পুলিপিঠের রূপকথা

পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়

‘পিঠে খাব মা’, পিঠে কি জিভেগজার মতো না ঠেকুয়ার মতো?

‘খাবি! খাবি? এই নে পিঠে’

গুম্

এ্যাঁ… কান্না

পিঠে খাওয়া নিয়ে এইরকম একটা মজা ছিল। আর এক মজা ছিল এইরকম। রান্নাঘরে দু’মুখো উনুনের আঁচে মা বসে। পায়েস রান্না করছে। নিরন্তর হাতা দিতে হয়। তাই অনেকক্ষণ মা আটকে আছে রান্নাঘরে। খুকির তা পছন্দ নয়। ফ্রক দুলিয়ে ঝুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের ফর্সা আঁচলঢাকা পিঠে। দুহাতে গলা জড়ানো, মা হাসে আর ছড়া বলে―

“পুলিপিঠে সাদাআআআসিধে

ভাজাপিঠে ভালো

রসের পিঠে ভারিইইইই মিঠে

বেজায় রসালো”

আরও পড়ুন: সূর্যাস্তের সূর্য সেন

ভালোনামটাকে আদরে মুড়িয়ে মা ডাকবে পুলিপিঠে, আর সে সাদাআআআ… সিধে। কথাটা সেঁধিয়ে গেল মনে। তাহলে ভাজাপিঠে আর রসের পিঠেদের ভালো নাম কী! তারা কাদের বাড়ির মেয়ে! তারা কেমন। ভেবে ভেবে ভেবলে যায় সে।

পৌষ-লক্ষ্মীপুজোয় এইসব হয় বাড়িতে, মুগপুলি, ভাজাপুলি, সোনার (কাঁসা পেতল মেজে মেজে মেনকাদিদি সোনা বানিয়েছে) গামলা ভরা ভরা ঘন লাল পায়েস, তার মধ্যে ভাসবে গাপ্পিমাছের মতো খুদি খুদি পুলি। সেই পুঁচকি পুলির মধ্যেও নারকেলের মিষ্টি ছাঁই। আর হয় পোষ (এরকম উচ্চারণ করে সব) সংক্রান্তিতে। মেনকাদিদি হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে কাজে এসে যেদিন বলবে, গঙ্গাসাগরের হাওয়া ছেড়েচেন গো! তার মানে সেদিন পৌষ মাসের শেষ। এরপরেই শীত কমে যাবে। দিন বড় হবে।

আর পিঠের গল্প? অগ্রহায়ণের মাসভর রোববার করে সকালে সবুজ চারা ঘেরা ইতুঘটের সামনে সেই ছেলেবেলার প্রথম পাঠের বইটা বোনটি (ঠাকুমার) ঠাকুরঘরের তাক থেকে নামবে। ‘বারোমেসে মেয়েদের ব্রতকথা’। ইতুপুজোর গল্প শোনার দিন। পড়ে পড়ে মুখস্থ।

আরও পড়ুন: ‘উঠে যাওয়া’ গানের কলকাতায় চলুন…

এক বামুন আর বামনি ছিল। তাদের দুই মেয়ে। উমনো আর ঝুমনো। তারা খুব গরিব। একদিন বামুনের পিঠে খাবার সাধ হয়েছে। বামনিকে এসে বললে, বামনি পিঠে করো। বামনি বলল― চাল, গুড়, নারকেল, আটা সব এনে দাও আমি পিঠে করে দিচ্ছি। বামুন ভিক্ষে-সিক্ষে করে চাল, গুড়, তেল, নারকেল সব এনে দিলে। বামুন বলল, শোন বামনি, এই পিঠে যদি মেয়েদু’টোকে দিস ওদের বনবাসে দিব। দিব বললেই হল! বামনি কোনও আপত্তি করবে না? তারও তো নিজের মেয়ে। কিন্তু করল না। প্রতিবাদ ব্যাপারটা তখন মেয়েদের করতে হয় না, আর এভাবেই চারিয়ে যেত মনে। কিংবা হয়তো বামুনকে ভয় পেত বামনি। কিংবা ব্যাপারটা সত্যিই ঘটবে ভাবেনি। যাইহোক, বামনি পিঠে ভাজতে বসল। একটা করে ভাজে আর যেই ছ্যাঁক করে শব্দ হয়, বামুন ছাদে বসে দড়িতে গিঁট দেয়। এদিকে ছ্যাঁক শব্দে মেয়েদের ঘুম ভেঙে গেল, তারা এসে বললে― মা মা কী করচিস মা, পিঠে দে মা খাই। মা চুপিচুপি তাদের দু’টো পিঠে দিয়ে বললে, খেয়ে শুয়ে পড়বি। বাবা যেন জানতে না পারে। তারা খেয়ে মুখ মুছে শুয়ে পড়ল। তারপর বামুন এসে খেতে বসল। একটা করে খায় আর গিঁট খুলতে থাকে। শেষে দু’টো গিঁট বাকি। বামুন রেগে লাল। বলল, নিশ্চয়ই মেয়েদু’টোকে দিয়েচিস, আমি এখনি ওদের বনবাসে দিব।

আরও পড়ুন: একসময় কলকাতায় নানান ধরনের উপধারার গান নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠেছিল

ভোর না হতেই বামুন মেয়েদের ডেকে বলল― চল, তোদের মামারবাড়ি দিয়ে আসি। বাবা হয়ে মিছে কথা বলে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়া। বাবা না ছেলেধরা! সেই যে মণিমাসির ছেলে বলেছিল, আমার বাপ বাপ নয় বাপরে বাপ! সেরকম বাবা হবে।

তারপর সে কি কাণ্ড! শুনতে শুনতে ঘন বনে হারিয়ে যাওয়া দুই অসহায় বোনের ছবি ঘিরে ফেলে শিশুমন। তারাও যে দুই বোন। আর মণিমাসি তো উমনো ঝুমনোই বলে তাদের। তারা রোগা, তারা মায়ের মতো সুন্দর হয়নি, তারা মণিমাসির ছেলের মতো একটা মোটে ছেলে নয়, পরপর দুই মেয়ে হয়েছে, এই সব কথাই কি ঢাকা থাকে ওই উমনো ঝুমনো নামের আড়ালে, একটা হালকা অভিমান জমে ওঠার মতো বয়স হচ্ছে আস্তে আস্তে। তবে নিজের বাড়িতে তাদের খুবই আদর। তাই অন্য কথা বেশিক্ষণ পাত্তা পায় না মনে।

গল্প মানেই তো সত্যি সেই বয়সে। নিজের বাবা, এরকম করতে পারল! এ কেমন গল্প? কই আমাদের বাবারা তো এমন না। মনে ভারি ভাবনা হয়। তার মানে উমনো ঝুমনোদের বাবারা এরকম হয়। উমনো ঝুমনোদের কী কষ্ট!

আরও পড়ুন: সুধীন-শ্যামল জুটি এবং বাঙালিয়ানায় মোড়া জিঙ্গল বেল

আর একটু বড় হতেই হাতে পাওয়া গেলো উপেন্দ্রকিশোর। এখন নিমগ্ন হয়ে নিজেই পড়তে পারার বয়স। ওব্বাবা, মানুষদের মতো চড়াইদের এবার পিঠে খেতে সাধ হয়েছে যে। চড়নীকে এসে চড়াই বলছে, ‘চড়নী আমি পিঠে খাব’। চড়নী তখন চড়াইকে জিনিসপত্রের ফিরিস্তি দেয়, ময়দা, গুড়, কলা, দুধ, কাঠ। চড়াইয়ের কাঠ ভাঙার আওয়াজে চলে এলো বাঘ (বনের রাজা) বাঘের আসার কি দরকার ছিল! বাঘ তো বনের রাজা (এ বইতে বলেনি সেকথা, কিন্তু সবাই জানে) আর তাইজন্যই কি তার সব জানা চাই, কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে! রাজাদের অগোচরে কিছুই হবার যো নেই নাকি! এবার সেও পিঠে খেতে চায়। কি মুশকিল! কেন, নিজে খাওনা, ছোট্ট চড়ুইদের অল্প সমর্থের সংসারে নাক গলানোর কী আছে!

এদিকে চড়াই কিন্ত ছোট্টখাট্টো বলে তার বুদ্ধি কম নয়! সে মোটেও ঘাবড়াবার পাত্তর নয়। বললে, সে খাওয়াবে বটে তবে বাজার এনে দিতে হবে বাঘকে। বুদ্ধি খাটিয়ে ফর্দের ফিরিস্তি দিলো বাড়িয়ে। ময়দা, কলা, দুধ, গুড়, ঘি, হাঁড়ি। বাঘ বোকা। সে সেসব এনে দিয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগল কখন পিঠে হবে। এদিকে চড়নী বাসায় চুপচাপ দিব্বি খাসা পিঠে বানিয়ে দু’জনে মিলে খেয়েদেয়ে, বাঘকে পাতায় করে কয়েকটা দেয়। বাঘ খেয়ে দেখে একটা ভালো কিন্তু পরেরগুলো ময়দা, ভুসি, গোবর দিয়ে গড়া। ওয়াক থু করে এইসা রেগে সে চড়ুইদের ধরবে ভাবে, এমন সময়, চড়ুনির হাঁচিতে হাঁড়ি ফেটে একসা কাণ্ড। আর বাঘেরা যতই তর্জন-গর্জন করুক আসলে তো রামভীতু হয়, সে চমকে চব্বিশ হয়ে পগার পার।

“চড়নী আমি হাঁচবো!” এই নিয়ে দু’বোনে কত হাসাহাসি, উফ! আর ওই কেঁদো বাঘ, সে কি না এতেই ভাগলবা, আবার হাসি হাসি হাসি দু’বোনে।

আরও পড়ুন: সারফারোশি কি তামান্না: বিসমিল ও তাঁর সহযোগীদের আত্মত্যাগের কথা

আর একটা গল্পের বইতে আবার পিঠেগাছ ছিল। ছবি ছিল সেই গাছের। একটা রাখাল ছেলের এত পিঠে খাওয়ার শখ হয়েছিল যে, অনেকগুলো খাওয়ার পর সে একখানা নিয়ে মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল, যাতে গাছ হলে সেখান থেকে আরও প্রচুর পিঠে পেড়ে সে খেতে পারে। কি লোভ রে বাবা! আর লোভের সাজাও পেয়েছিল তেমনি। সারারাত কোনওরকমে ঘুমিয়ে উঠেই বাগানে গিয়ে দেখে সত্যিই পিঠেগাছ হয়েছে আর প্রচুর পিঠে ঝুলছে। গাছে উঠে মনের সুখে খাচ্ছে এমন সময় সেই বুড়ির আগমন। ‘সেই’ মানে এ বুড়ি যে সে বুড়ি নয়। চালাক বুড়ি। চালাকি করে সে ছেলেকে গাছ থেকে নামিয়ে আনবে। তাইজন্য বলতে লাগল, হাতে দিসনা বাপ চটচট করবে, মাটিতে দিলে পিঁপড়ে খাবে এইসব। ছেলের মন গলে গেল। গলারই কথা। খুনখুনে বুড়ি বেচারি। নেমে এসে যেই দিতে গেছে ওমনি খপাত করে ধরেচে আর চেপেচুপে ঝোলায় ভরে আবার ছড়া কাটছে―

“কেঁদে কেঁদে সারা হলি

ভিজে গেলো কাঁধের থলি

তোকে রেঁধে খাব ঝোল

মিছে কেন করিস গোল!”

কি ভয়ংকর ব্যাপার! তারপর সে কত কি জটিল সব কাণ্ড! ছেলে চালাক কম না। বুদ্ধি খাটিয়ে ঠিক পালিয়ে এলো ডাইনি বুড়ির ডেরা থেকে, আর শেষের ছড়াটা সেই কাটল―

“ডাইনি বুড়ি পিঠে খাবি

আমার সাথে চল

তোর বউকে রেঁধে এলাম

কেমন মজা বল!”

পৌষপার্বণ আর পিঠের মিষ্টি নোনতা গল্পের ঝুলি এখানেই শেষ। আর কারও কাছে যদি কোনও গল্প থাকে তো পিঠে খেতে খেতে শোনার অপেক্ষা রইল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *