পাবলো নেরুদার কবিতা

অনুবাদ: জুয়েল মাজহার

জলপরি ও মাতালদের কাহিনি

ঘরটিতে মরদেরা জুটেছে সবাই, তখুনি ভেতরে এসে
ঢুকল সে পুরো বিবসনা।

মদ খেতে খেতে ওরা ছিটাতে লাগল ওর সারা গায়ে থু-থু।
নদী থেকে সবে উঠে আসা, ও ছিল সরল আলাভোলা।
ও তো এক জলপরি পথ ভুলে এসেছে এখানে।
ঝলোমলো অঙ্গে ওর বিদ্রূপের তুবড়ি গেল বয়ে।
খিস্তিতে-খিস্তিতে ওর হেমস্তন নোংরা-আবিল।
কান্না কাকে বলে ওর জানা নেই, চোখে তাই অশ্রু গড়াল না।

পরিধেয় কাকে বলে জানত না, সে-কারণে ছিল বিবসনা।
সিগারেটে-ছ্যাঁকা দিয়ে, বোতলের পোড়া ছিপি দিয়ে ওকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে
সরাইয়ের মেঝেজুড়ে গড়াগড়ি খেলো ওরা ইতর হাসিতে।

সুদূর প্রেমের রঙে সেজেছিল ওর দু’নয়ন;
ওর জোড়া বাহু যেন দুধশাদা পোখরাজে গড়া।
শব্দহীন জোড়া ঠোঁট কেঁপে উঠল প্রবালের গোলাপি আভায়;
আর সেই দরজাপথে হঠাৎই সে বাইরে হারাল।

নামল নদীতে যেই, জলে ধুয়ে গেল সব আবিলতা চোখের পলকে।
তুলল ঝিলিক ফের দেহ তার; বৃষ্টিঘোরে যেন কোনও শ্বেত মর্মর।
তাকাল না একবারও পিছু ফিরে; —দিল সে সাঁতার
ভেসে গেল শূন্যতার পানে শুধু, ভেসে গেল নিজেরই মৃত্যুতে।

[Fable of the Mermaid and the Drunks; by Pablo Neruda]

আরও পড়ুন: প্যানকেকগুলি

পাবলো নেরুদা (Pablo Neruda)

আসল নাম রিকার্দো এলিয়েসার নেফতালি রেইয়েস বাসোয়ালতো (Ricardo Eliecer Neftalí Reyes Basoalto)। চিলে (Chile)-র কবি ও রাজনীতিবিদ। রুবেন দারিওর পর লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি।

জন্ম দক্ষিণ চিলের পাররাল শহরে, ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই। মৃত্যু ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। পাবলো নেরুদা তাঁর ছদ্মনাম হলেও পরে তা আইনি বৈধতা পায়। ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন কৈশোরে। এর পেছনে ছিল দু’টি কারণ; প্রথমত, ছদ্মনাম গ্রহণ ছিল সে যুগের জনপ্রিয় রীতি বা চল; দ্বিতীয়ত, এই নামের আড়ালে তিনি তাঁর কবিতাগুলিকে তাঁর বদরাগী, ক্রোধান্ধ পিতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। অলাভজনক, অজাগতিক কাজের বিরুদ্ধে সদা খড়্গহস্ত ছিলেন তাঁর পিতা। সবসময়ই চাইতেন কবিতা-টবিতা লেখা, বনের মোষ তাড়ানোর মতন ‘ফালতু’ কাজ না করে যেন তার পুত্রধন আর দশটা ‘ভালো ছেলের মতন’ কোনও ‘ব্যবহারিক’ পেশা বেছে নেয়।

নেরুদা নামটির উৎস চেক লেখক ইয়ান নেরুদা (Jan Neruda)। এবং পাবলো নামটির সম্ভাব্য উৎস ফরাসি কবি পল ভেরলেন।

পাবলো নেরুদার জীবন ছিল কবিতায় সমর্পিত। কবিতার জন্য পুরোপুরি উৎসর্গীকৃত; এতটাই যে, ১৯২৩ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই Crepusculario (Twilight) প্রকাশ করার মতন কোনও টাকাকড়ি ছিল না হাতে। তাই টাকার জন্য বেচে দিয়েছিলেন একান্ত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র।

পরের বছর ‘Twenty Love Poems and a Song of Despair’ বইয়ের জন্য একজন আগ্রহী প্রকাশক খুঁজে পান। বইটি প্রকাশিত হওয়ামাত্র নেরুদা বনে যান সেলিব্রেটি; আর সেইসঙ্গে কবিতাকে আরও সময় দেবার জন্য ছেড়ে দেন পড়াশোনা।

মাত্র কুড়িবছর বয়সেই কবি হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়ে যান নেরুদা। তাঁকে বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক বলে মনে করা হয়। বিশ্বের প্রায় সব ভাষায় তাঁর রচনা পঠিত-অনূদিত। গদ্য ও কবিতা মিলিয়ে সংখ্যায় বিপুল তাঁর সৃষ্টিকর্ম; একইসঙ্গে কালজয়ী।

আরও পড়ুন: জয়া মিত্রের ‘যাত্রাপুস্তক’

হ্যারল্ড ব্লুম (Harold Bloom) তাঁর ‘প্রতীচ্য কানুন’ (The Western Canon) বইতে ‘প্রতীচ্য-ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু’ ২৬ জন ব্যক্তির তালিকা করেন, তাতে নেরুদার নামটিও ছিল।
নেরুদার সাহিত্যকর্মে নানারকম প্রকাশশৈলী, ধারা ও ঘরানা এসে একতারে মিলেছে। একদিকে যেমন লিখেছেন ‘টোয়েন্টি পোয়েমস অফ লাভ অ্যান্ড আ সং অব ডেসপায়ার’-এর মতো আসঙ্গলিপ্সু, প্রণয়কাতর, কামমোহঘন কবিতা, তেমনি লিখেছেন পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, আত্মজীবনীমূলক গদ্য, এমনকী প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইশতেহারও।

প্রায়শই লিখতেন সবুজ কালিতে; সবুজ ছিল আশা ও ব্যক্তিগত মনোবাসনা প্রকাশের প্রতীক।

জীবদ্দশায় নেরুদা একাধিক কূটনৈতিক পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর সুদীর্ঘ কূটনীতিক-জীবনের শুরু ১৯২৭ সালে। মায়ানমারে (তৎকালীন বার্মা) অনারারি কনসাল হিসেবে কাজ করার পর ১৯৩৩ সালে তাঁকে চিলের কনসাল করে পাঠানো হয় আর্হেন্তিনা (আর্জেন্টিনা)-র বুয়েনোস আইরিসে (Buenos Aires)। সে সময় আর্হেন্তিনা সফরে যান স্পেনের কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। সে-সুবাদে লোরকার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয় তাঁর।

পরের বছর বদলি হয়ে যান লোরকার দেশ স্পেনের মাদ্রিদে, কবি গাব্রিয়েলা মিস্ত্রালের স্থলাভিষিক্ত হয়ে। সেখানকার প্রাণবন্ত সাহিত্যিক বাতাবরণের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন; বন্ধুত্ব হয় অনেক বিশ্ববিশ্রুত কবি-লেখকের সঙ্গে; (আর লোরকার সঙ্গে বন্ধুত্বটি হয় গাঢ়তর) যাঁদের মধ্যে ছিলেন রাফায়েল আলবের্তি ও পেরুভীয় কবি সেসার বাইয়েহো-সহ অনেকেই। সেখানে স্প্যানিশ লেখক মানুয়েল আলতোলাগিররের (Manuel Altolaguirre) সঙ্গে মিলে ১৯৩৫ সালে ‘কাবাইয়ো ভেরদে পারা লা পোয়েসিয়া’ (Caballo verde para la poesîa) নামে বের করেন একটা সাহিত্য-সমালোচনা পত্রিকা।

আরও পড়ুন: ছোট ছোট দুঃখকথা

১৯৩৬ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে লেখালেখি ও রাজনৈতিক কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এই ভয়াবহ, করাল, রক্তাক্ত আর বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা লিপিবদ্ধ করেন নেরুদা ১৯৩৭ সালে তাঁর ‘হৃদয়ে স্পেন’ (Espana en el Corazone) বইতে। ওয়ার ফ্রন্ট থেকে প্রকাশিত সেই বইতে নেরুদা ফালাঙ্গিস্তদের হাতে তাঁর কবিবন্ধু ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার হত্যাকাণ্ডের কথাও লিখেছেন।

পরের বছর চিলেতে ফিরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন; বিপুল উদ্যমে শুরু করেন লেখালেখি। এর পরের বছর চিলের কনসাল হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য চলে যান মেহিকোতে। চার বছর পর ১৯৪৩ সালে চিলেতে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে সিনেটর নির্বাচিত হন।

চিলের রক্ষণশীল, দমনবাদী গনসালেস ভিদেলার (González Videla) সরকার মার্কিন সম্রাজ্যবাদের মদদে চিলে থেকে কমিউনিজমের মূলোৎপাটনে নামে। নেরুদাও কোপানলের শিকার হন। তারা কমিউনিজমকে নিষিদ্ধ এবং নেরুদাকে সিনেট থেকে বহিষ্কার করে তাঁর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অগত্যা ইয়ার-বন্ধুরা তাঁকে চিলের (চিলির) ভালপারাইসো বন্দর-লাগোয়া একটি বাড়ির বেজমেন্টে মাস কয়েকের জন্য লুকিয়ে রাখেন। পরে নেরুদা কোনওমতে গ্রেপ্তার এড়িয়ে মাইহে হ্রদঘেঁষা (Maihue Lake) পার্বত্য গিরিপথ ধরে পালিয়ে যান আর্হেন্তিনায় (Argentina)। আত্মগোপনে থাকার সময়ই ১৯৫০ সালে নেরুদা তাঁর অমর কাব্য ‘কান্তো হেনারাল’ (Canto general) প্রকাশ করেন। ১৯৫২ সালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা উঠে যাবার পর ফিরে আসেন চিলেতে। এর পরের দু-দশকে নিজের জনবান্ধব ভূমিকা ও বিপ্লবী চেতনার কবিতা লিখে পান ‘জনগণের কবি’ অভিধা। নেরুদা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সালভাদর আইয়েন্দের ঘনিষ্ঠ সহকারীতে পরিণত হন।

১৯৫০ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও পান। এসবের মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক শান্তিপুরস্কার (১৯৫০), লেনিন শান্তিপুরস্কার (১৯৫৩) এবং ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তার প্রসঙ্গ টেনে নিন্দুকেরা তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়েও বিতর্ক তোলে।

কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস নেরুদাকে অভিহিত করেন: ‘বিশ শতকের যে কোনো ভাষার (মানদণ্ডে) শ্রেষ্ঠ কবি’।

নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করে চিলিতে ফিরলে প্রেসিডেন্ট সালভাদর আইয়েন্দে জাতীয় স্টেডিয়ামে (এস্তাদিও নাশিওনাল) ৭০,০০০ লোকের উপস্থিতিতে সংবর্ধনা দেন তাঁকে।

চিলেতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআই-এর প্রত্যক্ষ মদদে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অগুস্তো পিনোচেতের (Augusto Pinochet) নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এর পরপরই পিনোচেত-বাহিনী ইসলা নেগ্রায় (Isla Negra) তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তাঁকে হয়রানি করে। এ ঘটনার পর নেরুদা যে উক্তি করেছিলেন তা এখনও উদ্ধৃত হয়: “Look around—there’s only one thing of danger for you here—poetry.”

আরও পড়ুন: ‘গুলিনদা’র জন্ম শতবর্ষ

প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। তিন দিন পরেই, পিনোচেতের ক্ষমতা-দখলের ঠিক ১২ দিনের মাথায়, ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চিলের সান্তিয়াগোতে কথিত ‘হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে’ মৃত্যু হয় তাঁর। নেরুদার এই মৃত্যু ছিল রহস্যঘেরা। ‘প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত নেরুদার মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে’ বলা হলেও অভিযোগ আছে, স্বৈরাচারী পিনোচেত সরকার তাঁকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগে হত্যা করে। পিনোচেত জনসমক্ষে নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজনের অনুমতিটুকু পর্যন্ত দেননি; জীবন্ত কিংবদন্তি নেরুদার মৃত্যুতে তাই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন হয়। প্রকাশ্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজনের অনুমতি না পেলেও হাজারে হাজারে শোকার্ত চিলিয়ান সেদিন কারফিউ ভেঙে পথে-পথে ভিড় জমায়। পাবলো নেরুদার গণ-অন্ত্যেষ্টি চিলের খুনে-সামরিক একনাকতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম গণপ্রতিবাদে রূপ নেয়।

সেদিন নেরুদার নিজের কবিতার ভাষাই যেন হয়ে উঠেছিল দ্রোহের গান ও আগুন: “To feel the love of people whom we love is a fire that feeds our life.”

জুয়েল মাজহার জন্ম ১৯৬২ সালের ২০ জানুয়ারি। নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়ায়। পিতা মুকদম আলি, মা বেগম নূরজাহান (সরু)। দু’জনই প্রয়াত। বন্ধু শিরিন সুলতানা ও পুত্র অর্ক মাজহারের সঙ্গে থাকেন ঢাকায়। পেশা সাংবাদিকতা। কৈশোরে নিরুদ্দেশযাত্রা। দীর্ঘ ভবঘুরে জীবন। যৌবনের একটা বড় অংশ কেটেছে বৃহত্তর সিলেটের পাহাড়ে। বিশেষত হবিগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারে। ঘৃণা করেন বৈষম্য, জাতিবৈর, সকল প্রকারের অন্ধতা। ঘৃণা করেন পৃথিবীকে খণ্ডক্ষুদ্র-করে-দেওয়া সীমান্ত নামের ‘খাটালের বেড়া’। লেখেন মূলত কবিতা। কালেভদ্রে সাহিত্যশিল্প বিষয়ে গদ্যও লেখেন। বিচিত্র বিষয়ে প্রচুর অনুবাদও করেন ইংরেজি থেকে বাংলায় আর বাংলা থেকে ইংরেজিতে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *