রাইজিং ফিনিক্স: ফিনিক্সদের ওড়ার গল্প

রণদীপ নস্কর

ছবিটি শুরু হয় ওয়াইডে কয়েকটি সিল্যুট দিয়ে। কয়েকটি ছায়ামূর্তি, কারোর হাত নেই, কারোর পা নেই; তাঁরা প্রত্যেকেই অ্যাথলিট। একটা ভয়েস-ওভার চলেছে, “আপনারা সকলেই অ্যাভেঞ্জার্সের নাম শুনেছেন। তাঁরা সুপারহিরো, পৃথিবীর রক্ষাকর্তা। আমরাও সুপারহিরো। প্রথম জীবনে কিছু ট্র্যাজেডি আমাদের জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। যে ট্র্যাজেডিগুলো আমাদের সাফল্যের পথে সবথেকে বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারত, এখন সেগুলিকেই আমরা জয় করে ফেলেছি।”

আরও পড়ুন: গোষ্ঠ পালের ইন্টারভিউ: স্মৃতিমেদুর রূপক সাহা

জঁ আলাইজা বাপতিস্তে

থিয়েটার থেকে বেরিয়ে হঠাৎ আততায়ীদের আক্রমণে ছোট্ট ব্রুস ওয়েন বাবা-মা’কে চোখের সামনে মারা যেতে দেখেছিল। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ব্রুসকে করে তুলেছিল ব্যাটম্যান, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ, গথামের রক্ষাকর্তা। পিটার পার্কারের কাকা বেন পার্কারকে এক ব্যাঙ্ক ডাকাত গুলি করে খুন করে, সেই ডাকাতকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নিরীহ পিটার পার্কার হয়ে ওঠে ক্ষিপ্র, সাহসী স্পাইডারম্যান। আফগানিস্তানের গুহায় অপহৃত টনি স্টার্ক সহবিজ্ঞানীকে মরতে দেখে আয়রন ম্যান হয়ে ওঠার প্রতিজ্ঞা করে। প্রতিটা সুপারহিরোর গল্পেই সুপারহিরো হয়ে ওঠার শুরুতে একটা ট্র্যাজিক ঘটনা আছে। প্রিয়জনের চলে যাওয়া আছে। যে ক্ষত, যে বিরহ একজন সাধারণ নিরীহ মানুষকে করে তোলে অতিমানবিক কেউ। লার্জার দ্যান লাইফ। বিশেষভাবে সক্ষম এই অ্যাথলিটদের ঘটনাটাও প্রায় একই। এদের কেউ বিরল রোগে ভুগে, কেউ অ্যাক্সিডেন্টে শরীরের অঙ্গ হারিয়েছেন, সেই ট্র্যাজেডি তাঁদের করে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য। তাঁদের হয়তো সুপারপাওয়ার নেই, বদলে তাঁদের অদম্য সাহস, অদম্য জেদ রয়েছে।

বেবে ভিও, ইতালিয়ান ফেন্সার

‘রাইজিং ফিনিক্স’ ছবিটি ফিল্ম হিসেবে কতটা নিপুণ বা ইতিহাসে কতটা জায়গা করে নিতে পারবে, সে তর্কে যাব না। আমার ধারণা, ইয়ান বোনোট আর পিটার সেই কথাটি মাথায় রেখেও এ ছবি বানাননি। এই ছবিটি আদতে অনেক ক’টি স্বপ্নের বুনোন, একখানি দৃশ্য-শ্রাব্য অনুপ্রেরণা।

ফ্রান্সের লং-জাম্পার জঁ বাপতিস্তে আলাইজা যেমন। বুরুন্ডিতে ১৯৯৩ সালে যে সিভিল ওয়ার হয়েছিল, তার ভিক্টিম আলাইজা। মাত্র তিন বছর বয়স তখন। মায়ের সঙ্গে পালিয়ে আসছিলেন, চার-চারটে বোমা পড়ে তাঁর আশপাশে। একটা পা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়, সারাশরীরের অজস্র জায়গায় চোট-আঘাত লাগে। চোখের সামনে মা-কে খুন হতে দেখেন। সেই ঘটনার প্রায় দুই দশক পরেও কথা বলতে গিয়ে আলাইজার চোখ ভিজে যায়। আলাইজাকে জিজ্ঞেস করা হয়, লং জাম্পার হলেন কেন? আলাইজা স্মিত হেসে উত্তর দেন, আমি জীবনে যা যা কিছুর সম্মুখীন হয়েছি, তা থেকে একটা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি লংজাম্পের মাধ্যমে। মনে হয়, সব ছেড়ে উড়ে যাচ্ছি অনেক দূরে। সব কিছুকে পেছনে ফেলে রেখে। আয়রনম্যান, ব্যাটম্যানের পাশাপাশি অজান্তেই জঁ বাপতিস্তে আলাইজার নামটা উচ্চারণ করতে ইচ্ছে করে না? অথবা অস্ট্রেলিয়ার এলি কোল? সাঁতারু এলি কোলের একটা পা ক্যানসারে বাদ পড়ে ছোটবেলায়। কোনও দিন হাঁটতে পারবে কি না, তা ঠিক ছিল না। সেখান থেকে এলি প্যারালিম্পিক্সে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করেন। গ্যালারিতে ঝরঝর করে কাঁদেন তাঁর বাবা-মা।

ছবির একটি অংশ

প্যারালিম্পিক্স কমিটির সিইও জাভি গঞ্জালেজ আর প্রেসিডেন্ট স্যার ফিলিপ ক্র্যাভেনকে কম বক্রোক্তি শুনতে হয়নি প্যারালিম্পিক্সের জন্য। শুনতে হয়েছে, ‘দিস ইস নট স্পোর্টস’। তবুও তাঁরা আয়োজন করেছেন, সুযোগ করে দিয়েছেন বিশেষভাবে সক্ষম হাজার হাজার অ্যাথলিটকে। মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন তাঁদের বিজয়কেতন ওড়ানোর।

খেলার মাঠ যেমন নির্মম, যেমন মুহূর্তের ভুল বিজয়ী বিজিত নির্ধারণ করে দেয়; তেমন খেলার মাঠ সুযোগও দেয় বটে। যাদের ওপর আর কেউ ভরসা রাখেনি, যাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার, তারা আবার খেলার মাঠে এসে দাঁড়ায়। চোখ বোজে, স্টার্টিং হুইসল বাজে, একটা বড় শ্বাস নিয়ে তারা দৌড়োয়। সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। জেতে? ধুর, পরিসংখ্যান আর কবেই বা পুরো সত্যিটা দেখিয়েছে!

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *