Latest News

Popular Posts

পিকাসোর আলো, পিকাসোর অন্ধকার

পিকাসোর আলো, পিকাসোর অন্ধকার

চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

জন্মের পর পারিপার্শ্বিকের মর্মে থেকে আমাদের বড় হওয়ার, চেতন হওয়ার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। আমরা এক দৃশ্যময়, শব্দময় চলিত জগৎ দেখি এবং অনুকরণ করার চেষ্টা করতে থাকি। একজন শিল্পীর অবজারভেশনের পদ্ধতি কিন্তু ওইখান থেকেই শুরু হয়ে যায়। সে ক্রমাগত দেখে এবং চোখের এক মূল্যবান ক্যামেরার মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে থাকে দৃশ্যপটের অভিজ্ঞতাসমূহ। পরবর্তী জীবনে সেইসব দৃশ্যেরই প্রকাশ ঘটান নতুন একেকটি দৃশ্যে, প্রত্যক্ষ দৃশ্যের সঙ্গে মেশে মানস-অবলোকন। এভাবেই জন্ম নেয় শিল্পের সন্তান।

আরও পড়ুন: ৭৮ বছর পরেও আলোচনার বৃত্তে নেই রানি অফ ঝাঁসি ব্রিগেড

প্রায় প্রত্যেক শিশুই হয়তো প্রারম্ভিক শৈশবে যখন আপ্রাণ চেষ্টা করে শব্দ আয়ত্ত করতে, তখন সে যে শব্দটিকে প্রথম আশ্রয় করে, সেটি হল ‘মা’, কিন্তু আজ থেকে বহু বছর আগে, ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর জন্ম নেওয়া একটি শিশু প্রথম যে শব্দ শিখল তা হল ‘পিজ’, স্প্যানিশ শব্দ ‘লাপিজ’ থেকে ‘পিজ’, অর্থ পেন্সিল। এই ছেলেটির পরবর্তী জীবন যে শিল্পের রাস্তায় বেঁকে যাবে, তা  হয়তো শিশুকালের এই ইঙ্গিতপূর্ণ ঘটনা থেকেই বোঝা যায়।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৩)

আমরা বেশিরভাগ শিল্পপ্রেমী মানুষই পিকাসোকে চিনি তাঁর বৈভবের আস্তরণে… পৃথিবী বিখ্যাত শিল্পী, ধনী, অহংকারী ও বিলাসী, যার একেকটা ছবি বিক্রি হয় শতকোটি টাকায়, তাঁর জীবনে কষ্টই বা কী? লড়াই-ই বা কী? সাফল্যের যে চূড়ায় তাঁর রথটি গিয়ে পৌঁছেছে, সেই চলে যাওয়ার পথে হয়তো গোলাপের পাপড়ি বিছানো। আমরা যদি ওই আলোকবর্তিকার আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া অন্ধকার পথটার গল্প শুনি, হয়তো-বা চোখে জল আসবে। একটা সময় ছিল যখন এই পিকাসোই পাগলের মতো ছবি এঁকে যাচ্ছেন, অথচ ছবির বিক্রি নেই, ঘরে একদানা খাবার নেই, শীতের বরফঠান্ডা হাওয়া থেকে বাঁচতে এককুচি আগুন নেই। কখনও খিদের জ্বালায় ছবি নিয়ে ব্যবসায়ীদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন, ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছেন অনাহার নিয়ে, কখনও রং ফুরিয়ে যাওয়ার জন্য মনোমতো ছবি শেষ করতে পারছেন না, আবার কখনও কবি বন্ধু ম্যাক্স জেকবের একচিলতে আস্তানায় অদ্ভুত জীবন কাটাচ্ছেন। দিনেরবেলা জেকব কাজে বেরিয়ে গেলে সেই সময়টা ঘুমিয়ে নিচ্ছেন আর সারারাত ছবি আঁকছেন। তা না করে উপায় নেই। কারণ বিছানা তো একটাই। সেটা জেকবকে রাতে ছেড়ে দিতে হবে বিশ্রামের জন্য। এও আরেক পিকাসো। আমরা যখন তাঁর সুপ্রতিষ্ঠিত জীবন দেখি, তার বৈভব দেখি, তখন তার আড়ালে এই ভয়ংকরতম লড়াইয়ের কাহিনি চাপা পড়ে যায়।

আরও পড়ুন: বনলতা সেন: ক্লান্ত ও বিষণ্ণ প্রেমিকের শোকগাথা

দিনের পর দিন গেছে, পিকাসো একটিও ছবি বিক্রি করে গ্রাসাচ্ছাদনের কোনও ব্যবস্থা করতে পারেননি। ছবি ব্যবসায়ীদের দরজায় ঘুরেছেন ছবি নিয়ে। প্রদর্শনী থেকেও আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। অথচ জীবনের প্রথমদিক থেকেই পিকাসোর ছবি যথেষ্ট পরিণত। খুব কম বয়সেই তিনি আয়ত্ত করেছেন গ্রেট আর্টিস্টদের দক্ষতা। তাঁর ড্রয়িং, রঙের ব্যবহারের মুনশিয়ানা, পরিপাটি কম্পোজিশন রচনা… এসবের তো অভাব ছিল না। তবে কেন তাঁকে নিদারুণ দারিদ্র্য বহন করতে হয়েছে সুদীর্ঘকাল? বন্ধুবান্ধব শুভানুধ্যায়ীদের দয়ায় দিন কেটেছে। কখনও আধপেটা খেয়েছেন। কখনও কেটেছে অনাহারে। কিন্তু একদিনের জন্যও কাজ বন্ধ করেননি। ভয়ংকর শীত, চরম প্রতিকূল আবহাওয়া দেখলে পিকাসো বলতেন, ‘আমার পরীক্ষা নিচ্ছে’। সত্যিই এ-এক কঠোর পরীক্ষা। সাফল্য সেই পায়, যার পা কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত। ফুলের বাগান পেরিয়ে স্বর্গের সিঁড়ি চড়া যায় না। সেখানে যাওয়ার রাস্তা নরকের মর্মস্থল দিয়ে। সব সফল মানুষকেই এই মূল্য দিয়ে যেতে হয়, পিকাসোকেও দিতে হয়েছে।

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *