‘পকেট হারকিউলিস’ হার মেনেছিলেন

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

তখনো আমার উচ্চতা সেই-ই প্রায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, বুকের ছাতি ৩২ ইঞ্চি, কিন্তু বাইসেপের মাসুল মানে muscle ফোলাতে পারতাম না। বইয়ের বাইরের জগৎকে দেখতে শিখলাম যখন কলেজের ক্লাশের শেষে বন্ধুর হাম্বার সাইকেলের রডে বসে যেতে শুরু করলাম খেলার মাঠের দর্শকাসনে অথবা রেল কলোনির হার্ভে ইন্সটিটিউটের জিমন্যাসিয়ামে। মামার বন্ধু ‘বীরেনদা’, কাকার বন্ধু ‘জয়দেবদা’— এঁরা দুয়ো দিলেও আমাকে আমন্ত্রণ জানাতেন ‘ব্যাম’-এর ক্লাশে চলে আসতে। (তবু ব্যামের ক্লাশে নাম লেখাইনি) অথচ সেই আমাকেই কিনা লিখতে হচ্ছে এক ব্যায়ামবীরের স্মৃতিচর্চা!

১৯৭৩/৭৪ সাল নাগাদ বিস্ময়চোখে প্রথম চাক্ষুষ করি এক ‘বিশ্বশ্রী’ বা ‘Mr. Universe’-কে। তিনি মনোহর আইচ— যাঁর উচ্চতা ছিল মাত্র ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি, ছাতি ৫৪ ইঞ্চি, কোমর ২৩ ইঞ্চি। সেই বিস্ময় দর্শনের গল্পে শেষে ঢুকব।

আরও পড়ুন: বিশ্ব সাহিত্যে চার চিকিৎসক ও বর্তমান অতিমারি

চিত্র সূত্র: safetyalert.weebly.com

কিংবদন্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইউ এন (উপেন্দ্রনাথ) ব্রহ্মচারীর নাতি ছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিক— তাঁর কাছেই গল্প শুনেছিলাম যে, মনোহর আইচের মতো ব্যায়ামবীর কিশোর বয়সে ‘কালাজ্বর’-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তিনি ইউ এন ব্রহ্মচারীর বিখ্যাত ‘ইউরিয়া স্টিবামাইন’ দ্বারা চিকিৎসার সুফল পেয়েছিলেন।

এই কিশোর যে পরবর্তীতে বহুবর্ণে রঙিন হয়ে উঠবেন, সে-কথা ভাবাই যায়নি। তবু নেহাৎ মনের দৃঢ়তা আর অধ্যবসায় সম্বল করে তিনি দেহসৌষ্ঠবের সাধনায় সফলতা লাভ করতে থাকেন। তিনি ব্যায়ামচর্চার পাশাপাশি কুস্তি ও ভারোত্তোলনে অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেতে থাকেন।

‘দ্য আউটলুক’ পত্রিকায় প্রকাশিত (১২ জুন,২০১৬) হরেশ পান্ড্য’র প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ১৯৫১ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম এশিয়ান গেমস, ১৯৫৪-এর দ্বিতীয় এশিয়াড (ম্যানিলা) এবং ১৯৫৮ সালে টোকিও-র তৃতীয় এশিয়াডে অপেশাদার ভারোত্তোলনে তিনি সুবর্ণপদক লাভ করেছিলেন।

আরও পড়ুন: হাতুড়ি

Mr. Universe-এর লড়াইয়ে অংশ নিতে ১৯৫১ সালে তিনিও লন্ডনে যান, কিন্তু সে-বছর প্রথম বাঙালি তথা এশীয় হিসেবে ভারতের প্রতিনিধি মনোতোষ রায় বিশ্বশ্রী বা Mr. Universe-এর খেতাব অর্জন করেন। মনোহর আইচ রানার-আপ হন।

জিদ আর অধ্যবসায়ের পরীক্ষায় পিছোতে চাননি মনোহর— তিনি ব্রিটিশ রেলওয়েজের চাকরি নিয়ে ব্রিটেনে থেকে গেলেন। পরের বছর ১৯৫২ সালে তিনি দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে বিশ্বশ্রী বা Mr. Universe-এর মুকুট নিজ শিরে ধারণ করেন। ১৯৫৫ ও ১৯৬০ সালেও বিশ্বশ্রী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অধিকার করেন।

অথচ এসবের আগেই ১৯৫০ সালে তিনি আন্তর্জাতিক Mr. Hercules প্রতিযোগিতায় সেরার মুকুটটি ছিনিয়ে এনেছিলেন। এবং ১৯৫২ সালেই তিনি Moniker Pocket Hercules উপাধি অর্জন করেন। আর সেই সময় থেকেই তাঁর পরিচিতিতে জড়িয়ে যায় নতুন নাম পকেট হারকিউলিস।

বর্ণচ্ছটায় এই ব্যায়ামবীরের জুড়িমেলা ভার। ব্রিটিশ কলোনিয়াল এয়ারফোর্সে যোগ দিয়েছিলেন এবং প্রতিবাদ করার জন্য কোর্ট মার্শালের রোষে পড়েন। অন্যদিকে, কিংবদন্তি জাদুকর পি সি সরকারের ম্যাজিক ট্রুপে কাজ করেছেন, কণ্ঠনালির চাপে বর্শা বাঁকানো, ধারালো তরবারির সূচ্যগ্রে পেট রেখে শুয়ে ব্যালান্স দেখানো ছিল তাঁর সেরা শিল্প। লন্ডনে ব্রিটিশ রেলওয়েজে চাকরি করেছিলেন। অন্যদিকে, ১৯৬০-এর দশক থেকে সার্কাস দলেও তাঁর অসামান্য শরীরি জাদু দেখানোতে মগ্ন ছিলেন।

আরও পড়ুন: ইসরাইল-প্যালেস্তাইন সংঘাত, একপেশে মিডিয়া

আবার এই লোকই ১৯৯১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে দাঁড়িয়ে হারেন, তবু ২০০০ সালের পর আবার প্রার্থী হবার স্বপ্ন দেখেছিলেন!

এই লেখা প্রায় শেষ। এবার প্রবেশ করি সেই বিস্ময় দর্শনের স্মৃতিতে। প্রায় ৪৭/৪৮ বছর আগে ‘ভারত সার্কাস’-এর তাঁবুতে দেখেছিলাম ‘পকেট হারকিউলিস’-এর বিস্ময়কর শরীরি খেলাগুলো। সার্কাসে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল লম্বা মোটা লোহার রডের একপ্রান্ত বুকে ঠেকিয়ে অন্যপ্রান্ত মাটিতে গেঁথে একবারে বাঁকিয়ে ফেলা অথবা  রডের দুই প্রান্তে কয়েকশো কেজি ওজনের লোহার চাকা একদমে মাথার ওপর তুলে ধরা। আজ মনে পড়ে না মোট কত কেজি ওজন, তবে তিনি প্রচারে এবং শো-এ প্রতিদিন চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করতেন যে, এই পরিমাণ ওজনের ভারী ‘বারবেল’ যদি কেউ ওঠাতে পারেন তবে তাঁকে ১০০০ টাকা (সেই সময়ের অর্থমূল্যে অনেক বেশি) চ্যালেঞ্জমানি বা পুরস্কার দেবেন।

বারংবার এই প্রচার শুনতে শুনতে জেদ লেগেছিল রানাঘাটের হার্ভের সদস্য তথা বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন ওয়েটলিফটার জয়দেব সাধুখাঁর। তিনি মহকুমা প্রশাসনকে রাজি করিয়ে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। এক নির্ধারিত দিনের সান্ধ্য শো-এ মহকুমা শাসক সহ অন্য প্রশাসনিক প্রধানদের উপস্থিতিতে অংশগ্রহণ করেন। (শ্রীসাধুখাঁর আমন্ত্রণে আমিও এই অবিস্মরণীয় ঘটনা চাক্ষুষ করেছিলাম) জয়দেবদা প্রথমেই ব্যাখ্যা করেন যে, শ্রীআইচ তাঁর উচ্চতা অনুসারে বারবেলটি তৈরি করিয়েছেন, যেটা সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার লোকের পক্ষে ন্যুব্জ হয়ে তোলা কষ্টকর। তবু তিনি এটা তুলে দেখাবেন, শুধু শর্ত যে আর কোথাও কখনো কোনো শো-এ শ্রীআইচ চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না— এই অঙ্গীকার করতে হবে।

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

গ্যালারি ভর্তি দর্শকদের অবাক করে দিয়ে জয়দেব এক সুযোগেই সোজা সেই বারবেল ভূমি থেকে মাথার ওপর তুলে ধরেন। প্রত্যেকে সহাস্য করতালিতে তাঁকে অভিনন্দিত করেন। প্রবীণ ভারোত্তোলক এসে জড়িয়ে ধরেন নবীনকে আর নবীন সাষ্টাঙ্গে প্রণতি জানান ভারতগর্ব বিশ্বশ্রীকে। শ্রীসাধুখাঁ যেহেতু অপেশাদার, তাই চ্যালেঞ্জমানি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। কিন্তু শংসাপত্র ও শ্রীআইচের অঙ্গীকারপত্র হস্তগত করতে ভোলেননি। সেই দৃশ্য আজো অমলিন।

Mr. Universe মনোহর আইচ এই পৃথিবীতে ১০৪ বছর বসন্ত প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ২০১৬ সালের ৪ জুন মহাপ্রস্থানের পথে গেলেন বিশ্ব মুষ্টিযুদ্ধের সর্বকালের সেরা ‘দি গ্রেটেস্ট’ ক্যাসিয়াস ক্লে (মহম্মদ আলি)। ঠিক তার পরের দিনই (৫-৬-২০১৬) প্রয়াত হন ‘পকেট হারকিউলিস’ বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ। আজ তাঁর স্মরণ দিবস।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *