Latest News

Popular Posts

প্রেমের ২৭

প্রেমের ২৭

তন্ময় ভট্টাচার্য

হলফ

তোমাকে হলফ করে বলে যাচ্ছি, আয়নার লোক—
চাইলে কুপিয়ে মারো, পুঁতে দাও ন’হাত গভীরে
কৃমি ও কেঁচোর খাদ্য হয়ে ভাবব এটাই কবিতা
চুঁইয়ে এসেছ দেখে দুটো তর্ক হবে তো বটেই
তবু অন্য কথা ছেড়ে ডাকামাত্র ফেরত যাব না

পাটভাঙা

ভাঁজ-খোলা বেনারসী ফিরে গেল তোষকে আবার
নিচে কিন্তু চিঠি ছিল, পুরাতনী, ফেলে দিলে আজকের জবাব হত না

জবাবে কীই বা থাকে! ব্যথাপিঠ। ব্যথামন।
এপাশ-ওপাশ সেরে ভেবে নেওয়া, সকাল নতুন

রাত অব্দি যেতে ফের পাট ভাঙে। আবার তোষক…

চিঠি কি এসব বোঝে! বেনারসী আসে যায়

ওদের বিয়ের কথা হোক

স্থায়ী

তাহলে বোঝাই গেল, শীত-পরবর্তী এই রোদ
আমার চরিত্র ধরে হ্যাঁচকা মেরেছে টেনে নিয়ে যাচ্ছে প্রকাশ্য ধাঁধায়
তোমার সঙ্গে যদি না মেলে তবুও শান্তি যেখানে জানলা খুলে যায়
তেমন ধুলোর মধ্যে পুরনো আছেন আছে রোজের বাসনধোয়া ঘর
সেখানে আমাকে দুঃখ দিতে হয় ভেঙে ভেঙে, মাইনে পিছিয়ে গেলে পর
কাল থেকে রোদ খেয়ে বেঁচে থাকব এই চুক্তি মা-বাবার মতন শোনায়

তিথৌ

চামর দুলিয়ে গেল আমাদের দেখামাত্র ডাক

বাকি তো কৃত্রিম পাঠ। সতর্কে শোনার।
ভেতরে-ভেতরে কিন্তু সুর ভেসে উঠেছিল খুব
দু’একটা হাঁস নেমে এসেছিল চরণধূলায়

বদলপথের দিনে ওদেরও মন্দগতি থাক

হতবাক

বিশ্বাসঘাতকতার রঙে ভরে উঠছে আকাশ। প্রতিটা মানুষ নিজেরটুকু বুঝে নিয়ে ভাব দেখাচ্ছে যেন কিছুই হয়নি, এই শহরে শুশ্রূষা আজও জোগাড় হয়েই যায়। করতলে সেই ভাবটুকু ধরি। আঙুলের ফাঁকে জমে আছে হতাশা। জলের মতো; ডোবাতে থাকে আর একসময় আছড়ে ফ্যালে খাদে। তখন শুধু মুখ তুলে তাকিয়ে থাকা— ওপরের পাথুরে জমি আর ব্যর্থ গাছটির দিকে ছুঁড়ে দেওয়া একটুকরো হাসি। সে যেন বোঝে, পারল না। যেন বোঝে, ডাল ঝাঁকিয়ে ফেলে দেওয়া এক অর্থে নিজেরই পরাজয়। তলিয়ে যেতে থাকি। অন্যের ভালো করতে গিয়ে, সমুদ্রসমান কান্না চেপে ধরি গলার ভিতর।

শ্রেষ্ঠ কবিতা

তোমার তো খালি অন্যের লেখা ভালো লাগে
আমাকে বলো না একটা কথাও, যাতে পরের
লেখাগুলো আরও সাহসী ও মৃদু হয়ে ওঠে

অথচ পারি না, আবেগে আবার পা পিছলোয়
গড়াতে গড়াতে যেখানে থামি, তা তোমার মুখ
ঝোড়ো হয়ে উঠি, তুমি ভাবো, বুঝি বয়েস কম

আমার শ্রেষ্ঠ কবিতা তোমার ছেড়ে চলে যাওয়া, অসংযম

ইতিবৃত্ত

ইতিপূর্বে ছিল পাঠ, ইতিপূর্বে ছিল বৃন্দাবন
ইতিপূর্বে রতি নাম্নী দেবী তারে করিল বরণ

তারও পূর্বে ছিল ভুখ্‌, ছিল স্পর্শে ফকিরালি ঠাঁই
যেন বা ভ্রমণে তারে বহুজনহিতায় শোনাই

শোনে না, কেবলি কাঁদে; গোকুলে বাড়িছে বুঝি কাম
ইতিপূর্বে চেতনা কি আরও অন্ধ হারায়েছিলাম!

অবস্থান

আমায় জড়িয়ে থাকা একটা মানুষও আর
আমার মনের মতো নয়

ওরা স্পষ্ট হেঁটে যেতে শিখেছে
যেদিকে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না কোনওদিন

আমার পথের পাশে তোমার সরাই
দেখা না-করেই থাকা যায়

আরও মিথ্যে এই পথ
পথের ধারণা নিয়ে ঝিলমিল সারাটা জীবন

আমি তথ্য ঘেঁটে কেন তোমাকে খোয়াব
যদি খোয়াবে তোমার ডাক পাই

শহরতলি

এই রাস্তা শুনশান। হলুদ আলোর কিছু
কথা ছিল, পারেনি এমন

শীতের ফসল এই আগুন
টায়ার-পোড়া ঘ্রাণ

পিছনে ফিরবে – এই বিশ্বাসে হুড খোলা
কী দ্রুত বয়স গলে জল

একা ছাড়লাম
ওকে পৌঁছে দেবে না, করতল?

বলেছিল

যার কেউ নেই, তার তুমি তো আছোই
না না ঈশ্বর নও, অত ক্ষুদ্র ভাবি না তোমায়
যেন উৎসব, যেন মেলায় বেড়াতে এসে কেউ
চোদ্দপ্রদীপ কিনে ফিরে গেল, সারাটা জীবন
শাড়ির বিধবা পাড় ছিঁড়ে ছিঁড়ে সলতে বানাবে

জলছাপ

তোমার বিয়ের আগে
যে কোকিল কেঁদে ওঠে
বোলো না, বসন্তের দেরি আছে এখনও অনেক

সে কাঁদুক, কেঁদে যাক
কাঁদতে কাঁদতে তার
রাধাচূড়া গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ুক আবার

তুমি বোলো, শীতকাল। আড়ালে কোটর মুছে নিও।

অন্তরালকথা

পুজোর পরেই যেই লক্ষ্মী এসেছিল
ফিরিয়ে দিয়েছি; ঘরে এক কণা ভালোবাসা নেই
কী খাওয়াব? যদিও সে অভুক্ত থেকে যেতে রাজি
চেয়েছিল শুধুমাত্র ‘পাশে আছি’— এই বোধটুকু

এত অল্প, এত অল্প— এত শূন্য, এত কম চাওয়া
দিতে হাত কেঁপে ওঠে; বিরক্তি এসে পড়ে নখে
কেন সেও অতিরিক্ত চাইল না সকলের মতো
কেন কেন সামান্য বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে

এক কণা ভালোবাসা, একফোঁটা চুমুকের খোঁজে
লক্ষ্মীকে ফেলে আমি অন্যের কৃপাভিক্ষা করি

এমন অসম্ভবে

চতুর ও বিষময়, মগ্নকাতর, আমি তোমার প্রদাহে বিল হতে চাই। ফুটিফাটা, অথচ কলসি হাতে, নচেৎ পানীয় বড় কম। ঝড় দাও, দাও স্বেদ, অতিরিক্তে ভরা মাঠ, যেন স্পষ্ট বেজে উঠি— হাহাকার, হাহাকার— ছিলে না তবুও মায়া নিরালম্ব, ক্ষীণ হয়ে আছে। এতদ্‌ গহনা বটে, গহনার দিন বটে— বটবৃক্ষ— ভৈরবী, রক্তে ছলাৎ করো নাম। আমি এ-বহতা প্রেমে, থেমে-থেমে, দ্রুতলয়ে, তোমাকে নদীর তীরে কোনোদিন ছেড়ে দেব এমন অসম্ভবে রতিলগ্ন পাঠ শোনালাম।

ভোর ভৈয়োঁ

(৩)
ঝিনুক, তুমিও কত রোদ!
এত ঝলসে দিয়েছ যে সকাল জ্ঞান হারিয়ে চিৎ

তোমাকে মায়ের মতো লাগে। আমি বাবার নকল।

আপিস যাব না
ঠেলে তুলে দিচ্ছ, স্নানও দিচ্ছ ওই

মোলাকাত

কিছুই দুঃখের নয়। আনন্দেরও নয় কোনোকিছু।
একটি বিহঙ্গবাক্য। দুটি হাত। বিলিতি আদব।
পুরনো গানের সূত্রে আমাদের দেখা হয়ে গেল।
জীবন, অতীতস্পর্শ, কোনোদিন বিরহে হেসেছ?

অবসরে

এভাবে সম্পর্ক রাখা যায় না মোটেই

তোমার উচিৎ ছিল ভয় পাওয়া, কেঁদেকেটে
আমাকে বুঝিয়ে বলা, আসলে করোনি কোনো ভুল

সরিয়ে-নিচ্ছি হাতে বারবার ছোঁয়ানো আঙুল—
এসব উচিৎ ছিল। কেঁপে-কেঁপে। তা না করে
অবরুদ্ধ কথাটিকে এত স্বার্থে ঢেলে নিলে

হারিয়ে ফেলার ভয়ে ফিরে যাচ্ছি, শ্বাস টেনে
বলছি এবারকার মতো ঘর দিলাম, কেমন?

মৃদু সারল্য ছাড়া, জবাবে তেমন কিছু নেই

ব্যূহ

‘উঠতে-বসতে কথা শোনায়, জানো?’—
মাঝরাত, কেঁপে উঠছে মেয়েটির দুব্‌লা শরীর

বুকের ভিতরখোপে টেনে নিচ্ছি তার ঘাম
ভয়, সুখ, কান্না। ঘরও…

সকাল না আসে যেন। ওকে তো ফিরতে হবে!
পাঠক, আমার হাতে হাত রেখে ব্যূহ তৈরি করো

ফলার

তোমাকে, দুঃখের দিনে, আমাদের পৈতৃক বাগান
কী কী ফল দিতে পারত, সে-কথা হিসেব করে
এবার বাজার কিছু কম কোরো, এসো, পেড়ে নাও

পায়ে ফুটবে বেলকাঁটা, পাখির উচ্ছিষ্ট কিছু শাঁস
আড়াআড়ি বাদ দিলে অবশিষ্টে পেট ভরে যায়—
ক্ষুধার নিয়ম জানি; যে-মন গরাসে নিল সম্পূর্ণ মানুষ

ভোগের সংকল্পে তার গোত্র কেন আলাদা, ঠাকুর?

নির্বাসনের পর

নিছক সৌজন্য দিয়ে শেষ হল কথোপকথন।
বাড়তি উল্লাস নেই, আলিঙ্গনচিন্তা নেই
বহুদিন বাদে দেখা হওয়ার খাতিরে যা যা হতে পারত, গল্পেই হয়।
নির্দিষ্ট মোড়ে এসে কিশোর কিশোরী ফের ঠিকানা হারায়
এক বাড়ি হতে পারত, এক ঘর, এক আয়নায়
দু’জনেই পাশাপাশি চুল আঁচড়াতে পারত; এটুকু তো গল্পেও হয়!

কিন্তু হল না। সৌজন্য ঠিক সময়ে মুখ খুলল, কৃত্রিম স্বর।
দূর থেকে দেখলে যে-কেউ ভাবতে পারে, আসছে বছর
ও দু’টিতে মিলে যাবে। পাথর গলছে দ্রুত। গল্পে তো হামেশাই হয়!

যেন সবই স্বাভাবিক! কেউ প্রশ্ন তুলল না, কী ছিল ওদের পরিচয়…

ঝলসে যাওয়ার বদলে

আমিও সেই পোষ্যের দলেই পড়ি, যারা তোমার আঙুল মেনে
বেরিয়ে গিয়েছিল মাথা নিচু করে। বেশিদূর যেতে পারেনি—
তার আগেই গর্জে উঠেছিল বন্দুক। একবার তোমার দিকে,
একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেছিল। পোষ্যের
হাসি সচরাচর কেউ দেখতে পায় না। কিন্তু তুমি, আমাকে
হাসতে দেখে এই যে ছুঁড়ে মারলে আঙুল, বল্লমের মতো বিঁধে
গেল পিঠে; এরপর থেকে কিন্তু কাঁচা মাংসে অনীহা রেখো না!

অর্পণ

কিছু ভালো, কিছু মন্দ, কিছু দিগ্বিদিক
লিখেছি, লিখেছি আমি খননশ্রমিক

উঠেছে রহস্যজল, হাড়গোড়, বিষ
সীমানায় হারিয়েছে কীসের হদিশ

খুঁজেছি ডুবুরিসুখ, মুক্তো, বালুকণা
না-খোঁজার বেড়া ঠেলে এখনও এলো না

যে প্রেম, যে অতিরিক্ত, মায়ামুঠিখানি
সমস্ত দেব তাকে, এই মাত্র জানি!

পাঠক

বিশ্বাস করো, তাকে দেখামাত্র মনে হল
ভারতীয় সংস্করণ

মলাটে আঙুল রেখে আরোই উত্তেজিত—
পড়তে কখন পাব তাকে

বিশ্বাস করো, তার লেখক পরিচিতি-র
এতটুকু কৃপণ ছিল না

বরং পদবি এত নিখুঁত, ভাবিইনি যে
কখনও বদলেছিল… কবে?

হুমকি

আপনাকে বলে দিচ্ছি, আর যদি কাউকে আমল
দিয়েছেন, চলে যাব অনিবার্য যেদিকে আষাঢ়

অমন ভিজতে দেখে আপনার কাতুরে বয়স
হিংসে করলে কিন্তু মানব না, বলে দিচ্ছি এই

এখনও সময় আছে, সব ত্রাণ ছাপিয়ে আমার
সীমানা ভাঙুন, জল, আমাকে মধ্যে টেনে নিন

ভাগ

শহরে বেড়েছে ভিড়, একইসঙ্গে নেই-এর বিকেল
লোকজন ছুটে যাচ্ছে, ফিরে আসছে পুরনো গুহায়
এমন দুর্গত দিনে তুমি ছিলে অনিষ্ট আমার
ত্রাণের সামগ্রী যত জড়ো করি, লুঠ হয়ে যায়
পাহারা বসিয়ে কোনো লাভ নেই, স্পষ্ট বুঝে গেছি
যদি না ইচ্ছুক তুমি সেরে নাও মৌল আলোচনা
একটি ঘরের জন্য আরেকটি ঘর ছেড়ে এলে
শুধু কি দুঃখই পাবে, আমি বুঝি অংশ নেব না?

ভারপ্রাপ্ত মনোবিদ

(৪)
জাদুকান্না গিলে নাও, জল ছুঁয়ে বলো যে এবার
সমস্ত ভাসিয়ে দেবে ধীরে ধীরে চলে যায় চলে যাচ্ছে ঘাসের বিবাহে
খানিক আটকে মুখ ফেরাল বুঝতে চাওয়া এত ভ্রম আকাশের নিচে
কেবলই ঝলক আনে স্মৃতিকৌটো উপচিয়ে সব রং পোকাভর্তি লাল
ক্রমশ বৃহৎ জ্ঞানে আরও জল হয়ে যাচ্ছে যন্ত্রণার এতদিনে ইতি
তোমার শরীর মৌন স্থিরচিত্রে মাখামাখি মাথা খেয়ে ফেলেছে প্রকৃতি

শেষ লগ্নে

প্রতিটা বিচ্ছেদরাতই
নিশিতে পাওয়ার মতো ম্লান

কে জানি বলিয়ে নেয় ভুল

প্রভাব কাটলে বুঝি
যে আমার কেউ নয়

আমি তার বিরহব্যাকুল

ধন্যবাদ

তাহলে, নমস্য প্রেম, এই জন্য ডেকেছেন? যাতে ছিটকে সরে যাই, সারা গা ঝলসে যেন প্লেটে-প্লেটে ঘুরি আর সবাই মরিচ-নুন মাখায়?

কারিগর হওয়া শক্ত। দু-চার হাতুড়ি মেরে কাটানো জীবন; তাও নখে লাগে। চেপে ভাবি, একদিন তুলো তো হবেন!

শীতে তেমনি কথা ছিল। বসন্তে ভিতপুজো; পরবর্তী শীতে, পরিবার…

নমস্য ওহে, এভাবে সমাপ্তি হয়? দর্শকেরা ঠিকঠাক ফেরে?

**Cover Painting Credit – A Summer Landscape, Georges Seurat, 1883

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *