প্রাচীন ইটের ডাকবাক্স

উমা মণ্ডল


এখনও চিঠির সারি থেকে খুঁজে চলে লুপ্তপ্রায়
কথাগুলি; বা রংছবি শব্দের ব্যথার
স্তূপীকৃত এই পদাবলি যেন ঘুমে ঢাকা কোন
কালবৈশাখীর মেঘ
পুড়ে পুড়ে কালো ছবি আঁকে আকাশের গায়ে

কবে থেকে লিখেছিল মনে পড়ে না আর সে কথা
তবু ব্যথা তো জলের রেখা তো; বিষের ধোঁয়া
নীল গুলে লেপে দেয় প্রত্যেক ঘরের কোণে
তারপর ভেঙে বৃষ্টি তুমুল ধারায়

ইটগুলি জানে সব। তবু ভরা ইন্টারনেটের
যুগে চিঠি লেখে
রক্ত কাঁদে, পাচীন ধুলোর কোলে বসে

আরও পড়ুন: বর্ষা সিরিজ (পরবর্তী অংশ)


অশ্বত্থের পাশে নাটমন্দিরের শিলালিপি
ধূসর ধূসর গন্ধে চোখ জ্বালা করে
এই বুঝি আদি ধুনা রিংয়ের আকারে
ব্রহ্মাণ্ডের চৌকাঠের পাশে বাবু বসে
দেবী বুঝি ভোগ নেবে গৃহস্থের হাত থেকে
লুচি সুজি; ভিয়েনের আগুন ঊর্ধ্বমুখী
ঘিয়ের সুবাস… সেই চোখ জ্বলে

হাড়িকাঠে ধুলো জমে পুরু হয়ে গেছে
কতকাল যে লালের পাশ দিয়ে যায় না গো
ডানাকাটা পাখি স্বপ্ন দেখে সাতসমুদ্রের রাজপুত্তুরের
ঘোড়া উড়ে যায়
থাক ইতিকথা ছেলে ভুলোনো পার্বণ
এখন দেবীর চোখ লাল; মাহেন্দ্রের ঘণ্টা বাজে
একশো আট পদ্ম নিয়ে আরতির ফ্ল্যাশব্যাক
নেচে নেচে চামরের সাদা চুলগুলি বাতাসের
কাছে খোঁজ করে লুপ্ত ঘরগুলির জানালা…
থেকে দূরে ঝুপ করে আঁচলের শব্দ
ভুল ছিল ব্যথা ছিল

আরও পড়ুন: আলোছায়ার লেখা


বুড়ির বাকুলে কে হেঁটে বেড়ায়
লাল ইট অন্ধকারে হাত তুলে ডাকে
কিছুক্ষণ নিঃশব্দের ঘাম থেমে থাকে
তারপর নদী হু-হু করে, বান আসে
থইথই কাগজের নৌকা ভেসে যায়
সহজ পাঠের পাতা ছিল; থেকে ভাঁজে ভাঁজে
পদ্মানদী ও আমার গঙ্গানদী

গাঢ় অমাবস্যা নেমে আসে পাড় ধরে
ছায়া ছায়া বনজের কাঁটা কাঁটা শব্দগুলো
ঝোপেঝাড়ে ঘর বাঁধে সাধের নৌকার বৈঠা
শুধু বয়ে যাওয়া ভালোবাসা নিয়ে কাঁধে করে
বরফের পাশ দিয়ে উঁকি দেয় ছেলেবেলা
লাল জামা উড়ে যায় প্রাচীন ইটের কাছে
চুপিচুপি বলে; শব হয়ে আছে সব…

আরও পড়ুন: আয়ুবিষয়ক


দীর্ঘ বিরতিতে ছিল ঠাকুমার ঝুলি
লণ্ঠনের পাশে মাদুরের এইভাবে শুয়ে থাকা
তীব্র হিংসার ভাষারা দপ করে জ্বলে ওঠে
মায়া কাজলের কাছে অশনিসংকেত
বেহাগের আলাপের মতো; দুঃখ হাসে
ময়নামতির আদরে আবডালে
নিশাচর পেঁচা গজগজ করে যায়

চুরি করে আনা ফল
আচারের আবেগের দড়িগুলো এতই গরিব
কেটে কেটে যায়
মাপজোক করে সুদে আসলের বাটখারা নিয়ে
তর্ক হয়; তারপর কাঁটা চিরে দেয়
হৃৎপিণ্ডের শিরা ধমনীর সব পথ

ধু-ধু আলো-আঁধারির দরজা কতদিন বন্ধ
বারবার ধাক্কা দিয়ে খোলে না চিচিংফাঁক

আরও পড়ুন: হাথক দরপণ


সদর পুকুরে ডাক শুনে ছুটে গিয়েছিল
রাঙাবউ; পাশে গোলাবাড়ি
ননদিনী কি দিনেও আফিমের নেশা করে…
বিধবার একাদশী পড়ে আছে ধানের ঘরেতে
উল্টে যাওয়া গ্লাসে জল; শূন্য হয়ে আছে
মা লক্ষ্মীর হাঁড়ি

কে ডাক দিল তাহলে, ভ্রম
ছায়াপথে এতগুলো ডানাভাঙা প্রজাপতি
সে তো চুকে বুকে গেছে বেশ কিছুকাল আগে
অথচ রাধা বিরহ
যমুনার কালো জল কিছুদিন থেকে পুকুরের জলে দেখা
গিয়েছিল বটে
পোড়া কপাল মেয়ের; ডুব দে জলেতে
দিয়েছিল ডুব, ওইটুকু গ্লাস; তবু জল ঠিক
টেনে নেয় দাগ, ভিতরের আখ্যানগুলোকে

পরজন্মে কন্যা হয়ে এসো আঁচলের কাছে
জমিয়ে রেখেছি আতরের রাতগুলো
একটাও ঘুণ পোকা কাছে আসতে দেবে না
বউদিদি দেখো

আরও পড়ুন: তিনটি কবিতা


এখনও চিঠির সারি থেকে খুঁজে চলে লুপ্তপ্রায়
এই ভরা ইন্টারনেটের যুগে চিঠি লেখে
ইটের ডাকবাক্স
শাখাপ্রশাখায় ঝিঁ ঝিঁ; বলে
আয়না আয়রে

জিনগত সমীকরণের পাড়ে কিছু নেই
শূন্যের পরে কী…
জানি না তো

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *