রোগ এবং রোগমুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ

অনিন্দ্য বর্মন

মৃগেন ভটচায্ ওরফে আত্মারামকে চেনেন? ভবানন্দ? অথবা লক্ষ্মণ ভটচায্? এদের না চেনাটাই স্বাভাবিক। অথচ বাজারে এদের প্রত্যেকেরই বিশেষ সুনাম। প্রত্যেকেই ভালো গণৎকার। একজন যোগ্য চিকিৎসকের মতোই সর্বরোগ নাশ, মানুষের পীড়া নিবারণ এদের হাতের মুঠোয়। পরে জানা যায়, এরা প্রত্যেকেই দাগি আসামি। চিকিৎসাশাস্ত্রের আড়ালে ফেঁদে বসেছিল জঘন্যতম ব্যবসা। শয়ে শয়ে মানুষ এদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু একদিন এরকম ধুরন্ধর আসামির মুখ থেকেও খসে পড়েছিল ভালোমানুষিকতার মুখোশ।

আরও পড়ুন: একটি বিশুদ্ধ ইতরামি

ঠিক এই ব্যবসাটাই (পড়ুন, কালোবাজারি) হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। অতিমারিই সম্ভবত একমাত্র প্রাণী, যার জন্মদিন পালিত হল মৃত্যু এবং কান্নায়। মনে পড়ে, গতবছর ঠিক এই সময় সমগ্র দেশে জারি হয়েছে সতর্কবার্তা। প্রত্যহ বাড়ছে অতিমারির প্রকোপ এবং মৃতের সংখ্যা। একদিকে চিকিৎসকেরা লড়ছেন, শহিদ হচ্ছেন অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে। অন্যদিকে, জীবনদায়ী ওষুধ বাজারে অমিল, পারদ চড়ছে মধ্যবিত্তের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের। এক বছর পরেও এই বাস্তবটা পাল্টায়নি। জীবনদায়ী ওষুধ এবং অক্সিজেন নিয়ে শুরু হয়েছে চাপান-উতোর। তারই মাঝে নির্বাচনী লড়াই। এই দ্বৈত দৈত্য মানুষকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর পথে। শহরের রাস্তা জুড়ে গড়ে উঠছে মনুষ্যসভ্যতার কবর-শশ্মান।

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ: সত্যজিৎ রায়ের দু’টি সিনেমা

এখানেই মনে থেকে যাবেন সত্যজিৎ রায়। অনেকের প্রিয় মানিকদা। ভারতের প্রথম অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্দেশক, লেখক এবং স্রষ্টা, সুকুমার রায়ের সুপুত্র সত্যজিৎ রায়। উপরের তিনটি মানুষকে হয়তো এবার চিনতে পারবেন। এনারা হলেন গোঁসাইপুর সরগরম-এর মৃগেণ ভটচায্, সোনার কেল্লা-র ভবানন্দ এবং হত্যাপুরী-র লক্ষ্মণ ভটচায্। যদি বর্তমান প্রাসঙ্গিকতার কথা ওঠে, তাহলে সত্যজিতের লেখনী এবং চলচ্চিত্রে বারংবার উঠে এসেছে বিভিন্ন অসুখ অথবা মহামারির কথা।

আরও পড়ুন: করোনাকালের ডায়রি ১

প্রথমেই আসা যাক সত্যজিৎ সৃষ্ট চলচ্চিত্রের কথায়। পথের পাঁচালী-তে অসুখের চলচ্চিত্রায়ন আমরা দেখেছি, মুগ্ধ হয়েছি এবং কেঁদেওছি। ইন্দিরা ঠাকুরণ মারা যান বার্ধক্যজনিত অসুখে। এরপর দুর্গার জ্বর এবং মৃত্যু আমাদের শোকস্তব্ধ করেছে। যক্ষ্মাজনিত রোগে হরিহরের মৃত্যু। বিভূতিভূষণের লেখনীকে হুবহু পর্দায় তুলে ধরেছিলেন নির্দেশক। অশনি সংকেত-এর মন্বন্তরেও বেজে উঠেছে মৃত্যুর হাহাকার। মানুষ এবং তাদের অসহায়তা। ভেঙে পড়া সমাজ, শাসনব্যবস্থা। সেই রকমই আকৃষ্ট করে চারুলতা। একদিকে চারুলতার একাকিত্ব, অন্যদিকে মন্দাকিনীর উচ্ছলতা। গৃহের প্রাচীরে আবদ্ধ একটি প্রাণ যে উড়তে চায়, স্বাধীন হতে চায়। মন্দাকিনী বর্তমানের আদর্শ নারী। একদিকে তার ঘর বাঁধা পড়ে আছে সংসারধর্মে, অন্যদিকে সে মুক্তমনা। ঠিক যেমন এই সমকালীন লকডাউনে আমরাও খুঁজে নিতে চাইছি একটি মুখায়বয়ববিহীন মুক্ত, তরতাজা বাতাস। আবার গুপী গাইন বাঘা বাইন-এ কণ্ঠহীনদের স্বর ফিরিয়ে দিয়ে চেষ্টা হয়েছে রোগ নিরাময়ের। সত্যজিৎ একদিকে তুলে ধরেছেন রোগ এবং আর্তনাদ, অন্যদিকে মানুষকে দেখিয়েছেন নিরাময়ের পথ।

আরও পড়ুন: আমাদের প্রতিটা দিনই মে দিবস

ঠিক তেমনই বারংবার সত্যজিতের লেখনীতেও উঠে এসেছে বিভিন্ন রোগ এবং নিরাময়ের উল্লেখ। সুরজ সিং (গোলাপি মুক্তা রহস্য) অথবা মগনলাল মেঘরাজ (জয় বাবা ফেলুনাথ, যত কাণ্ড কাঠমান্ডু এবং গোলাপি মুক্তা রহস্য)-এর ক্ষেত্রে বারবার ফেলুদা বলেছে যে, এই মানুষগুলির রোগ হল এরা সামান্য কিছু টাকা ফেলে দুনিয়াটাকে কিনতে চায়। রোগে ক্লিষ্ট অর্জুন এখানে সার্কাসের খেল দেখায় (জয় বাবা ফেলুনাথ)। অথবা আহত কারাণ্ডিকার বশ করে সুলতানকে (ছিন্নমস্তার অভিশাপ)। সত্যজিতের আরেক সৃষ্টি এবং আবিষ্কার কামু মুখোপাধ্যায়। সোনার কেল্লা-র মন্দার বোস, জয় বাবা ফেলুনাথ-এর অর্জুন। এক ক্ষেত্রে আসামির চ্যালা, অন্যক্ষেত্রে রোগাক্লিষ্ট ব্যক্তি। অথচ তাদের সমস্ত দোষ নির্দেশক ঢেকে দেন তাদের অভিনয়ের মাধ্যমে। সত্যজিতের সৃষ্ট প্রফেসর শঙ্কু-র ক্ষেত্রেও উঠে এসেছে বিভিন্ন রোগের কথা। এবং সকল ক্ষেত্রেই প্রফেসর শঙ্কু রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করেছেন তার সর্বরোগনাশক বড়ি মিরাকিউরল। এই ওষুধের গুণেই তিনি কখনও সারিয়ে তুলেছেন বিশিষ্ট বন্ধু সন্ডার্সের কর্কটরোগ অথবা সামারটনকে বাঁচিয়ে তুলেছেন নির্মম বিষের আঘাত থেকে। এভাবেই বারবার বিভিন্ন রোগের নিরাময় করেছেন শঙ্কু। অবশ্য শঙ্কুর ক্ষেত্রে সত্যজিৎ আরেকটি অস্ত্রের ব্যবহার করেছেন। দুষ্ট দমনের অস্ত্র অ্যানাইহিলিন। এই দিয়েই শঙ্কু সকল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের নাশ করেছে।

আরও পড়ুন: আমি না গেলে মান্নাবাবু গান গাইবেন না, বলেছিলেন প্রবাদপ্রতিম তবলাবাদক রাধাকান্ত নন্দী

ব্যক্তিগত মতে, সত্যজিৎ পৃথিবীর ঘৃণ্যতম রোগের ব্যাখ্যা করেছেন নিজস্ব লেখনী এবং চলচ্চিত্রায়নের মেলবন্ধনে। হীরক রাজার দেশে বর্তমান সময়ের যোগ্য পূর্বসূরি। রাজা ধংস করেছেন শিক্ষাব্যবস্থা, রাজ্যকে উন্নত প্রতিপন্ন করতে হটিয়ে দিয়েছেন গরিব রাজ্যবাসী, মুখ বন্ধ করেছেন কৃষক, শ্রমিক অথবা গায়কের এবং দেশ উন্নয়নের নামে গড়ে তুলছেন স্বপ্রতিমা। এবং সত্যজিতের মতে, এটাই এই বর্তমানের সবথেকে ভয়ংকর রোগ। অসুখ। এই অতিমারি এবং সত্যজিৎ মিলে গিয়ে একাকার। সত্যজিৎ বহু আগেই লিখেছিলেন, আমি অনেক পরে লেখা শুরু করি। তখন তিনি প্রায় চল্লিশ। আর হীরক রাজা বলেছিলেন— এরা যত বেশি জানে, তত কম মানে। হে ভারত, আমি মূর্খই ভালো আছি কারণ পৃথিবীখ্যাত নির্দেশক আকিরা কুরোসেওয়া বলেছিলেন— সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র সূর্য এবং চন্দ্রমা। তা যদি না দেখে থাকো, তাহলে কিছুই দেখনি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *