প্রতিহিংসাপরায়ণতা কি সুচতুর চাল!

গৌতম দে

করোনা নামক ভয়াবহ অতিমারির মধ্যেও আমরা নির্বাচন, কুম্ভমেলা একে একে পার করেছি। আনন্দ করেছি। করোনা নামক কঠিন ভাইরাসের অবস্থানকে ভুলে গেছি। ফলে যা হবার, তা-ই হয়েছে। করোনার অতিমারির ঢেউ আজ সমগ্র দেশজুড়ে আছড়ে পড়েছে। আক্রান্ত এবং মৃত্যুর নিরিখে এক নম্বরে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই বলছে।

নির্বাচনের আগে এই অতিমারির প্রকোপ গাঁয়ে-গঞ্জে এবং শহরতলিতে এমনটা ছিল না। নির্বাচনোত্তর পর্বে তার ভয়াবহতা প্রকট হয়েছে। চিকিৎসা নেই। ওষুধ নেই। অক্সিজেন নেই। ভ্যাকসিন নেই। খালি ‘নেই’ রাজত্বে বাস করছেন আপামর পশ্চিমবাংলার জনগণ। অদ্ভুত এক নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে এই বাংলায়। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আজ আকাশছোঁয়া। সর্বত্র কালোবাজারিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষ আজ বড় অসহায়। একটা জবরদস্ত ভয়ের আবরণে বেঁচে আছেন। তার ওপর বিষফোঁড়ার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিদিন। আগামীকাল কী হবে? কী খাবেন? জানেন না কেউ। ভাবতে ভাবতেই দিন যায়। চোখের সামনে গভীর অন্ধকার নেমে আসে।

আরও পড়ুন: গ্রেপ্তারির সঠিক সময় এটি নয়: অধীর চৌধুরী

এখন প্রশাসনের টনক নড়ল, দ্বিতীয়বারের জন্য লকডাউনে যাওয়া যেতে পারে। এই মহামারিকে আটকাতে এই পন্থা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই। অতএব দু’সপ্তাহর লকডাউন লাগু হল। পশ্চিমবাংলার মানুষ মেনেও নিয়েছেন এই পন্থা, বাঁচার তাগিদে। ট্রেন বন্ধ। বাস বন্ধ। এমনকী অটো-টোটো-রিকশও বন্ধ। যারা দূর-দূরান্ত থেকে ট্রেনে করে শহরে কাজে আসতেন, তাদের কাজ থাকবে কিনা আগামী দিনে তার নিশ্চয়তা নেই। হয়তো দ্বিতীয়বারের জন্য আবারও কাজ হারাবেন। অতিমারির এই মৃত্যু ভয় থেকেও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে এই ‘ভয়’। না মরেও এক আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে আছেন।

ডাক্তারবাবুরা বলছেন, এই করোনা নামক মারণব্যাধিকে আটকাতে পারে একমাত্র মাস্ক। এই মাস্কই প্রধানতম ওষুধ। সেইসঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। তাহলেই আমরা এই করোনার শেকল পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারব।

সরকারও বলছেন, বারবার এই একই কথা। আটকাতে হবে এই অতিমারিকে। এই যুক্তিতে সমগ্র পশ্চিমবাংলায় লকডাউনের কথা ভাবা হয়েছে। ছা-পোষা জনগণ তাও মেনে নিয়েছেন। বেঁচে থাকলেই তবে কাজ। সংসার প্রতিপালন। আনন্দ উৎসব। আমরা আজ কী দেখলাম, দেশের এক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এই লকডাউন এবং অতিমারির মধ্যেও তৎপর। নির্বাচিত বিধায়কদের এখনি গ্রেপ্তার করতে হবে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। সমগ্র বাংলায় এক অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। হাজারে হাজারে মানুষ জনশূন্য রাস্তায় নেমে পড়েছেন। আন্দোলন করছেন। ইট পাটকেল ছুড়ছেন। টায়ার পোড়াচ্ছেন। যেন দক্ষিণের ছায়াছবির দৃশ্যের শ্যুটিং চলছে!

আরও পড়ুন: নিজাম প্যালেস ছাড়লেন মমতা, কী বললেন তিনি

কিন্তু বাস্তব উলটো কথা বলছে। এটার দিক্-নির্ণয় ভালো কি মন্দ, জানি না। রাজনীতির তত্ত্বের কচকচানিতেও যেতে চাই না। তবুও সাধারণ মানুষ হিসেবে এইটুকু বলতে পারি, এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যেভাবে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় টেনে বের করে পশ্চিমবাংলার বাস্তব পরিস্থিতিকে নরক করে তুলেছেন তা ভবিষ্যত সুখকর নয়। হলফ করে বলতে পারি। একটা ভয়াবহ অরাজকতা তৈরি করার প্রয়াস চালাচ্ছে কিছু সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদরা। এর ফলে সাধারণ মানুষের মৃত্যু আরও ভয়ংকর আকার নিতে পারে। এই বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। ভবিষ্যৎ বলবে সে কথা।

সব খেলারই হারজিত আছে। একপক্ষ হারবে। একপক্ষ জিতবে। এটা কোনও নতুন কথা নয়। এটাই আদি অনন্ত নিয়ম। বরং আত্ম সমালোচনা করুন। আজ বড় প্রয়োজন আত্ম সমালোচনার। এই ভাবনাটা মাথায় রাখার দরকার। করোনার মতো মারণব্যাধি আমাদের স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না একটুও। অনেকেই পরিজন হারাচ্ছেন। নারদা, সারদায় লক্ষ লক্ষ টাকা কামানো ব্যক্তিরা দুই দলে সমান বিরাজমান। আজ পশ্চিমবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজনরা জানেও সে কথা। কেউ ধোয়া তুলসীপাতা নয়।

কেউ কেউ বলছেন, এটা ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা’র সুচতুর চাল। এই কথা নতুন কিছু নয়। অতীতেও দেখা গেছে, এইরকম রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতার ন্যক্কারজনক রক্তাক্ত খেলা। সে প্রসঙ্গে না যাওয়াই ভালো। পশ্চিমবাংলার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষরা জানে সে কথা।

আরও পড়ুন: রাজ্য নিয়ে রাজ্যপালের ইঙ্গিতপূর্ণ টুইট

আজ পশ্চিমবাংলার মানুষ বারুদের স্তূপের ওপর বাস করছেন। অতীতে অনেক ভয়াবহ রক্তাক্ত আন্দোলন দেখেছেন, এই পশ্চিমবাংলার মানুষ। ঘুরে দাঁড়াতেও জানে। নাগরিক বিস্ফোরণ তা প্রমাণ করেছে বারবার।

ঘরের সামনের দরজা দিয়ে যে আলো ঢোকে, তাকে আন্তরিকতার সঙ্গে আহ্বান করুন। পিছনের দরজা দিয়ে শুধু গভীর অন্ধকার ঢোকে। ঢোকে অন্ধকারের বার্তা। তা চিরস্থায়ী হয় না। ইতিহাস সেই কথাই বলে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *