পয়লা বা পহেলা বৈশাখ

পৌষালী সেনগুপ্ত

বাঙালি। একটি জাতির নাম। জনগোষ্ঠী, যাদের মুখের বুলি বা ভাষা— ‘বাংলা’! এই বাংলাভাষী নৃগোষ্ঠীকেই, একত্রে ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করে আসা হচ্ছে বিগত কয়েক যুগ ধরে। না, এখানে সমগ্র বাঙালি জাতির ও ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনার মণ্ডলী বসাব না আমরা। তবে প্রারম্ভ হিসেবে এটুকু শিবের গাজন তো গাইতেই হয়, তাই নয় কি? এই যে বাঙালি জনগোষ্ঠী, যা ছড়িয়ে আছে বর্তমান সময়ে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মহাদেশের ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশ, এই দু’টি জায়গায় এবং বিক্ষিপ্তভাবে, পৃথিবীর অন্যত্রও, তাঁদের নিজস্ব জীবনশৈলী, যাপনবিধি ও নানাবিধ কার্যক্রম রয়েছে, যা বংশানুক্রমে চলে আসছে এবং তাও, বিভিন্ন ভূখণ্ড ও জনপদ জুড়েই।

আরও পড়ুন: চৈত্র সংক্রান্তি আর গাজনের দিনগুলো

পাঠকের অবগত থাকবে, এই ভাষাকে কেন্দ্র করেই একটি আস্ত, নতুন সার্বভৌম দেশ গড়ে ওঠে পূর্বাপর ইতিহাসে, যার নামেই রয়েছে বাংলা। বিভাজনের প্রাথমিক হেতু অন্য থাকলেও পরবর্তীতে এই ভাষার আন্দোলনের দাবি জন্ম দেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র— বাংলাদেশ। এই দেশের অধিবাসী সকল ও ভারতের ‘পশ্চিমবঙ্গ’ বলে পরিচিত রাজ্যটির মধ্যেই মূলত, এই জনগোষ্ঠীকে দেখা যায়। বাংলা দিনপঞ্জিকা তথা ক্যালেন্ডারের উৎস নিয়ে নানাবিধ মত প্রচলিত আছে। সম্রাট আকবর প্রচলিত ‘হিজরি’ সালের নিবন্ধন, বা নক্ষত্রমণ্ডলীর চলন ও গমনের ওপর তৈরি করা যে দিবস, মাস ও বছরের গুণতি— এই দু’টি প্রধান স্তম্ভ পাওয়া যায়। এক নজরে বাংলার বারো মাসগুলি দেখে নেওয়া যাক চলুন— বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র।

আরও পড়ুন: প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

মাসগুলির নামাঙ্কণ হয়েছে নক্ষত্রমণ্ডলীর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে। মায়, দিবসের নামকরণেও ওই পদ্ধতিই অবলম্বন করা। গ্রহসমূহের ও নক্ষত্রের চলনের নামে, দিবসের নাম যথা— সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি ও রবি। মাসের শেষ দিনটিকে ‘সংক্রান্তি’ বলা হয় ও শেষ মাস— চৈত্র। তাই একযোগে ‘চৈত্র সংক্রান্তি হিসেবে, ইংরেজি মাসের ১৩/১৪ তারিখ (একেক বছর এটা পাল্টে যায়) পালন করা হয় ও তার পরের দিনটিই, বৈশাখ মাসের প্রথমদিন হিসেবে সাড়ম্বরে উদ্যাপন করা হয়! ‘পয়লা / পহেলা বৈশাখ’-এর, এই হল উৎপত্তি বৃত্তান্ত, অল্পের মধ্যে। এ বিষয়ে বহুবিধ জ্ঞানগর্ভ, তথ্যবহুল বহু লেখ / প্রবন্ধ সময়ে সময়ে ব্যক্তিবিশেষে লিখে থাকেন।

আমরা অত তত্ত্বকথায় নাই বা যাই পাঠক! আপামর পঃবঙ্গবাসীর স্মৃতিতে বোধ করি থাকবে, ‘হালখাতা’, একটি বিশেষ উৎসব, এই দিনে। গৃহস্থ ঘরের গুরুজনদের সঙ্গে গিয়ে চিরচেনা বিপণিগুলোর আতিথেয়তা অনুভব করা; পুরাতন সব হিসেব-নিকেশ সমাপ্ত করে নতুনকে আবাহন করে পূর্ণ উদ্যমে নতুন ব্যবসাপাতি আরম্ভ করা— এটি একটি বেশ উল্লেখযোগ্য, আমুদে প্রচলন বলা চলে, যা এখনও শহর ও মফস্‌সলের দোকানদারেরা পালনের চেষ্টা করেই থাকেন। ‘পয়লা বৈশাখ’কে আবাহন করার আগে অবশ্য পুরনো বছরের বিদায় জরুরি। ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ উপলক্ষেও তাই বাংলার ঘরে ঘরে (দুই বাংলাতেই), শাকান্ন ভোজন ও বিভিন্ন মেলার উদ্ভব এবং সেই মেলায় সানন্দে ও সোৎসারে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় মানুষজনকে। স্নান সেরে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, বচ্ছরকার দিনে ঘরদোর সব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে জীবনের প্রতি এক ঝলমলে দৃষ্টি নিয়ে নূতন উদ্যমে পথ-চলা শুরু করা, এই দিনের অন্তর্নিহিত গুঢ় তত্ত্ব।

আরও পড়ুন: কাসুন্দি-তৃতীয়া

জীবন নির্বাহ হয়, খাদ্য ও কাজের সংযুক্তিতে। এই ধারা আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। আমাদের জীবনচরিত মোটামুটি চলে ওই পথ ধরেই। এই যে বর্ষবরণের আয়োজন— তা ওই নতুন ফসলকে কেন্দ্র করেই এবং আগামীর পাথেয় সংগ্রহের লক্ষ্যকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে চলার জন্য। এই কারণকে কেন্দ্র করেই ঘোরে সমস্ত উদ্‌যাপন, তা একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়, যদিও শহর-কেন্দ্রিক উদ্যাপনের চরিত্র কিয়দংশে আলাদা হয়েছে, হতে বাধ্য। তৎসত্তেও দেখা যায় প্রায়, প্রতি ঘরে ঘরেই, যথাসাধ্য সুখাদ্য ও নতুন কাপড়ের আয়োজন করার প্রচেষ্টা থাকে। সন্ধ্যাবেলায় , ‘হালখাতা’র নিমন্ত্রণ রক্ষার ব্যাপার থাকে। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কুশলবিনিময়— এইসব নিয়েই মোটামুটি সাদরে পালন করা হয়— ‘পয়লা বৈশাখ’!

এই দিনের জন্য বাংলাদেশে ঠিক কেমন আয়োজন হয়, জানতে ইচ্ছুক পাঠক? আসুন, ছোট্ট করে এটা জেনে নিন। বাংলাদেশে, সংশোধিত দিনপঞ্জিকার জন্য, মাঝেমধ্যে দিনটি পালন হয় / হতে পারে ইংরেজি মতে আলাদা দিনে। সেসব জটিলতা পেরিয়ে, আসুন আমরা দেখি কীভাবে একটি ‘আদ্যোপান্ত বাংলাদেশি পহেলা বৈশাখ’— ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে পালিত হয়। ১৩৭২ বঙ্গাব্দ (১৯৬৫) থেকে, বাংলাদেশের ‘ছায়ানট’— সাংস্কৃতিক পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি, পয়লা বৈশাখের সূর্যোদয়ের প্রথম রশ্মির ছোঁয়া নিয়ে, ঢাকাস্থিত ‘রমনা উদ্যানের বটবৃক্ষমূলে’— বিশ্ববরেণ্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহোদয়ের রচিত “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো”— গেয়ে দিনটিকে বরণ করে নেওয়া শুরু করেন। এটি ছিল একটি বলিষ্ঠ রাজনৈতিক পদক্ষেপও। তদানীন্তন পাক-মদতপুষ্ট আইয়ুব-সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপনার্থে। মূলত, বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষার্থেই এই কাজটি করা হয় এবং বহুল পরিমাণে জনপ্রিয়তা লাভ করে। সেই থেকে, দিনের শুরু এভাবেই হয়। বলাই বাহুল্য, বহু মানুষের সমাগম হয়, হয়ে আসছে প্রথাগতভাবে ওই জায়গায়। মহা সমারোহে নতুন বছরকে আবাহন করা হয়। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চারুকলা’ প্রতিষ্ঠানটিও ‘প্রভাতফেরি’র আয়োজন করে থাকে নানান বর্ণাঢ্য কারুকাজের ব্যবহার করে আয়োজিত মিছিল দিয়ে শুরু করে।

আরও পড়ুন: ‘বনলতা সেন’ আসলে মৃত্যু, জন্ম থেকে জন্মান্তরে যাবার বিশ্রাম

এই সমস্ত প্রত্যক্ষ করতে সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, টিএসসি ও শহিদ মিনার সংলগ্ন জায়গা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় সেই সাতসকালেই! পথঘাট, সব সুন্দর আলপনা ও নানাবিধ চিত্রকর্ম দিয়ে অলংকৃতও করা হয়, ছাত্র-শিল্পীদের উদ্যোগে। সংস্কৃতি হিসেবেই, খাদ্যাভাসে পোক্ত জায়গা করে নিয়েছে, বহুচর্চিত ‘ইলিশমাছ ভাজা , পান্তা ভাত সহযোগে’। নানান পদের ভর্তাও এ দিন খাদ্যরসিক থেকে আপামর জনতার পাত অধিকার করে থাকে। সারাদেশের কোনায় কোনায় বেশ কিছু মেলাও প্রচলিত আছে, যা বহু পুরাতন বলেই জানা যায়।

মূলত, শিবঠাকুরের গাজন, চড়কের উপলক্ষে মেলা বসে। মেলায় দূরদূরান্তের মৃৎ-শিল্পী ও অন্যান্য কারুকৃতরা তাঁদের পসরা সাজিয়ে বসেন। মানুষের অদম্য জীবনীশক্তি ও কৃতবিদ্যার এ এক অনন্য বিস্তার। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বহমান এই যে আদি চলনের ধারা, যা উত্তর-প্রজন্ম নানান অসুবিধের সম্মুখীন হয়েও আগলে নিয়ে কালের মহাসড়কে ধাবমান— এটা দেখতে ও অনুধাবন করতে সত্যিই ভালো লাগে। মানুষ চাইলে, সমস্ত বাধাবিপত্তিই জয় করতে পারে— আমাদের অগ্রজরা যেন আমাদের এই বার্তাই দিয়ে গেছেন, এই সমস্ত নিয়ম, বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে।

আরও পড়ুন: দশটি লিমেরিক

এই বছর, চলমান অতিমারির জন্য সব জায়গাতেই যৎপরোনাস্তি সাবধানতা অবলম্বন করা হচ্ছে।বৃহৎ সংখ্যায় মানুষের জমায়েতের বিরুদ্ধে। আমাদের আয়োজন-উদ্যাপন ও তাই ম্রিয়মাণ, ওপারের ব্যবস্থাপনাও। মাত্র ১০০ জনের শোভাযাত্রা হবে, তাও চারুকলা অনুষদের প্রাঙ্গণেই। বাইরের রাস্তায় নয় এবং সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনেই। কিছু স্থিরচিত্রে, এ বছরের চারুকলা-কর্তৃক প্রস্তুত দেওয়ালচিত্রের নমুনা দেওয়া থাকল। ইলিশ-পান্তার বৈচিত্র্য ও চিত্রে সমৃদ্ধ করুক। আমাদের ‘বাঙালি সত্তা’, আজন্ম বেঁচে থাকুক এইসব ঘটনাবলির হাত ধরে!

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *