কাছের মানুষ প্রণবদা

শুভেন্দু বারিক

৩১ আগস্ট, ২০২০, বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিট, প্রণবদা চলে গেলেন। একটি মানুষ, যিনি ভারতীয় সংবিধানকে আক্ষরিক অর্থে আন্তরিকতার সঙ্গে সম্মান করতেন; মন্ত্রগুপ্তির শপথ কোনও দিন কোনওভাবে ভঙ্গ করেননি, এমনকী ইন্দিরা গান্ধির দুঃসময়ে তাঁর অনেক কাছের লোক, অনুগ্রহপুষ্ট লোক তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেও প্রণবদা কখনও সরে যাননি। ইন্দিরাকে নিজের দ্বিতীয় মা ভাবতেন, ইন্দিরাও তাঁকে ছেলে হিসেবে দেখতেন। স্থিতপ্রজ্ঞ ছিলেন তিনি। কোনও বিষয়ে বিচলিত হতে দেখিনি। সিদ্ধান্ত নিতেন অনেক ভেবেচিন্তে। তিনি যখন পুরোপুরি রাজনীতিতে যোগ দিলেন, তার আগেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন। অন্য অনেকের মতো লিয়েন নিয়ে রাজনীতি করেননি। আমার সৌভাগ্য তাঁর নিকট সান্নিধ্য যেমন পেয়েছি, পেয়েছি তেমনি স্নেহও। জুনের শেষ শনিবার (২৭/৬/২০২০) আমার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। যেমন প্রায়ই কথা হত শনিবার সকালে বিশেষ সময়ে। আমার ৭৮তম জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমাকে বলেছিলেন— ‘কাজ করে যা অন্যের জন্য, সেটাই দেশসেবা।’

দিনের নির্দিষ্ট সময় ফোন তুলে যখন বলি— ‘শুভেন্দু বলছি’; জবাব আসে— ‘কেমন আছিস, কলেজের সবাই কেমন— কাজ শুরু হয়েছে তো?’— এমন আন্তরিক সংলাপ আসছে ফোনের ও-প্রান্তের বিশিষ্টতম মানুষের কণ্ঠ থেকে। তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়, আমাদের ‘প্রণবদা’। কলেজ থেকে অবসর নিয়েছি সতেরো বছর, অথচ যোগটা রয়ে গেছে নিয়মিত, প্রণবদা জানেন। প্রণবদার সক্রিয় উদ্যো্গে কলেজের যে উন্নয়নের কাজ চলছে, তারই খবরাখবর জানতে চান। আমি এবং কার্তিকদা (কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং বর্তমান পরিচালন সমিতির সভাপতি) নিয়মিত যোগাযোগ রাখি প্রণবদার সঙ্গে। যখনই কথা বলেন— একইরকম আন্তরিকতার স্বর; যার শুরু সেই ১৯৬৩ সাল থেকে।

আমি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র আর প্রণবদা বিদ‍্যানগর কলেজের নবাগত অধ্যাপক। আসলে আমার থাকার জায়গা আর প্রণবদার কাজের জায়গার মূল কেন্দ্র  বহুবাজারের ‘ভারতসভা’ (Indian Association )। দু’জনের বাবা-ই প্রাক্তন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ভারতসভার সাধারণ সম্পাদক হরেনবাবুর (হরেন্দ্রনাথ মজুমদার, এমএলসি) সুহৃদ। ভারতসভার তৎকালীন সভাপতি ছিলেন এন সি চ‍্যাটার্জি, লোকসভার প্রাক্তন অধ‍্যক্ষ সোমনাথ চ‍্যাটার্জির বাবা। হরেনবাবু বিদ‍্যানগর কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি। আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ বারিক ওই সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অখিলভারত প্রাথমিক শিক্ষক সংঘের সম্পাদক। আমি ওখানে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি এবং আমার খরচ চালানোর রুজি আসে ভারতসভা গ্রন্থাগারের সহকারী হিসেবে কাজ করে।

বিদ‍্যানগর কলেজ সবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (১৯৬৩-র ২৯ জুলাই), ক্লাস শুরু ৮ আগস্ট থেকে। প্রথমদিন যোগ দিয়েছিলেন অধ‍্যক্ষ সুশীলকুমার চ‍্যাটার্জি। অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন শ্রীমতী মঞ্জুশ্রী বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় (ইংরেজি), শ্রীরবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (অর্থশাস্ত্র ), শ্রীসচ্চিদানন্দ সরকার (ইতিহাস), শ্রীবিশ্বনাথ কয়াল (ইংরেজি, আংশিক সময় )। ৯ আগস্ট শ্রীতুষার রঞ্জন চ‍্যাটার্জি (বাংলা) এবং ১০ আগস্ট যোগ দেন শ্রীপ্রণবকুমার মুখার্জি (রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস)।

বিদ্যানগর কলেজ। ছবি: vidyanagarcollege.net

একবছর পর অর্থাৎ ১৯৬৪-র আগস্ট থেকে প্রণবদাকে উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন থেকে দৈনন্দিন কার্যক্রমের সবকিছু বুঝে নিতে এবং পরিচালকদের বুঝিয়ে দিতে নিয়মিতভাবে ওঁকে আসতে হত ভারতসভা ভবনে। থাকতেন হাওড়ার কদমতলায়। এক একদিন রাত হয়ে গেলে আমাদের সঙ্গেই ভারতসভাতে থেকে যেতেন। হাওড়া থেকে প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে কলেজ। ওখানেই শিক্ষাকর্মী বিশ্বনাথ সামান্য কিছু রান্না করে দিলে তাতেই ওঁর চলে যেত। কখনও খাবার ব্যাপারে বিশেষ বাছবিচার ছিল না। কিছু সেদ্ধ, একটু ডাল আর সামান্য আলুপোস্ত— ব্যস। মাঝেমধ্যে আমিও চলে যেতাম ওঁর খাবারে ভাগ বসাতে। অন্যদিকে, ভারতসভায় আমার ইকমিক কুকারে রান্না করা মাংস ভাত কিংবা বিকেলে টেবিলে পাতা কাগজে মুড়ি-বাদাম-বাতাসা কিংবা আমার রান্না করা সাবুর খিচুড়ি চেয়ে খেয়ে তৃপ্তি প্রকাশ করেছেন— সে-সব ভোলার নয়।

ইতিমধ্যে ভারতসভার গ্রন্থাগারিক বীরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হলে প্রণবদাকেই ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়। কলেজের পঠন-পাঠন, উপাধ্যক্ষের দায়, সরকারি অফিসে যাতায়াত এবং সন্ধ্যায় গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব সামলাতেন সুচারুভাবে। এই সময় থেকে ওঁর আরও বেশি কাছে আসার সুযোগ হয় আমার।

এদিকে রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও খাদ্য আন্দোলন ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। উত্তর চব্বিশ পরগনার স্বরূপনগর— বাদুড়িয়াতে তা তীব্র আকার নেয়। পুলিশের গুলিতে কিছু মানুষ হতাহত হয়। বিধান পরিষদের সদস্য হিসেবে হরেনবাবু ওই অঞ্চলের আন্দোলনজনিত পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখে রিপোর্ট দিতে প্রণবদাকে পাঠান; আমি যাই ওঁর সহকারী হিসেবে। আমরা চারদিন ওই অঞ্চলে ঘুরে যে তথ্য সংগ্রহ করি, তা রাজ্য বিধান পরিষদে হরেনবাবু তুলে ধরেন। বেশ শোরগোল পড়ে।

এরপর এল ১৯৬৭-র সাধারণ নির্বাচন। হরেনবাবু হাসনাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রে এবং অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী হলেন। এঁদের হয়ে প্রচারের মুখ্য দায়িত্ব পড়ল প্রণবদার ওপর আর অফিস ইত্যাদি সামলানোর দায়িত্ব আমার ওপর। ওই সময় দিনরাত এক করে নাওয়া-খাওয়া প্রায় ভুলে গ্রামগঞ্জের মাঠ-ময়দানে ঘুরে প্রণবদা যেভাবে তথ্যসমৃদ্ধ বক্তৃতায় প্রচারের দায়িত্ব পালন করলেন এবং ওঁরা দু’জন বিপুল ভোটে জয়ী হলেন, তাতে প্রণবদার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও বাগ্মিতায় হরেনবাবুদের আস্থা অনেক গুণ বেড়ে গেল। ওদিকে কলেজ গড়ে উঠছে, অনেক কাজ।এখানকার সাধারণ মানুষ, চায়ের দোকানি থেকে বাসের স্টার্টার, প্রকৃতি, ছাত্রছাত্রীদের অকৃপণ ভালোবাসা ওঁর মনে বিদ্যানগরে থাকবার বাসনা জাগিয়ে তুলল, এক খণ্ড জমিও কিনে ফেললেন। বয়স্ক ছাত্রদের সুবিধার্থে সন্ধ্যায় হ্যাজাক জ্বালিয়ে ক্লাস নেবার ব্যবস্থা হল। শুরু করলেন কলেজ সংলগ্ন কমিউনিটি সেন্টারের ঘরে থাকতে। সাধারণত যা হয়ে থাকে, এই সক্রিয়তায় কিছু লোকের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ধীরেন্দ্রনাথ বেরা এবং উপাধ্যক্ষ (তখন কোনও অধ্যক্ষ ছিলেন না) প্রণবদা। ওঁর এসব ভালো লাগছিল না।

১৯৬৭-র নির্বাচনে অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে বাংলা কংগ্রেসের জন্ম হল। সুশীল ধাড়া হলেন সাধারণ সম্পাদক। হরেনবাবুর পরামর্শে সুশীলবাবুরা প্রণবদাকে অফিস সেক্রেটারি হিসেবে নিলেন। এভাবে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আগে তিনি কলেজের শিক্ষকতাপদে ইস্তফা দিলেন— সেটা ১৯৬৮ সাল। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলা কংগ্রেসের কোটায় প্রণবদা রাজ্যসভায় মনোনীত হলেন। প্রণবদার বাগ্মিতা দিল্লির নেতৃবৃন্দকে আকৃষ্ট করল। বিশেষত ‘রাজন্যভাতা বিলোপ’ এবং ‘ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ’ সম্পর্কিত বিল দু’টির আলোচনায় প্রণবদার দৃপ্ত, তথ্যনিষ্ঠ ও আবেগী বক্তৃতা শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধিকে মুগ্ধ করে। সভাশেষে তিনি তাঁকে নিজের কক্ষে ডেকে নেন। পরে তো ওঁদের দু’জনের সম্পর্ক কত গভীর হয়েছিল, শ্রীমতী গান্ধি কত ব্যাপারে প্রণবদার ওপর নির্ভর করতেন, তা তো এখন ইতিহাস।

ওই সময় কলেজে বাংলা সাম্মানিক পাঠক্রম অনুমোদন পেলে আংশিক সময়ের শিক্ষক হিসেবে আমি যোগ দিই। ফলত কলেজে সহকর্মী হিসেবে কমদিনই ওঁকে পেয়েছি। কিন্তু অন্যভাবে যথার্থত সহকর্মী হিসেবে সেই ১৯৬৪ থেকে নানাভাবে জড়িয়ে ছিলাম— সে সম্পর্ক এখনও তেমনি অটুট। ২০০৪-এর নভেম্বরে আমার পুত্রের বিবাহ উপলক্ষে উনি যোগ দিতে না পারলেও আমার স্ত্রীকে ব্যক্তিগত চিঠিতে আমাদের পুত্র-পুত্রবধূকে আশীর্বাদ জানিয়েছেন। কিংবা ২০১৩-র অক্টোবরে (তখন তিনি রাষ্ট্রপতি) আমার একাত্তরতম জন্মদিনে ফোনে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন— ‘অনেক অনেক কাজ করতে হবে, সুস্থ থাকতে হবে। ভালো থাকিস।’

১৯৮১-৮২’তে আমি যখন শিক্ষা সংসদের সম্পাদক আর প্রণবদা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী, তখন প্রাক্তন ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে আমরা ওঁর কাছে কলেজের উন্নয়নে সাহায্য চাই। নিউ আলিপুরে মঞ্জুদির (কলেজের প্রথম দিককার শিক্ষিকা) বাড়িতে উনি আমাদের সঙ্গে বসেন এবং ঠিক হয় অর্থমন্ত্রী হিসেবে নয়, অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু সাহায্য করা যায় কিনা দেখবেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই রাজস্থানের পিলনি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আড়াই লক্ষ টাকা পাই। ওই টাকায় কলেজে একটি চারতলার ভিতযুক্ত হলঘর তৈরি এবং কলেজের খেলার মাঠের জন্য প্রায় সাড়ে তিন একর জমি কেনা হয়। সেই বাড়ির দ্বারোদ্ঘাটন করতে আসেন প্রণবদা। সেদিনের অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির তৎকালীন সম্পাদক চন্দন রায়চৌধুরি।

২০১১–র সেপ্টেম্বরে কলেজের প্রাণীবিদ‍্যা ও দর্শন বিভাগ আয়োজিত ইউজিসি স্পনসর্ড জাতীয় আলোচনাচক্রে যোগ দিতে এসে  তিনি আমাদের সঙ্গে একান্ত ঘরোয়া আলোচনায় বসেছিলেন। ব‍্যক্তিগত আলাপচারিতায় সে আলোচনা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। সেমিনার উপলক্ষে প্রকাশিত স‍্যুভেনিরে আমার লেখা ‘ফেলে আসা দিনগুলি ‘সম্পর্কে প্রণবদা ভাষণ দিতে উঠে বললেন—  ‘শুভেন্দুর লেখা পড়তে পড়তে সত‍্য সত‍্যই সেইসব দিনকে যেন ফিরে পেলাম।’ এরপর আমরা কয়েকজন ঢাকুরিয়ায় ওঁর বাড়িতে দেখা করে কলেজের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সামগ্রিক পরিকাঠামোর উন্নয়নের উদ্দেশ্যে সরকারি সাহায্যের আবেদন করি। উনি পরামর্শ দেন আমরা যা চাই তার বিস্তারিত প্রকল্প তৈরি করে যেন ইউজিসি-তে পাঠাই। স্বভাবতই প্রকল্প তৈরিতে অনেকটা সময় কেটে যায়। অবশ‍্য জমা দেবার কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিনিধিরা কলেজ পরিদর্শনে আসেন এবং প্রার্থিত অর্থ মঞ্জুর করতে তৎপর হন। ইতিমধ্যে মঞ্জুরীকৃত অর্থের একটি অংশ আমরা পেয়ে গিয়েছি। ২৫ জুলাই, ২০১২ যেদিন রাষ্ট্রপতি পদে অভিষিক্ত হচ্ছেন, সেদিনও ফোনে কথা হয়েছে। আগাম শুভেচ্ছা জানাতে বললেন, ‘এখন প্রস্তুতি চলছে, ব‍্যস্ত আছি, পরে কথা হবে।’

২৯ জুলাই ২০১২ কলেজ প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উৎসবের সূচনায় এলাকার মানুষ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়ে পদযাত্রার আয়োজন হয়। আমরাও (আমি এবং সহকর্মী কবি পবিত্র মুখোপাধ‍্যায়) যাচ্ছি। অন‍্যদিনের মতো ওঁর সঙ্গে কথা বলার সময় এসে যাওয়ায় গাড়িতে বসেই ফোন করি। উৎসবের সর্বাঙ্গীন সাফল‍্য কামনা করে এবং সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেন, ‘ইউজিসির অনুদানের টাকা শিগ্‌গির পেয়ে যাবি; কিছুদিনের মধ্যে কলেজের অনুষ্ঠানে যাব। ‘পবিত্র’র সঙ্গেও কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি হবার কয়েকদিন পরে ফোন করতেই বললেন, ‘কবে আসছিস? সবাইকে নিয়ে আয়।’ বললাম— ‘আপনি কিছুদিন থিতু হবার পর আমরা কয়েকজন যাব।’ নভেম্বরের মাঝামাঝি ফোন করে বললেন, (একইদিনে কার্তিকদাকেও) ‘আগামী জানুয়ারির ১৮ থেকে ২০ কলকাতায় থাকব। অনেকগুলো অনুষ্ঠান আছে। ওই সময় কলেজের অনুষ্ঠান করতে পারলে ভালো হয়, আমি যাব।’ আমাদের সে কী আনন্দ! একইসঙ্গে চিন্তাও বেড়ে গেল অনেকগুণ। রাষ্ট্রপতি আসবেন। নানারকম প্রোটোকলের জটিলতা, সবকিছু সামলানো সহজ নয়। তাছাড়া ডিসেম্বরে অধ‍্যক্ষ  অবসর নিচ্ছেন। দায়িত্বে আসছেন আমাদের সকলের প্রিয়ভাজন ড. অরবিন্দ ঘোষ। দেখলাম, কার্তিকদা ও অরবিন্দের নেতৃত্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা সেই বিরাট কর্মযজ্ঞ সুচারুভাবে সম্পন্ন করলেন। প্রচলিত প্রোটোকল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণের একটি খসড়া উদ‍্যোক্তাদের পক্ষ থেকে পাঠাতে হয়। সেটি রাষ্ট্রপতির সচিবালয় অনুমোদন করলে (প্রয়োজনে পরিবর্তন করে) নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি সেটি পাঠ করেন। খসড়াটি রচনার দায়িত্ব ছিল আমার উপর এবং সেটি অপরিবর্তিত রেখেই অনুমোদন আসে। যদিও প্রণবদা অনুষ্ঠানে ওই লিখিত ভাষণের কিছুটা পড়ার পর বললেন, ‘এটা আমার নিজের কলেজ, এখানে কত সুখদুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে, সেসব কথা না বললে স্বস্তি পাব না।’ এরপর লিখিত ভাষণ পাশে সরিয়ে রেখে নিজস্ব স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে প্রায় এক ঘণ্টা দশ মিনিট (পূর্ব নির্ধারিত সময় বরাদ্দ ছিল পঁচিশ মিনিট) বক্তৃতা দিলেন, আন্তরিকতার ছোঁয়ায় সকলকে মাতিয়ে। ওইদিন প্রকাশ‍্য সভার আগে প্রথমে প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের এবং পরে সহকর্মী ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে আন্তরিক আলাপচারিতায় পুরনো দিনের কথা ও কলেজের ভবিষ্যৎ চলার পথের নির্দেশিকা দিলেন এবং সুবর্ণজয়ন্তী পূর্তির অনুষ্ঠানে আসবেন বলে জানিয়ে গেলেন। ওই সময় আমার সদ‍্য প্রকাশিত একটি কবিতা সংকলন— ‘কান পেতে রই’, ওঁকে উপহার দিই এবং সংকলনের একটি রচনা বিশেষভাবে দেখাই। সেখানে সদ‍্যপ্রয়াত কিশোরীদার (প্রণবদার সহকর্মী অধ্যাপক কিশোরীমোহন ভট্টাচার্য) বিষয় ছিল এবং প্রণবদার প্রসঙ্গও ছিল অবধারিতভাবে। উনি পুরো কবিতাটি নিবিষ্টভাবে পড়লেন। আশ্চর্যের বিষয় হল প্রকাশ‍্য সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বন্ধু বিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে প্রথমে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের একটি কবিতার অংশ আবৃত্তি করে বললেন, ‘শুভেন্দুও একটি কবিতা লিখেছে’। তারপরই আমার রচনার অংশ থেকে আটটি পঙ্‌ক্তি অবলীলায় আবৃত্তি করলেন। ওঁর স্মৃতিশক্তির কথা আগেই বলেছি। এখন দেখলাম একবার মাত্র পড়ে আমার ওই অকিঞ্চিৎকর লেখাটির অংশ হুবহু বলে গেলেন। অনুষ্ঠান শেষে আমার প্রাক্তন ছাত্ররা ঘিরে ধরে আমায় বলতে লাগল— ‘আপনি কবিতা লেখেন, জানতাম না তো।’

আর একটি ঘটনা। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে আমার সঙ্গে ফোনে ওঁর কথা হয়। সেদিনও হয়েছে। তবে প্রথম দু’বার ওঁকে পাইনি। ওঁর সচিব বললেন, উনি স্নানে গিয়েছেন, পরে কথা বলবেন। তার কিছুক্ষণ পরে আমাদের দু’জনের কথাও হয়। ওইদিন বিকেলে আমি এবং সুদীপ গোস্বামী (বড়িশা শশীভূষণ জনকল্যাণ বিদ‍্যাপীঠের প্রধানশিক্ষক) রাস্তায় হাঁটছি। এমন সময় একটি ফোন এল প্রণবদার। ‘কী রে তুই ফোন করেছিলি?’ আমি বললাম, ‘হ‍্যাঁ, সকালে তো আপনার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে!’ উনি বললেন, ‘না, আন অ্যাটেন্ডেড ফোনে তোর নম্বর দেখলাম।’ বিস্মিত না হয়ে থাকা যায়? সুদীপ বললেন, ‘রাষ্ট্রপতি আন অ্যাটেন্ডেড ফোন অ্যাটেন্ড করছেন তালিকা ধরে ধরে, ভাবা যায়‌!’ আর আমাদের আশপাশে নেতানেত্রীরা? হয়তো বড়জোর একজন কাউন্সিলর কিংবা স্থানীয় কোনও কমিটির প্রধান— তাঁরা তো ধরাছোঁয়ার বাইরে— যদি না কোনও ধরাকরার লোক থাকে। সত‍্যিই এরকম বড় মনের মানুষ আজ দুর্লভ।

কতবার বলেছেন রাষ্ট্রপতি হবার পর আগের মতো স্বাধীন নন, প্রোটোকলের গেরোয় বাঁধা। তিন বাহিনীর প্রধান হয়েও ওই তিনের ঘেরাটোপে সারাক্ষণ। তাই লেখায় নিজেকে সঁপে দিয়ে আজন্ম পড়ুয়া মানুষটি কিছুটা স্বস্তি পান।

বউদির (শুভ্রা মুখোপাধ‍্যায়) প্রয়াণের দিন চারেক পর অনেকক্ষণ কথা হল। সবই পুরনো কথা— কদমতলার স্মৃতি, ভারতসভার স্মৃতি— নিতান্তই ব‍্যক্তিগত কথা। কত ভারাক্রান্ত এবং দায়বদ্ধ— দেশ ও জাতির প্রতি।

প্রণবদা, যিনি জাতীয় স্তরের নীতি নির্ধারকের ভূমিকা বহুদিন পালন করেছেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা স্বীকৃত, সেই তিনি সবসময় কাছের মানুষটিই ছিলেন। তাঁর প্রতিটি কথাই কী আন্তরিক, কী উষ্ণ। আমি উদ্দীপিত হই যখন বলেন— ‘তোর কবিতার বই (‘সময়ের সঙ্গে’) পড়েছি, ভালো লাগল!’ ওই বইতে ওঁকে নিয়ে একটি লেখা আছে, সেটি এখানে উল্লেখ করে তাঁকে আমার প্রণাম জানাই।

দিল্লী দূর নয়

‘কাছের মানুষ’ কথাটা কথার কথা
নয় মোটেই— যখন বলো— ‘কেমন আছিস্’!
বর্তমান ভারতের প্রথম নাগরিক! তুমি
এখনও স্মরণে রাখো সাতষট্টির খরায়
মেঠো আল পার হয়ে শুকনো চিড়ে
আর পাটালি গুড়ে ক্ষুধা নিবারণ; পাশাপাশি
টাকি-হাউসের বনেদি আতিথেয়তাও; রাজনৈতিক
অস্থিরতার মাঝে কেমন করে হাসনাবাদ,
বসিরহাট জয় হয়েছিল— মজুমদার ও
কবিরের! এমনি কতোদিন কতোরাত পেরিয়েও
সিদ্ধান্তে অটল থাকলে— রাজনীতি আর
অধ‍্যাপনার সহবাস মানা নয় কখনো।
সম্মুখের দীর্ঘপথে সংযত পদক্ষেপ
বাধা-বিপত্তি হয়েছে সহনীয়। রাষ্ট্র ছাড়িয়ে
অন‍্য দিগন্তেও তোমার স্থিতপ্রজ্ঞার উজ্জ্বলতা
দীপ্তিমান! তোমার স্মৃতির ঝাঁপি ম্লান
করে স্মৃতিধরকেও—; কোটি কোটি মানুষের
ভীড়েও চিনে নাও আত্মজন— সহার্থীকে;
চাণক্য তোমার নাম বড়ো একপেশে। বরং
সঙ্কটে কাণ্ডারী তুমি দেশ ও জাতির;
গান্ধীবাদী পিতার উত্তরাধিকার বয়ে চলো
নিরন্তর; পৃষ্ঠে কোনও অস্ত্রলেখা থাকে না
অহিংস যোদ্ধার। সম্মিত উচ্চশির মহৎ
সন্তান, জেনো, বুকে থাকে জননীর!
এখনও একই কণ্ঠস্বরে শুনি ‘কেমন আছিস্’
বুঝি— মাথার ওপর আশিসধারা, আর
আশ্বাসের হাত-শুধু আমাতে নয়, আরো
আরো অনেক অনেক;— দিল্লী দূর নয়।’

লেখক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিদ‍্যানগর কলেজ। সহযোগী সম্পাদক কবিপত্র পত্রিকা। বিশিষ্ট সমাজসেবী। আত্মজন-এর প্রতিষ্ঠাতা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *