পঁচিশে বৈশাখের আগে করোনার বদলে কবিতার কথা

অনুপম মুখোপাধ্যায়

পঁচিশে বৈশাখ যখন আসন্ন, করোনা আমাদের ঘিরে রেখেছে। রবি ঠাকুরের আপন দেশে কবিরা কি আজ কবিতা লিখছেন না তা বলে? শিল্পী কি আঁকছেন না? নৃত্যশিল্পী কি বন্ধ রেখেছেন তাঁর প্র্যাকটিস? বিশ্বকবির জন্মদিন যখন প্রায় এসেই পড়ল, মহামারিকে একটু ভুলে কবিতা নিয়ে একটু ভাবা যাক। ভাবা যাক কবি ও কবিতার যন্ত্রণা নিয়ে। সেই যন্ত্রণা রবীন্দ্রনাথকে ভোগ করতে হয়েছে, আজকের কবিকেও করতেই হচ্ছে। এই তো সেদিন সোশ্যাল নেটওয়ার্কে দেখলাম একজন কবিকে তাঁর নতুন পাঠক বলছেন, “আপনার লেখা বুঝি না।” কবি বললেন, “আচ্ছা, ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে’ এই লাইনটার অর্থ আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন?” নতুন পাঠক বললেন, “তাই তো! ছেলেবেলা থেকে শুনছি লাইনটা। মানে বোঝার কথা তো ভাবিনি!”

আরও পড়ুন: কাঙ্ক্ষিত আঁধারে

একটা কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, কবিতা যতটা কবির, তার চেয়ে ঢের বেশি পাঠকের। একজন কবি যদি নিজের কবিতা সম্পর্কে কথা বলেন, তিনিও সেটা কবি হিসেবে নয়, নিজের কবিতার পাঠক হিসেবেই বলেন। পাঠকের জন্যই কবিতা লেখা হয়। নাহলে সে কবির মনে জন্ম নিয়ে কবির মনেই মুছে যেত। কিন্তু এই সময়ের কবিতায় পাঠকের ভূমিকা ক্রমেই জটিল হয়ে পড়ছে। এই সময়ের কবিতায় পাঠক প্রায় বিলুপ্ত একটি প্রজাতি। কবিরা লেখেন, কবিরা ছাপেন, কবিরাই পড়েন। কবিরা একে অপরকে অবলম্বন করে বেঁচে আছেন। এর মধ্যে এমন কোনো মানুষ যদি উপস্থিত হন, যিনি কবিতা লেখেন না, কিন্তু কবিতা পড়েন, পড়তে ভালোবাসেন, এমনকী কবিতা পড়েই বেঁচে থাকেন, আমরা প্রত্যাশা করব তিনি কোনো সাইকেল বা মোটরবাইক বা বাস-ট্রাম-ট্রেনে চড়ে আমাদের কবিতায় নামলেন না। নিশ্চয়ই তাঁর একটা স্পেসশিপ থাকবে। তিনি এই পৃথিবীর নন। অতিশয়োক্তি ছাড়া অনেক সময় সত্যিই সত্যিটাকে বোঝানো যায় না।

আরও পড়ুন: সুখের সন্ধানে

এবং এটাই তো সত্যি। আজ কবিতার পাঠক নেই। তবু করোনার বিভীষিকা পেরিয়ে গেলেই দেখা যাবে আবার কবিতার রাশি রাশি পত্রিকা বেরোচ্ছে। কবিতা উৎসব হচ্ছে। কবিরা গাঁটের কড়ি খরচা করে অকাতরে নিজেদের বই ছাপাচ্ছেন। প্রকাশক বড়লোক হচ্ছেন তরুণ কবির স্বপ্ন-টপ্ন খেয়ে। কিন্তু পাঠক নেই। কেন নেই? এর পিছনে কিছু নির্দিষ্ট কারণ আছে। সেগুলো আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা, হয়তো সমাজতাত্ত্বিকরা না-ও মেনে নিতে পারেন। কুছ পরোয়া নেহি। সেগুলো পরপর বলে ফেলি। আপনি সহমত নাকি অসহমত, সেটা পরে ভাবা যাবে।

গত কুড়ি বছরের দৃশ্যপট যদি ভাবা হয়, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা একটা অবহেলিত ভাষায় পরিণত হয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় সত্যিই নেই। সাহিত্যের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান ছাঁদের মধ্যে ছাত্রছাত্রীর বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে সৃজনশীল আগ্রহ সৃষ্টি হবেই, তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা আদৌ নেই। এটা হয়তো আমরা মেনেই নিচ্ছি যে, আজকের বেশিরভাগ মেধাবী পাঠক ইংলিশ মিডিয়াম থেকে বেরোচ্ছে এবং তারা মিলান কুন্দেরা পড়তে আগ্রহী, অরুন্ধতী রায়, বিক্রম শেঠ, অমিতাভ ঘোষ বা সলমন রুশদিও তারা পড়ে, কিন্তু সমকালীন বাংলা সাহিত্য তারা পড়ে না। সময় কাটাতে হলে বরং শোভা দে বা চেতন ভগৎ পড়ে। বাংলা সাহিত্য পড়ার ইচ্ছা অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে শিক্ষায় ভাষার সীমাবদ্ধতা। তারা রবীন্দ্রনাথকে পড়তে চাইলে হয়তো অনুবাদে পড়বে। তারা বাংলা সাহিত্যকে অনুবাদে পড়বে, যদি তা ‘গীতাঞ্জলি’র মতো নোবেলজয়ী, ‘দেবদাস’ বা ‘ঘরে বাইরে’র মতো ক্লাসিক অথবা সিনেমা-সফল কিছু হয়। উপন্যাস ভাষান্তরের মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছতেও পারে। উপন্যাস অনেক বেশি সামাজিক সফলতা অনেক সহজে পায়। বাংলা কবিতার তো সেই সুযোগও নেই। তারা বিনয় মজুমদার বা রমেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরিকে কেন পড়বে? তাদের কবিতার পিপাসা মেটানোর জন্য আন্তর্জাতিক কবিতার পুরো ভাঁড়ার খোলা আছে।

আরও পড়ুন: হারু হরবোলা

The Last Harvest - Framed Prints by Rabindranath Tagore | Buy Posters,  Frames, Canvas & Digital Art Prints | Small, Compact, Medium and Large  Variants

বাংলাভাষার প্রতি আমাদের ক্রমিক আত্মবিশ্বাসের অভাব আজকের বাংলার সাহিত্যকে আবার ১৯শ শতকের সেই পরিসরে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কি যখন বাংলাভাষায় সাহিত্যচর্চার কোনো গরিমা ছিল না? বাংলাভাষায় আন্তর্জাতিক সাহিত্য করা যায়, এটা ভাবলেই সেই সময়কার উচ্চশ্রেণির লোকেরা নাক সিঁটকোতেন। সেইদিন কি আবার এসে পড়ছে? ঢাকঢোল পিটিয়ে আজকাল বলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্য না কি আজ আর আন্তর্জাতিক নয়। বিশ্বাস হয় কি? বাংলাদেশে এই সমস্যা নেই। বাংলাদেশের লোকেরা সাহিত্যে আজ পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে আত্মবিশ্বাসী তার একটা খুব বড় কারণ, বাংলা ওঁদের রাষ্ট্রীয় সুবিধাপ্রাপ্ত ভাষা। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে নিশ্চয়ই পশ্চিমবঙ্গীয় কোনো কবি গোলগাল দায়সারা লেখা লিখছেন না। তিনি নিজের লেখাটাই লিখছেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি সেই কবিতার প্রচারের ভারও তাঁকে নিতে হবে। যদি তিনি একেবারেই স্বতন্ত্র এক ভাষায় কবিতা রচনা করেন, যেমন তাঁর সময়ে রবীন্দ্রনাথ করেছেন, সমাজের মধ্যে নিজের কবিতার প্রতি রুচিবোধ তৈরির দায় আজকের কবিকেই নিতে হচ্ছে কারণ তাঁর হয়ে সেটা তো অন্য কেউ নেবে না। তিনি এমন কবিতা লিখছেন, যেটার দোকানদারি হয় না, বাণিজ্য হয়, বাণিজ্যতরী লাগে। এবং তাঁর কাজটা কঠিন, সিন্ধবাদের মতোই।

আরও পড়ুন: এক আলোর পৃথিবী

এই সমস্যা চিরকালীন। নতুন কবিকে অনেক রসিক পাঠকও বোঝেন না। কোনো কবিকেই হয়তো কোনো পাঠক পুরোপুরি বোঝেনি। কবি নিজেই তো পারেন না তাঁর অনেক উচ্চারণ বুঝতে। তিনি যদি সেটা বুঝতেন, তাহলে কবিতা নয়, অনেক কম পরিশ্রমে একটা গদ্য লিখে ফেলতেন। সেটা নিশ্চয়ই খবরের কাগজের রিপোর্টের মতো ‘সহজ’ হত। কিন্তু এক শ্রেণির পাঠক আছেন, তাঁরাই সংখ্যাগুরু, তাঁরা সাহিত্যের অন্যান্য ধারার মতোই কবিতাকে ‘বুঝতে’ চান। সাহিত্যের অন্যান্য ধারাগুলোও যে সর্বদা খুব ‘বোঝা’র, এমন নয়। কমলকুমার মজুমদার বা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌-র গল্প-উপন্যাসগুলো কি তাঁরা খুব অনায়াসে ‘বোঝেন’? কিন্তু তাঁরা কবিতায় কোনো দুরূহতা বরদাস্ত করবেন না। এঁরা সপাট উচ্চারণ চান। যেমন হয়তো― “সকালের কোকিল আমাকে বলে গেল / আমার চাকরি নেই/ তাই তুমি আমাকে / ভালোবাসো না”, অথবা “একটি মেয়ে লাঞ্ছিতা হল / সমাজপতিরা চুপ/ তার অপরাধ ছিল রূপ”। আজও এমন লেখা হয়, ফেসবুকে আকচার দেখা যায় ২০০-৩০০ লাইক সমেত এবং অনেক ‘অসাধারণ’ ‘অসামান্য’ ‘কোনোদিন ভুলব না’ ‘কী লিখেছিস বস’ সমেত। এ-রকম লেখা পত্রিকার দপ্তরেও আসে। তেমন সম্পাদকের হাতে ছাপাও হয়ে যায়। আজও এ-রকম লেখা হলে বেশিরভাগ পাঠক বলবেন, “হ্যাঁ, কবিতা হল বটে। আমরা বুঝতে পেরেছি কবি কী বলতে চায়। কবির সঙ্গে আমরা একমত।”

আরও পড়ুন: শ্রমিকের সামান্য ‘পান্তা ভাতে’ একটু লবণের ব্যবস্থার হোক

এই সমস্যা হয়তো চিরকাল ছিল। মাইকেলের প্রসঙ্গ তো ছেড়ে দিন। আজ তাঁকে অনুবাদে পড়তে হবে আমাদের মধ্যেকার অনেককেই। রবীন্দ্রনাথকে ‘আধো আধো ভাষা’র ‘পায়রা কবি’ বলা হয়েছিল তাঁর ‘অস্পষ্টতা’র কারণে। পরে কোনো মেজর কবিই বাদ যাননি। জীবনানন্দ দাশকে কদর্য আক্রমণ করা হয়েছে। অস্পষ্টতার অভিযোগ শোনেননি, অথচ মেজর বাঙালি কবি, এটা হয়তো একমাত্র ঈশ্বর গুপ্ত ছাড়া বাকি সকলেরই ভাগ্যের বাইরে রয়ে গেছে। আজকের পাঠকের হাতে সময় আরো কম। সে চায় আরো সপাট উচ্চারণ। তার মধ্যে একটু কায়দা থাকলেই হবে। একটু প্রেম। একটু মনখারাপ। একটা দেড়-দু’ইঞ্চির কবিতাকে দেড়-দু’মিনিটের বেশি সময় দিতে আজকের পাঠক নারাজ।

এই সময়ের পাঠকের সামনে একটা বিরাট পাঁচিল হল কবিতাকে সংস্কৃতিচর্চার বিবিধ শাখার সঙ্গে ঘুলিয়ে ফেলা। এটা মারাত্মক। এখান থেকেই প্রকৃত সারস উড়ে পালাতে শুরু করে। কবিতা এখানে প্রথমে ঘুলিয়ে যায় আবৃত্তির সঙ্গে। কবিতাকে ভাবা হয়― ‘স্বরচিত কবিতা’। পাঠক আশা করেন তিনি যে কবিতা পড়তে চান, প্রত্যেক কবি সেটাই লিখবেন। সেটাই হয়ে যায় কবিতার সামাজিকভাবে মান্য প্রতিমা।  সেটাকে অমান্য করলে সেই লেখা পাঠকের কাছে আর কবিতা থাকে না, পাগলামো হয়ে যায়। পাঠক প্রথমে হোঁচট খায়, খেয়েই বিরক্ত হয়― “এ তো আমার রাস্তার জিনিস নয়! এটা এমন কেন?” অভ্যাসের অন্তর্গত নয়, এমন কোনোকিছুকেই মানুষ নিঃসন্দেহে অকাতরে গ্রহণ করতে পারে না, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালি।

কবিতার রাস্তাতেও আমরা বাঙালি। আমাদের অভ্যস্ত নিরাপত্তা ও আরাম হয়তো শিল্পের বা সৃজনশীলতার সবক্ষেত্রেই আমরা খুঁজি। তাই আজ উপন্যাসকে হতে হয় ডেলি সিরিয়ালের পরিপূরকমাত্র। কবিতাকেও চটজলদি লোকপ্রিয়তা পেতে হলে আগেই হতে হবে ব্যান্ডের গানের মতো, জনপ্রিয় গানের মিষ্টি লিরিকের মতো। অথবা, নতুন কবিকে চটজলদি সফলতা পেতে হলে সংস্কৃতির মধ্যে আগেই জায়গা করে নেওয়া কোনো কবিতার কাঠামোকে অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে। জলদি স্বীকৃতি পেতে হলে, কবিকে হয়তো মেনে চলতেই হবে একটা গাইডলাইন― কীভাবে লিখলে আপামর পাঠক আরাম পাবে অথচ উদ্বেল হবে। সে কাজ সোজা এমন নয়। কিন্তু সেটার জন্য সৃষ্টিসুখের উন্মাদনা লাগে না, লাগে দক্ষতা, আর চাই পাঠকের মনস্তত্ত্বের বোধ। কবিতা ধীরে ধীরে কাঠের বা টেরাকোটার মূর্তির মতো সুন্দর কিন্তু একই ধাঁচের হয়ে ওঠে, ড্রইংরুমের জিনিস হয়ে যায় গ্রন্থাগারের বদলে। পাঠক তাতে খুশিই থাকেন। কবিদের মধ্যে চলতে থাকে মিষ্টি আর নরম কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা। এটা বোধহয় প্রতি যুগেই হয়েছে। যে কোনো নতুন কবিকে প্রথমেই তাঁর নতুনত্বের আঘাত সইতে হয়েছে।

আরও পড়ুন: ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা

পাঠকের মনস্তত্ত্ব বুঝে নিয়ে, নিজের সৃষ্টিশীলতাকে ধামাচাপা দিয়ে লেখা যে সংস্কৃতিমান্য পঙ্‌ক্তিগুলোকে অনেকসময় কবিতা বলা হয়, তারা যে সুখপাঠ্য নয় এমন বলা চলে না। হয়তো সেগুলো পড়তে ভালো লাগবে অনেক বেশিই। তারা নিরাপদ। তারা মসৃণ। নিটোলতার বিভ্রম থাকে তাদের মধ্যে। কবি সেগুলোকে লেখার ক্ষেত্রে খুবই দক্ষ এবং সচেতন থাকেন, আগেই বললাম। কিন্তু দক্ষতা আর সচেতনতার কারবার কি কবিকে মানায়? কবির কাজ পাঠককে অনভ্যাসের অভ্যাসে টেনে আনা। প্রথমে পাঠক যে প্রত্যাখ্যান করবে, সেটা তার অভ্যাসের দোষ। রবীন্দ্রনাথকেও প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল। সেটাই ইতিহাস বলে। কিন্তু পরে কিছু পাঠক গ্রহণও করবে। পাঠকের সংখ্যাটা বাড়বে, যদি কবির সত্যিই দূরপাল্লার দম থাকে। তখন সংস্কৃতি সেই ‘না-কবিতা’ বা ‘অ-কবিতা’কে স্বীকার করবে। সেটাই কবির চ্যালেঞ্জ। একমাত্র এভাবেই কবিতার নদী বহে যায়, যুগে যুগান্তরে। আর করোনা পেরিয়ে এসে পড়ে পঁচিশে বৈশাখ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *