পুজোর গান এবং ‘বাজনা গান’

গৌতম দে

বাঙালির বড় পার্বণ। দুর্গোৎসব। সেই দুর্গাপুজো আসলেই মনে পড়ে পুজোর গানের কথা। গীতিকারদের কথা। সুরের কথা। সুরকারদের কথা। গায়ক এবং গায়িকাদের কথা। তারপরের কথা…

বাংলার নামকরা কথাসাহিত্যিকদের গল্প ও উপন্যাসের মতো ‘বাংলা গান’ও একসময় আপামর বাঙালিদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল। পুজোর আগে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতেন, শুধুমাত্র ভালো ‘আধুনিক বাংলা গান’ শোনার জন্য। আজ সেসব আক্ষরিক অর্থে সময়ের কালানুপাতে হারিয়ে গেছে। সেই ষাটের দশক থেকে পর পর চার দশক বাংলা কথাসাহিত্য এবং নতুন পত্রপত্রিকার মতো দাপিয়ে রাজত্ব করেছিল বাঙালির অন্তরস্থলে ‘আধুনিক বাংলা গান’ এই বঙ্গে। ক্রমে ক্রমে সারাদেশে। দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। সাবেকি ভাষায় ‘পুজোর গানের’ তকমায় সারাদেশে সাড়া ফেলেছিল।

আরও পড়ুন: উলা বীরনগরের প্রাচীন বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস

আমরা সেইসব দশকগুলিকে আজও মনেপ্রাণে কথাপ্রসঙ্গে স্মরণ করি। পুলকিত হই। আনন্দ উচ্ছ্বাসে ক্ষণিকের মুহূর্ত প্রকাশ করে ফেলি। আলোচনা করি কোনও না কোনও আড্ডায়। আনন্দের বিহ্বলতায় আজও গেয়ে উঠি অজান্তেই দু’কলি সেইসব জনপ্রিয় গান। অক্লেশে বলেও ফেলি সে ছিল এক স্বর্ণযুগ। সত্যিই স্বর্ণযুগ ছিল বটে! সবাই যেন স্টার। সুপারস্টার। কী খেলাধুলায়, কী রাজনীতিতে, কী ছায়াচিত্রে, কী বাংলা কথাসাহিত্যে কিংবা বাংলা গানে। আজও আমরা তাঁদের সৃষ্টিকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। অনায়াসে অতীতচারী হয়ে উঠি মুহূর্তে। ভাবলেই অজান্তেই সেইসব শিল্পর দ্বারপ্রান্তে হাজির হয়ে যায় মন। তারপর অসীম তৃপ্তির বৃত্ত তৈরি করে চারপাশে। যা একান্তই ব্যক্তিগত।

এই প্রতিবেদনে শুধু সেই স্বর্ণযুগের গায়ক, গায়িকা, গীতিকার, সুরকারদের কথাই বলব। তাঁরা এখনও আমাদের মননে বেঁচে আছেন। অধিকাংশ মানুষই আজ বেঁচে নেই। অথচ তাঁদের সৃষ্টি এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বাংলা গানের জগতে। এখনও তাঁরা রাজ করে চলেছেন আপামর নাগরিকের নগরজীবনে। সেইসব জনপ্রিয় গানগুলো এখনকার উঠতি গায়ক এবং গায়িকারা রিমেক করে লাইমলাইটে আসার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ সফল হন। কেউবা কালের নিয়মে তলিয়ে যান। কিন্তু সেইসব গানগুলো আজও জনমানসে হীরের মতো দ্যুতিমান।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা বান্নু সমাজের হাতে শুরু হওয়া রাবণ দহন আজ রাঁচির ঐতিহ্য

রেডিয়ো, টিভি এবং মোবাইলে আজ অজস্র চ্যানেল। সেইসব চ্যানেলে আজও শুনতে পাই জগন্ময় মিত্র, মৃণাল চক্রবর্তী, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অখিলবন্ধু ঘোষ, পিন্টু ভট্টাচার্য, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, বনশ্রী সেনগুপ্ত, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর সেন, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, শচীন দেববর্মন, তালাত মাহামুদ, মহম্মদ রফির মতো আরও অনেকের গান। নাম বলে শেষ করা যাবে না। তাঁরা বাংলা গানকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যা আজও বিরাজমান। সমৃদ্ধ করেছে বাঙালির সংস্কৃতিকে। এ কথা অনস্বীকার্য।

সেই স্বর্ণশিখরে বাংলা গানের জয়যাত্রায় যাঁরা কারিগর ছিলেন, তাঁরা কেউ কারোর চেয়ে কমতি ছিলেন না। ছায়াচিত্রের বাইরেও তাঁদের সৃষ্টির অপেক্ষায় থাকতেন আপামর বাংলা ভাষাভাষীরা পুজোর গান। কিংবা আধুনিক বাংলা গান। হ্যাঁ। পুজোর গান। আধুনিক বাংলা গান।

আরও পড়ুন: পাবলো নেরুদার কবিতা

পুজোর আগে রাশি রাশি পত্রিকার ভিড়ে পুজোর গানও ব্যতিক্রম ছিল না। পুজোর আগে নতুন পত্রপত্রিকার মতো এইচএমভি থেকে বের হত গানের ক্যাটালগ। গীতিকার, সুরকার, গায়ক-গায়িকাদের ছবিসহ এবং গানের দু’কলি পঙ্‌ক্তি ছাপা হত। রঙিন এবং দামি আর্টপেপারে ছাপা ক্যাটালগটি রেকর্ডের দোকান থেকে পাওয়া যেত। দেখতাম পুজোর আগে সেই নতুন ক্যাটালগের গন্ধ নিয়ে গানপাগল বাঙালিদের মাতামাতি। গানের পাশাপাশি সেইসব গীতিকারদের নাম, সুরকারদের নামও অজানা থাকত না। শ্যামল গুপ্ত, মুকুল দত্ত, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরির মতো আরও অনেকের নাম অনায়াসে বলে ফেলতেন বাঙালি শ্রোতারা অমুক গানটির গীতিকার কে? সুরকারই বা কে? আজও আমরা সেইসব কৃতি মানুষদের নতচিত্তে স্মরণ করি।

তখন এই কলকাতা শহরে অনেক সিডি কিংবা রেকর্ডের দোকান ছিল। পুজোর আগে সেইসব দোকানে গান পাগল মানুষরা হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। এখন সেইসব দোকানগুলো উধাও। লেনিন সরণির জ্যোতি সিনেমার পরে ফুটপাথের ধার ঘেষে অনেক রেকর্ডের দোকান ছিল। ট্রামের টুংটাং ঘণ্টির সঙ্গে জনপ্রিয় বাংলা এবং হিন্দি গানের কলি ভেসে আসত কানে। সেই জ্যোতি সিনেমাহলও নেই। নেই দোকানগুলোও। মেট্রো সিনেমার পাশে আরও একটি সিডির দোকান ছিল। এখন আছে কিনা জানি না।

ভবানীপুরের পূর্ণ সিনেমার হলের পাশে আরও একটা সিডির দোকান ছিল। সেটাও আজ বোধহয় নেই। যেমন নেই পূর্ণ সিনেমা হলটি। ওই দোকানের সামনে পুজোর আগে আমার মতো অনেককেই ভিড় করে শুনতে দেখেছি ‘এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না, যাতে মুক্তো আছে’। নির্মলা মিশ্রের গান। বোধহয় ’৭৮ সালের গান। ওই বছরেই ওই গানটিই বিজয়ের শিরোপা পেয়েছিল। তখন এইচএমভি জনপ্রিয়তা এবং বিক্রির নিরিখে সে বছরের সেরা গান ঘোষণা করতেন।

আরও পড়ুন: এক অবিরাম স্বীকারোক্তি

ধরুন নির্মলা মিশ্রের ওই গান। ’৭৮ সালে প্রকাশ হয়েছিল। তার মানে এখন সেই গানটির বয়স ৪৩ বছর। এখনও গানটি কোথাও বাজলে বাঙালি শ্রোতারা কান পেতে শোনেন। অজান্তে গুনগুন করে গেয়েও ওঠেন। অমনি নস্টালজিক হয়ে পড়েন।

তাবড় তাবড় সুরকার ছিল সেই সময়। কেউ কারোর চেয়ে কম যান না। পঙ্কজ মল্লিক, শচীন দেববর্মন, সুধীন দাশগুপ্ত, রাহুল দেববর্মন, নচিকেতা ঘোষ, সলিল চৌধুরি, স্বপন-জগমোহন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রবীন ব্যানার্জি, পবিত্র মিত্র নামক আরও অনেকে ছিলেন। আজ সেইসব স্বর্ণযুগের সুরকার এবং গীতিকাররা নেই। নেই প্রণম্য গায়ক ও গায়িকারা। তাঁদের সুললিত সৃষ্টির ঝরনা বেঁচে আছে আজও।

ভাবুন একবার। হারমোনিয়াম আর তবলা সহযোগে গেয়ে গেছেন কত গান হেমন্ত এবং মান্না জুটি। কিংবা আরও কেউ কেউ। গানের কথাগুলো তাঁদের কণ্ঠ থেকে স্পষ্ট ঝরে পড়ত বাতাসে। শ্রোতারা কথাগুলো বুঝতে পারতেন। মুগ্ধ হতেন। আজ সেইসব গানগুলো বিভিন্ন উঠতি গায়করা যখন গান, তখন সেই গানের মাদকতা আর থাকে না। গানের কথা তলিয়ে যায়। বেড়ে ওঠে নিত্যনতুন বাদ্যযন্ত্রের দাপট। পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মন চায় না, তবুও আমাদের মেনে নিতে হয়েছে।

আরও পড়ুন: এবার পুজোয় লেনিন বিরিয়ানি

তারপর এলো নতুন গানের ভাবনা নিয়ে একদল গায়ক। তাঁদের গান নাকি ‘জীবনমুখী’! এই তাঁদের শিরোনাম ছিল। এক অদ্ভুত শব্দবন্ধন। নতুন প্যাকেজ। পাবলিককে খাওয়াতে হবে। চালাকির এ এক নতুন সংজ্ঞা। অথচ এই জীবনমুখী তকমাধারীদের কণ্ঠে যখন শুনি অতীতের গান, তখন আক্ষরিক অর্থে তাঁদের চালাকিটা সহজে ধরা পড়ে যায়। সেইসব গায়ককুল এবং তাঁদের গান আজ এক অর্থে বিলীন হয়ে যেতে বসেছে।

তারপর এলো বিভিন্ন নামধারী ব্যান্ডের পশ্চিমি অনুকরণ। তাঁরা যখন গাইছে, তখন আমরাও পারব। আমরা গাইব। সুর তৈরি করো। বাংলা কথা বসাও। সেইসব গানের প্রথম দু’টো শব্দ শোনার পর আর পুরো গানটির কথা শোনা যায় না। কেবলই ঝম্পর ঝম্পর কানফাটানো বাদ্যযন্ত্রের দাপট। গানের কথাতেও তেমন গভীরতা নেই। তখন মনে হয়, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ আর নয়। মন বলে, পালাই পালাই। তা-বলে সব গানই কিন্তু খারাপ নয়। সেটা সিন্ধুতে বিন্দুসম।

আসলে এখনকার সময়ে ওজনদার গানের কথাকারের অভাব। অভাব সুরকারেরও। রাশি রাশি গজিয়ে ওঠা ব্যান্ড নামক দলের যথেচ্চারের শিকার এখনকার বাংলা গানের জগত। টি-টোয়েন্টি খেলার মতোই মার ছক্কা। লাগে তুক লাগে তাক। ওই পর্যন্তই। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। গানের জগৎ থেকে বিছিন্ন হয়ে রাজনীতির ময়দানে দৌড়চ্ছে সেইসব শিল্পীরা। কেউবা বুটিকের দোকান খুলে বসেছে শহরে। কেউবা সিনেমাতে মাথা গলিয়েছে। তাঁরা ভালোভাবেই জানেন, আমাদের তৈরি করা এমনতর ‘চালাকির প্যাকেজ’ পাবলিকরা বেশি দিন সহ্য করবেন না। হয়েছেও তাই।

আরও পড়ুন: হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

কোনও এক জায়াগায় সাক্ষাৎকারে সতীনাথ মুখোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমরা গেয়েছিলাম প্রকৃত অর্থে গান। এখনকার গান হল গিয়ে বাজনা গান…। এই করোনাকালে এখনকার গায়ক এবং গায়িকাদের হাহাকার শুনি বিভিন্ন মিডিয়ায়। ফলে রিমেকের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে কণ্ঠীর সংখ্যাও পুজো পার্বণে এবং বিভিন্ন জলসায়। ফলে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবলেই এখন খুব সহজেই নস্টালজিক হয়ে পড়ি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *