রাধাগোবিন্দ মন্দির, দক্ষিণ ময়নাডাল (থানা- পাঁশকুড়া, মেদিনীপুর)

চিন্ময় দাশ

আড়াইশো-তিনশো বছর আগের কথা। একটা সময়কাল জুড়ে অনেকগুলি সম্প্রদায়ের মঠ গড়ে উঠেছিল মেদিনীপুর জেলায়। রামানুজ সম্প্রদায়, নিম্বার্ক সম্প্রদায়, গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় তাদের অন্যতম। মন্দিরও নির্মাণ করেছিল এরা প্রত্যেকেই। এই তালিকায় ছিল মধ্বাচার্য্য সম্প্রদায়ও। ভারতজুড়ে বহু মঠ-মন্দির ছিল এদের। মেদিনীপুর জেলাতেও একটি মঠ গড়েছিল মধ্বাচার্য্য সম্প্রদায়। সেই প্রাচীন মঠ আর মন্দিরের ইতিহাস ভূগোল নিয়ে আমাদের আজকের জার্নাল।

আরও পড়ুন: ‘বাংলার শিবাজি’ শোভা সিংহের শীতলা মন্দির, রানির বাজার (ঘাটাল থানা, মেদিনীপুর জেলা)

প্রথমে আমরা এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মধ্বাচার্য্য সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলে নিই। দক্ষিণাপথের অন্তর্গত তুলুব-এর অধিবাসী মধিজি ভট্টের পুত্র ছিলেন মধ্বাচার্য্য। বলা হয়, ভগবান নারায়ণের আদেশে, স্বয়ং বায়ু দেশে ধর্ম স্থাপনের জন্য মানবদেহে আবির্ভূত হয়ে, মধ্বাচার্য্য নামে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন। ১১২১ শকাব্দ তাঁর আবির্ভাব কাল। বাল্যকালে মাত্র ৯ বছর বয়সে, অনন্তেশ্বর মঠে বিদ্যালাভের কালেই জনৈক প্রেক্ষাচার্যের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। সেসময়ই বৈরাগ্যের উদয় হওয়ায়, সংসার ত্যাগ করেন। তাঁর গুরুর দেওয়া নাম— পূর্ণপ্রজ্ঞ। এছাড়াও আনন্দতীর্থ, আনন্দজ্ঞান, জ্ঞানানন্দ, আনন্দগিরি প্রভৃতি নামেও তিনি খ্যাত হয়েছিলেন।

মধ্বাচার্য্য ‘গীতাভাষ্য’ রচনা করে বদ্রিকাশ্রমে যান এবং ব্যাসদেবকে উপহার দেন। প্রীত হয়ে তাঁকে ৩টি শালগ্রাম উপহার দিয়েছিলেন ব্যাসদেব। সুব্রহ্মণ্য, উদিপী এবং মধ্যতল— এই ৩ স্থানের তিনটি মঠে শিলাগুলি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। উদিপী ছিল মধ্বাচারীদের প্রধান তীর্থ। সেখানে তিনি এক বণিকের জলমগ্ন জাহাজ থেকে একটি কৃষ্ণমূর্তি উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

উদিপীতে অবস্থানকালে মধ্বাচার্য্য ৩৭টি মূলগ্রন্থ এবং কয়েকটি ভাষ্য রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর মত হল, সকলের আগে একমাত্র অদ্বিতীয় আনন্দস্বরূপ ভগবান নারায়ণই বিরাজিত ছিলেন। সেই নারায়ণ বা বিষ্ণুর কায়া থেকেই সমূহ জগতের উৎপত্তি। মধ্বাচার্য্য ঋষি ঈশ্বর ও জীবের পৃথক স্বত্ত্বা স্বীকার করতেন। সেকারণে, তাঁর মত ‘দ্বৈতবাদ’ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছিল। বদরিকাশ্রমে তাঁর তিরোধান ঘটে।

বহুসংখ্যক শিষ্য ছিল তাঁর। ৮টি মঠ প্রতিষ্ঠা করে, ৮ জন ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসীকে অধ্যক্ষ হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। শিষ্য পরম্পরায় অধ্যক্ষ নিয়োগের রীতি বা নির্দেশও দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর প্রিয় শিষ্য ছিলেন পদ্মনাভতীর্থ। তিনি ৪টি মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এইভাবে শিষ্য পরম্পরায় সারাদেশে বহু মঠ এবং মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমাদের বর্তমান আলোচ্য মন্দিরটি তেমনই একটি।

মেদিনীপুর জেলায় পাঁশকুড়া থানার ময়নাডাল গ্রামে মন্দিরটি স্থাপিত। ৪টি ফলকে বিভক্ত একটি প্রতিষ্ঠালিপি আছে এই মন্দিরে। টেরাকোটা অর্থাৎ মাটির ফলকে খোদাই করে পোড়ানো, লিপি। বানান ও যতিচিহ্ন অপরিবর্তিত রেখে, ক্রমান্বয়ে লিপির বয়ানটি এরকম: “সন ১১৪৫ সাল / মাহ বৈসাখ। শ্রী প্রাণবল্বভ / গোস্বামীর সেবক। সেবক শ্রীবি / ক্রম দে। শ্রী কৃষ্ণচরন / দাস রাজা।” পূর্ববর্তী পুরাবিদ অধ্যাপক প্রণব রায়-এর বিবরণ এবং আমাদের সমীক্ষাকালে মন্দিরের পরিচালক-পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সংগ্রহ করা বিবরণ থেকে বলা যেতে পারে— এই মঠের মোহান্ত প্রাণবল্লভ গোস্বামীর সময়কালে, বাংলা ১১৪৫ সন কিংবা ইং ১৭৩৮ সালে এই দেবালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

পঞ্চ-রত্ন রীতির দক্ষিণমুখী মন্দির। ইট-চুন-সুরকির উপাদানে নির্মিত। সাড়ে ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের সম্পূর্ণ বর্গাকার সৌধটির উচ্চতা ৩৫ ফুট। পাদপীঠ তেমন উঁচু নয়। তবে একটি প্রদক্ষিণ-পথ আছে পাদপীঠের উপরে। সামনে খিলান-রীতির তিনটি দ্বারপথ যুক্ত অলিন্দ। গর্ভগৃহে অতিরিক্ত একটি দ্বারপথ আছে, পুরোহিতের প্রবেশের জন্য। একটি সিঁড়িও আছে উপরে ওঠার। পাঁচটি রত্নেই ‘রথ-বিভাজন’ করা। কোণের রত্নগুলিতে ‘ত্রি-রথ’ এবং কেন্দ্রীয় রত্নটিতে ‘পঞ্চ-রথ’ বিভাজন করা হয়েছে। রত্নগুলির মাথায় বেঁকি, আমলক, কলস এবং চক্র স্থাপিত। অলিন্দের ভিতরের ছাদ হয়েছে ‘টানা-খিলান করে। গর্ভগৃহের ছাদ প্রথমে দুদিকে দুটি বড় খিলান গড়ে, তার মাথায় ছোট গম্বুজ স্থাপন করে নির্মিত হয়েছে। পরবর্তীকালে একটি ঝুলন মন্দির এবং একটি নাটমন্দির নির্মিত হয়েছিল এখানে। ঝুলন মন্দিরটি ‘দালান-রীতি’র, নির্মিত হয় ১২৫৫ বঙ্গাব্দ বা ইং ১৮৪৮ সালে। কারিগর ছিলেন দাসপুরের বৃন্দাবনচন্দ্র মিস্ত্রি। আর নাটমন্দিরটি নির্মিত হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দ বা ইং ১৯২০ সালে। এই সবগুলি নিয়ে মন্দির-চত্বরটি ‘অস্থল’ নামে পরিচিত।

প্রয়াত মোহান্তদের চার-চালা রীতির কয়েকটি সমাধি-মন্দির আছে এখানে, একই চত্বরে। তার ভিতর প্রধান হল, অস্থলের আদিপুরুষ প্রাণবল্লভ গোস্বামীর সমাধিটি। কিন্তু বর্তমানে ভারী জীর্ণ অবস্থা সৌধটির। ভিতরে উঁকি মেরে দেখবার মতো অবস্থাও নেই। তবে বাইরে দেখা যায়, সামনের দেওয়ালটি বর্গাকার সুদৃশ্য টেরাকোটা ফলকে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফলকগুলিরও আজ ভারী জীর্ণ দশা। নাটমন্দিরের সামনে, অন্য দুটি সমাধি-মন্দিরের দ্বারপথের দু’দিকে, দুটি করে দ্বারপালমূর্তি স্থাপিত আছে। মূল মন্দিরটিও টেরাকোটা ফলকে সাজানো হয়েছিল। তিনটি দ্বারপথের মাথার উপরের তিনটি বড় প্রস্থে, কার্নিশের নীচে একটি সারিতে এবং দু’দিকের কোনাচ অংশের লাগোয়া দুটি সারিতে ছিল ফলকগুলি। ১৯৫০ সালে মন্দিরের সংস্কার কাজের সময়, কেবল কোনাচের দুটি সারি ছাড়া, অধিকাংশই মুছে ফেলা হয়েছে। ফলকগুলির মোটিফ হিসাবে দেখা যায়— চতুর্মুখ ব্রহ্মা, ডমরুধারী মহাদেব, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ইত্যাদি দেবদেবীর মূর্তি। মানবমূর্তি হিসাবে দেখা যায়— মৃদঙ্গ বাদনরত কীর্তনিয়া, জটাধারী সন্ন্যাসী, গোঁসাই ঠাকুর ইত্যাদি।

সাক্ষাৎকার শ্রীপূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী, শ্রীকৃষ্ণানন্দ চক্রবর্তী— দক্ষিণ ময়নাডাল।

সহযোগিতা শ্রীপার্থ দে— তমলুক।

পথ-নির্দেশ ট্রেন কিংবা বাসযোগে পাঁশকুড়া। সেখান থেকে উত্তরে ঘাটালগামী পথে কেশাপাট। সেখান থেকে ২ কিমি পশ্চিমে দক্ষিণ ময়নাডাল গ্রাম। ভৌগোলিক অবস্থান— ২২.৪৪৮৮৮ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৭.৭৩৫২৮ পূর্ব দ্রাঘিমা।

ছবি লেখক

Similar Posts:

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *