শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়ির রঘুনাথের রথযাত্রা

তিরুপতি চক্রবর্তী

নদিয়া জেলার ভাগীরথী পাড়ের সুপ্রাচীন ও সুপ্রসিদ্ধ এক জনপদ হল ‘শান্তিপুর’। মূলত হস্তচালিত তাঁত শিল্পের পীঠস্থান এই শান্তিপুর তার কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে বর্ণময়। যুগাবতার শ্রীশ্রীচৈতন্যদেব, শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য্য, সাধক শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, ‘শ্রীরাম পাঁচালী’ বা রামায়ণ রচনাকারী কবি কৃত্তিবাস ওঝা সহ বহু সাধুপুরুষের লীলাক্ষেত্র। এই পুণ্যভূমি বীর আশানন্দ, কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, নাট্যকার নির্মলেন্দু লাহিড়ী প্রমুখের জন্মস্থান এই  পূণ্যভূমি। এই শান্তিপুর এক উৎসব নগরী। শাক্ত-বৈষ্ণবের মিলনক্ষেত্র এই মন্দির নগরীতে বারো মাসে তেরো পার্বণ। যদিও শান্তিপুর রাসোৎসবের জন্য সুপ্রসিদ্ধ, তথাপি শান্তিপুরে পালিত হয় না এমন কোনও উৎসব বা ব্রত নেই। দুর্গোৎসব, রাসোৎসব, দোলযাত্রা, গাজন প্রভৃতির পাশাপাশি বহু প্রাচীনকাল থেকে শান্তিপুরে মহাসমারোহে পালিত হয় রথযাত্রা। সেই আবহমান কাল থেকে শান্তিপুরে বড় গোস্বামী বাড়ি ও মধ্যম গোস্বামী বাড়ির গোকুলচাঁদজিউ, সাহা বাড়িতে রথযাত্রা পালিত হয়ে চলেছে। আজ আমরা বলব বড়গোস্বামী বাড়ির রথযাত্রা সম্পর্কে।

আরও পড়ুন: গড়িয়ার রথবাড়ি

আনুমানিক সতেরো শতকে জানকীনাথ চট্টোপাধায়ের বংশের রাজবল্লভ নামে এক ব্যক্তি শান্তিপুর মদনগোপাল পাড়ার ভট্টাচার্য বংশে বিবাহ করে কুলভঙ্গ করেন। কুলভঙ্গ করে রাজবল্লভ চট্টোপাধ্যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত শান্তিপুরে মসলিনের বড় কারখানায় কাজ পান। এরপর তিনি নিজ পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সততার গুণে ফ্যাক্টরির দেওয়ান পদে নিযুক্ত হন এবং এ অঞ্চলে ‘দেওয়ান চাটুজ্জে’ নামে বিখ্যাত হন। উক্ত চট্টোপাধ্যায়দের শান্তিপুরের বাটীতে রঘুনাথজিউ বিগ্রহ স্থাপিত ছিল এবং তাঁরা মহাধুমধামে রঘুনাথ বিগ্রহকে নিয়ে শান্তিপুরের বাড়িতে প্রথম রথযাত্রা পালন করতেন। রাহুল হালদার শান্তিপুরের রথ নিয়ে একটি লেখায় (লেখার নাম শেষে দেওয়া হল) দেখিয়েছেন যে, পরবর্তীকালে যখন চট্টোপাধ্যায়রা শান্তিপুর থেকে চলে যান, তখন তাঁরা শ্রীরঘুনাথ বিগ্রহকে শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য্যের বংশধর বড়গোস্বামীদের হাতে তুলে দেন। বড় গোস্বামী বাড়ির লোকেরা তখন থেকেই চট্টোপাধ্যায়দের রঘুনাথকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরামকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ৩০০ বছরেরও আগে থেকে শান্তিপুরে রথযাত্রার ধারাটি বজায় রাখেন। যে রঘুনাথজিউকে কেন্দ্র করে এই রথযাত্রা শুরু হয়, তার শ্রীমূর্তিটি রামচন্দ্রের প্রচলিত মূর্তি অপেক্ষা একটু আলাদা প্রকৃতির। এখানে রামচন্দ্র পদ্মাসনে উপবিষ্ট, ধুতি পরিহিত, গায়ে চাদর ও গাত্রবর্ণ সবুজ।

আরও পড়ুন: রথ, লোকারণ্য; ইতি আনন্দ

মূলত রঘুনাথ বা শ্রীরামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই রথ ক্রমে শান্তিপুরবাসীর কাছে রঘুনাথের রথ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। পুরী, গুপ্তিপাড়া, মাহেশ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য রথগুলির প্রত্যেকটিই কাষ্ঠ নির্মিত হলেও শান্তিপরে রঘুনাথের রথটি লৌহ নির্মিত। রথটির উচ্চতা প্রায় তিরিশফুট, ন’টি চূড়া বা রত্নমণ্ডিত এবং ন’টি লৌহনির্মিত বিশালাকার চক্র রথের একদম শীর্ষদেশে বৃহত্তর চূড়ার ভিতর শ্রীশ্রীরামচন্দ্র সহ জগন্নাথ-সুভদ্রা ও বলভদ্রা দেবত্রয়ের মূর্তি বসানো হয়। রথযাত্রা উপলক্ষে রথটিকে সুন্দরভাবে সাজানো হয়।

রথযাত্রার দিন অর্থাৎ আষাঢ়ী শুক্ল দ্বিতীয়া তিথিতে সকালবেলা বড়গোস্বামী বাটীর ভিতর শ্রীরামচন্দ্রকে হাওদায় বসিয়ে বিশেষ পূজা করা হয়। বিশেষপূজা শেষ হলে জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম দেবত্রয়ের সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্রকেও রথের কাছে নিয়ে আসা হয়। ভক্তবৈষ্ণবগণ কীর্তন করতে থাকেন। খোল-কর্তাল-হারমোনিয়াম, শঙ্খ, উলু প্রভৃতি মাঙ্গল্য ধ্বনীতে মুখরিত হয় রথপ্রাঙ্গণ। রথপ্রাঙ্গণে দেব-বিগ্রহগুলিকে আনার পর সেখানে আবার তাঁদের নৈবদ্য নিবেদন করা হয়। তার পর কীর্তন করতে করতে ও প্রভুর জয়গান করতে করতে দেব মূর্তিগুলি নিয়ে ভক্তবৃন্দ রথের চারিদিক পরিক্রমা করেন। রথপরিক্রমান্তে শ্রীরামচন্দ্রকে চেন ও কপিকলের সাহায্যে রথের সর্বোচ্চ চূড়ায় তোলা হয়। রথের নির্দিষ্ট জায়গায় শ্রীমূর্তিগুলি বসানোর পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমবেত আপামর ভক্তবৃন্দ রথের দড়িতে টান দিয়ে  রথকে নিয়ে যেতে থাকেন। টানতে টানতে সকলে প্রভুর জয়ধ্বনী করতে থাকেন।

আরও পড়ুন: রথের দিনে ‘রাধারাণী’-র খোঁজ আজও করি

এই রঘুনাথের রথকে কেন্দ্রকরে বড়গোস্বামী পাড়ার রথতলা থেকে মাতা আগমেশ্বরী দেবীর মন্দির পর্যন্ত মেলা বসে। রথদ্বিতীয়া থেকে শুরু করে উল্টোরথ পর্যন্ত চলে এই মেলা। রথের মেলা মানেই জিলিপি আর পাঁপড়ভাজা। এছাড়াও বসে নানা রকম মাটি বা কাঠের পুতুল, কাঠের রথ, বর্তমানের প্লাস্টিকের খেলনা, বাঁশি, একতারা, মনোহারী সামগ্রী ও অন্যান্য মুখরোচক খাবারের দোকান। আর বর্ষার মরশুম হওয়ায় রথের মেলার একটি অন্যতম বিক্রয় সামগ্রী হল বিভিন্ন কলমের গাছ। দূর-দূরান্ত থেকে চাষি ও নার্সারির মালিকেরা কলমের আম, পেয়ারা, লেবু প্রভৃতির চারাগাছ নিয়ে দোকান করেন।

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

শুধু রথযাত্রাই নয়, শান্তিপুরের রথযাত্রা মানে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসবও বটে। সেই আবহমানকাল ধরে চলে আসছে রথযাত্রার দিন ঘুড়ি ওড়ানোর রেওয়াজ। ঘুড়ি ওড়ানোকে কেন্দ্র করে শান্তিপুরের শিশু কিশোর থকে শুরু করে বয়স্করাও মেতে ওঠেন এই রথের দিন। রথের কিছু দিন আগে থেকে চলতে থাকে কাচগুঁড়ো করা, সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া প্রভৃতি। দক্ষ কারিগররা তাঁদের সিদ্ধ হাতে ঘুড়ি তৈরি করেন রঙবেরঙের কাগজে বাঁশের কাঠি লাগিয়ে। বিশেষ কারিগরি দক্ষতায় তৈরি করতে থাকেন বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ি। বর্তমানে কাগজের ঘুড়ির পাশাপাশি প্লাস্টিকের ঘুড়ির চাহিদাও বেশ বেড়েছে। রথের দিন সকাল থেকে শুরু হয় মাঠে-মাঠে, ছাদে-ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা। সেদিন সকাল থেকে শান্তিপুরের আকাশ লাল, নীল, সবুজ হরেক রকম রঙের বিভিন্ন আকৃতির ঘুড়িতে ছেয়ে যায়। চলে প্যাঁচ খেলার লড়াই। একদলের ঘুড়ি কেটে গেলে অন্যদল আনন্দ করে।

আরও পড়ুন: বদ্যিনাথের সংসার: মতি নন্দীর একটি অগ্রন্থিত গল্প

তারপর থেকে অপেক্ষা উল্টোরথের। উল্টোরথের আগের দিন বড়গোস্বামী বাড়িতে শ্রীশ্রীরামচন্দ্রকে দ্যাওড়া ভোগ নিবেদন করা হয়। এবং দ্বিতীয়ার মতো একই রীতিতে রথে তুলে পুনরায় যথাস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আশা হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী রথের দিন থেকে পুনর্যাত্রার দিন পর্যন্ত জগন্নাথের মাসির বাড়িতে থকার যে রীতি আছে শান্তিপুরে রঘুনাথের পৃথক কোন গুন্ডীচা মন্দির না থাকায় গর্ভমন্দিরে যেখানে রামচন্দ্র সারাবছর থাকেন সেই মন্দির ব্যতীত ভিন্ন একটি মন্দিরে রামচন্দ্র সহ জগন্নাথ, বলদেব এবং সুভদ্রাদেবীকে দ্বিতীয়া থকে নবমী পর্যন্ত রাখা হয়, দশমির দিন পুনর্যাত্রার মাধ্যমে আবার দেবতারা নিজমন্দিরে প্রত্যাবর্তন করেন।

ঋণ স্বীকার

রঘুনাথ জীউ, ঘুড়ি উৎসব এবং মেলাকে কেন্দ্র করে জমে ওঠা শান্তিপুরের রথযাত্রা: রাহুল হালদার

ভাষাপথ: বাংলার রথ সংস্কৃতি সংখ্যা (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০১৮), সম্পাদনা: অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সনৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *