পয়লা

অলক্তা মাইতি

মেয়েটা শুধুই কাজের কথা বলে। ইনভেস্টমেন্ট, ডিবেঞ্চার, ইকুইটি, অ্যাপ্রাইজালের বাইরে কোনও কথা এগোতেই পারে না কখনও। রুফটপের অসাধারণ ডিনার ডেটে মারকাটারি রোমান্টিক লাইভ ব্যান্ডের সামনেও সেদিন আমরা ভারতবর্ষে এসআইপি-র ফিউচার আলোচনা করেছি। বেশ পরিষ্কার বুঝতে পারছি, এভাবে চলতে থাকলে আমার ফিউচার অন্ধকার। ওর কানের পাশের ঢাল বেয়ে নেমে আসা নরম চুলের পরত ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলতে চাই, নেশা আই লাভ ইউ। কিন্তু জিভ জড়িয়ে আসে, ভাষা হারিয়ে যায়। বারগেন্ডি কিম্বা হেজল নাট চুলের চেকনাই তে লাট খেতে খেতে ওর চোখের দিকে তাকালেই মনে পড়ে যায়, Mutual Fund investments are subject to market risk. Please read the offer document carefully before investing।

আরও পড়ুন: এই টুম্পা, ব্রিগেড চল!

গত এক বছর চার মাসে আমার প্রায় সব জানা হয়ে গেছে ওর অফিস সম্পর্কে। কে কাকে টপকে কোন মার্কিংয়ে এগোতে চাইছে, বোর্ড অফ ডিরেক্টারসের ফোকাসটা ঠিক কোন দিকে, এইচআর-এর পলিসি এবং ব্যর্থতার কারণ, ব্লু চিপ ইনভেস্টমেন্টে ওর কত টাকা কোথায় কোথায় খাটছে। ইনফ্যাক্ট NAV দেখে প্রতিবার সঠিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যানটা আমি শুধু ওর জন্যই নয়, ওর প্রতিবেশীদের জন্যও করে থাকি, কিন্তু পরিবর্তে কোনও রিটার্ন পাই না। এ জীবনটা আমার ব্যাঙ্কার হয়েই কেটে যাবে মনে হচ্ছে, বয়ফ্রেন্ড হবার ভাগ্য সবার আর…। কোনও কুক্ষণে যে অর্জুন আমার ফেবু প্রোফাইলের ইন্ট্রোতে লিখেছিল A risk-free Banker with guaranteed high return-কে জানে। আমার ভেতরের রক্ত মাংসের মানুষ টাকে নেশা কি কোনও দিনই দেখতে পাবে? কে জানে।

আরও পড়ুন: মাতৃভাষা দিবসে ‘ভাইরাল’ উত্তম-কিশোর স্মৃতিমাখা গানের দৃশ্য প্রসঙ্গে

প্রথম প্রথম কিন্তু আমার বেশ লাগত। ওর ফোন নম্বর পেতে বা ওর সঙ্গে দেখা করতে আমার একটুও বেগ পেতে হয়নি। চার বছরের চাকরি-জীবনে যা কিছু শিখেছি, তা যে এত ভালো রিটার্ন দেবে এ তো আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। বিটেক করে র্যা ঙ্কিংয়ে আসার দুঃখটা রয়েই গিয়েছিল মনে মনে। প্রথমবার রোহনের বার্থডে পার্টিতে আলাপ হওয়ার পর যখন নেশা নিজে থেকেই নম্বরটা দিল, তখন প্রথমবার মনে হয়েছিল সবটা বোধহয় এতটা খারাপও নয়। প্রথমবার কফিশপের আলো আঁধারে মন্দ লাগছিল না ULIPS-এর কথা বলতে। তীব্র কফির গন্ধ ভেদ করে একটা হাল্কা মুলতানি মাটি, গোলাপ জলের গন্ধ, চশমার ফ্রেমে ঠিকরে ওঠা বেগুনি আলোটা দারুণ লাগছিল সেদিন। সেই ভালোলাগাটা অবশ্য আজও রয়ে গেছে। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে গুণোত্তর প্রগতিতে। প্রতিবার নেশা যখন রাস্তা পেরিয়ে কিংবা ফুটপাথের গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে আমার দিকে এগিয়ে আসে… আমার মনে হয়… মনে হয়, সব অপেক্ষার পরিণতি এত সুন্দর হলে আজীবন দাঁড়িয়ে থাকা যায় বাসস্টপে। পৃথিবীর সবটুকু আলো আসতে আসতে হাসতে হাসতে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে এর চেয়ে ভালো আর কিই-বা হতে পারে। এই কাছে আসার মুহূর্তটার সামনে এ পৃথিবীর সব রেটিং মিথ্যে, সব বেনিফিট ঝুঠা।

আরও পড়ুন: ভাষার মাস কেন নয় ফাল্গুন

তবে ওই অব্দিই। তার পর মুখ খুললেই দেবী ইন্ডিয়ান ফিনান্সিয়াল সিস্টেম। ওর নাম অন্বেষা ব্যানার্জি হল কী করে কে জানে! পাটেল কিংবা শাহ হওয়া উচিত ছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে NPS লাগিয়ে বেশ কিছু ইনকাম ট্যাক্স বাঁচালুম ম্যাডামের। খুব কায়দা করে একদম আর্দ্র, ঘন গলায় জিজ্ঞাসা করলাম– ‘‘এই যে মাদাম, এত যে মাথা খাটালাম, বলি শিরঃপীড়ায় অমৃতাঞ্জনটুকু জুটবে তো?” নেশা নির্বিকারভাবে বলল, ‘‘নিশ্চয়, I owe you a treat. এপ্রিলের সেকেন্ড উইকের আগে ফ্রি হব না আমি। তখন একটা দিন দেখে ডিনার… নাহ ডিনারটা না একটু হেকটিক হয়ে যায়। লাঞ্চে মিট করি?” আমার কণ্ঠস্বরের ব্যরিটোন মুহূর্তে চুপসে গেল। বেশ, তবে তাই হোক।

বহু প্রতীক্ষার অবসানে আজই সেই ‘owe you treat’-ওয়ালা দিন। ঘটনাচক্রে আজ পয়লা বৈশাখ তাই আমার ছুটি। নেশার ছুটি না থাকারই কথা, কিন্তু কেন জানি না মহিলা বাড়িতে। ফিনান্সিয়াল ইয়ারের শুরুতেই ছুটি নেওয়ার বাঁদি সে নয়, তবু… সকাল সকাল মেসেজ এলো “অফিস যাইনি। খুব রোদ। বেরোবো না। কাম টু মাই প্লেস।” অন্য কেউ হলে হয়তো অন্য ইঙ্গিত খুঁজে নাচতে থাকত এই মেসেজ পেয়ে। কিন্তু আমি জানি বাইরে রোদ উঠুক বা বর্ষা, এর অ্যান্টেনা শুধু একটাই ফ্রিকুয়েন্সি জানে। হয়তো শরীর-টরীর খারাপ। তাই অফিস বাঙ্ক। কিংবা নতুন কোন প্ল্যান আছে মাথায়। গতবার বলেও ছিল কী একটা স্টার্ট আপ করতে চায়। হয়তো সে সবই ডিসকাস করবে। ধুর ভাল্লাগে না। দুনিয়ার লোক, বস থেকে ইস্ত্রিওলা সবাই শুভ নববর্ষ, শুভ নববর্ষ করে মাথা খেয়ে ফেলল। এ মেয়ে কি একটা ফরোয়ার্ডেড মেসেজও পাঠাতে পারে না শুভেচ্ছা জানিয়ে? আমি কি তার সৌজন্যের লিস্টেও নেই? হয়তো জানেই না যে, আজ একলা নয় পয়লা বৈশাখ। সে যাই হোক, যখন বাজল বাঁশি তখন রাধা যাবেই যমুনায়। কি আর করা! বাড়িতে মা পাঁঠা রাঁধছে। সঙ্গে চিংড়ি মাছের মালাইকারি, মুড়ি ঘণ্ট। সেসব ছেড়ে আমি চললুম Tacos কিংবা পেপারড পাস্তা স্যলাড খেতে। ধুর ভালো লাগে না। মেয়েরা না জাস্ট ব্ল্যাকমেল করে এভাবে। আমি খুব দারুণ জানি ওই মুলতানি মাটির গন্ধ আর কাজলঘন চোখ দু’টোকে একহাত দূর থেকে অনুভব করার সুযোগটুকু ছাড়া আর কিচ্ছু পাওয়ার চান্স নেই আজ। কোনও মাস্কারার আসকারা আমায় অচিনপুরের খোঁজ দেবে না এই নিঝুম দুপুরবেলায়। তবু… সব ইনভেস্টমেন্ট কি আর কুইক লিকুইডিটির সম্ভাবনাকে উসকে দিতে পারে? সবটা তো আর সেনসেক্স দিয়ে মাপা যায় না। অতঃপর চল মন শ্রীনিকেতন, ঢাকুরিয়ায়।

কলিং বেলটা বাজানোর আগে পাঞ্জাবির হাতাটা একটু গুটিয়ে নিলাম। না অন্য কিছু নয়। এটা জাস্ট আমার বিশ্রাম মোড থেকে সাবধান মোডে সিফটিং। নেশা জানুক না জানুক আমি জানি, আজ বৈশাখের পয়লা তাই পাঞ্জাবি মাস্ট। সঙ্গে বাঞ্ছারামের আম দই আর বেকড রসগোল্লা। মিষ্টি তিনি পছন্দ করেন কিনা জানি না। চকোলেট খান না জানি। তাই আজকের দিনটা মাথায় রেখে সেফ খেললাম। করিনা কাপুর থেকে সেলিনা জেটলি সবাই জানে বাঙালি মানেই মিষ্টি দই আর রসগোল্লা। উফ এত ভাবছি কেন? কেমন একটা টেনশন হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। মনে হচ্ছে যেন ব্রিজ ভেঙে পড়বে এক্ষুনি। আমি বেল বাজালাম।

আরও পড়ুন: ‘দেশভাগ: ঐতিহাসিকতা, চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাটক’ বিষয়ে ওয়েবিনার, আয়োজনে চিত্তরঞ্জন কলেজ

**

গুমোট গরম ছিল সারাদুপুর। এখন পড়ন্ত বিকেলে খানিক কালবৈশাখী শুরু হল। এলোমেলো হাওয়ায় নেশার নীল সার্টিনের ওড়না উড়ে যাচ্ছে ফিরে আসছে। আমি আঙুল রাখলাম ওর মুখের ওপর ছড়িয়ে পরা অবিন্যস্ত চুলের গোছায়। কানের পাশে ঠেলে দিলাম হাভানা ব্রাউন দুষ্টুমিদের। নেশা আপত্তি করল না। একটা দুপুরে ইনভেস্টমেন্ট অনেকটা ম্যাচিওর করেছে আজ। অনেকটা কাছাকাছি, অনেকটা সঘন হয়েছে সহাবস্থান। নাহ, চুমু খাইনি এখনও, নেশার পেলব কোমরে টান মেরে বুকের কাছে আটকে রাখা হয়নি এখনও। শুধু ভরপেট ভোজ হয়েছে। মোচার চপ, ইলিশ পোলাও, মটন কষা, আমের চাটনি আর পায়েস। সঙ্গে দই মিষ্টি তো ছিলই। অন্বেষার ফ্যামিলির সবাই তো সেই দিল্লির চিত্তরঞ্জন কলোনিতে। পয়লা বৈশাখ ওদের বাড়ি জোড়া ইলিশ আসে। সে-সব কথা মনে করেই মনটা খারাপ ছিল ক’দিন। তাই আজ ম্যাডাম সকাল থেকে কোমর বেঁধে রান্না করেছেন আমার জন্য। ইউ নো, এই মুহূর্তে এই শহরে আমিই তো ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ নাকি। কি বিশ্বাস হচ্ছে না! এ বাবা আমি বলছি না। নেশা নিজে বলেছে একটু আগে। সত্যি। আজ সারাদুপুর আমরা একটুও কাজের কথা বলিনি। শেয়ার নয় পেয়ার বেড়েছে শুধু। সারেগামা caravan-তে গান শুনেছি প্রচুর। প্রচুর বাংলা গান। এখনো আরতি মুখার্জি গাইছেন… এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়, জ্যৈষ্ঠতে হল পরিচয় আসছে আষাঢ় মাস মনটাই ভাবছে… কি হয় কি হয়… কি জানি কি হয়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Violet Chanda

    কি অন্যরকম ❤️
    হাত থেকে সুতো ছেড়ে দিয়ে বেলুন উড়ে যাচ্ছে দেখার মতো ভালো অনুভূতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *