আমার মা-টি, লালমাটির দেশের পুজো

Bolpur-Cover

পূর্বা মুখোপাধ্যায়

কী বলি, কীভাবেই বা বলি, পুজোয় আমার বহুদিন কলকাতা নেই, বীরভূম আছে। শোভাবাজার রাজবাড়ি যেমন ছিল এককালে, তার চেয়ে একটু বেশিই আছে সুরুল রাজবাড়ি, দুই তরফ। আছে গোস্বামী বাড়ির একচালের মা। আর কোনও বছর খানিক দূরে তালতোড়ের জমিদারবাড়ির ঠাকুরদালান জুড়ে ঢাকের বাদ্যি, ধুনোর গন্ধ, জ্যোৎস্নার মতন স্নিগ্ধ আলপনা। আমার দেশগাঁ স্বয়ং শাকম্ভরী। রাঢ়বাংলার মাটি সপ্রাণ, রক্তবর্ণা রক্তাম্বরা মহামায়ার দেহ। তন্ত্রক্ষেত্র। কৃষ্ণাতিথিতে, কালীপূজার রাত্রে সে-মাটিতে কোন্ চোরাটান হিলহিলিয়ে ওঠে, যে জানে সে-ই জানে। আশপাশের দশ-বিশটা গাঁয়ে খোঁজ নিলেও কেউ বলবে না, এখানে মাটি ঘুমোয়। তন্ত্রক্ষেত্র। ছেলেখেলার জিনিস নয়। অনধিকারীও জানে, এর রক্তপায়ী মর্ম।

আরও পড়ুন: বীরভূমের বিপ্রটিকুরী গ্রামের দুর্গা

সুরুলের বড়বাড়ি ও দুর্গা মাতার মন্দিরের পরিচয় ফলক। ছবি: দীপান্বিতা হাজরা

কঙ্কালী, ডাঙ্গালী, ফুল্লরা,অট্টহাস, নন্দিকেশ্বরী,  তারা, মৌলিক্ষা, নলাটেশ্বরী, মহিষাসুরমর্দিনী… বীরভূমের দিকে দিকে ত্রিনয়ন মেলে আছেন, সদাজাগ্রত। জাতধর্ম নিয়ে মাথা ঠোকাঠুকি করে মরে গেলেও কারও সাধ্য নেই তাঁদের ভুলক্রমেও অস্বীকার করবে। না, আজও সে সাধ্য হয়নি কারও। দেবী মা। সন্তান মাত্রই জানে, সে সন্তান।

আরও পড়ুন: স্মৃতির ভেলায় চড়ে বাঁকুড়ার বড়চাতরা গ্রামের দুর্গাপুজো

খোয়াইয়ে আদিবাসী নৃত্য ও হাট। ছবি: দীপান্বিতা হাজরা

শাক্তের পাশাপাশি বাউল বোষ্টমেরও দেশ এটা, হ্যাঁ, পীর-ফকিরেরও দেশ। উৎসব একখানা লাগলেই হয়, আসরে সবাই একজোট! পাথরচাপড়িতে দাতাবাবার দুয়ার যেমন সব্বার, মায়ের থান নিয়েও কোনও ভাগাভাগি শেখেনি এখানে মানুষ। আমাদের এই গেঁয়ো সরল বিশ্বাসের পৃথিবী, ভক্তিমার্গ ছাড়া কিচ্ছু জানে না, কিচ্ছু বোঝেনি এখনও। এখানে পাড়ার বারোয়ারি মণ্ডপগুলো সবই বাঁধানো, শখের নয়। সাজপোশাক পালটে গেলেও, এখনও, শতবর্ষ আগের ঐতিহ্যে, পুজোর ক’দিন পাড়াসুদ্ধু লোক দুর্গাদালান ছাড়া কিছুই চেনে না। বারোমাস পুজোবেদিতে টানটান মাটির পিলসুজ, পেরেকে মায়ের টকটকে মালা ধুলো মেখে হাওয়ায় দুলছে… যেন তাঁর নিজের বসবাসের ঘরখানি ছেড়ে তিনি গৃহকাজে সরে আছেন। কচিকাঁচার দল সে-ঘরে দিনমানে খেলা করে বেড়ায়। রাত্তিরে কী হয়, কেউ জানে না। মায়ের ঘর, মা আছেন, এই তো বিশ্বাস! নিবিড় বিশ্বাস।

আরও পড়ুন: ঝাড়খণ্ডের চন্দনকেয়ারির কুরমিটোলার দুর্গাপুজো

গোস্বামীদের বাড়ির পুজো। ছবি: লেখক

সন্ধে গড়িয়ে ঘন রাত নামলে প্রান্তরের ওপারে দূর শিবতলায় ফ্লুরোসেন্ট বাতি জ্বলে ওঠে। তার আলো ডাঙার পর ডাঙা পেরিয়ে আঁধারডোবা আমাদের গাঁয়ের ঘরগুলিকে অভয় দিয়ে বলে, “বাবা সুরথেশ্বর জেগে রয়েছেন। কুনো ভয়টো লাই। তুমরা রসি খেয়ে ঘুমাও কেনে। চান্দ থাকতে উঠ্যে পড়বে। মাঠ্যে যাবে। ছাতু কুড়োবে ফরেস্টে। ছাতুভাজা দিয়ে দুটো ভাত বেশি খাবে উৎসবের দিনে। মাঠকে মাঠ পেরিয়ে তুমাদের উঠানে খেলতে আসবে পুঁটি চ্যাং কইমাছ। তেঁতুল দিয়ে টক বানিও। উৎসবের দিনে ঘরে অতিথ এলে তার পাতেও দিও দুটো। মা শাকম্ভরী। শাকে মাছে ভাতে অন্নপূর্ণা তাঁর ভাঁড়ার খুলে দিয়েছেন। প্রসীদ। আনন্দ করো, শুধু আনন্দ।”

সুপুরের জোড়া শিবমন্দির। ফাইল চিত্র

হ্যাঁ, বলিপুর থেকে বোলপুর। কিংবদন্তির এই ভূমির তলায় এক বুড়ি কাছিম পিঠ পেতে ঘুমিয়ে আছে। কথিত আছে, রাজা সুরথের আরাধ্যদেবতা শিবতলার ওই শিব, আর তাঁরই শক্তি স্বয়ং দেবী দুর্গাকে বলিরক্ত উৎসর্গ করতে গিয়ে সুরথরাজা এই ভূমি রক্তস্রোতে ভাসিয়েছিলেন। বাঁধ দিয়ে সেই রক্তপ্লাবন আটকানো হয়, বাঁধগোড়ায়। বলিপুর থেকে বোলপুর। এ রবীন্দ্র-নন্দনতত্ত্বের বাইরের এলাকা। আদিম। এই আদিমতার সুতো টেনে নন্দনতত্ত্বের তাঁতে বুনে একখানি কল্পলোক বুনেছিলেন আদিবাসীদের ঘরের লোক হয়ে ওঠা এক শিল্পী। খোয়াইয়ের রক্তলাল বুকের পাশে, হীরালিনীর মাঠে তাঁর অনস্তিত্ব আজও উৎসবের রঙিন অস্তিত্বে মিশে আছে। মাদলের বোল তুলে আদিবাসী নাচের আসরে সেখানে বাংলায় ঝাড়খণ্ডে গলাগলি চলে, চলে দলে দলে নাচের প্রতিযোগিতা। স্বরচিত সেইসব প্রিয় দৃশ্য, আজও ছবির ভেতর থেকে হাসিমুখে তাকিয়ে দেখেন বাঁধন দাশ। আর নাগরিক বিস্ময় ইদানীং সেখানে ঘন ঘন ক্যামেরার ফ্ল্যাশে চলকে ওঠে। পুজোর ক’দিন উজাড় হয়ে যান ট্যুরিস্টরা।

১. বড় বাড়ির দুর্গা, ২. ছোটবাড়ির দুর্গা (সুরুল রাজবাড়ি – সরকার বাড়ি)। ছবি: লেখক

এ লেখা আমি যে খুব লিখতে চেয়েছিলুম, এমন নয়। এইজন্যেই নয়। পুজোর ফ্যাশন, থিম পুজোর বাহিরানা নিয়ে বছর বছর মেতে কলকাতায় ভিড়ভাড়াক্কার কাউন্টডাউন তো অনেক হল। কক্ষনও চাইব না সেই মাতন এই মাতনকে বুঝেপড়ে নিতে আসুক। এ মাতন তো মর্মের। রক্তের। শখ আহ্লাদের নয়। অনাড়ম্বর সহজ বিশ্বাসের। জয় মা মহিষাসুরমর্দিনী! জয় সুরথেশ্বরীর জয়!

আদিবাসীদের ঘরের লোক হয়ে ওঠা শিল্পী বাঁধন দাশের সঙ্গে…

কভার ছবি: ইন্দ্রজিৎ মেঘ

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *