রাখীর সঙ্গে গুলজারের যে সম্পর্ক কিংবা জ্যোৎস্নার সঙ্গে রেশমের…

পূর্বা মুখোপাধ্যায়

আমাদের কালে রাখীপূর্ণিমা আর তরুণ বয়সের মধ্যে একটা রহস্যমধুর সম্বন্ধ ছিল। আমরা ছেলেমেয়েরা যখন জুটি নয়, দল বেঁধে ঘুরতাম, ধরা যাক পাঁচটি ছেলের সঙ্গে তিনটি মেয়ের একটি দল, আমরা মেয়েরা স্থির করে নিয়েছিলাম এই ছেলেদের সঙ্গে আমাদের কিছুতেই প্রেম হবে না। কঠোর প্রতিজ্ঞা যাকে বলে। প্রতিবারই রাখী উপলক্ষে আমরা রেশমি সুতোর বর্ণিল বন্ধন কিনে আনতাম এবং সাঙ্গোপাঙ্গদের হাতে জড়াতাম। তারপর এটা খাওয়াবি চ’ ওটা খাওয়াবি চ’ করে একপ্রস্ত দাবিদাওয়া চলত। বাড়ি আসার সময় ক্যাডবেরি, পেন, কবিতার বই ব্যাগে ঢুকত, রাখীবন্ধনের উপহার। রফিক ছিল আমার নিবিড় স্নেহের ভাই। স্নেহের আতিশয্যজনিত কারণে সে আমাকে তারাপদ রায়, দামি কলম-টলম যতই উপহার দিতে থাকে, আমার বাবা কিঞ্চিৎ বিচলিত হয়ে পড়তে পড়তে একদিন বলেই ফেলেন, “কই, সব ভাইয়ের প্রতি তোমার সমস্নেহ দেখি না কেন!” ফলে সেম বোট ব্রাদার্স অচিরে বাড়িতে আমার পিতৃসকাশে আবির্ভূত হয়।

আরও পড়ুন: রিপন কলেজ: কলকাতা থেকে দিনাজপুর

সে কথা যাক। বাবার কন্যাটি যে রাখীবন্ধনের ব্যাপারে যথেষ্ট অনির্ভরযোগ্য, তার প্রমাণ তিনি কেন, তাঁর কন্যাও অনেক দেরিতে টের পেয়েছিল। বহু রেশমবন্ধনের গিঁট অস্বীকার করে শেষপর্যন্ত যিনি এ নশ্বর জীবনের সঙ্গীরূপে অবতীর্ণ হলেন, তাঁকে বাবার আদেশে স্বহস্তরচিত ফুলের রাখী বেঁধেছিলাম। বাবাকে দুঃখিত করা আমার অভিপ্রায় ছিল না। তথাপি সত্যের খাতিরে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম বাঁধছি, কিন্তু এ রাখী সে রাখী নয়। “তবে এ কোন্ রাখী?” জানার জন্য বাবা মরিয়া হলে তাঁকে মনোযোগ দিয়ে একটি নজরুলগীতি শুনতে বাধ্য করি এবং জয় গোস্বামীর একটি কবিতা। নজরুলকে বাবা কাছেপিঠে পাননি কখনও। জয় গোস্বামীকে পেয়ে খুশির চোটে তাঁর বিখ্যাত কবিতাটি ভাগ্যিস ভুলে গিয়েছিলেন! আমি কিন্তু উভয়ের সেই মিলনদিনে যথেষ্ট মাত্রায় উদ্বিগ্ন ছিলাম।

আরও পড়ুন: সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)

আমাদের কালে প্রেমের সঙ্গে রাখীপূর্ণিমার একটি আড়াআড়ি মধুর সম্বন্ধ ছিল। বহু ছেলের বুক ঢিপঢিপ করত পাছে কবজিতে আকাঙ্ক্ষিত স্পর্শখানি ভুল দিনে ভুলভাবে এসে লাগে। এখনও তা তেমনভাবে আছে কিনা, জানা নেই। তবে কিনা, চিরপুরনো চাঁদ উঠলে এখনও সেই চোরা হাওয়া লুকিয়ে লুকিয়ে বয়ে যায়। আকাশ ও পৃথিবীর বহুবর্ণময় বন্ধনরহস্য ভেদ করতে গিয়ে জীবনানন্দীয় হৃদয়ের বোন কথাটির অর্থ সহসা বুঝতে পারি। জ্যোৎস্নারাত্রিটি বড় মধুময় লাগে। সাধ হয়, যা কিছু সুন্দর অক্ষয় হোক, চিরতারুণ্যময় হোক। অনুভূতির তারে তারে বেজে উঠুক প্রাণ। আর, আনন্দের সঙ্গে বিস্ময়বোধের সম্বন্ধ হোক চিরজীবী।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *