পাগলা দাশু মারাদোনা

শুভ্রাংশু রায়

এ এক অদ্ভুত মিল। অবশ্য অমিলের ফর্দটা বেশ বড়। আবির্ভাবের সময়কাল, ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি, ভাষা কর্মক্ষেত্র সবই দূর থেকে সুদূর। তবু সকলের খবরের কাগজ মিলটা মনে করিয়ে দিল। ১৮৮৭ আর ১৯৬০। বছরের ফারাক থাকলেও দিনটা আজকেই। অর্থাৎ ৩০ অক্টোবর জন্মেছিলেন তাঁরা। সুকুমার রায় এবং দিয়েগো মারাদোনা।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মী বা অলক্ষ্মীপাড়ায়, ১৯৬৪-র একদিন

শুধু মিল কি কেবল জন্মের তারিখেই! হ্যাঁ, সাদা চোখে এটাই সত্য। দু’জনেরই জন্মতারিখ ৩০ অক্টোবর। তবু দু’টি মানুষকে কেমন যেন এক বিন্দুতে অন্তত আজকের দিনের জন্য বা আজকের দিনে কিছু মুহূর্তের জন্য এক বিন্দুতে মেলাতে ইচ্ছে করল। আর এর জন্য দায়ী ওই কাল্পনিক চরিত্রটি। যে চরিত্রটি নামের ব্যঞ্জনায় বা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। তাঁর স্রষ্টা সুকুমার রায়কে ইতিহাস ভূগোল এবং সময়ের গণ্ডিকে মুছে দিয়েছে। নাহ সুকুমার রায়ের ‘পাগলা দাশু’ বা ‘আবোল তাবল’-এর অন্যান্য চরিত্র হয়তো সেই অর্থে বিশ্বজনীন জনপ্রিয়তা পায়নি এখনও, কিন্তু কালোত্তীর্ণতার প্রশ্নে সুকুমার রায়ের সৃষ্টি সসম্মানে উত্তীর্ণ।

দিয়েগো মারাদোনা? তিনি তো খ্যাতির শীর্ষে। বিশ্বজনীন খ্যাতি। যে বিশ্বকাপ ‘তাঁর’ বিশ্বকাপ বলা হয়, সেই ছিয়াশির মেক্সিকো বিশ্বকাপে যে খেলায় নিজের অর্ধ থেকে বল টেনে নিয়ে গিয়ে ইংল্যান্ডের ছ’জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে শতাব্দীর সেরা গোল করেছিলেন সেই খেলাতেই করে বসেছিলেন কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল। এই নাম মারদোনার নিজেরই দেওয়া। এক ঘর ভর্তি ক্রীড়া সাংবাদিকের সামনে ব্রিটিশ মিডিয়াকে বলে বসেছিলেন এটা হল ফকল্যান্ড যুদ্ধের বদলা। মারদোনার এই বিবৃতি তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। টুর্নামেন্ট তখনও শেষ হয়নি। কিন্তু বুয়েনস আয়ার্সের শ্রমিক পরিবারের পঞ্চম সন্তান তাতে বিন্দুমাত্র দমে যাওয়ার লোক ছিলেন না। সেই বছরই বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে ফিফার প্রেসিডেন্ট হ্যাভেলঞ্জের করমর্দনের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে অগ্রাহ্য করে মারাদোনা যেন বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেম ‘এ বান্দা কুছ হটকে হ্যায়’। তিনি যে হটকে, তা কালক্রমে গোটা বিশ্ববাসী টের পেয়েছিল।

‘তাহার চোখ দুটি গোল গোল, কান দুটি অনাবশ্যক রকমের বড়, মাথায় একবস্তা ঝাঁকড়া চুল।’— নাহ এটি মারাদোনার বিষয়ে লিখিত নয়। হ্যাঁ অনেকেই, বিশেষত যাঁদের সুকুমার রায়ের লেখাপত্তের সঙ্গে পরিচিতি আছে, তাঁরা বুঝে গেছেন কার বিষয়ে এটি লেখা। পাগলা দাশু। সুকুমার রায়ের অনেক অনবদ্য সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম। আর একটি অংশ তুলে ধরছি— ‘‘একদিন সে বলিল, ‘ভাই, আমাদের পাড়ায় যখন কেউ আমসত্ত্ব বানায় তখনই আমার ডাক পড়ে। কেন জানিস?’ আমরা বলিলাম, ‘খুব আমসত্ত্ব খাস বুঝি?’ সে বলিল, ‘তা নয়। যখন আমতত্ত্ব শুকোতে দেয়, আমি সেইখানে ছাদের উপর বার দুয়েক চেহারাখানা দেখিয়ে আসি। তাতেই, ত্রিসীমানার যত কাক সব ত্রাহি ত্রাহি করে ছুটে পালায় কাজেই আর আমসত্ত্ব পাহারা দিতে হয় না।’…” হাস্যরসের মধ্যে, পাগলামির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত  বিষয়গুলির প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার এক সাহসী প্রয়াস।

তাই আজ এতদিন পরেও যখন সুকুমার রায়ের জীবন সাহিত্য সৃষ্টির দিকে ফিরে তাকাই তখন কেন জানি না বারবার মনে হয় আসলে সুকুমার রায় প্রাতিষ্ঠানিকতাকেই প্রশ্নচিহ্নের সামনে ফেলতে চেয়েছেন বারংবার। তাঁর নিজে হাতে গড়া Monday club, যা বন্ধু মহলে পরিচিত ছিল ‘মণ্ডা ক্লাব’ হিসেবে কারণ সাহিত্য চর্চা আড্ডার সঙ্গে দেদার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল বা তাঁর ননসেন্স ওয়ার্ড নিয়ে লেখা ছড়া কবিতা মধ্যে লুকিয়ে ছিল প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি তীব্র শ্লেষ।

পাগলা দাশু ছিল সেইরকমই এক চরিত্র। কোথাও না কোথাও বৃহৎ প্রেক্ষাপটে ফেলে এক প্রান্তে সুকুমারের সাহিত্য সৃষ্টি পাগলা দাশুকে ছুঁয়ে রেখা টানতে শুরু করলে এঁকে-বেঁকে অবশেষে এক ঝাঁকড়া চুল বিশিষ্ট এক ক্ষ্যাপাটে ব্যক্তিত্বকে ছুঁয়েই যায়। সেই ব্যক্তি হলেন আজকের দিনে ডায়মন্ড জুবিলি পূর্ণ করা দিয়েগো মারাদোনা। কল্পচরিত্র পাগলা দাশুর স্রষ্টা সুকুমার রায় ওরফে তাতা এবং দিয়েগোর  চরিত্রে অনেক হয়তো অমিল পাওয়া যায়। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বেপরোয়া  ক্ষ্যাপামি এবং চারপাশের লোকজনের প্রতি তীব্র শ্লেষ যদি এইটুকুই ধরা যায়, তাহলে নিছক ৩০ অক্টোবর দু’জনের জন্মদিন মিলটা শুধুমাত্র এই জায়গায় থেমে থাকে না।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক

Facebook Twitter Email Whatsapp

8 comments

  • Debashis Majumder

    wonderful. simply fantastic

  • দারুন লাগলো পড়ে ।।

  • Malyaban Chattopadhyay

    অন্যভাবে নায়ক কথন

  • Amrita Basu Roy Chowdhury

    Excellent piece of writing. Enjoyed thoroughly.

  • সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়

    এই ভাবনাটাই তো চমকে দেবার মতো ! চমৎকার !

  • ভালোই।

    গল্পের গরু গাছে ওঠে।

  • Sri Nabarun Chakraborty

    Excellent connection between these two iconic persons. I think nobody imagined and thought about it before you. Neither Sukumar Roy knew or heard the name of Diego Maradona as because it was impossible nor Diego know Sukumar Roy’s name yet it makes us wonder. Sukumar Roy is famous for his literature work and Diego Maradona is famous in the football world.
    Beautiful writing sir….

  • Subhro mukherjee

    Good copy

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *