিএনএ-র একেকটা নিউক্লিওটাইডের গঠনে থাকে ফসফেট গ্রুপ, রাইবোস (সুগার)। আর থাকে নাইট্রোজেন যুক্ত জৈব যৌগ বা বেস (Nitrogen)। এদের নাম— অ্যাডেনিন (A), গুয়ানিন (G), থায়ামিন (T), সাইটোসিন (C)।

আরও পড়ুন: জনপ্রিয়তা কি সীমাবদ্ধতাও

James Watson | Biography, Nobel Prize, Discovery, & Facts | Britannica
জেমস ওয়াটসন

ডিএনএ-র আবিষ্কর্তা আমেরিকার বৈজ্ঞানিক জেমস ডি. ওয়াটসন এবং ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক ফ্রান্সিস হ্যারি কম্পটন ক্রিক প্রায় সাত দশক আবে আমাদের জানিয়েছিলেন (১৯৫৩)—ক্রোমোজোমের গভীরে জিনের অবস্থান। জিন অনেকটা মণি দিয়ে গাঁথা মালার মতো (চিত্র ২)। মালার একেকটি মণিই জিন। প্রতিটি মণি অর্থাৎ জিন বংশগতির ধারক এবং আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। জিন বংশ পরম্পরায় সঞ্চালিত হয় আর জিনের মধ্যে সাংকেতিক ভাষায় লেখা থাকে বংশগতির খুঁটিনাটি, সুস্থতা এবং আরও অনেক রহস্য। মনুষ্যকুলে কেউ লম্বা, কেউ নীলাক্ষী, কেউ শৈশবেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত— এসব জিনের গঠনেই চিহ্নিত। জিন আদতে ডিএনএ-র এক ক্ষুদ্র অংশ, যার মধ্যে প্রোটিন তৈরির কোড বা নির্দেশ লেখা থাকে। নির্দেশ লেখা হয় AGTC-এর অ্যারেঞ্জমেন্ট (সজ্জা) দিয়ে। সাংকেতিক ভাষা (কোড) বা ডিএনএ-র নির্দেশ মেনে প্রোটিন তৈরির কাজ করে রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড (RNA) (চিত্র ৩ ডিএনএ –আরএনএ-প্রোটিন)।

আরও পড়ুন: অন্ধেরা, নির্বোধেরা

ফ্রান্সিস হ্যারি কম্পটন ক্রিক

শরীরে কোষের সংখ্যা পঁচাত্তর লক্ষ কোটি (75x 1012)। আর কোষও বহু ধরনের, প্রায় দু’শো রকম। কোষের আকার ছোটবড় হলেও এরা ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ লম্বা-চওড়া-উচ্চতা বিশিষ্ট। সাধারণভাবে কোষ লম্বায় ২-১২০ মাইক্রন। ১০০ মাইক্রন মানে এক মিলিমিটারের একের দশ ভাগ। ক্ষুদ্র কোষ নিজেকে তথা সমগ্র দেহকে বাঁচিয়ে রাখে জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শক্তি তৈরির মাধ্যমে। একটা কোষ থেকে অপর কোষের সৃষ্টি হয়। শরীরের বৃদ্ধি, ধ্বংস আসলে কোষেরই বিভাজন ও মৃত্যুর বিবরণ। নিউক্লিয়াসে জিনের মধ্যে সঞ্চিত নির্দেশ অনুযায়ী কোষেরা জীবন প্রক্রিয়া চালাতে থাকে। তৈরি করে শরীরের প্রয়োজনীয় উপাদান (প্রোটিন), কোষের ভিতর জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় বস্তুও বাইরে বের করে দেয়। জিনের ক্ষয়ক্ষতির মেরামতিও নিপুণ দক্ষতায় চালাতে থাকে (রিপেয়ার জিন)। কিন্তু জিনের ত্রুটি (Mutation) মাত্রাতিরিক্ত হলে অনেক সময়ই মেরামত করা সম্ভব হয় না।

দুই বিজ্ঞানী (সেমেঞ্জা এবং র‍্যাডক্লিফ) এবং তাঁদের সহযোগীরা জানান দিলেন দারুণ এক তথ্য। অক্সিজেনের পরিমাপ বুঝতে পারা এবং তাকে মাপতে পারার কৌশল জানে প্রাণী দেহের সমস্ত কোষই। মেপে নেবার কাজটি করে ইথ্রোপয়েটিন আর শরীরের সমস্ত কোষেই আছে তার উপস্থিতি। ইরিথ্রোপয়েটিন তৈরি হয় কিডনি কোষে। কিন্তু সেখানে থাকলেই হবে না, বাঁচার স্বার্থে তাকে হতে হবে সর্ব কোষে বিরাজমান।  

কোষের কোন্ কোন্ যন্ত্রপাতি অক্সিজেন মেপে নেবার কাজটি করে? এক ধরনের প্রোটিন কমপ্লেক্স কর্মটি সম্পাদন করে। এটি আবার ডিএনএ-র নির্দিষ্ট অংশের (ডিএনএ-সেগমেন্ট) সঙ্গে অক্সিজেনের সহায়তায় যুক্ত হয়ে থাকে। এ তথ্য গোচরে আনলেন কয়েকজন বিজ্ঞানী। তাঁদের অগ্রগণ্য ডক্টর সেমেঞ্জা। ডক্টর সেমেঞ্জা এবং তাঁর সহকারীরা এই প্রোটিনের নাম দিলেন হাইপক্সিয়া ইন্ডিউসিং ফ্যাক্টর (হিফ, HIF)। হিফ জিন আবিষ্কার করলেন ডক্টর সেমেঞ্জা, তার সঙ্গে হিফ প্রোটিনটির রাসায়নিক চরিত্রও শনাক্ত করে ফেললেন।

হিফ কমপ্লেক্সের ক্রিয়াকর্ম বুঝে উঠতে দীর্ঘকাল ব্যাপী প্রচেষ্টা চলেছিল। ডিএনএ-র কোন্‌ অংশে থাকে হিফ জিন? জানা গেল হিফ দু’টো প্রোটিন দিয়ে তৈরি। এদের নাম হিফ আলফা (Hif 1α) আর এআরএনটি (ARNT, Aryl hydrocarbon receptor nuclear translocator)। এরা আদতে ট্র্যান্সক্রিপ্সন ফ্যাক্টর (Transcription Factor) অর্থাৎ জিনদের উপর আধিপত্য চালায়। জিনের কাজকর্মও নিয়ন্ত্রণ করে।

এদের ক্রিয়াকলাপ খানিক বোঝা গেলেও অন্যান্য বহু প্রসঙ্গিক প্রশ্ন অধরা রইল। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে, সংক্ষেপে আগের প্রসঙ্গে ফিরি।

আরও পড়ুন: মানভূমের মনসা পরব

জিনের গঠন

কোথায় থাকে hif1α? থাকে hif নামের একটা প্রোটিনের ভেতর, arnt-র সঙ্গে। এই প্রোটিনটা (Hif 1α) এরিথ্রোপোয়েটিন হরমোন বাড়ানো-কমানো নিয়ন্ত্রণ করে। জিনের একটা বিশেষ জায়গায় আটকাতে পারলেই ওই প্রোটিন (Hif 1α) এরিথ্রোপোয়েটিন হরমোনের ক্ষরণ বাড়াবে। কেমন করে বাড়াবে? আর বাড়লেই বা কী হবে?

প্রথমে বলি কেমন করে বৃদ্ধি ঘটাবে এরিথ্রোপোয়েটিনের? এরিথ্রোপোয়েটিন আদতে  প্রোটিন। প্রোটিন তৈরির নির্দেশ অর্থাৎ কোড লেখা থাকে ডিএনএ-র মধ্যে। লেখা হয় এজিটিসি-র সাজানোর ভিত্তিতে। এই সজ্জার মধ্য দিয়েই হয় জিনের প্রকাশ বা ‘জিন এক্সপ্রেশন’। ডিএনএ-র সংকেত উদ্ধার হওয়ার পর শুরু হয় বহু কাজ। ট্রান্সক্রিপশন, ট্রান্সলেশন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় নতুন প্রোটিন।

ট্রান্সক্রিপশন, ট্রান্সলেশন ব্যাপারগুলো কেমন? সহজ কথায়, প্রতিলিপি তৈরি করা আর ছাপিয়ে যাওয়া। কপি পেস্ট, কপি পেস্ট। আর্দালির মতো মেসেঞ্জার আরএনএ যায় ডিএনএ-র বিশেষ অংশে, জিনগুলোর কাছে। তারপর জিনটার গায়ে বেসগুলোর (AGTC) প্রতিলিপি, অর্থাৎ সজ্জা (sequence) নকল করে লিখে নিয়ে আসে। অর্থাৎ ‘প্রতিলিপিকরণ’ বা ট্রান্সক্রিপশন। এবার দরকার পিওনের কাজ। ওই নকল করা আদেশপত্রটি (অর্থাৎ কোড) এবার তুলে দিতে হবে সঠিক ঠিকানায়। এই কাজটি করে আরএনএ। নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে সাইটোপ্লাজমের জেলি সাঁতরে আরএনএ যাবে দূরে, রাইবোজমের কারখানায়। জিনের নির্দেশ পাঠ করে সেখানে তৈরি হবে প্রয়োজনীয় প্রোটিন অণু। জিন, আরএনএ আর রাইবোজম অনবরত করে চলেছে এই কাজ। এর নাম ট্রান্সলেশন।

আরও পড়ুন: রিপন কলেজ: কলকাতা থেকে দিনাজপুর

ডিএনএ-আরএনএ-প্রোটিন

এই সব ট্রান্সক্রিপশন, ট্রান্সলেশন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে hif1α-র ক্রিয়ায় তৈরি হয় ইরিথ্রোপয়েটিন। পরবর্তী সময়ে উঠে এলো আরও নতুন তথ্য। জানা গেল, অক্সিজেনের মাত্রা বেশি থাকলে, কোষের মধ্যে হিফ 1α থাকে খুব কম পরিমাণে। আবার কোষে অক্সিজেন কমে গেলেই, হিফ 1α-এর বাড়তে থাকে। কেন এমন হয়? উত্তর জানতে জিন বিদ্যার (জেনেটিক্স) গভীরে ঢুকতে হবে।

হিফ 1α নামের প্রোটিন ডিএনএ-র বিশেষ অংশে যুক্ত থেকে (Binding DNA segment) পরিচালনা (control) করতে পারে EPO জিনকে (এবং অন্য জিনকেও)। এমন যাদের ক্ষমতা, জিনবিদ্যার ভাষায় তাদের নাম ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর। তাহলে জানা গেল, হিফ 1α একটি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর। এর ক্রিয়াতেই তৈরি হয় এরিথ্রোপয়েটিন। এরিথ্রোপয়েটিন তৈরি করে লোহিত রক্ত কণিকা। রক্তের মধ্যে থাকা লোহিত রক্তকণিকা শরীরের বিভিন্ন স্থানে অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যায়।

ইরিথ্রপয়েটিন প্রোটিন তৈরি করে হিফ 1α জিন। ফলত অক্সিজেন ঘাটতি থেকে কোষ তথা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ রক্ষা পায়। কাজ সমাধা করে দেবার পরে হিফ 1α প্রোটিনটির কী পরিণতি হয়? এর উত্তরও মিলেছে। হিফ 1α কোষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কারণ? কম মাত্রার অক্সিজেনেই টিকে থাকতে পারে হিফ 1α। অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় এলে প্রটিওসোম (Proteosome) নামের এক প্রোটিন হিফ 1α-কে নষ্ট (Degradation) করে দেয়। পরীক্ষায় প্রমাণিত তথ্য: স্বাভাবিক অক্সিজেন মাত্রায় ছোট আকারের প্রোটিন ইউবিকুইটিন (ubiquitin peptide) হিফ 1α-এর সঙ্গে যুক্ত হলেই সেটি (হিফ 1α) ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কেমন করে হয়? ইউবিকুইটিন প্রোটিনটি হিফের সঙ্গে যুক্ত হলে তবেই তো তাকে (হিফ 1α কে) নষ্ট করতে পারবে। তাই স্বাভাবিক প্রশ্ন, হিফ-এর সঙ্গে কেমন করে যুক্ত হবে  ইউবিকুইটিন? দীর্ঘ দিনের অজানা বিষয়। আলোকপাত করলেন অন্য এক রোগ নিয়ে গবেষণা রত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী, উইলিয়াম কেলিন (William G. Kaelin Jr)।

বিজ্ঞানী কেলিন কাজ করছিলেন ভন হিপেল লিন্ডু (HVL) নামের এক রোগ নিয়ে। জিনঘটিত এই রোগে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গজিয়ে ওঠে টিউমার। ক্যানসার নয় এমন টিউমার। মস্তিষ্ক, শিরদাঁড়া, রেটিনা এমনকী চোখেও দেখা যায়। দীর্ঘ গবেষণায় ধরা পড়ল, এই জেনেটিক রোগে কয়েকটি পরিবারের লোকের ভিএইচএল (vhl) জিনের পরিবর্তন (মিউটেশন) ঘটে গেছে। ডক্টর কেলিন প্রমাণ করলেন, ভিএইচএল জিন একটা প্রোটিনকে এনকোড (Encode) করে। সেই জিন আবার রোগীকে ক্যানসার হওয়া থেকে রক্ষা করে। অর্থাৎ পরিবর্তিত VHL জিন ক্যানসার প্রতিহত করে। অন্য কথায় VHL জিনের অনুপস্থিতিই ক্যানসার ডেকে আনে।

অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এই পরীক্ষার ফল। কেলিনের পর্যবেক্ষণ জানান দিল, ভিএইচএল জিন অক্সিজেন-ঘাটতি বা হাইপক্সিয়ার কারক জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে (চিত্র ৪)।

এর পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করে ফেললেন বিজ্ঞানী র‍্যাডক্লিফ। জানালেন, ভিএইচএল প্রোটিন, HIF-1α-এর সঙ্গে রাসায়নিক বন্ধনী তৈরি করে যুক্ত হয়ে যায়। তারপর স্বাভাবিক মাত্রার অক্সিজেন-পরিবেশে HIF-1α প্রোটিনকে ধ্বংস করে দেয়। অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকলে এ কাজ আদৌ সম্ভব নয়। অর্থাৎ, HIF-1α কম অক্সিজেন মাত্রাতেই কর্মক্ষম এবং সক্রিয় থাকে। অক্সিজেন স্বাভাবিক মাত্রায় এলে HIF-1α ধ্বংস হয়ে পড়বে।   

আবার জিজ্ঞাসা। কীভাবে অক্সিজেনের মাত্রা VHL এবং HIF-1α মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করে? অক্সিজেনের পরিমাণ বুঝবার (সেন্স করবার) কৌশল ঠিক কোথায় লুকিয়ে থাকে? উত্তর খুঁজতে খুঁজতে HIF-1α প্রোটিনের একটা নির্দিষ্ট অংশে নজর পড়ল। বিজ্ঞানী কেলিন এবং র‍্যাটক্লিফ অনুমান করলেন, অক্সিজেন সেন্স করবার জায়গা লুকিয়ে থাকে প্রোটিনের ত্রিমাতৃক গঠনের কোন এক অংশে। পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁরা প্রমাণ করলেন (২০০১ সালে) যখন অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে, HIF-1α প্রোটিনের গায়ে দু’টো হাইড্রক্সিল গ্রুপ যুক্ত হয়ে যায়। প্রোটিনের এই পরিবর্তন (prolyl hydroxylation) VHL প্রোটিনকে সাহায্য করে HIF-1α’কে চিনে নিতে। এর পর প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত এনজাইমের (prolyl hydroxylases) ক্রিয়াতেই HIF-1α তখন ধ্বংস (ডিগ্রেড) হয়ে যায় (চিত্র ৪, হাইপক্সিয়া, জিন অ্যাক্টিভেশন)।

আরও পড়ুন: নদিয়ার পুতুলনাচ

হাইপক্সিয়া ও জিন অ্যাক্টিভেশন

অক্সিজেনের মাত্রা (লেভেল) কীভাবে শরীরবৃত্তীয় কাজগুলো নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে, তার বিবরণ কয়েকজন বিজ্ঞানী আমাদের জানালেন। তাঁদের দীর্ঘকালীন অক্লান্ত গবেষণা উদ্ঘাটন করেছে মহামূল্যবান সব তথ্য। জানতে পেরেছি কোন প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের মাত্রা বুঝে নিয়ে কোষ তাদের মেটাবলিসম নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন, কম অক্সিজেন মাত্রা (অর্থাৎ শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের সময়) আমাদের পেশী কীভাবে মানিয়ে নিতে পারে। অক্সিজেনের মাত্রার উপর নির্ভর করে অনেক ক্রিয়াকর্ম। নতুন রক্তবাহী নালী তৈরি, লোহিত কণিকা তৈরি। প্রতিরক্ষা তন্ত্র অক্সিজেনের মাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে কাজ করতে থাকে। মায়ের গর্ভে সন্তানের বৃদ্ধিও নির্ভর করে অক্সিজনের মাত্রার উপর।

বহু রোগের মূলে যুক্ত অক্সিজেন সেন্সিং কৌশল। ক্রনিক রেনাল ফেলিওরে, অর্থাৎ কিডনি বিকল এমন রোগীদের শরীরে ইপিও কমে যাবার দরুন লহিত রক্তকণিকা কমে যায়। ফলে রক্তাল্পতা দেখা যায়। ক্যানসার রোগের ক্ষেত্রেও অক্সিজেন তৈরির মেশিনারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। টিউমারের বৃদ্ধির জন্য নতুন রক্তবাহী নালী তৈরি হয়। এ কাজে সাহায্য করে HIF-1α। তাই HIF-1α-র কার্যকারিতাকে আক্রমণ করে ক্যানসার রোগের ওষুধ তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে হার্ট কিডনি-সহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরিতেও নতুন দিক নির্দেশ করবে HIF-1α; সামগ্রিকভাবে, অক্সিজেন সংবেদন বিষয়টির গভীরে লুকিয়ে আছে বহু ধরনের রোগ মুক্তির দিশা।

ড. সৌমিত্র কুমার চৌধুরী, ভূতপূর্ব বিভাগীয় প্রধান ও এমেরিটাস মেডিক্যাল স্যায়েন্টিস্ট, চিত্তরঞ্জন জাতীয় কর্কট রোগ গবেষণা সংস্থান, কলকাতা।

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

One thought on “অক্সিজেন সংবেদন

  1. অনবদ্য এবং খুবই প্রয়োজনীয় একটি লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *