উত্তরা থেকে উত্তরণ: একটি সমষ্টিগত যাত্রা

অভিজিৎ বসু

‘কালো জলে কুঁচলাতলে’ গানটি জনপ্রিয় হওয়ার পর আমি নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। সেখানে বাংলা ঝুমুর, ভাটিয়ালি এবং অন্যান্য লোকসংগীতের প্রদর্শন এবং ক্লাস নেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এটা আমার কাছে বিরাট প্রাপ্তি এবং অবশ্যই সেটা ‘উত্তরা’ ছবিতে গান গাওয়ার ফসল। এর জন্য আমি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ উনিই আমায় ‘উত্তরা’তে গান গাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: হিন্দু পালপার্বণে জামাই ষষ্ঠী বা অরণ্য ষষ্ঠীর তাৎপর্য

আমার একদম প্রথমদিকের প্লেব্যাক একটি মালয়ালম ছবিতে। ১৯৯০ সালে জি. আরাভিন্দনের ‘বাস্তুহারা’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। ছবিটি মালয়ালম ভাষায় কিন্তু কলকাতা-কৃষ্ণনগরের পটভূমিকায় এবং দুই বাংলার রিফিউজিদের নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। নায়ক একজন সরকারি আধিকারিক। ছবিটিতে নীনা গুপ্ত অভিনয় করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে এই ছবিটির জন্য পূর্ববঙ্গের ভাটিয়ালি এবং মারফতি ৩টি গান আমি রেকর্ড করেছিলাম। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর গানগুলি বেশ জনপ্রিয় হয় এবং নতুন, তরুণ প্লেব্যাক হিসেবে আমার পরিচিতি তৈরি হয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আমার গান নিয়ে লেখাও ছাপা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমা কেবলমাত্র চলচ্চিত্রের গুণেই ভাস্বর

এই সময়ে আমার বিশিষ্ট সাংবাদিক বন্ধু বিক্রমণ নায়ার আমাকে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাছে নিয়ে যান। ওনার সঙ্গে সেটাই আমার প্রথম সাক্ষাৎ। তিনি ছিলেন সংগীতরসিক এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি। অবাক বিষয় যে, আমার গান তিনি আগেই শুনেছিলেন। আমায়িক মানুষ। খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। উনি আমার গান খুবই ভালোবাসতেন। উৎসাহ দিতেন। ভালো কবিতাও লিখতেন। বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় ওনার লেখা পড়েছি। নির্দেশক ছাড়াও তিনি ব্যতিক্রমী কবি ছিলেন।

আরও পড়ুন: হিন্দু পালপার্বণে জামাই ষষ্ঠী বা অরণ্য ষষ্ঠীর তাৎপর্য

এরপর আমি প্রথম ওনার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই। প্রথম ‘তাহাদের কথা’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওনার সঙ্গে মোট ৩টি ছবিতে কাজ করেছি। তাহাদের কথা (১৯৯২), চরাচর (১৯৯৩) এবং উত্তরা (২০০০)। সত্যি বলতে প্রথম দু’টি ছবিতে গানকে সেভাবে এক্সপ্লোর করা হয়নি। কিন্তু ‘উত্তরা’তে গানকে ভীষণভাবে এক্সপ্লোর এবং এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছিল। ‘উত্তরা’তে আমি ৩টি গান গেয়েছিলাম। ‘কালো জলে কুঁচলাতলে’, ‘ফুলগাছটি লাগাইছিলাম’ এবং ‘ভালো ঘাটের জল লিবি’। ‘উত্তরা’ ভেনিস পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি। বলতে গেলে আমার প্লেব্যাক অথবা কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যে প্রতিষ্ঠা, তা হয়তো আমি ‘উত্তরা’ থেকেই পেয়েছি। বিশেষত, ‘কালো জলে কুঁচলাতলে’ গানটি ভীষণই জনপ্রিয় হয়েছিল। একটা ছবির ভিজ্যুয়াল অনুযায়ী কোন গান ব্যবহার করা উচিত, সেটা উনি খুব ভালো জানতেন। ‘কালো জলে কুঁচলাতলে’ গানটির সময়ে যে মাস্ক ডান্স (মুখোশপরা নাচ), সেটি উনিই দৃশ্যায়ন করেছিলেন।

আরও পড়ুন: বীরদের নগর আর উলার মেলা

ছবি অনিন্দ্য বর্মন

‘কালো জলে কুঁচলাতলে’ গানটি আমি পেয়েছিলাম রাঢ় বঙ্গে। সেখানে এটাকে ‘পাতা গীত’ বলা হয়। অর্থাৎ চারটি লাইনের গান। আমি সেভাবেই বিভিন্ন পাতা গীত সংগ্রহ করেছিলাম। ব্রিটিশদের সময়ে আমাদের বাংলার ঝুমুর পৌঁছয় আসামে। চা-বাগান শ্রমিকদের সংস্পর্শে এর সঙ্গে অসমের ঝুমুর গান মিশ্রিত হয়ে এই পাতা গীত তৈরি হয়েছিল। আমি এই পুরনো সুরটাকেই পুনর্নির্মাণ করি। যেমন ‘আল কিনারে নাহর গাছে বগা বগা ফুল/ ফুলকে দেখিয়া ছোড়ি ধ্যাচাকে চামড়াইল’ এই লাইনটা একটা খুবই জনপ্রিয় সুর। এই সুরের আদলে আমি তৈরি করেছিলাম ‘কালো জলে কুঁচলাতলে ডুবলো সনাতন/ আজ সাড়া না, কাল সাড়া না, পাই যে দরশন’। এইভাবেই আমি গানগুলি সংগ্রহ করে বুদ্ধদেববাবুকে শোনাই। ওনার ভালো লাগে। পরবর্তীতে এই গানগুলি উনি ‘উত্তরা’ ছবিতে ব্যবহার করেন। উত্তরার বাকি ২টি গান প্রচলিত লোকগীতি। আমার সংগীত নির্মাণকে ইনি বরাবর যোগ্য সম্মান এবং উৎসাহ দিয়েছেন। বুদ্ধদেববাবুর সঙ্গে এরপর আর কখনও কাজ করার সুযোগ হয়নি। তবে একবার ওনার মেয়ের সঙ্গে ‘ওহ’ নামের একটি হিন্দি ছবিতে কাজ করেছি। ওনার মেয়ে ছিলেন ছবিটির সংগীত পরিচালক। ছবিটিতে আমি একটি প্রচলিত ঝাড়খণ্ডী লোকগীতি গেয়েছিলাম।

আরও পড়ুন: এক সমুদ্রকন্যা ও তার সমুদ্র-সুতো তৈরির গল্প

ছবি অনিন্দ্য বর্মন

বুদ্ধদেববাবু কেমন নির্দেশক ছিলেন, তা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। আমি সংগীতের মানুষ। তবে এটুকু বলতে পারি যে, বাংলার শ্রেষ্ঠ নির্দেশক সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিনহা এবং মৃণাল সেন-পরবর্তী সময়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত নিজস্ব একটা ঘরানা তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাঁর চিন্তাভাবনা এবং দৃশ্যের বাস্তবায়ন সমসাময়িক অন্যান্য নির্দেশকের থেকে ভিন্ন ছিল। ভারতবর্ষ ছাড়াও পৃথিবীর বহু দেশে তার ছবি বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে। সংগীতের ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে উত্তরাতে কাজ করেছেন, সেটা আশ্চর্যের এবং তারিফযোগ্য। পটভূমি নির্মাণ, দৃশ্যায়ন, আবহ নির্মাণ এবং এই সকল কিছুকে তিনি একত্র করতে পেরেছিলেন। বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণের সময়ে ওনার সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল। ওনার আকস্মিক প্রয়াণে আমরা ভিন্ন ধারার ছবি এবং সংগীতের ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হলাম।

অভিজিৎ বসু একজন সংগীত শিল্পী, সংগীত শিক্ষক, সংগীত পরিচালক, লোকগান সংগ্রাহক ও গবেষক। প্লেব্যাক শিল্পী হিসাবে কাজ করেছেন বহু সিনেমায়। সুরকার এবং গীতিকার হিসাবেও বহু ছবিকে ঋদ্ধ করেছেন তিনি। তাঁর গান যেন ‘সোঁদা মাটির নোনা জলে’র গন্ধে ম-ম করে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *