পোকেমন মুভির অ্যাশ, পিকাচু এবং টিম রকেট

অনিন্দ্য বর্মন

পোকেমন অর্থে আসলে পকেট মনস্টার্স। যেহেতু পোকেমন পোকেবলে থাকে এবং ট্রেনাররা এই পোকেবলগুলি নিজেদের পকেটে অথবা ব্যাগে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাই এরকম নামকরণ। পোকেবল প্রয়োজন অনুযায়ী আয়তনে ছোট করা যায়। পোকেমন ধরার সময় পোকেবলটি বড় হয়, আবার পোকেমন ধরার পর সেটিকে পকেটে রাখার জন্য ছোট করে নেওয়া যায়। পোকেবলের বড় মাপটি একটি বড় ক্রিকেট বলের আয়তন আর ছোট হলে সেটা পিংপং বলের আয়তনে দাঁড়ায়। পোকেমন ধরার সময় অথবা তাদের বল থেকে ছাড়ার সময় ট্রেনাররা বলে ওঠে ‘পোকেবল… গো!’ অ্যাশ নতুন কোনও পোকেমন ধরার সময় পোকেবল ছোড়ার আগে সাধারণত কিছু বলে না। পোকেমন ধরার পর অ্যাশ নতুন পোকেমনকে বল থেকে বের করে আনে। সে এবং পিকাচু সাদরে নতুন বন্ধুকে তার টিমে স্বাগত জানায়। একজন পোকেমন ট্রেনার নিজের কাছে একসঙ্গে সর্বাধিক ৬টি পোকেমন রাখতে পারে। তার বেশি হলে নিয়ম অনুযায়ী পোকেমন এবং পোকেবল স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেনারের মাদারল্যাবে (ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা) চলে যায়। অ্যাশের মাদারল্যাব হল প্রফেসর ওকের ল্যাবরেটরি।

আরও পড়ুন: বিপণন ও পোকেমন: কার্ড ও গেমিং

নতুন পোকেমন ধরার পর অ্যাশ এবং পিকাচু

প্রথমবার ক্র্যাবিকে (ওয়াটার) ধরার পর অ্যাশ বুঝতে পারেনি তার পোকেবল কোথায় গেল! মিস্টির থেকে অ্যাশ জানতে পারে যে, ক্র্যাবি প্রফেসর ওকের কাছে চলে গেছে। অ্যাশ ফোনে কথা বলে এবং ক্র্যাবিকে দেখে নিশ্চিন্ত হয়। প্রয়োজন পড়লে ট্রেনাররা নিজস্ব মাদারল্যাব থেকে পোকেমন বদলে নিতে পারে। যা অ্যাশ পোকেমন লিগে অংশগ্রহণ করার সময় বারবার করে থাকে। পোকেমন লিগের প্রত্যেকটি ম্যাচে অ্যাশ কী পোকেমন ব্যবহার করবে অথবা তার ব্যাটেল স্ট্র্যাটেজি কী হবে, সেটা বেশিরভাগই ব্রক ঠিক করে দেয়।

আরও পড়ুন: অভিন্ন হৃদয় বন্ধু: অ্যাশ, ব্রক, মিস্টি এবং পোকেমন

ক্র্যাবিকে ধরার আগের মুহূর্ত

এই অবস্থায় কেমন লাগবে যদি হঠাৎ পর্দায় দেখা যায় যে, পোকেমন আছে কিন্তু অ্যাশ বা পোকেমন কার্টুনের অন্যান্য জনপ্রিয় চরিত্ররা অনুপস্থিত? ডিটেক্টিভ পিকাচু দেখতে বসলে এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ এই সিনেমার প্রধান চরিত্র অ্যাশ নয়, টিম গুডম্যান নামক এক যুবক। তবে পিকাচু আছে। আসলে এই সিনেমাটির সঙ্গে বর্তমান পোকেমন কার্টুনের কোনও মিলই নেই। যার ফলে দর্শকরা একটু হতাশই হয়েছেন। সম্ভবত এই কারণেই প্রচুর ভিউয়ারশিপ থাকা সত্ত্বেও সিনেমাটি বেশি জনপ্রিয় হয়নি। অবশ্য সেদিক থেকে দেখতে গেলে গত কয়েক বছরে যে ক’টা পোকেমন অ্যানিমেটেড মুভি হয়েছে, কোনোটাই সেরকমভাবে দর্শকদের মনে দাগ কাটতে পারেনি।

আরও পড়ুন: পোকেমনের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগত

‘ডিটেক্টিভ পিকাচু’ সিনেমায় টিম গুডম্যানের সঙ্গে পিকাচু

১৯৯৮ সালে পোকেমনের প্রথম অ্যানিমেটেড মুভি বাজারে আসে। নাম ‘পোকেমন দ্য ফার্স্ট মুভি, মিউটু স্ট্রাইকস ব্যাক’। সেই থেকে মোট কুড়িটা অ্যানিমেটেড মুভি তৈরি হয়েছে। শেষের দু-একটা বাদ দিয়ে বাকি সবকটা সিনেমাই বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। শেষ সিনেমাটির নাম ছিল ‘পোকেমন মিউটু স্ট্রাইকস ব্যাক’। অজানা কারণেই প্রথম এবং শেষ মুভির গল্প একই রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এই শেষ মুভিটি প্রথম মুভিটির রিমেক। পোকেমনের প্রত্যেক মুভিতেই অ্যাশ এবং পিকাচু আছে। তবে বাকি চরিত্ররা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পালটে গেছে। প্রত্যেক মুভিতেই একজন করে রেয়ার অথবা লেজেন্ডারি পোকেমনকে দেখানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: যা দেখি, যা শুনি, যা লিখি

মিউটু স্ট্রাইকস ব্যাক সিনেমার একটি দৃশ্য

এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক যে, পোকেমন মুভিতে আমরা কোন কোন নতুন পোকেমনের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যাদের চট করে অন্য কোনও এপিসোডে দেখা যায় না—

১৯৯৮ – মিউটু স্ট্রাইকস ব্যাক – মিউ এবং মিউটু

১৯৯৯ – দ্য পাওয়ার অফ ওয়ান – আর্টিকুনো, জ্যাপডস, মলট্রেস এবং লুগিয়া

২০০০ – স্পেল অফ দ্য ইউনোন – এনটেই

২০০১ – সেলেবি ভয়েস অফ দ্য ফরেস্ট – সেলেবি

২০০২ – ল্যাটিওস অ্যান্ড লাটিয়াস – ল্যাটিওস এবং লাটিয়াস

২০০৩ – জিরাচি দ্য উইশমেকার – জিরাচি

২০০৪ – ডেসটিনি ডিওক্সিস – রেক্যুইজা এবং ডিওক্সিস

২০০৫ – লুকারিও অ্যান্ড দ্য মিস্ট্রি অফ মিউ – লুকারিও

২০০৬ – পোকেমন রেঞ্জার অ্যান্ড দ্য টেম্পল অফ দ্য সি – মেনেফি

২০০৭ – রাইজ অফ ডার্করাই – ডার্করাই

আরও পড়ুন: জেলার নাম বাঁকুড়া

মিউ এবং মিউটু

২০০৮ – জিরাটিনা অ্যান্ড দ্য স্কাই ওরিয়ার – জিরাটিনা এবং ডিয়াল্গা

২০০৯ – আরসিয়ুস অ্যান্ড দ্য জুয়েল অফ লাইফ – আরসিয়ুস এবং পালকিয়া

২০১০ – জরোআর্ক দ্য মাস্টার অফ ইল্যিউশন – জরোআর্ক এবং জরোয়া

২০১১ – ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট – ভিকটিনি, রেশির‍্যাম এবং জেকরম

২০১২ – ক্যিউরেম ভার্সেস দ্য সোর্ড অফ জাস্টিস – কোবালিয়ন, ভিজিয়ন, টেরাকিয়ন এবং ক্যিউরেম

২০১৩ – জেনেসেক্ট অ্যান্ড দ্য লেজেন্ড অ্যাওয়কেন্ড – জেনেসেক্ট

২০১৪ – ডায়ানসি অ্যান্ড দ্য ককুন অফ ডেস্ট্রাকশন – ডায়ানসি এবং ভেলটাই

২০১৫ – হুপা অ্যান্ড দ্য ক্ল্যাশ অফ এজেস – হুপা

২০১৬ – ভলক্যানিয়ন অ্যান্ড দ্য মেকানিকাল মার্ভেল – ভলক্যানিয়ন এবং মাগ্যিয়ের্না

২০১৭ – আই চুস ইউ – হোওহ

২০১৮ – দ্য পাওয়ার অফ আস – জেরাওরা ২০১৯ – মিউটু স্ট্রাইকস ব্যাক (রিমেক) – মিউ এবং মিউটু

এছাড়াও সম্প্রতি আরও একটি পোকেমন অ্যানিমেটেড মুভি বাজারে এসেছে। ২০২০-র ডিসেম্বরে তৈরি হয় ‘সিক্রেটস অফ দ্য জাঙ্গল’। এই মুভিটি অ্যানিমেটেড হলেও এর গল্প ডিটেক্টিভ পিকাচুর মতোই স্বতন্ত্র। এখানে অ্যাশের বদলে মূল চরিত্রের নাম হল কোকো।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৯)

পোকেমনের মুভিগুলোও তৈরি হয়েছে পোকেমন এপিসোডের আদলে। গল্প অবশ্যই আলাদা এবং স্বতন্ত্র। প্রত্যেক মুভিতেই অ্যাশ, পিকাচু এবং তাদের বন্ধুদের দেখানো হয়। ঘটনাচক্রে তারা কোনও এক রেয়ার অথবা লেজেন্ডারি পোকেমনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তারপর শুরু হয় টানটান অ্যাডভেঞ্চার। বিভিন্ন ঝুঁকি পেরিয়ে শেষে অ্যাশ জয়লাভ করে। গল্পের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে মানুষ এবং পোকেমনের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এবং সমাজের অন্যান্য ভালো দিকগুলোকে তুলে ধরা হয়। আসলে পোকেমন মানেই মানুষের সঙ্গে পোকেমনের বন্ধুত্ব এবং বিশ্বাস। যে সময় একটি মুভি বাজারে আসছে, ঠিক সেই সময়ে পোকেমন এপিসোডে দেখানো প্রধান চরিত্রকেই মুভিতে দেখা যায়। তাই পোকেমন এপিসোডের মতোই মুভিতেও অ্যাশ এবং পিকাচুর সঙ্গী হয় ব্রক, মিস্টি, ডন, মে, ম্যাক্স, সিলান, ক্ল্যেমেন্ট, বনি এবং অন্যান্যরা।

আরও পড়ুন: বাংলায় বিবিধরূপে মনসা পার্বণ ও রান্নাপুজো

মিউটু স্ট্রাইকস ব্যাক সিনেমায় অ্যাশের মৃত্যু এবং পিকাচুর কান্না

আরও একটি বিষয় হল যে, প্রত্যেক পোকেমন মুভির নায়ক হল অ্যাশ এবং পিকাচু। নায়ক থাকলে খলনায়ক তো থাকবেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই (মুভি এবং এপিসোড) খলনায়কের ভূমিকা পালন করে টিম রকেট। আগেই বলেছি যে, এই টিম রকেটে সবথেকে বেশি চর্চিত ৩ জন হল জেসি, জেমস এবং মিয়াওথ। তবে এই ভিলেন টিম রকেট সংস্থাটি বেশ বড়। এদের বস হল জিওভানি। জিওভানি অথবা টিম রকেটের দু’টো মূল উদ্দেশ্য, রেয়ার অথবা লেজেন্ডারি পোকেমন ধরা এবং তাদের শক্তিকে নিজেদের সুবিধের জন্য ব্যবহার করা। জিওভানি আসলে ভিরিডিয়ান শহরের জিম লিডার। অন্যদিকে, জিওভানিই মিউ থেকে কৃত্রিম পোকেমন মিউটু তৈরি করার জন্য দায়ী। শুধু তাই নয়, জিওভানি এবং টিম রকেট বিভিন্নভাবে পোকেমন চুরি করা এবং তাদের শক্তিকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে অত্যন্ত দক্ষ। বিভিন্ন সময়ে তারা পৃথিবী, মানবজাতি এবং পোকেমনদের সর্বনাশ ঘটানোর চেষ্টা করেছে।

আরও পড়ুন: ‘নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি’: বঙ্গে বিশ্বকর্মা

টিম রকেটের বস এবং ভিরিডিয়ান শহরের জিম লিডার জিওভানি

একটা উদাহরণ এক্ষেত্রে দেওয়া যেতে পারে। পোকেমনের প্রথম এবং শেষ মুভির হিউম্যান মেড এবং ল্যাবরেটরি বর্ন পোকেমন মিউটু-র সৃষ্টির পেছনে মূল হাত ছিল টিম রকেটের সাইন্টিস্টদের। এমনকী ডিটেকটিভ পিকাচু-তে মিউটু-কে তৈরি করা হয়েছে এইভাবেই। মিউটু-র মিউটেশনের জন্য টিম রকেট ব্যবহার করেছে সাইকিক পোকেমন মিউ-এর শক্তি। মিউটু অবশ্যই মিউএর থেকে বেশি শক্তিশালী। তবে কৃত্রিম পোকেমন হলেও মিউটু পোকেমনদের মন বুঝতে পারে। ঠিক এই কারণেই টিম রকেট কখনওই মিউটুকে আয়ত্তে আনতে পারেনি।

আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ার সমসাময়িক সাহিত্যপত্র

হোয়েন প্রদেশের টিম অ্যাকয়া এবং টিম ম্যাগমা

কিছু এপিসোডে এবং ৬নং মুভিতে আরও কিছু ভিলেন টিম দেখানো হয়েছে— টিম ম্যাগমা এবং টিম অ্যাকোয়া। এরা মূলত হোয়েন প্রদেশে কাজ করে এবং অ্যাশের হোয়েন লিগ এপিসোডে এদের দেখা যায়। টিম ম্যাগমা ফায়ার পোকেমন ব্যবহার করে এবং টিম অ্যাকোয়া ওয়াটার পোকেমন ব্যবহার করে। এদের কর্মপদ্ধতি একদমই টিম রকেটের মতো। তবে পোকেমনের ৯৭% মুভি এবং এপিসোডে দেখা যায় টিম রকেটকে। বিশেষত জেসি, জেমস এবং মিয়াওথকে। বলতে দ্বিধা নেই যে, এই তিনজন অ্যাশ এবং পিকাচুর মতোই প্রায় প্রত্যেক এপিসোডেই থাকে। এবং সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় যে, ভিলেন হলেও এরা তিনজন দর্শকদের কাছে ভীষণই জনপ্রিয়।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *