গড়িয়ার রথবাড়ি

সোমা মুখোপাধ্যায়

আজ থেকে প্রায় বছর দেড়েক আগেকার ঘটনা। নদিয়া জেলার শান্তিপুরের রাধা মদনগোপালের ওপর ফেসবুকের আমার লেখা পড়ে আমার সঙ্গে পরিচয় হয় একটি মেয়ের।ওর নাম রূপা। জানতে পারি, তার শ্বশুরবাড়ি বৈদ্যবাটি অর্থাৎ আমার বাপের বাড়ি শ্রীরামপুরের থেকে খুব বেশি দূর নয়। এভাবেই গড়ে ওঠে পরিচয়। জানা যায়, তার একটি ছোট ছেলেও আছে। ফেসবুকে বন্ধুত্ব হওয়ার পর সেদিনই তার প্রোফাইল দেখতে গিয়ে আমি এক অদ্ভুত জগন্নাথ মূর্তি দর্শন করি।এই জগন্নাথ সচরাচর আমরা যে জগন্নাথ দেখে থাকি, তার থেকে একেবারেই ভিন্ন ধরনের। সঙ্গে রয়েছেন সুভদ্রা আর বলরাম, তাঁরাও অন্যরকম। আমি সঙ্গে সঙ্গেই ওকে‌ আবার মেসেজে জিজ্ঞাসা করি যে, এই মূর্তিটি কোথাকার? এর উত্তরে সে জানায় যে, তার বাপের বাড়ি হল গড়িয়া এবং ওই বাড়িতেই তাদের জগন্নাথের মন্দির আছে। আমি শুনে খুবই আগ্রহ দেখাই ওই মন্দিরটি দেখতে যাব বলে। আমার অফিস থেকে বেশি দূর নয়। তখন আমি অফিসেই ছিলাম।

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

ছুটির পর অফিস থেকে বেরিয়ে আমি গড়িয়ার দিকে রওনা হই। এই রাস্তা আমার বেশ চেনা। তাই অসুবিধা হয় না ওদের বাড়ি পৌঁছে যেতে। ৪৫নং বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা নিয়ে নিই তাই। এছাড়া এলাকাতেও ওদের বাড়িটি খুবই পরিচিত। কারণ বাড়িটার নাম রথবাড়ি। প্রতিবছর রথযাত্রা খুব ধুমধাম করে পালিত হয়।

আমার আসার কথা মেয়েটি তার বাবাকে অনেক আগেই বলে রেখেছিল। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন আমার জন্য। দোতলার উপরে ওদের থাকার জায়গার পাশাপাশি রয়েছে জগন্নাথ মন্দির আর দুর্গা মন্দির। পরিচয় হয় রূপার মায়ের সঙ্গেও, যিনি ইসকনের একজন ভক্ত। পরিবারটি ভীষণভাবে দেবতার প্রতি অনুরাগী। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কথা বলে আমি এই জগন্নাথ দেবের এক বিরল ইতিহাস জানতে পারি। জানতে পারি, আমাদের সংস্কৃতির এক অজানা দিক। রূপার বাবা নারায়ণ চন্দ্র বণিক আর পরবর্তীতে পিসিমা স্বপ্না মজুমদারের স্মৃতি থেকে জানা এই কাহিনি আমি তুলে ধরলাম।

আরও পড়ুন: বদ্যিনাথের সংসার: মতি নন্দীর একটি অগ্রন্থিত গল্প

রূপার বাবারা সকলেই অবিভক্ত বাংলার নোয়াখালি অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। এই মূর্তি তাঁর ঠাকুরদা চন্দ্র মোহন বণিকের প্রতিষ্ঠিত। ওনার জন্ম ১৯০৩ সালে। ১৬ বছর বয়সে তিনি বাবা-মাকে না জানিয়ে ওনার ঠাকুরমা আর ঠাকুরদার সঙ্গে পুরীধামে জগন্নাথ দেবের দর্শনে যান। জগন্নাথ দর্শনের পর ওনার মনে হয় যদি ওনার সঙ্গে এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটে অর্থাৎ ওনার কাছেও যদি সমুদ্রে নিমকাঠ ভেসে আসে, তাহলে উনিও তা দিয়ে বাড়িতে বিগ্ৰহ প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু সাতদিন পুরী বসবাসে এমন কিছুই ঘটে না।

যেদিন ওনারা ফিরে আসবেন, সেদিন সমুদ্রকে প্রণাম করতে গিয়ে ওনার পায়ে কিছু একটা ঠেকে। উনি দেখেন, একটা নিমকাঠের চারা‌। চন্দ্র মোহন এমনিতেই আধ্যাত্মিক প্রকৃতির ছিলেন। তিনি আপ্লুত হন এই চারা পেয়ে। বোঝেন, জগন্নাথ দেব সব ভক্তের মনোবাসনাই পূর্ণ করেন। সত্যিই তো যদি কোনও বিশাল নিমকাঠ ভেসে আসত, তা তো নোয়াখালি পুরী থেকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হত না। যাইহোক, বাড়ি ফিরে ওই নিমচারাটি তিনি পুঁতে দেন।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)

রথ সাজানো, ছবি রূপা বণিক পাল

এরপর প্রায় সাত বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। ততদিনে গাছটিও বড় হয়েছে। তবে বিগ্ৰহ নির্মাণের জন্য আরও সময়ের অপেক্ষায় উনি থাকেন। এই সময় তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহের পর পর এক রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেন চন্দ্র মোহনের সদ্য বিবাহিত নববধূ। তিনি দেখেন, তাঁদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠার জন্য জগন্নাথ বলরাম আর সুভদ্রার দারু বিগ্ৰহ। উনি ওনার স্বামীকে স্বপ্নেই জিজ্ঞাসা করছেন, এই বিগ্ৰহকে কীভাবে ধান দুর্বা দিয়ে বরণ করবেন। স্ত্রীর স্বপ্নের এই স্বগোক্তিতে চমকে ওঠেন চন্দ্র মোহন। নিমগাছ তো এখনও বড় হতে বাকি। এ তাহলে কীসের ইঙ্গিত!

কেটে যায় কয়েকটা দিন ‌ওদেশের রীতি অনুসারে অষ্টমঙ্গলার পরে বধূ একা তাঁর বাপের বাড়ি গিয়ে থাকেন। একে বিজোরে যাওয়া বলে। যেদিন চন্দ্র মোহন স্ত্রীকে আনতে যাবেন, সেদিন দরজা খুলে হতবাক হয়ে দেখেন আগের রাতে সামান্য ঝড়ে ওই নিমগাছটি পরে গেছে। চন্দ্র মোহন বোঝেন অন্তর্যামীর ইচ্ছের কথা। শ্বশুরবাড়ি থেকে সস্ত্রীক ফিরে এসেই ওই বৃক্ষ থেকে স্থানীয় শিল্পীকে দিয়ে অপরূপ তিনটি বিগ্ৰহ নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকেই এই বিগ্ৰহ পূজিত হচ্ছেন বণিক পরিবারে।

আরও পড়ুন: বাংলাভাষাকে সঙ্গে নিয়ে হিল্লিদিল্লি

স্নানযাত্রার ছবি, রূপা বণিক পাল

চন্দ্র মোহনের ছিল পারিবারিক সোনার রুপো র ব্যবসা। ব্যবসার কাজে তাঁকে নানা জায়গায় ঘুরতে হত। এমনই একদিন তিনি কোনও এক জায়গায় যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি মসজিদের গায়ে এক অদ্ভুত লেখা দেখে তার মন পরিবর্তন হয়। লেখাটি ছিল এইরকম— ‘ঠকাতে ঠকাতে যায় ঠকিতে ঠকিতে যায়’। ওনার মনে হয়, এই লেখা যেন ওপরওয়ালা তার জন্যই পাঠিয়েছে। সত্যিই তো যিনি স্বর্ণকার, যাঁদের সোনা-রুপোর ব্যবসা, তাঁরা যখন মানুষকে জিনিস বেচেন, তখন তো সেই খাদ মেশানো জিনিস বেচে।

প্রসাদ, ছবি: রূপা বণিক পাল

আবার মানুষের কাছ থেকে যখন সোনা বা রুপোর জিনিস কেনেন, তখনও সেই খাদ বাদ দিয়ে একেবারে যতটা পারে কম টাকা তাঁদেরকে দেন। অর্থাৎ তাঁরা মানুষকে ঠকানোর ব্যবসা করে। কিন্তু এর বিনিময়ে তাঁরাও তো ঠকে যায়। সেটার হিসেব তো একজনই রাখেন, যাঁকে চোখে না দেখলেও শেষ বিচারের দিনে তাঁর কাছে এই বিচার তো তাঁদের হবেই। সঙ্গে সঙ্গেই যেন তাঁর মন পরিবর্তন হয়ে যায়। তিনি স্থির করেন, আর যাই করুন এই লোক ঠকানোর ব্যবসা তিনি কোনও দিনই করবেন না। বাড়ি ফিরে তিনি তাঁর বাবাকে এই কথাটা জানান।

সেই সময় তাঁর ঠাকুরমা মারা গিয়েছিলেন। গয়ায় পিণ্ডদান করতে তিনি তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। এইখানে তিনি ঠাকুমার পিণ্ডদানের পাশাপাশি আরেকটি ও পিণ্ডদান করেন অর্থাৎ তার ব্যবসার পিণ্ডদান। তিনি অঙ্গীকার করেন যে, তাঁর বংশধররা আর কেউ কোনওদিন এই লোক ঠকানো সোনা-রুপোর ব্যবসা করবেন না।

আরও পড়ুন: সাহিত্যের ইয়ারবুক (ঠিকানাপঞ্জি): বাংলা সাহিত্য-প্রেমীদের এক মূল্যবান সম্পদ

ছবি সৌজন্য:মতলব জগন্নাথ মন্দির, চট্টগ্ৰাম, বাংলাদেশ

ভারত বিভাজন হলে তাঁরা এই বঙ্গে চলে আসেন। তাঁর ইষ্ট দেবতা সহ এবং এখানে মন্দির পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন। জগন্নাথ দেবের রথ তাঁর হাতেরই তৈরি। বর্তমানে সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আবার একটি রথ ওই রথের আদলেই তৈরি করা হয়েছে।

বাংলায় আমরা যে জগন্নাথের পুজোর ধারা দেখি, তা শুরু হয় মোটামুটি চৈতন্যদেবের পুরী যাওয়ার পর থেকে। আর নিমকাঠে দেবদেবীর মূর্তি তৈরি নাকি পুরীর জগন্নাথ দেবের ধারাকে অনুসরণ করে করা হয়। কলকাতার বহু প্রাচীন পরিবারে কোথাও এককভাবে জগন্নাথ দেব। আবার কোথাও জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মন্দির যেমন আছে, তেমনি নিত্য দেবদেবীর পাশে জগন্নাথের মূর্তি রয়েছে। এইসব মূর্তিগুলো পুরীর জগন্নাথের অনুরূপ। কিন্তু রূপাদের এই জগন্নাথের মূর্তি সম্পূর্ণ অন্যরকম।

আরও পড়ুন: তামিল পত্রিকা ‘বিবেকচিন্তামণি’

শিল্পী দেবাশীষ চন্দের হাতে গড়া জগন্নাথ

রূপাদের বাড়ির এই তিন দেবতার মূর্তি একেবারেই মানুষের মুখের আদলে। তাঁদের নাক চোখ আর মুখের খোদাই একেবারে ভিন্ন রকম। এছাড়া এখানে জগন্নাথ দেবের গায়ের রং ছিল নীল। রূপা এবং রূপার বাবা নারায়ণ চন্দ্র বণিক জানান যে, ২০১৪ সাল নাগাদ ওনার ভাইয়ের ছেলে এই ঠাকুরের অঙ্গরাগ করার আগে স্বপ্নাদিষ্ট হন। সেখানে জগন্নাথ দেব তাঁকে জানান যে, তাঁর মূর্তি যেন পুরীর মতোই হয়। তবে বলরাম এবং সুভদ্রাকে বদল করার কোনও দরকার নেই। সেইমতোই তিনি তাঁর গৃহদেবতার অঙ্গরাগ করেন।

রূপার বাবা নারায়ণ চন্দ্রবাবু আর পিসিমা স্বপ্নাদেবী আরও জানান যে, অবিভক্ত বাংলার নোয়াখালিতে নাকি জগন্নাথ দেবকে রামচন্দ্রের অনুরূপভাবে পুজো করা হত‌। রামচন্দ্র ওখানে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। সেই কারণেই ওখানকার জগন্নাথদেবের গায়ের রং নীল। আর তার মুখমণ্ডলের গড়নটাও একেবারেই অন্যরকম। পুরীর জগন্নাথদেবের মতো নয়। এভাবেই তাই ওই জগন্নাথ বলরাম আর সুভদ্রাকে নির্মাণ করেছিলেন নোয়াখালির সেই শিল্পী।  

হাণ্ডিলের জগন্নাথ দেব। ছবি সৌজন্য: শ্রীশ্রীজগন্নাথ ধাম, হান্ডিয়াল, চাটমোহর, পাবনা

আমি পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেট থেকে বাংলাদেশের কিছু জগন্নাথ মূর্তি দেখার চেষ্টা করি এবং খুব আশ্চর্য হই যে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে যে জগন্নাথ মূর্তিগুলো রয়েছে, তা কিন্তু সমস্তই এই রূপাদের দেবতাদের আদলের। কোথাও আবার জগন্নাথ বলরাম অনেকটা দু’হাত তোলা গৌর-নিতাইয়ের মতো। মনে হয়, গৌর এবং নিতাইয়ের প্রভাবে বাংলাদেশের নোয়াখালি এবং তাঁর সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে এই ধরনের জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা নিজস্ব ঢঙে মূর্তি তৈরি হয়েছিল, যা অনেকটাই পুরীর জগন্নাথের থেকে আলাদা। এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণায় হয়তো অনেকটা আলোকপাত করতে পারবে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *