রাধাদামোদর মন্দির, মাংলই (পাঁশকুড়া থানা, মেদিনীপুর)

চিন্ময় দাশ

শতবর্ষ আয়ু হলে তখন পুরাবস্তুর আখ্যা জোটে কোনও মন্দিরের কপালে। সেটি তখন হেরিটেজ বা ঐতিহ্য হিসাবেও গণ্য হয়ে উঠতে পারে। এমন মন্দিরের সংখ্যা মেদিনীপুর জেলায় বোধকরি এক হাজারের কম নয়। কিন্তু কেবলমাত্র অলংকরণের গৌরবে জেলার যে কয়েকটি মন্দির একেবারে সামনের সারিতে আছে, মাংলই গ্রামের এই মন্দির তার অন্যতম। আজ সেই সালংকারা মন্দিরের কথা আমাদের এই প্রতিবেদনে।

আরও পড়ুন: ‘বাংলার শিবাজি’ শোভা সিংহের শীতলা মন্দির, রানির বাজার (ঘাটাল থানা, মেদিনীপুর জেলা)

সারাভারতে হিন্দু দেবমন্দির নির্মিত হয়েছে মূলত ৩টি রীতিতে। উত্তর ভারতের নাগর রীতি, মধ্য ভারতের বেসর রীতি, আর দাক্ষিণাত্যের দ্রাবিড় রীতি। বাংলায় বর্তমানে মন্দিরের চারটি শৈলী দেখা যায়— দালান, শিখর, রত্ন এবং চালা। রত্ন রীতিকে বলা যায়, উত্তর ভারতের বিশালাকার সূচিমুখ দেবালয়গুলির ক্ষুদ্র সংস্করণ। এখানে রত্ন শব্দটির অর্থ হল— চূড়া। গর্ভগৃহ নির্মাণ করে, তার মাথার ছাউনির উপর রত্ন স্থাপন করা হয়। এতে মন্দিরের সৌন্দর্য এবং গরিমা বৃদ্ধি হয়। ছাউনি হিসাবে এক বা একাধিক তল স্থাপন করে, প্রতিটি তলেই চার বা ততোধিক রত্ন স্থাপিত হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন: রাধাগোবিন্দ মন্দির, দক্ষিণ ময়নাডাল (থানা- পাঁশকুড়া, মেদিনীপুর)

সাধারণভাবে মন্দির দু’টি উপাদানে নির্মিত হয়— ইট এবং পাথর। এই বিভাজন ছাড়াও, মন্দিরের আরও কিছু বিভাজন করা যায়। সেটি তার অলংকরণ বিচার করে। মন্দির অলংকরণের বিভিন্ন রীতি আছে। প্রধান এবং সর্বজনপ্রিয় হল টেরাকোটা ফলক যুক্ত করা। মন্দিরের সৌন্দর্য এবং মহিমা দুইই বৃদ্ধি পায় তার ফলে। ইটের তৈরি মন্দির তো বটেই, পাথরের দেওয়াল দেওয়া মন্দিরেও পোড়ামাটির ফলক যুক্ত আছে, এমন উদাহরণও কম নেই।

আরও পড়ুন: ঔষধি গাছে ঘেরা ঝাড়গ্রামের কনক দুর্গা

টেরাকোটা ফলকে সমৃদ্ধ মন্দিরই সবচেয়ে জনপ্রিয়। তার সমাদর চিরকালীন। দেশে বিদেশে সর্বত্রই টেরাকোটা ফলক গুণিজনের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়ে এসেছে। মেদিনীপুর জেলার যে কয়েকটি মন্দির, টেরাকোটা ফলকের গুণে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল, মাংলই গ্রামের এই মন্দির তাদের একটি।

আরও পড়ুন: মন্দির বানিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় রেল, দেড়শতাধিক বছর ধরে সেখানেই আরাধ্য দুর্গাপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গা

মন্দিরটি বিুষ্ণমন্দির। মন্দিরের পাশেই রয়েছে দেবতার একটি রাসমঞ্চ। এত সুন্দর, সারা অঙ্গ জুড়ে এত অলংকৃত রাসমঞ্চ এই জেলায় খুব কমই আছে। কিন্তু এই মন্দির ও রাসমঞ্চের বর্তমানে অতি জীর্ণদশা। রাসমঞ্চে একটি প্রতিষ্ঠালিপি আছে। সেটির হুবহু বয়ান— ”শ্রীশ্রী রাধাদামুদরজীউ/ শুভমস্তু সকাব্দাঃ /১৭৮০ সক সন ১২/ ৬৬ সাল ইঙরাজী/ সন ১৮৫৯ সাল/ শ্রীঠাকুরদাস মাইতি”। অর্থাৎ দেড়শো বছর অতিক্রম করেছে এটির আয়ু।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মী বা অলক্ষ্মীপাড়ায়, ১৯৬৪-র একদিন

একটু অতীত ইতিহাসে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। পাঁশকুড়া থানার লাইফ লাইন বলা যায় কংসাবতীকে। কৃষিজ সম্পদে বহুকাল থেকে সমৃদ্ধ পাঁশকুড়া থানা। এই থানার উর্বরতা নির্মাণ এবং আর্থিক সমৃদ্ধির মূল কারিগর কংসাবতী নদী। দাসপুর থানার শিলাবতীর মতো, পাঁশকুড়া থানায় একসময় নীল এবং তুঁতচাষে গভীর ভূমিকা পালন করেছে কংসাবতীর অববাহিকা অঞ্চলগুলি। একসময় রেশম শিল্পের সুবাদে, তার উৎপাদন এবং বাণিজ্যের ফলে, বহু পরিবার ধনী হয়ে উঠতে পেরেছিল। সেসময় ইংরেজের প্রচলিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু থাকায়, তাঁদের অনেকেই ছোট-বড় নানা মাপের জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পাঁশকুড়া থানায় আজ যত দেবমন্দির আছে, তার অধিকাংশই এইসকল জমিদার পরিবারের হাতে তৈরি হয়েছিল। ধরে নেওয়া যায়, ঠাকুরদাসও সেই ধারাতেই জমিদারি এবং কুলদেবতার জন্য অনিন্দ্য সুন্দর এই মন্দির আর রাসমঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে তাঁর বংশধরগণই মন্দির ও রাসমঞ্চের মালিক।

আরও পড়ুন: জনাইয়ের বাকসা গ্রামে…

ইটের তৈরি বর্গাকার মন্দিরটি দক্ষিণমুখী। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ উভয়ই সাড়ে ১৮ ফুট, উচ্চতা প্রায় ৩৫ ফুট। বাংলা ১২৪৪ সন বা ইং ১৮৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটির গরিমা তার টেরাকোটা ফলকের জন্য। একই বেদিতে তিনটি মন্দির— মূল বড় মন্দির রাধা-দামোদরের, শালগ্রাম শিলা বিগ্রহে আরাধনা। পঞ্চ-রত্ন রীতির মন্দির, মাথার রত্নগুলিতে কলিঙ্গশৈলীর ‘রথ-বিভাজন’ ও ‘পীঢ়ভাগ’ রচিত। মূল মন্দিরের অলিন্দে ত্রি-খিলান দ্বারপথ। মাথার সিলিং ‘টানা খিলান’। গর্ভগৃহের একটিই দ্বারপথ, সিলিং হয়েছে পাশ-খিলানের উপর গম্বুজ স্থাপন করে। দু’দিকে আছেন দুই মহাদেব, তাঁদের মন্দির দু’টি শিখর দেউল রীতির। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সওয়া ৬ ফুট, উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। সিলিং চারটি অর্ধ-খিলান করে নির্মিত।

বিষ্ণু মন্দিরটি টেরাকোটা ফলকে সমৃদ্ধ। ফলকগুলি আছে সামনের দেওয়াল জুডে়। মুখ্য ফলকগুলি আছে তিনটি দ্বারপথের মাথায় তিনটি পৃথক প্যানেলে। মোটিফ— কমলে কামিনী, অর্জুনের লক্ষ্যভেদ, বকাসুর বধ, হিড়িম্বা বধ, গোপিনীগণ পরিবৃত রাধাকৃষ্ণ, রামবাবণের যুদ্ধ ইত্যাদি। অষ্টাদশভুজা দুর্গার ফলকটি উল্লেখযোগ্য।

একটি রাসমঞ্চ আছে রাধা-দামোদরজীউর। শ্রেষ্ঠ সম্পদ সেটিই। মুখ্য চূড়ার সঙ্গে দ্বিতলে আট এবং ত্রিতলে আট— এই নিয়ে সতেরো চূড়া রাসমঞ্চ। চূড়াগুলি কলিঙ্গধারায় পীঢ় ভাগ করা। আট কোনা সৌধ। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ১৬ ফুট, উচ্চতা ২৫ ফুট। পশ্চিমদিকের পাদপীঠে সিঁড়ি যুক্ত একটি ছোট সুড়ঙ্গদ্বার আছে উপরে উঠবার জন্য। যা একান্তই নজিরবিহীন। সিঁড়ির নীচের সিলিংগুলি নির্মাণে শিল্পী তাঁর দক্ষ হাতের ছাপ রেখে গেছেন।

অজস্র টরাকোটা ফলকে সমৃদ্ধ সৌধটি। মোটিফ হিসাবে দেখা যায়: কৃষ্ণলীলা থেকে— গোপিনীদের বস্ত্রহরণ, ননীচুরি, নৌকা পারাপার ইত্যাদি। রামায়ণ থেকে— সীতাহরণ, জটায়ুর যুদ্ধ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, বানর সেনা, রামের অভিষেক ইত্যাদি। এর সঙ্গে রূপায়িত হয়েছে সমুদ্র মন্থন, দশভুজা বন্দনা, দুর্গার আবির্ভাব ইত্যাদি। একেবারে উপরের সারিতে আট দিক জুডে় আটটি বড় প্যানেল। বড় বড় মূর্তিতে রাধা-কৃষ্ণ–গোপিনীদের লীলাক্রীড়া রচিত। পঙ্খের কাজে ময়ূরমূর্তিগুলিও নজর কেডে় নেয়। কিন্তু মন্দির এবং রাসমঞ্চ— দু’টিরই আজ ভারী জীর্ণ দশা। সংস্কারের অভাবে, মৃত্যুর প্রহর গুনছে সৌধ দু’টি। অথচ, রক্ষা করলে, জেলার ঐতিহ্যপূর্ণ প্রত্নসম্পদ হিসাবে গণ্য হতে পারত এগুলি।

সাক্ষাৎকার: শ্রীঅসিত কুমার মাইতি— মাংলই।

পথ-নির্দেশ: পাঁশকুড়া রেল স্টেশন থেকে রাধাবল্লভপুরগামী ট্রেকার নিয়মিত যাতায়াত করে। কাঁসাই নদীর পাড় ধরে, ফুলের জলসা দেখতে দেখতে, যাত্রাপথটি ভারি মনোরম। পাটনায় নেমে, ডান হাতে মাংলই গ্রাম।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *