প্রাচীন পুজোর রানাঘাট

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

যে বয়সে অনেকেই ‘ঠাকুর’ দেখতে যায়, সেই বয়সে আমার কোনও পুজো ছিল না। জমিদার বংশের স্পর্শ ছিল আজন্মকাল, তাই মোহমুক্তি ঘটেছিল সামন্তপ্রভু, জমিদার, সম্ভ্রান্ত ইত্যাদি শব্দগুলির থেকে। জমিদারদের বাড়িগুলোকে খণ্ডহর জ্ঞানে দাপিয়ে বেড়িয়েছি সেখানে, হরর-থ্রিল খুঁজতে চেয়েছি।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি পুরস্কারজয়ী ফুলিয়ার বীরেন বসাকের বাড়ির দুর্গোৎসব বাড়ির পুজোয় থিমের ব্যবহার আনে প্রথম

শৈশবে বোধনের ভোরে বাবার হাত ধরে পালচৌধুরী বাড়ির মণ্ডপে গিয়ে পৃথক আতিথেয়তা পেয়েছি। কেন তা বুঝিনি, পরে শুনেছি পালচৌধুরী বংশের রেওয়াজ ছিল বোধনের দিন ভোরে শুদ্ধবস্ত্রে, নগ্নপদে হালালপুরে সরখেলদের বাড়িতে পূজা-উপাচার পৌঁছিয়ে উক্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের অনুমতি নেওয়ার। তবেই তারা নাকি নিজেদের পূজার্চনা শুরু করতে পারতেন। সেই রেওয়াজের খোঁয়াড়িতেই বোধ করি বাবা পৃথক আতিথেয়তা পেতেন!

আরও পড়ুন: বৈষ্ণব এবং শাক্ত মতের সমষ্টি বাগনান কল্যাণপুরের রায়বাড়ির পুজো

এ পর্যন্ত গল্পকথাই মনে হবে। তাছাড়া রানাঘাট এমন এক স্থান যার নিজস্ব, নিরপেক্ষ কলমে লেখা কোনও প্রাচীন ইতিহাস নেই। এ শহর যেন আত্মপর (স্বার্থপর হতে গেলেও তো সু অর্থ সম্পন্ন হতে হয়) মানুষে ভরভরন্ত! যেন ইতিহাস ভুলে থাকা অথচ myth-মিথ্যা আঁকড়ে থাকার শহর! ইতিহাসের অর্থ কি রাজা-জমিদার-সম্ভ্রান্তদের মিছিল! ইতিহাস মানে কি শুধুই তাদের বন্দন-গীতি?

আরও পড়ুন: শান্তিপুরে ৫০০ বছরের অধিক পুরনো চাঁদুনি বড়ির পুজো

আমি আমার পুরোনো আচরণেই মত্ত থাকি— সামন্তদের কীর্তন করার বাসনা আমার নেই এবং পুজোর প্রতি অকৃত্রিম অশ্রদ্ধা এখনও অটুট। তবু অনুজ বন্ধুর দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়ে চেষ্টা করব কালের নিয়মে পয়সার ঝনৎকার শোনানোর জন্য কত পরিবার পুজোয় মেতেছিল আর সেইসব পুজোর কোনগুলো এখনও বিদ্যমান, সেটাই দেখার।

আরও পড়ুন: শান্তিপুরের বড় অদ্বৈত অঙ্গনে শারদীয়ায় পূজিতা হন দেবী কাত্যায়নী

আগে দুই পালচৌধুরী বাড়িতে দু’টো পুজো হত। একটা এখন বন্ধ, আর একটি পুজো যে এ-বছরেও হবে তা বুঝলাম শিল্পী অনুপ পালের বাড়িতে মূর্তির ছবি তুলে!

আরও পড়ুন: ২৭৫ বছরের পুরনো রানাঘাটের দে চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো

শৈশবে যৌবনে যে ভগ্নপ্রায় সাতমহলা বাড়িতে তোরণ দিয়ে দেখা যেত পুজোমণ্ডপ, প্রৌঢ়ত্বে দেখেছি সেগুলো সব জবরদখল অথবা ছদ্মবিক্রি হয়ে যেতে। এখন যদিও বা অতি কষ্টে মণ্ডপটি দেখা যাবে, কিন্তু টেরাকোটার জোড়া শিব মন্দির দু’টি দৃশ্যদূষণের অন্তরালে চলে গেছে। আর পাঁচটি খিলানযুক্ত ঠাকুর দালানের অনেকখানি ছাদ ভেঙে গিয়ে শুধু থাম দাঁড়িয়ে আছে।
এই পরিবারের কন্যা ইন্দ্রাণী পালচৌধুরী হলিউডের একজন বহু আলোচিত মডেল, অভিনেত্রী, পরিচালক তথা ফোটোগ্রাফার।

আরও পড়ুন: মন্দির বানিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় রেল, দেড়শতাধিক বছর ধরে সেখানেই আরাধ্য দুর্গাপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গা

ঘটকপাড়ায় কয়েক ঘর ঘটক তথা পূজারি ব্রাহ্মণের বাস ছিল ঠিকই, কিন্তু পাড়ার খ্যাতি ছড়িয়েছিল একদা স্বাধীনতা-যোদ্ধা তথা ধানবাদের একটি কয়লা খনির মালিক শ্রীহারাধন ঘটকের সুবাদে। তদানীন্তন সময়ে ইংরেজ স্থপতির তৈরি পোর্টিকো সমন্বিত বিশাল বাংলো বাড়ি, দারুণ ফোয়ারা, সযত্নলালিত ফুলের বাগান সম্ভ্রম আদায় করত। এই ঘটক বাড়ির পুজোও দেড়শো বছরের প্রাচীন। বিগত বছর পঁচিশেক ধরে সিমেন্টের মূর্তি (শিল্পী: অনুপ পাল) পূজিত হয় এবং দশমীতে শুধুমাত্র ঘট বিসর্জন হয়।

আরও পড়ুন: নারায়ণপুরের সরকার বাড়ির দুর্গার চালচিত্রে আঁকা থাকে গ্রামের বিদ্যালয়ের ছবি

আমি সবিশদ কিছু জানি না, তবে পুরোহিত পাড়ার ‘সদু বামনির পুজো’ নাকি রানাঘাটের আদি পুজো! এখন বারোয়ারি পুজো হলেও শুভনামটা অবিকৃত রয়ে গেছে।

পালচৌধুরী বংশের প্রায় সমসময়ে চূর্ণির পশ্চিম পাড়ে আঁইশতলায় দেচৌধুরী পরিবার বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেন। স্রোতস্বিনী দামাল নদী তার গতিপথ পাল্টানোয় ভাঙনের তোড়ে ভেঙে পড়ে সেই প্রাসাদ।

তারপর ওই পরিবার বর্তমান দেচৌধুরীপাড়ায় ১১৯৮ বঙ্গাব্দে প্রাসাদ নির্মাণ করান। পরিবারের মতে ২৭৫ বছরের পুরনো তাদের এই পুজো। বছর কয়েক আগে পূজামণ্ডপটিকে দারুণভাবে সাজিয়ে তোলা হয়। পুজোর ক’টা দিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও নাকি হয়!
এই বংশের এক সুসন্তান কবি নিজন দেচৌধুরী।

নাশড়াপাড়ার ঘোষ বাড়ির পুজোও নাকি ৫০০ বছরের দ্বারপ্রান্তে! ছোট বয়স থেকে শুনে এসেছি যে, এই পরিবারের পুজো হুগলিতে থাকার সময়ে শুরু হয়েছিল। এই পাড়ার জনবৈচিত্র‍্যের সুবাদে এই বাড়ির পুজোয় হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্য সম্মিলন দেখা যেত। বর্তমানে বসতবাড়ির ভগ্নদশা! তবু এখনো কয়েকজন বংশধর পুজোর ব্যবস্থা করেন।
প্রখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী পার্থ ঘোষ এই বংশের সুসন্তান।

নাশড়াপাড়ার শর্মাবাড়ির পুজো নাকি ৭৫০ বছরের বেশি সময় (ওই পরিবারের দাবি) অতিক্রম করেছে! কয়েক বছর আগে পুজোমণ্ডপটিকে ঢেলে সাজানোর পরে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

রানাঘাটের অন্যতম প্রাচীন লালগোপাল উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি যাঁর দানে নির্মিত, সেই লালগোপাল পাল মহাশয়ের ভদ্রাসনে বিগত প্রায় ১৬৫ বছর ধরে বেশ জাঁক করেই দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। যথাযথ সংস্কারের ফলে সিংহদ্বার, ভবন ও মণ্ডপ এখনও সুদৃশ্য।
রানাঘাটের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সঙ্গে পাল পরিবারের সুসন্তান শ্রীসলিল পাল মহাশয় জড়িত ছিলেন।

রানাঘাট শহরের সীমা ছাড়িয়ে উত্তরে হিজুলি গ্রামের গাঙ্গুলি বাড়ির পুজো পৌনে দু’শো বছরের। নিয়মিত মণ্ডপ সংস্কার হয়। এই পুজো এখনও গ্রামের মানুষের অতিপ্রিয় (যদিও এখন অনেক বারোয়ারি পুজো হচ্ছে)।

কালের দামাল প্রবাহে অনেক পুজো বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকগুলি খুঁড়িয়ে চলেছে আর কিছু পুজো এখনও পুজোর জাঁক বজায় রেখেছে।

ছবি: ভাস্কর

যেসব পুজো বন্ধ হয়ে গেছে, তার মধ্যে অগ্রগণ্য পালচৌধুরী বংশের স্থপতি কৃষ্ণচন্দ্র পান্তির চূর্ণি তীরবর্তী আদি বাসভবনের আদি পুজোটি। চাঁদনি মাঠের পাশের জোড়া নহবতখানায় উস্তাদ ও তাঁর সাগির্দদের সম্মেলক বাদনে মুখরিত হত শারদ আকাশ আর সেই তোরণের নীচ দিয়ে ঢাকের বাদ্যির তালে তালে শুরু হত পুজো। কয়েকবারের বিরতিসহ এই পুজো ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল।

কৃষ্ণচন্দ্র পান্তির নহবতখানা। ছবি: ভাস্কর

আমরা শৈশবে এই পুজোকে ‘তারা পালচৌধুরীর পুজো’ বলতাম। এই বাড়ির পুজো বন্ধ হওয়ার পরে এলাকাবাসীর ধারণা পালচৌধুরীদের পুজো মানেই চাঁদনি মাঠের উল্টোদিকেরটা।

রানাঘাটের উত্তরে হালালপুরে শাহী সড়কের ওপর আনুমানিক ৩০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল সরখেল বংশের দুর্গাপুজো। কিন্তু প্রায় ৯০ বছর আগে জমিদার বাড়িতে ভয়াবহ ডাকাতির পরে সপরিবারে তাঁরা শহরে চলে যান এবং সেই পুজো বন্ধ হয়ে যায়।

রানাঘাটের চিলড্রেন্স পার্কের পাশে কাঁসারি বাড়ির পুজো, ষষ্ঠীতলায় দ্বারিক মল্লিকের পুজো, দেচৌধুরীপাড়ার জনার্দন কুণ্ডুর বাড়ির পুজো, রেলের পূর্বপাড়ে মহাপ্রভুপাড়ার মুখে মল্লিকদের বাড়ির পুজো এসবই বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, ঘটক পাড়ায় ১১৫ বছর পুজো চালানোর পরে গত ২০১৬ সালে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
এই বংশের সন্তান ছিলেন শিল্পী সত্যনারায়ণ দালাল যিনি ছবি আঁকার পাশাপাশি শস্যের ওপর মিনিয়েচার ছবিও আঁকতেন।

২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যায় অত্যন্ত মানবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পূর্বপাড়ের ‘সুরেন প্রামাণিকের পুজো’র কর্মকর্তারা। তাঁরা তাঁদের পুজো বন্ধ ক’রে বন্যাপীড়িতদের আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করেন।

রানাঘাটের চাঁদনি (অথবা হ্যাপি ক্লাব অথবা বড়বাজার মাঠ নামে পরিচিত) মাঠ সংলগ্ন চূর্ণি নদীর ঘাটে যে ভাসান হত, তা ছিল নয়নাভিরাম (বছর কয়েক আগে অবশ্য অসহ্য প্রযুক্তি এসে ঢেকে দিয়েছে ঐতিহ্যকে)।

বছর পঁয়ত্রিশ আগে দশমীর দুপুরে দুই নৌকায় পা’ রেখেই যেন দেবী যেতেন বিসর্জনে। পালচৌধুরী বাড়ির দেবী নিরঞ্জনের পর একে একে বালুচরে এসে দাঁড়াত অন্য বাড়ির, পল্লির মূর্তিগুলো।

ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে মন্দমন্থরে, হাজার হাজার দর্শক জড়ো হতেন এই ভাসান দেখবেন বলে। শুধু এই ভাসান দেখার জন্যেই দূরদূরান্ত থেকে দর্শক আসতেন, আত্মীয়ের ভিড় লেগে থাকত পরিবারগুলোয়। নদীতে নৌকার ভিড় জমে যেত, নৌভ্রমণ করতে করতে ভাসান দেখতেন শৌখিন মানুষজন।

ফাইল চিত্র

বিশাল মাঠের একপাশে বড়সড় চৌকো এরেনা করা থাকত ‘মকফাইট’ মানে বাজি পোড়ানোর জন্যে। নানা বয়সের ছেলেমেয়েরা ওই এরেনা থেকে নানা দিকে উড়িয়ে দিত হাউই, রকেট; ফাটাত কালিপটকা/ ধানিপটকার চেইন অথবা ছোট থেকে বড় চক্লেট বোমা অথবা দোদমা; জ্বালাত তুবড়ি, ইলেক্ট্রিক তার; আরও কত কী-ই!

ক্লান্তি ধুয়ে যেত চূর্ণির জলে, ফুটে উঠত অমলিন হাসি। বাড়ি ফেরা, পথে কোনও শূন্য মণ্ডপে সিদ্ধিতে চুমুক, বড়দের ঢিপ আর ছোটদের কপালে টিপ। ঘুমের ঘোরে ভোর রাতে বলে উঠত, আসছে বছর…

উল্লিখিত ছবি ছাড়া সব ছবিই লেখকের তোলা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *