প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

অলিভিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

৯ এপ্রিল কবিতাপ্রেমীদের কাছে একটি স্মরণীয় দিন। শার্ল বদলেয়রের (১৮২১-৬৮) জন্মদিন। আর এই ৯ এপ্রিল দ্বিশতবর্ষ পেরিয়ে গিয়েছেন তিনি। আশ্চর্য সমাপতনে এই দিনেই প্রয়াত হলেন কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় (১৯৪০-২০২১), যাঁর কাব্যসম্ভার ছুঁয়ে ছিল বদলেয়রের আধুনিকতার একটি প্রধান দিক: যাবতীয় শুচিতার সংস্কার তথা মাঙ্গলিক অবভাস অতিক্রম করে ধ্রুব এক অমঙ্গলবোধ আজীবন তাড়িত করেছে ছয়ের দশকের এই বিষাদপ্রোথিত কবি-আত্মাকে।

পাঁচের দশকের শেষভাগে বাংলা কবিতায় পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের আবির্ভাব, কিন্তু প্রতিষ্ঠা ছয়ের দশকের গোড়ায়। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর খ্যাতি যখন তুঙ্গে এবং হাংরি কবিরা যখন অন্তর্ঘাতময় ইশতেহার ছড়িয়ে দিচ্ছেন, পবিত্র তার মধ্যেও নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন, বস্তুত তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন বাংলা কবিতার স্বতন্ত্র একটি ভাবধারা। মূলত সুসংবদ্ধ দীর্ঘকবিতা ও বৈচিত্র্যময় সনেটের জন্য স্মরণীয় এই কবি দু’টি সাহিত্য আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব— ধ্বংসকালীন আন্দোলন (১৯৬৯) ও থার্ড লিটারেচার (১৯৮০)। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা কাব্যধারায় তাঁর সম্পাদিত কবিপত্র (১৯৫৭) কখনোই কৃত্তিবাস বা শতভিষা-র মতো অতি-গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উল্লিখিত না হলেও ছয় দশকের বেশি সময় ধরে এই পত্রিকা নিরন্তর আমাদের বাংলা কবিতার নতুন রসদ জুগিয়ে চলেছে। 

আরও পড়ুন: মাতৃভাষা দিবসে ‘ভাইরাল’ উত্তম-কিশোর স্মৃতিমাখা গানের দৃশ্য প্রসঙ্গে

পাঁচের দশকের অস্মিতা তথা কাব্যে শিল্পিত আত্মপ্রক্ষেপের ধারণা থেকে দূরে সরে পবিত্র ঘোষণা করেছিলেন—

আমি ভূতগ্রস্ত কবি, সম্মোহিত শব্দের শিকারী

আজন্মতাড়িত আত্মা; অস্থির অশান্ত সিদ্ধবাক;

যে তীক্ষ্ণ আঘাত করে, আমি পায়ে নত হই তারই;

যদি সে পোড়ায়, আমি পুড়ে পুড়ে হয়ে যাই খাক্‌,

এবং উদ্ভূত ছাই ভরে রাখি শব্দের কলসে; … (নির্বাচিত কবিতা ১)

তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘শবযাত্রা’ (১৯৬১) থেকেই কবিসত্তার নিজস্ব স্বর শোনা গিয়েছিল। এরপর একে একে ‘হেমন্তের সনেট’ (১৯৬১), ‘আগুনের বাসিন্দা’ (১৯৬৭) এবং ‘ভাসান’ (১৯৬৯) প্রকাশিত হয়। এই কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ মিলে তাঁর কাব্যধারার প্রথম পর্যায়ে মুখ্য বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছিল মৃত্যু ও বিষাদ। অভিমান ও বেদনার প্রকাশে এই পর্বে তিনি অন্তর্মুখী। ১৯৬৯-এ প্রকাশিত ‘ইবলিসের আত্মদর্শন’ থেকে তাঁর কাব্যধারার দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা। এই সময়েই তিনি ধ্বংসকালীন কবিতা আন্দোলন শুরু করেন, যার চেতনা পরবর্তী দশকে ‘অস্তিত্ব অনস্তিত্ব সংক্রান্ত’ (১৯৭০), ‘বিযুক্তির স্বেদরক্ত’ (১৯৭২), ‘সঙ্গ নিঃসঙ্গতার দিনলিপি’ (১৯৭২) ইত্যাদি কাব্য পর্যন্ত প্রসারিত। পূর্ববর্তী ধারণার সঙ্গে এই পর্বে যুক্ত হয়েছে আগ্নেয় দ্রোহ। পরবর্তী সময়ে ‘পশুপক্ষী সিরিজ’ (১৯৮১), ‘দ্রোহহীন আমার দিনগুলি’ (১৯৮২), ‘আছি প্রেমে বিষাদে বিপ্লবে’ (১৯৮৭), ‘আরোগ্য-ভূমির দিকে’ (১৯৯৪), ‘পরশুরাম পর্ব’ (১৯৯৬), ‘বিষ নয় উঠেছে অমৃত’ (১৯৯৯) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে দিয়ে থার্ড লিটারেচার আন্দোলনের পটভূমি প্রস্তুত হয়ে যায়। এই একুশ শতকেও পবিত্র জারি রেখেছিলেন কবিতার অভিযান। এই শতাব্দীতে প্রকাশিত হয়েছে ‘সন্ধিক্ষণে আছি’ (২০০১), ‘শোনো স্বপ্নভুক শোনো’ (২০০৫), ‘আমি ভূতগ্রস্ত কবি’ (২০০৭), ‘চেনাপথ অন্ধকার’ (২০১০), ‘সচেতন স্বপ্নচারী’ (২০১১)। পাশাপাশি আত্মজীবনী ‘দ্রোহীপুরুষ’ (২০০৯), ‘জীবন এরকম’ শীর্ষক আত্মস্মৃতিমূলক রচনা ও ডায়েরিতে যেমন অকপট এক কবির মুখোমুখি হই আমরা, তেমনি ছয় দশকব্যাপী কবিপত্র-র মতো কবিতা-পত্রিকা সম্পাদনা ও দীর্ঘদিন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপনার সূত্রেও লিখেছেন পাঁচটি প্রবন্ধগ্রন্থ। এই গদ্যসম্ভারের সিংহভাগই কবিতা-সংক্রান্ত, এখানে তাঁর অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, বিশ্বাস ও পরিণত প্রজ্ঞার পরিচয় পাই আমরা।

আরও পড়ুন: ‘খেলা হবে’ রাজনৈতিক রেষারেষির মাঝে একটুকরো মিষ্টি

পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের জন্ম পূর্ববঙ্গে ১৯৪০ সালের ১২ ডিসেম্বর। ১৯৪৭-এ দেশভাগের ফলে তাঁকে বাংলার পূর্বপ্রান্তের নদীবিধৌত পল্লিপ্রকৃতি তথা শৈশব-কৈশোরের জন্মভূমি থেকে উদ্বাসিত হতে হয়, স্বাভাবিকভাবেই চিরতরে ভিটে হারানোর এই ক্ষত ও বেদনা কবি আজীবন বহন করেছেন। আর এখান থেকেই শুরু হয়েছে উদ্বাস্তু জীবনের সংগ্রাম। পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের কবিতা তথা কবিসত্তায় এই ঘটনাক্রম খুব গভীরে প্রভাব রেখে গেছে।

তাঁর আত্মকথা ‘দ্রোহীপুরুষ’-এর সূচনাই পূর্ববঙ্গের ফেলে আসা গ্রামের কথায়। কবির জন্ম ও শৈশব কেটেছে বরিশালের আমতলিতে, মাতুলালয়ে। ঔপনিবেশিক ভারতের প্রত্যন্ত এক পল্লিগ্রামে আধুনিক সাহিত্যের পরিবেশ তথা সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থার অভাবের মধ্যে ভাবীকালের এক কবির প্রাথমিক পাঠ শুরু হয়েছিল। কিন্তু বালকের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা বিঘ্নিত হয় মায়ের অকালপ্রয়াণে। এক বৃষ্টিভেজা দিনে মায়ের মৃত্যু সাত বছরের বালক পবিত্রকে দিয়ে যায় চিরস্থায়ী এক শূন্যতার বোধ, ‘জীবনের ক্ষণিকতা সম্বন্ধে স্পষ্ট বোধ সেই বয়সেই জন্মে।’ (দ্রোহীপুরুষ) পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের কাব্যভাবনায় যে বিষাদ নিহিত, তার প্রাথমিক উৎস সম্ভবত এখানেই। পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনে কবিতার আগমনে কবির মনে হয়েছিল, সেই মৃত মা যেন আবার তাঁর কাছে ফিরে এসেছেন কবিতা হয়ে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দর্পণে অনেক মুখ’ (১৯৬০)-এ প্রথম যে প্রতিবিম্বটি খুঁজতে চেয়েছিলেন, তা তাঁর মায়েরই। বিশ্বসংসারকে তুচ্ছ করে এক বালক যেভাবে মায়ের কোলে আশ্রয় নেয়, পবিত্রও তেমনি আঁকড়ে ধরেছিলেন কবিতাকে।

আরও পড়ুন: পঞ্চাশ পূর্ণ ‘বাবু মশাইইই…’

আদর্শ শৈশব তিনি পাননি। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা অনেকটাই বিবাগী হয়ে পড়েন, ফলত তিনি মানুষ হন মাসির কাছে। দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে মাসির সঙ্গে এদেশে এসে পৌঁছনোর পরে শুরু হয় কঠোর জীবনসংগ্রাম। আশ্রয়ের সন্ধানে দমদম থেকে খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ থেকে ভবানীপুর, কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় তাঁকে ঘুরতে হয়েছে। দ্রোহীপুরুষ-এর প্রথমাংশে দেখি, কলকাতায় স্থায়ী ঠিকানার খোঁজেই কেটে গেছে গোটা একটা দশক। বারবার বাসাবদলের মতো তাঁকে বদলাতে হয়েছে একাধিক স্কুল। ফলত তাঁর ছাত্রজীবনও বিঘ্নিত। একাধিক স্কুল ঘুরে তিনি থিতু হন কলকাতার বিখ্যাত সাউথ সাবার্বান স্কুলে। এই স্কুলের শিক্ষকদের অনুপ্রেরণাতেই তাঁর কাব্যচর্চার সূচনা। স্কুলের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যপত্রিকাটি সম্পাদনাও করেছেন তিনি। তাঁর সম্পাদনাতেই সাউথ সাবার্বানের সাহিত্য পত্রিকার জীবনানন্দ স্মৃতি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এক কথায় এই স্কুলে থাকতেই তিনি বাংলা কবিতার ভুবনে প্রবেশ করেন। সেই সঙ্গে আধুনিক কবিতার পরিচয় তাঁর কৈশোরক কাব্যপ্রয়াসকে নিজস্বতার দিকে নিয়ে যায়। পাশাপাশি চলছিল দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম। এর মধ্যেও কবিতা তাঁর কাছে ছিলো পরম আশ্বাসের মতো। কবি নিজেই জানিয়েছেন—

দারিদ্রকে ভয় পাইনি কোনোদিন, কেননা জন্ম থেকেই দারিদ্র আমার নিত্যসঙ্গী।… ওর মধ্যে আমার ধ্রুব আনন্দের লক্ষ্য তখন কবিতা। কবিতা আমাকে দারিদ্রের পীড়ন থেকে বাঁচাতো, অসীম আশায় বুক বাঁধতে বলতো, শেখাতো। (দ্রোহীপুরুষ)

নিরালম্ব এক উদ্বাস্তু মানুষ এভাবেই নিজের সর্বস্ব কবিতাকে সমর্পণ করেছিলেন। এই সমর্পণে আত্মনিবেদনের থেকেও বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর আগ্নেয় সত্তার স্ফুরণ। মাসির অকৃত্রিম স্নেহ-প্রশ্রয় ছাড়া প্রায় সর্বক্ষেত্রেই জুটেছে অবহেলা, যে-কারণে শৈশবেই তাঁর মধ্যে ভবিষ্যতের এক দ্রোহীপুরুষের বীজ রোপিত হয়ে যায়। দেশত্যাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে পড়ায় অবহেলা আর প্রত্যাখ্যান স্বভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। আর তাঁর ভেতরের দ্রোহীপুরুষটি ক্রমশ দুর্বিনীত হয়ে উঠতে থাকে এবং কবিতার মধ্যে দিয়েই যাবতীয় অবহেলা, প্রত্যাখ্যানকে প্রত্যাঘাতের পথ খুঁজে নেন কবি। কবিতাই হয়ে ওঠে তাঁর গোপন মোক্ষণের ক্ষেত্র। দ্রোহমূলক প্রত্যাঘাতই হয়ে ওঠে তাঁর কবিসত্তার মৌল ধর্ম। কবি চেয়েছিলেন— ‘যে-কোনো শিল্পই হবে রক্ত দিয়ে ফোটানো গোলাপ।’ (‘যে কোনো শিল্পই হবে’, হেমন্তের সনেট) কবিতার কাছে তিনি কোনও স্বপ্নমদির প্রতিবেশ চাননি, বরং অনিঃশেষ অস্থিরতা, নিরন্তর এক তাড়নাই ছিলো তাঁর ইপ্সিত, যা পাঠকের ভালো থাকার বোধকে বিঘ্নিত করবে। তাঁর কবিতা মধ্যবিত্ত বাঙালির নান্দনিক রুচিশীলতাকে বারবার নিয়ে গেছে অস্বস্তিকর এক নৈরাজ্যের বোধে, যার যথার্থ সূচনা ইবলিসের আত্মদর্শন-এ। ছয়ের দশকে তিনি যে কাব্য-আন্দোলন শুরু করেন তার নামও দেন ধ্বংসকালীন আন্দোলন।

আরও পড়ুন: ‘বনলতা সেন’ আসলে মৃত্যু, জন্ম থেকে জন্মান্তরে যাবার বিশ্রাম

পাঁচ-ছয়ের দশকে কৈশোর-যৌবনের ঋতুতে নিজেকে ‘কংগ্রেস-বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন পবিত্র। সেই কারণেই বিধানচন্দ্র রায় (১৮৮২-৬২)-এর নির্বাচনী জয়ে কিশোর পবিত্র বিমর্ষ হন। বহু মানুষের মতো কমিউনিজমই তাঁর আদর্শ বিকল্প মনে হয়েছিল। যদিও সক্রিয় রাজনীতিতে তিনি কোনোদিনই নিজেকে জড়াতে চাননি, মানসিক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও খাতায়-কলমে পার্টির সঙ্গে সংযুক্ত হননি। তাঁর সংক্ষিপ্ত আত্মকথা ‘জীবন এরকম’-এ কবি এর দু’টি স্বতন্ত্র কারণ উল্লেখ করেছিলেন। প্রথমত, নিজের জীবনসংগ্রাম, বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর লড়াই করে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সর্বহারার মুক্তির জন্য খুব বেশি সময় বের করতে পারেননি, আর দ্বিতীয়ত, তাঁর প্রধান দায়বদ্ধতা ছিল কবিতার কাছে, বাকি সময়টুকু কাব্যনন্দনের দেবীকে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করতে চেয়েছিলেন কবি। আটের দশকের গোড়ায় ছবি আঁকায় মন দিয়েছিলেন, তাঁর ছবির একক প্রদর্শনীও হয়, বিভিন্ন সংবাদপত্র সপ্রশংস সমালোচনা করে, কিন্তু তারপরেও তিনি হয়ে পড়েন দ্বিধান্বিত। কবিতার কাছেই যাঁর প্রথম আনুগত্য, কবিতার পথে অন্তরায় হতে পারে এমন সমস্ত কিছু থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। কবিতার জন্যই অচিরেই চিত্রবিদ্যাকে বিদায় জানিয়েছেন। তাই বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আজীবন তাঁর মানসিক সমর্থন থাকলেও, তাঁর কবিতায় নিঃসন্দেহে সব-হারানো মানুষের কথা পাওয়া গেলেও, কোনও বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য থেকে তিনি সব সময় কবিতাকে দূরে রাখতে চেয়েছেন। ইবলিসের আত্মদর্শন-এ কবি বলেছেন—

রাজতন্ত্র গণতন্ত্র সাম্যবাদ বাত্‌লে দিতে পেরেছে কখনো

কোন্‌ পথে মানুষের চিরন্তন সূর্যোদয় হবে?

কোন্‌ পথ চলে গেছে লোভ ঈর্ষা অক্ষমতা রক্তপাত ঠেলে

প্রেমের বা করুণার বিকাশের প্রতিশ্রুত সাম্রাজ্যের দিকে। (ইবলিসের আত্মদর্শন)

পরবর্তীকালে ‘প্রগতিসাহিত্যের সংকট’ শীর্ষক এক নিবন্ধে পবিত্র বাংলাভাষায় রচিত প্রগতি সাহিত্যের সংকীর্ণতা তথা একদেশদর্শিতার কথা তুলে ধরেছিলেন। কবিতাকে কোনও তাত্ত্বিক অনুশীলনের ফলশ্রুতি হিসেবে দেখতে চাননি কখনও, তিনি জানতেন সাধারণ মানুষের মুক্তি কোনও রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে আসবে না। তাঁর যাপিত জীবন ও নিজস্ব জীবনাভিজ্ঞতাই তাঁকে আপসহীন প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার দিকে নিয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানকে খারিজ করে তাঁর বিভিন্ন কাব্যপ্রয়াসে তিনি মানুষের কথাই তুলে ধরতে চেয়েছেন। ছয়ের দশকে কংগ্রেসি অপশাসনের মধ্যেও নবজাতকের জন্য সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন। কবিতাকে তিনি পণ্য করতে চাননি, মানুষের মর্যাদা রক্ষার হাতিয়ার কবিতা। নিছক শব্দ নিয়ে খেলা তাঁকে আকর্ষণ করেনি কখনো। উত্তীর্ণ শিল্প তাঁর মতে এক পরিপূর্ণ জগতের কিংবা জীবনের অপূর্ণতার পরিপূরক।

আরও পড়ুন: রঙের গাঁ খোয়াবগাঁ

পবিত্র মুখোপাধ্যায় নিরন্তর মানুষের ক্ষোভময় বেঁচে-থাকার মধ্যে বাঁচতে চেয়েছেন তাঁর কাব্যসম্ভার নিয়ে। মানুষের অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের কথা তুলে ধরেছেন কবিতায়, তারই তত্ত্বায়ন ঘটেছে কবিতা বিষয়ক রচনায়। পরিব্যাপ্ত মানব-সংস্কৃতিকে ধরতে চেয়েছেন বলেই বারবার তাঁর কাব্যে এসেছে পর্বান্তর। খণ্ডকবিতার পাশাপাশি আশ্রয় নিয়েছেন মহাকবিতার বেদিমূলে। সেই মহাকবিতায় পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে মানুষের সত্তা ও শূন্যতা ধরা পড়েছে এক মহাসময়ের প্রেক্ষিতে, আয়াসহীনভাবে তিনি অতীতকে বর্তমানের লীলাভূমিতে দাঁড় করাতে পারতেন এবং একইসঙ্গে বর্তমানকে চাপিয়ে দিতে জানতেন ইতিহাসযানে। শুধুমাত্র ছন্দের নৈপুণ্য নয়, শব্দ ব্যবহারের চাতুরি নয়, বক্রোক্তির তীক্ষ্ণতা নয়, দর্শন বা দর্শনহীনতা, আত্মকণ্ডূয়ন নয়, সমস্ত বিরোধকে দূরে সরিয়ে যিনি জীবন ও কবিতাকে একসূত্রে মেলাতে চেয়েছেন, কবিতাকে তিনি শেষপর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছেন সেইখানে, যেখানে কবিতা ‘‘আত্মদর্শন হয়েও বিশ্বের সমগ্র বেদনাকে ধারণ করে থাকবে, যা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতন সহজ অথচ জরুরি হয়ে উঠবে। ইতিহাসে দর্শনে বিচিত্র-অনুভূতির সংক্রমণে কবিতা হবে নিষ্ঠুর অথচ করুণাময় এক যথার্থ আত্মঅভিজ্ঞান যা স্বকালের হয়েও অনাগত কালের প্রবীণ ন্যুব্জদেহী মানুষের যথার্থ শব্দযান; বামন অবতারের মতো ত্রিপদে ত্রিকাল ও ত্রিজগৎ ধারণ করে আছে’’ (‘কবিতাভাবনা’, বিচ্ছিন্ন অবিচ্ছিন্ন)।

লেখক সন্তোষপুর পাঁচুড় কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *