পূর্বাদিকে মনে রেখে…

পারমিতা নাগ

‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে
দেয় সে দেখা নিশীথরাতে স্বপনবেশে।।’

রবীন্দ্রসংগীতের জগৎকে অনেকখানি শূন্য করে দিয়ে চলে গেলেন পূর্বা দাম, ৮৫ বছর বয়সে। এ মৃত‍্যু পরিণত বয়সে। অসুস্থ ছিলেন অনেকদিন। স্মৃতিও হারিয়ে ফেলেছিলেন অনেকটাই। তবু ‘নিশীথরাতের স্বপনবেশে’ তাঁর গান যেন আমাদের স্মৃতির দুয়ারে হানা দেয় বারবার। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের আহ্বানে সাড়া দিতে চায় মন কেবলই।

আরও পড়ুন: অনন্য মানুষ: অনন্য জীবন

রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে পরিচয় আমার বোধ হওয়ার থেকে। বাবার (অমল নাগ) কাছে রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষায় হাতেখড়ি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভেবেই বাবা বাড়ির পাশে ‘রবিতীর্থ’ সংগীত শিক্ষায়তনে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। সুচিত্রা মিত্রের সুযোগ্য তত্ত্বাবধানে সেখানে বিভিন্ন সময়ে নানা গুণিজনের কাছে শিক্ষা লাভ করেছি। সুশীল দে ভৌমিক, দ্বিজেন চৌধুরী, তুষার ভঞ্জ প্রভৃতি, সর্বোপরি শ্রীমতী সুচিত্রা মিত্র… এঁদের প্রত্যেকের উপযুক্ত ও সযত্ন শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়েছি।

‘রবিতীর্থ প্রাক্তনী’ নামটা তখন শুনতাম, যেখানে সুচিত্রাদির সুযোগ্যা ছাত্রীরা ছিলেন সদস্যা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পূর্বা দাম, প্রমিতা মল্লিক, রমা মণ্ডল প্রমুখ বিশিষ্ট গুণী শিল্পী। আমাদের দুর্ভাগ্য, সুচিত্রা মিত্রের পর শিক্ষক রূপে প্রাক্তনী হিসেবে কাউকেই পেলাম না। যদিও পূর্বাদির কন্যা কোয়েলি আমার একসময়ের সহপাঠী ও বন্ধু ছিল বলে পূর্বাদিকে দেখেছি, কিন্তু সংগীত শিক্ষা নেওয়া হয়নি কখনও। এই আক্ষেপ যাওয়ার নয়।

সুচিত্রা মিত্রের শিক্ষার ধারা যাঁরা যোগ্যতার সঙ্গে বহন করে নিয়ে গিয়েছেন, পূর্বা দাম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। নিজস্ব গায়কি ও স্বকীয়তায় তিনি অনন্যা। বিভিন্ন পর্যায়ের রবীন্দ্রসংগীত তাঁর গায়নভঙ্গিতে আজও স্বতন্ত্র। পরিশীলিত কণ্ঠ হৃদয়কে সত্যিই মন্দ্রিত করে।

শারীরিক অসুস্থতায় নানা সময়ে অশক্ত হলেও মানসিক দৃঢ়তায় এগিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের পাবনা জেলায় মামার বাড়িতে জন্মেছিলেন পূর্বা সিংহ। তাঁর সেজোমামা ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র (বটুকদা)। তাঁর মা-ও গান ভালোবাসতেন। তাই সাংগীতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। পরে কলকাতায় এসে সুচিত্রা মিত্র পরিচালিত ‘রবিতীর্থ’-তে ভর্তি হন।

আকাশবাণী, দূরদর্শন, কলকাতা তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন পূর্বা দাম। ছ’য়ের দশক থেকে নিয়মিত রেকর্ড বেরিয়েছে তাঁর। ২০১৩ সালে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘সঙ্গীত সম্মান’ পুরস্কারও পেয়েছিলেন।

কবি অরুণ দে

সুচিত্রা মিত্রের পরিচালনায় তাঁর ‘শান্তি করো বরিষণ’ অ্যালবামের ‘আমারে যদি জাগালে আজি নাথ’ গানটি ভীষণভাবে মনে পড়ছে আজ। এই গানটির পরিবেশনায় যে আবহ শিল্পী নির্মাণ করেছেন, তা বড়ই মনোগ্রাহী। সুচিত্রা মিত্রর পরিচালনায় পূর্বাদির আর একটি অ্যালবাম ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’-এর অন্তর্ভুক্ত ‘আমার মন মানে না’ গানটি তাঁর কণ্ঠ এবং গায়কীর সার্বিক আবেদনে অনন‍্য মাত্রা সংযোজিত করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি নানান রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘আসা যাওয়ার মাঝখানে’, ‘রয় যে কাঙাল শূন‍্য হাতে’, ‘যাদের চাহিয়া তোমারে ভুলেছি’, ‘আমি ফিরব না আর’, ‘ভুলে যাই থেকে থেকে’, ‘এই তো তোমার আলোকধেনু’, ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’, ‘আমার বিচার তুমি করো’— এরকম অজস্র রবীন্দ্রসংগীত তাঁর কণ্ঠমাধুর্যে আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি এনেছে। অল্পশ্রুত রবীন্দ্রনাথের গানগুলি তাঁর কণ্ঠে যেন নতুন হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রসংগীতের জগতে এ ধরনের শিল্পী বর্তমানে দুর্লভ। আমার আরেক সংগীত শিক্ষক শ্রদ্ধেয় শ্রীআশিস ভট্টাচার্যের সঙ্গে পূর্বাদির এই সাদৃশ‍্য আমায় মুগ্ধ করে। ‘ভাবনা রেকর্ডস’ থেকে এঁদের একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল। সেটিতে আশিসদার কণ্ঠে ‘যখন তুমি বাঁধছিলে তার’, ‘জানি জানি কোন আদিকাল হতে’, ‘ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায়’ প্রভৃতি গান এবং পূর্বা দামের কণ্ঠে ‘জানি নাই গো সাধন তোমার’, ‘হার মানালে গো’, ‘যদি হল যাবার ক্ষণ’ প্রভৃতি স্বল্পশ্রুত গান যে অনুরণন জাগিয়ে তোলে, তা অনবদ‍্য। বাদ‍্যযন্ত্রের প্রাবল‍্য ছাড়াই এই ডিজিটালাইজড যুগে প্রতিটি গান শুধু শিল্পীর কণ্ঠের মায়ায় এক অনাবিল পরিসর রচনা করে দেয়। এখানেই তাঁরা সার্থক। তাই পূর্বাদির কাছে শিখতে না পারার আক্ষেপ কিছুটা এভাবে দূর করার চেষ্টা করি।

পূর্বাদির কন‍্যা কোয়েলির সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরে কয়েকবার পূর্বাদির সঙ্গে দেখা হয়েছে। মাতৃসমা তিনি। তাঁর স্বভাব ও মধুর ব‍্যবহারে মুগ্ধ হয়েছি। বাবার খবর নিয়েছেন। শারীরিক অক্ষমতায় বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি, কিন্তু বাবার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা বারবার ব‍্যক্ত করেছেন। পূর্বাদির স্বামী শ্রীঅরুণ দামও খুব মজার ও রসিক মানুষ। ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার সময় কত গল্প করতেন।

কোনও একবার শান্তিনিকেতনে গিয়ে শ‍্যামবাটি অঞ্চলে ‘বনপুলক’ নামে একটি বাড়িতে উঠেছিলাম। পূর্বাদির ছোট বোনের বাড়ি সেটি। খুব আলাপ জমেছিল সেবার দুই বৃদ্ধ— বৃদ্ধার সঙ্গে। পরেও অনেকবার গিয়েছি। একলা থাকতেন। পূর্বাদির ছোটবেলার কত গল্প শুনিয়েছিলেন ওঁরা। এখন আপশোস হচ্ছে কেন গল্পগুলো লিখে রাখলাম না!

পূর্বাদি গত ১৯ তারিখ অনন্তলোকের পথে যাত্রা করেছেন। সুচিত্রা মিত্রের জন্মদিনের লগ্নে গুরু-শিষ্যার  মিলন হল যেন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে বলি— ‘তপন বরণ যিনি, আঁধারের পারে যিনি, যাঁহারে জানিয়া জীব মরণ এড়ায়’— সেই অমৃতপুরুষের আনন্দধামে তাঁর যাত্রা শুভ হোক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • খুব মনে আছে পূর্বাকে।আমার সঙ্গে দেখা বহু বছর আগে নিউ আলিপুরের বিদ্যাভারতী স্কুলের শিক্ষিকা হিসাবে ।তখন বিবাহিতা কিনা আমার মনে নেই।আমার ছেলে নার্সারিতে ভর্তি হয়ে ছিল।পূর্বা আন্টি বলতে অজ্ঞান ছিল।জানতাম উনি সুচিত্রা মিত্রর ছাত্রী ।আমাকে বলেছিলেন আপনার ছেলের ঈশ্বর দত্ত গলা ।গান ছাড়াবেন না।মাত্র এক কি দু বছরের আলাপ।তারপর যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায় ।রেকর্ড বা টিভিতে গানই শুনেছি খালি।কিন্তু এখনো মনে আছে সেই দীর্ঘাঙ্গী শ্যামলা কোঁকড়ানো চুল ওয়ালা মেয়েটিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *