পোস্টমর্টেম: ২০২১ বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের অন্তর্স্বর

গৌতম গুহরায়

মাঝে গঙ্গা পশ্চিমবাংলাকে উত্তরে ও দক্ষিণে আলাদা করে রেখেছে। ফরাক্কার সেতু হওয়ার আগে, দেশ বিভাজিত হওয়ার পরেও নৌকায় করে এক কষ্টসাধ্য পাড়ি দিয়ে এ-পাড়ের মানুষকে ও-পাড়ে যেতে হত। পশ্চিমবাংলার উত্তর ও দক্ষিণের এই দুরত্ব আজও মেটেনি। এই দূরত্ব গণতন্ত্রের উৎসবেও দেখা যায় ও যাচ্ছে। ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচন বা তার পরের পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে এবারের বিধানসভা নির্বাচন, দুই বাংলার রায় ভিন্ন রয়েই গেল। সেই সময় দেখা গিয়েছিল গোটা বাংলার রায়ের ভিন্ন রায় এখানের মানুষ দিয়েছে। ২০১১-র পরের পঞ্চায়েত নির্বাচনে একমাত্র জলপাইগুড়ি জিলা পরিষদ ছিল বামদের দখলে। দক্ষিণ বাংলা যখন প্রায় সমস্বরে বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করছে তখন এই উত্তরে তারা মাটি খুঁজে পাচ্ছে।

আরও পড়ুন: এটাই পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্য

এবারের নির্বাচন অন্যান্য বারের থেকে নানা অর্থেই ভিন্ন ছিল। উত্তরবাংলা সন্নিহিত অসমের এনআরসি সংক্রান্ত সমাস্যার প্রত্যক্ষ প্রভাব এখানে ছিল। এছাড়াও ভৌগলিক দিক থেকে তিনটি আন্তর্জাতিক সীমানা ও দু’টি রাজ্য সীমানা ছুঁয়ে থাকা এই অঞ্চলের স্পর্শকাতরতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হিমালয় ও সন্নিহিত এই অঞ্চলের জনজাতি ও ভাষাগত বৈচিত্র্য এখানকার জনসমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এর উপর বিরাট এলাকা জুড়ে থাকা চা-বাগান, এর শ্রমিক শ্রেণি নির্ণায়ক ভোটার প্রায় ১৬টি বিধান সভার ক্ষেত্রে। চা-বাগানগুলো শতবর্ষের অধীক কাল ধরে হিমালয় ও সন্নিহিত অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে এসেছে। চা-বাগানের সেই রমরমা অবস্থা আগের মতো নেই এটি সত্যি, কিন্তু এখনও প্রায় ৫ লক্ষ শ্রমিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত। এদের প্রতি যুগযুগ ধরে যে বঞ্চনা চলছে যার থেকে এরা বের হতে পারছে না, আজও। অশিক্ষা, অপুষ্টি, অসুস্থতা এদের ভবিতব্য। এর উপর হিউম্যান ট্রাফেকিং রয়েইছে। এই চা-শ্রমিকদের সংগঠনে বামপন্থীদের একাধিপত্য ছিল শ্রমিক আন্দোলনের জন্মলগ্ন থেকে। কিন্তু সম্প্রতি এদের মধ্যে ভিন্ন ভাবনা এসেছে, নিজেদের জাতিসত্তা নিয়ে স্বতন্ত্র আন্দোলনের পথে নেমেছে। তারা বাম, কংগ্রেসের বা আগের ও বর্তমানের শাসকদলের প্রতি আশাভঙ্গের যন্ত্রণা অনুভব করছে। এরা মূলত ছোটনাগপুর সহ ওই অঞ্চল থেকে আড়কাঠি দিয়ে নিয়ে আসা আদিবাসী মানুষজন। ফলে ভাষাগত ও জাতিগত ভিন্নতা ছিলই। এবারের নির্বাচনে শাসক বিরোধী অবস্থানে যাওয়ার ফলে চা-বলয়ের ভোটের ফল ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’ বিরোধী হয়েছে। এর ফলে চা-বলয়ে তৃণমূল ও সহযোগীরা নিশ্চিহ্ন প্রায়। আর যে অঞ্চলে একাধিপত্য ছিল বামপন্থীদের, শ্রমিক আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম মানুষজনের সেই মিথ আজ শুধুই মিথ। নকশালবাড়ি আন্দোলনের এই ভিত্তিভূমির চা-বাগানগুলো থেকে লাল পতাকা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ক’বছর আগেই। মধ্যবিত্ত ও মুলত ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রিত শহর শিলিগুড়িতে এবার বামপন্থীদের শেষ প্রদীপটিও নিভে যাওয়ার পেছেন যদিও অন্য কিছু ‘ফ্যাক্টর’ কাজ করেছিল। অশোক ভট্টাচার্য এখানে জনপ্রিয়তম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা ও দলের মধ্যে বিরুদ্ধ স্বরকে সহ্য করতে না পারার অভিযোগ আগেও ছিল। সেই কারণেই হয়তো রাজনৈতিক শিষ্য শঙ্কর ঘোষ বিজেপি থেকে দাঁড়িয়ে অস্বাভাবিক ফল করে ফেললেন। বিখ্যাত নোবেলজয়ী সাহিত্যিক মার্কেস বলেছিলেন যে, ক্ষমতা মানুষকে নিঃসঙ্গ করে, এই নিঃসঙ্গতা সে বুঝতে পারে না। অশোকবাবুর মতো ক্ষমতার নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে না পারার খেসারত দিলেন গৌতম দেব, সৌরভ চক্রবর্তীরাও। কোচবিহারের দীর্ঘদিনের সাংসদ ছিলেন অমর রায় প্রধান, তাঁর ছেলে অর্ঘ্য রায় প্রধান তৃণমূলে এসে বিধায়ক হয়েছিলেন। কোচবিহারের রাজনীতির প্রধান বাম মুখ ছিলেন কমল গুহ, তিনি প্রয়াত হওয়ার পর উত্তরের ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রধান চেহারা ছিলেন উদয়ন গুহ। তিনিও নানা সমীকরণে তৃণমূলে যান, এরপর দুঃসময়েও বিধায়ক পদ ধরে রাখা পরেশ অধিকারীও। ফলে ওই জেলায় বামশক্তি হীনবল হয়। তৃণমূলের লোভের রাজনীতির এই চাল একদিন তাদের বিরুদ্ধেই যায়, উত্থান ঘটে বিজেপির, যার প্রধান চেহার নিশীথ প্রামাণিক বা মিহির গোস্বামীর তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এখানে তৃণমূল থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। সেই এগিয়ে থাকা ফল প্রায় অপরিবর্তিত রেখে দিল তারা।

আরও পড়ুন: বাংলা নিজের মেয়েকেই চাইল, কিন্তু বাংলার মানুষও এখনও অনেক কিছু চায়

গোটা রাজ্যের থেকে এই অঞ্চলের আরও এক ভিন্নতা চিহ্নিত করা যায় তথাকথিত ‘বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন’ দিয়ে। এখানে পুঞ্জিভূত একাধিক স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবিতে সংগঠিত আন্দোলন। কোনও কোনও দল এদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে চিহ্নিত করলেও নিবার্চনের সমীকরণে এই দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিচ্ছিন্নতার আন্দোলনকে মোকাবিলা করতে গিয়ে একের পর এক ‘অ্যাকাডেমি’, ‘পরিষদ’ গঠন করে দিয়েছেন। কিন্তু এই সুবিধাবাদী কৌশল খুব একটা কাজে আসেনি। কামতাপুরি, গোর্খাল্যান্ড, গ্রেটার কোচবিহারের মতো দল বা গোষ্ঠী নির্বাচনে বস্তুত আলাদা কোনও প্রভাব রাখতে পারেনি। কখনও কখনও জাতি গোষ্ঠীর আবেগ থেকে ধর্মীয় আবেগ এগিয়ে থাকে, এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি এখানে সুবিধাজনক জায়গায় থেকেছে। এই অঞ্চলের মধ্যবৃত্তের একটা বড় অংশ দেশভাগের স্মৃতি নিয়ে আসা মানুষ, এঁদের মধ্যে নিজেদের মতো কাজ করেছে আরএসএস এবং বিজেপি। এর ফল সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। যে অঞ্চল থেকে রতনলাল ব্রহ্মণ, জ্যোতি বসুদের মতো অবিসংবাদিত বামপন্থী নেতা অবিভক্ত বাংলার আইনসভায় এখান থেকে জয়ী হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তেভাগা আন্দোলন, চা-শ্রমিক আন্দোলনের, নকশালবাড়ি আন্দোলনের ভিত্তিভূমিতে জাতি সত্তার, ধর্মীয় সত্তার রাজনীতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে তা সময় বলবে।

তবে শুধু ধর্মীয় বা জাতি সত্তার আবেগ নয় কোনও কোনও অঞ্চলে বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনের পেশি দর্শন মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছিল। তার জবাব এবারের ও বিগত পার্লামেন্ট নির্বাচনে দিয়েছেন অনেকে। নিজের ভোট নিজে দিতে না পারার বা ভোটে দাঁড়াতে না দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে মানুষ ভুলতে পারেনি।

আরও পড়ুন: গণতন্ত্র ও আমরা

গোটা বাংলার নির্বাচনের ফলে দেখা যাচ্ছে যে, বাঙালির স্বাভিমান রক্ষার পক্ষে রায় দিয়েছে জনতা। মূলত ভিনরাজ্যের নেতৃত্বের ভাষণে যে ‘সোনার বাংলা’র কথা ছিল, তার প্রতি বিশ্বাস রাখেনি মানুষ। কিন্তু ধর্মীয় মেরুকরণের বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি ভেবেছে তারা। এবারের নির্বাচন অন্যান্য বারের থেকে অনেকটাই ভিন্ন এই কারণে যে, আগে কোনওদিন ধর্মীয় শ্লোগান, ব্যক্তি কুৎসার ধর্মীয় রং এমন দাপিয়ে বসেনি নির্বাচনের প্রচারে। এই দাপাদাপির ফলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটা আতঙ্ক জন্মেছিল এটা স্বাভাবিক। সেই কারণে তার একদিক বেছে নিয়েছে, তৃণমূল। এখানেও বামও কংগ্রেসের ভুল ছিল যে, তারা ভেবেছিল আব্বাসের তথাকথিত সেকুলার ফ্রন্ট মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছে, কিন্তু তারা বাংলার প্রায় ৪ কোটি মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করে না এটা তারা জেনেও না জানার ভুল করল। এর ফলে আদর্শগত বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হল তাদের। মানুষ একপক্ষকেই বেছে নিল। এর কুফল যেটা হল, তা হল― নির্বাচনী রাজনীতির প্রচার থেকে আদর্শভিত্তিক প্রচার, মানুষের জীবন সুরক্ষা, চাকরির দাবি প্রভৃতি গুরুত্বহীন হয়ে গেল। মেরুকরণের এই বিষময় প্রকোপ দেশভাগের আগে দেখেছে বাংলা, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করে ধর্মীয় ও ভাষাগত বহুত্ববাদ পীঠস্থান যে বাংলা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রগতিশীল দুর্গ যে বাংলা তার সামনে এক বিপদের ঘণ্টি বাজিয়ে দিল এই নির্বাচন। আগামীতে বাংলা ও বাঙালি কোন পথে এগোবে, আগামী সময় কী নির্ধারণ করবে, বাংলার এই স্বাতন্ত্র্য রক্ষিত হবে কি না, তা সময়ই বলবে। নগর বাংলার মানুষ, শিক্ষিত অংশ যেভাবে ভেবেছেন গোটা বাংলার ভাবনা তার থেকে ভিন্ন হয়নি। ‘বহিরাগত’ ও ‘বাংলার মেয়ে’কে অসম্মান একটি প্রভাবশালী প্রচার হয়েছিল এই রায়ে সেটা মানতেই হয়। যোগী আদিত্যনাথ, বিজয়বর্গীয় বা এই বাংলার অনেক বিজেপি নেতার ভাষায় সাম্প্রদায়িক স্বর যেভাবে প্রকাশ্যে এসেছিল, তা বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সচেতন অংশের সঙ্গে অধিকাংশ মানুষের মনে এই আশঙ্কা জন্ম দেয় যে, এই বাংলার পক্ষে বিজেপি আগ্রাসী আম্প্রদায়িকতার আমদানি করছে। বাংলার মুসলমান সহ অন্যেরাও ভেবে নেয় যে ‘আদ্যোপান্ত সাম্প্রদায়িক দল’টাকে আটকাতে পারলে অন্তত বেঁচে থাকা যাবে। এটারই প্রতিফলন ভোট বাক্সে পড়েছে। বামপন্থীদের প্রতি বিশ্বাস হারানো বাংলার মানুষের কাছে এই মুহূর্তে একটাই বিকল্প ছিল, সে সেখানেই ভোট দিয়েছে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *