কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমা কেবলমাত্র চলচ্চিত্রের গুণেই ভাস্বর

অনুপম মুখোপাধ্যায়

চলে গেলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। তিনি সেই বিরল কয়েকজন পরিচালকের একজন ছিলেন যাঁদের ক্ষেত্রে সেলুলয়েডে কবিতার প্রসঙ্গটা বারবার ফিরে আসে। একটা কথা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চলে যে, বুদ্ধদেব আগে একজন কবি ছিলেন, তারপর একজন চিত্রপরিচালক। ঘটনা হল, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত অবশ্যই একজন কবি ছিলেন। কিন্তু সে-কারণে তাঁর কবি পরিচয়কেই যে সর্বাগ্রে আমাদের ধরতে হবে, এমন কোনও ব্যাপার সম্ভবত নেই। এটাই ঘটে, যখন একজন কবি তাঁর উপন্যাস লেখেন, যখন একজন কবি ছবি আঁকতে যান। তখন সেই উপন্যাসে আর ছবিতে কবিতার ইশারাগুলো খুঁজতে চাওয়া হয়, তাঁদের উপন্যাস লেখার বা ছবি আঁকার দক্ষতাকে অতিক্রম করে। এটা মনে হয় ঠিক নয়। এই প্রবণতা ভুল মূল্যায়নের সম্ভাবনাকে অনেক বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন: ছাঁকনি

বিদেশেও কবিরা সিনেমা বানিয়েছেন। খুব বিখ্যাত উদাহরণ হিসাবে আমরা পিয়ের পাওলো পাসোলিনির কথা ভাবতে পারি। এটাও ঘটনা যে, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর সিনেমা দেখতে গিয়ে আমার কোথাও খুব অজ্ঞাত কোণে পাসোলিনিকে মনে পড়ে। রায়-সেন-ঘটকের যে নির্মাণশৈলী, তার থেকে বুদ্ধদেবের সিনেমার প্রচুর পার্থক্য। বুদ্ধদেবের চলচ্চিত্রে আগাগোড়াই স্বপ্ন আর বাস্তবের একটা লেনদেন চলতে থাকে। এই স্বপ্ন বা জাদুময় দিকটার জন্যই তাঁর সিনেমা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমাদের মধ্যে অনেকে তাঁর সিনেমাটিক গুণের তুলনায় কাব্যিক সুষমা নিয়ে বেশি কথা বলেন। ঘটনা হল, বুদ্ধদেব তাঁর কবি পরিচিতি থেকে সিনেমায় যদি বাড়তি কিছু যোগ করেও থাকেন, তা হয়েছে সিনেমার পথেই।

সিনেমার মধ্যে এমন কোনও কিছুর উপস্থিতিই সম্ভবত খুব কাঙ্ক্ষিত নয় একজন পরিচালকের কাছে যেটা সিনেমাকে খাটো করতে পারে, অন্য কোনও অনুষঙ্গের অবতারণা করে। কবিতা হল যেকোনও কিছুর মূল নির্যাস। সম্ভবত পৃথিবীতে এমন কোনও কিছুর অস্তিত্ব সম্ভবই নয়, যা তার মূল ভিত্তিভূমিতে গিয়ে কবিতার হয়ে কথা বলে না। পলিটিক্সের মধ্যে, ক্রিকেটের মধ্যে, এমনকী কুস্তির মধ্যেও কবিতা আছে, কবিতার গুণ আছে। কারণ কবিতাই হল বিশ্বচরাচরের সারবস্তু। প্রত্যেক শুক এবং সারি শেষ অবধি কবিতার দাঁড়েই দোল খায়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমাও কোনও ব্যতিক্রম নয়। তাঁর নির্মাণের মূলেও কবিতা আছে। দেখতে গেলে জাঁ লুক গোদার কিংবা কোয়ান্টিন টারান্টিনোর সিনেমাও কি তাদের ভিত্তিভূমিতে গিয়ে কবিতার পিপাসা জাগিয়ে তোলে না?

আরও পড়ুন: জেরুসালেম

কিন্তু বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার কবিতার প্রসঙ্গ তোলাটাকে আমার একরকম মুদ্রাদোষ বলেই মনে হয়। একটা চরম গদ্যময় ডকুমেন্টরি বা একটা চরম অসামাজিক ব্লু-ফিল্মও তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে গিয়েও কবিতার কথা বলতে থাকে, সেটাই স্বাভাবিক। যেকোনও কিছু সৃষ্টি করতে গিয়েই একজন স্রষ্টাকে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে কবিতার ভিত্তিভূমিটিকে তিনি প্রকট করবেন, নাকি প্রচ্ছন্ন রাখবেন। বুদ্ধদেবের ক্ষেত্রে যে সেই ভিত্তিভূমি বারবার প্রকট হয়েছে, এ তাঁর কোনওরকম সিনেমাটিক ব্যর্থতা নয়, এ তাঁর সিনেমাটিক বৈশিষ্ট্য এবং সিদ্ধান্ত।

শেষে একটাই কথা বলার, আজ এই ১০/০৬/২০২১ তারিখে বাংলা চলচ্চিত্র আরও দীন হল। এমন একজন পরিচালক চলে গেলেন, যিনি আজীবন শিল্পের মেরুদণ্ড সোজা রেখে কাজ করে গেছেন। আপস করেননি। বলিউডের শিল্পীদের নিজের সিনেমায় নিয়েছেন, হয়তো বিপণনের সুবিধার্থেই নিয়েছেন, কিন্তু সেই শিল্পীদের দিয়ে জীবনের অন্যতম সেরা কাজটাও করিয়ে নিয়েছেন। মিঠুন চক্রবর্তী যে অভিনয় করতে পারেন, সেটা সম্ভবত ‘তাহাদের কথা’-ই প্রমাণ করেছিল। ‘আনোয়ার কা আজিব কিস্যা’ আমার মনে হয় নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকীর অন্যতম সেরা কাজ। এগুলো থেকে মেরুদণ্ড বোঝা যায়। বোঝা যায় বিপণন আর ‘বেওসা’ এক ব্যাপার নয়।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সিনেমা বানানোর পাশাপাশি কবিতা লিখতেন। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অনুরোধ একটাই, তাঁর সিনেমা নিয়ে কথা বলার সময়, আলোচনাটাকে কেবলমাত্র সিনেমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেই তাঁর প্রতি সুবিচার হবে। তখন তাঁর নন্দনতত্ত্বে কাব্যিক সুষমা নিয়ে কথা বলতে গেলে, সম্ভবত, বুদ্ধদেবের একজন চিত্রপরিচালক হিসাবে যে অপরিসীম গুরুত্ব প্রাপ্য, তার হানি হবে। কেবলমাত্র সিনেমার গুণেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক। কবিতার কারণে নন।  

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *