সাতাশ বছর পরেও জীবন্ত পঞ্চম

শুভ্রাংশু রায়

প্রায় তিন দশক ছুঁতে চলল। রাহুল দেব বর্মন ওরফে আর ডি বর্মন ওরফে পঞ্চম আমাদের মধ্যে সশরীরে নেই। কিন্তু তিনি আছেন, বেশ ভালো রকমই আছেন। স্টিরিয়ো সাউন্ডে আছেন, রিমেক্সের মধ্যে আছেন, ব্যান্ডের মধ্যে আছেন এবং সবথেকে বড় কথা― মানুষের মনে রয়ে গেছেন এই ‘গ্লোবাল পঞ্চম’। নেট ঘাঁটলেই বেরিয়ে আসবে তাঁর সুরারোপিত গানের সংখ্যা। ইউটিউবে মাউস ঠেকালেও বেজে ওঠে অনেক গান। একটা সময় বম্বের হেন কোনও প্রথম সারির নায়ক-নায়িকা ছিলেন না, যিনি রাহুল দেব বর্মনের সুর করা গানে লিপ মেলাননি। তবু জীবনের একটি প্রান্তে এসে আরডি-র হাতে প্রায় ছবি ছিল না বললেই চলে। এমনকী সইতে হয়েছে একাকিত্বের যন্ত্রণাও।

একটা সময়, ইউটিউবেই দেখছিলাম বিধু বিনোদ চোপড়ার একটি সাক্ষাৎকার। যেখানে বিধু বিনোদ বলছেন, প্রোডিউসারদের কথা ছিল প্রয়োজনে নতুন কাউকে নিন কিন্তু আর ডি বর্মন নয়। কতটা হতাশা গ্রাস করেছিল সেই সময় পঞ্চমকে? এক সময় নিজের বাংলোর সামনে যে মানুষটি প্রোডিউসারদের রীতিমতো লাইন লাগাতে দেখেছেন, সেই মানুষটিই মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে যখন মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মানুষজনের কাছে এমন শীতল ব্যবহার পেতে শুরু করেছিলেন? ঘোড়ার মুখ অর্থাৎ আর ডি বর্মনের নিজের মুখ থেকে জানার কোনও উপায় নেই। নিজে কোনও আত্মজীবনী লিখে যেতে পারেননি। তেমন কোনও ডকুমেন্টারি জীবিতকালে পঞ্চমের ওপর তৈরি হয়নি, যা স্রষ্টার যন্ত্রণার কথা প্রকাশ্যে আনবে।

১৯৯৪ সালের ৪ জানুয়ারি যখন আচমকা হৃদ্‌রোগ এই কলাজয়ী সুরস্রষ্টার জীবনে পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিল, তখন ১৯৪২: আ লাভ স্টোরি-র গান রিলিজ হয়নি। আরডি-র মৃত্যুর দিন কয়েকের মধ্যে দূরদর্শনের মেট্রো চ্যানেলে (DD Metro) ‘সুপারহিট মোকাবিলা’য় দেখা গিয়েছিল গ্রামের রাস্তায় সাইকেল চালাতে চালাতে নায়িকা মনীষা কৈরালার প্রেম স্বপ্নে বিভোর অনিল কাপুরের গলায় নব্বইয়ের অন্যতম সেরা রোমান্টিক গান, ‘এক লাড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লাগা’, লাইব্রেরিতে মনীষা কৈরালার সঙ্গে দুষ্টুমি-মাখা ‘রুঠ না জানা তুমসে কহু তো’, বৃষ্টিভেজা নায়ক-নায়িকার গলায় ‘রিমঝিম রিমঝিম’ বা এক আবেগঘন মুহূর্তে কুমার শানুর কণ্ঠে ‘কুছ না কহো’। গানটির ফিমেল ভয়েজ ছিল লতা মঙ্গেশকরের। মনে পড়ে, সে-বছর মাতিয়ে দিয়েছিল গানগুলি। দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে সুদূর মফস্‌সল, এমনকী প্রত্যন্ত গ্রামে চারদিন ধরে বেজেছিল শুধু পঞ্চমের হিন্দি ছবিতে শেষ সৃষ্টিগুলি।

১৯৪২: আ লাভ স্টোরি-র সংগীত পরিচালনার সময় আরডি

সে-বছর রাহুল দেব বর্মন জিতে নিয়েছিলেন সেরা সংগীত পরিচালকের ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার। পুরুষ নেপথ্য কণ্ঠ শিল্পী হিসেবে কুমার শানু লাগাতার পঞ্চম ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার এসেছিল ‘এক লাড়কি কো দেখা তো…’ সৌজন্যে। ফিল্মি ম্যাগাজিন, পত্রপত্রিকা, টিভির পর্দায় আবার পঞ্চমের প্রশংসক গোষ্ঠী হাজির হয়ে গেল। পঞ্চমের অকাল পঞ্চত্বপ্রাপ্তির কারণে মুম্বই ইন্ডাস্ট্রির কী ক্ষতি হল, সেই নিয়ে রুদালি করার লোকজনের অভাব হল না। আর ডি বর্মন অবশ্য ততদিনে এ-সবের থেকে অনেক অনেক দূরে।

বিধু বিনোদ চোপড়াকে অবশ্য এই গোষ্ঠী থেকে একদমই আলাদা রাখা যায়। কারণ কি ১৯৪২: আ লাভ স্টোরি-তে রাহুল দেব বর্মনকে সুযোগ দেওয়ার জন্য? হ্যাঁ, ‘সুযোগ’ শব্দটি সচেতনভাবে ব্যবহার করলাম। কারণ যখন আর ডি বর্মনকে এই সিনেমার জন্য মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে বিধু বিনোদ চূড়ান্ত করেন, তখন শোনা যায় একটি নামজাদা মিউজিক কোম্পানি ফিল্ম মিউজিক বাবদ আগাম রয়্যালটি দিতে পিছিয়ে আসে। তবুও পিছিয়ে আসেননি তিনি। পঞ্চমেই আস্থা রেখেছেন তিনি।

অবশ্য বিধু বিনোদ চোপড়ার সঙ্গে রাহুল দেব বর্মনের এটাই প্রথম কাজ নয়। ১৯৮৯-তে মুক্তিপ্রাপ্ত বিধু বিনোদের পারিন্দা ছবিতে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন রাহুল দেব। ওই ছবিতে সুর করেছিলেন পঞ্চম। আশা ভোঁসলে এবং সুরেশ ওয়াদকারের গাওয়া ‘তুম সে মিলকে অ্যায়সা লাগা’ গানটি রীতিমতো জনপ্রিয় হয়েছিল। মিষ্টি রোমান্টিক নম্বর হিসেবে বহু মানুষ গানটিকে আজও মনে রেখেছেন।

সত্তরের দশকে অসংখ্যবার ফিল্ম ফেয়ার অ্যায়্যার্ডে সেরা সংগীত পরিচালকের জন্য নমিনেশন পেয়েও শেষমেশ সেরার স্বীকৃতি মেলেনি। অথচ এমন অনেক উদাহরণ আছে যে, রাহুল দেবের সুর করা গান গেয়ে নেপথ্য পুরুষ এবং মহিলা শিল্পী হিসেবে অনেক গায়ক-গায়িকা সেরার স্বীকৃতি ফিল্ম ফেয়ারে অর্জন করেছেন। ফিল্ম ফেয়ারে শেষমেশ সেরা মিউজিক ডিরেক্টরের পুরস্কার মিলল আর ডি বর্মনের, ১৯৮৩-তে সনম তেরি কসম ছবিতে সুরারোপ করার জন্য।

তবে অনেকের আশা ছিল ১৯৮১ সালেই পঞ্চমের এই ফিল্ম ফেয়ার ডেডলক ভেঙে যাবে। কারণ ’৮১-তে পঞ্চম সুর দিয়েছিলেন রকি, লাভ স্টোরি, বারসাত কি এক রাত, কুদরত মতো ছবিতে জনপ্রিয় হওয়া গানগুলিতে। যদিও সে-সম্মান জোটেনি রাহুল দেবের। কিন্তু তিরাশির পরের বছর আবার রাহুল দেব বর্মন সেরা সংগীত পরিচালকের সম্মানে ভূষিত হন। এবার মাসুম ছবির জন্য। কিন্তু আশির দশকই পঞ্চমের জন্য সবথেকে বিপর্যয়ের দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। কেন তা হল, সে নিয়ে অনেক শব্দ খরচ করা যায়। কিন্তু স্বল্প শব্দে এই বিপর্যয়কে ব্যাখ্যা করা যায় এইভাবে― বাপ্পী লাহিড়ীর উত্থান, ’৮৭-তে প্রিয় বন্ধু এবং তাঁর সুরে অগুনতি হিট গান উপহার দেওয়া কিশোর কুমারের মৃত্যু, দীর্ঘদিনের সহকর্মী প্রোডিউসার নাসির হোসেনের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় এবং ১৯৮৮-তে আচমকা হার্ট অ্যাটাক ও লন্ডন বাইপাস করতে যাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন মুম্বই শহরে অনুপস্থিতি এবং অবশ্যই আশা ভোঁসলের সঙ্গে মন কষাকষি।

আর ডি বর্মনের সঙ্গে বাপ্পী লাহিড়ী

প্রকৃতপক্ষে ’৮২-তে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ডিস্কো ডান্সার কেবলমাত্র মিঠুন চক্রবর্তীকে নায়ক হিসেবে ভারতে প্রতিষ্ঠা দেয়নি, এই ছবির সংগীত পরিচালক বাপ্পী লাহিড়ীর জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বী করে তুলেছিল। বিশেষত তাঁর ‘ডিস্কো’ মিউজিক। ১৯৮৩-তে আর ডি ফিল্ম ফেয়ার জিতলেও সে-বছর বাপ্পী লাহিড়ী নমক হারাম সিনেমায় সংগীত পরিচালনার জন্য নমিনেশন পেয়েছিলেন। এই ছবির গানগুলি কিন্তু কম জনপ্রিয় হয়নি। পরের বছর আবার পঞ্চম সেরার শিরোপা জিতলেন, কিন্তু বাপ্পীর বেতাব নমিনেশন পেল। আর ১৯৮৫-এর ফিল্ম ফেয়ারে দেখা গেল সেরার মুকুট চলে গেল বাপ্পী লাহিড়ীর মাথায় আর বেস্ট মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে তিনটি ছবির গান নমিনেশন পেল (সেরার স্বীকৃতি পাওয়া শারাবি ছাড়াও বাকি দু’টি নমিনেশন পাওয়া ছবি ছিল কসম পয়দা করনেওয়ালি কি এবং তোফা)। আর ডি বর্মনের জওয়ানি-ও অবশ্য নমিনেশন পেয়েছিল। পরের বছর বাপ্পী লাহিড়ীর সেরা মিউজিক ডিরেক্টর সেকশনে কোনও নমিনেশন না পেলেও আর ডি সাগর সিনেমায় সুরারোপ জন্য নমিনেশন পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু সেরার শিরোপা রবীন্দ্র জৈন নিয়ে গিয়েছিলেন সে-বছর। পরের দুই বছর ফিল্ম ফেয়ার অ্যায়ার্ড সেরিমনি অনুষ্ঠিত হয়নি কিন্তু বক্স অফিসের নিরীক্ষে বাপ্পী লাহিড়ী পিছনে ফেলে দিয়েছিলেন পঞ্চমকে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *