উৎসবের ঋতু, ঋতুর উৎসব

সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

‘আফ্রিকার রাজা’ সিংহের মুখের মধ্যে ধাতব গণেশের মূর্তি চুইংগাম দিয়ে আটকে রেখেছিল রুকু ওরফে ক্যাপ্টেন স্পার্ক। আর মগললাল মেঘরাজের সেই গণেশ মূর্তির লোভের শিকার হয়ে খুন হয়ে গেলেন প্রতিমা শিল্পী পালমশাই। এমনই দুর্গোৎসবের দেখা মিলেছিল সত্যজিৎ রায়ের ছবি জয় বাবা ফেলুনাথ-এ। যে বছর মারা গেলেন সত্যজিৎ রায়, সে বছরই, ১৯৯২ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটল এক তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালকের। যে ছবি দিয়ে চলচ্চিত্র জগতে তাঁর আগমন, তা পুরোপুরি দুর্গাময়। শুধু প্রথম ছবি নয়, তাঁর পরের আরও দু’টো ছবি জুড়েও ছিলেন দেবী দুর্গা। তিনি ঋতুপর্ণ— ঋতুপর্ণ ঘোষ। এই উৎসবের ঋতুতে দেখে নেওয়া যাক তাঁর সেই তিন ছবি, যাতে ছিল দুর্গাকে ঘিরে ওঠা উত্সব। ‘হীরের আংটি’ (১৯৯২), ‘উৎসব’ (২০০০), ‘অন্তরমহল’ (২০০৫)— এই তিন ছবি জুড়েই ছিল দুর্গা।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা বান্নু সমাজের হাতে শুরু হওয়া রাবণ দহন আজ রাঁচির ঐতিহ্য

‘হীরের আংটি’ শুরু হচ্ছে রতনলালবাবুর (বসন্ত চৌধুরি) বাড়ি গন্ধর্বকুমার (অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়)-এর আগমন  দিয়ে। পুজোর আর ক’দিন বাকি! সাধু ভাষায় কথা বলা গন্ধর্বকুমার বাড়ির ছোটদের প্রিয় গনুদাদা হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা বাধে যখন সে পুরনো এক সূত্রে রতনলালের সম্পত্তি দাবি করে। সাংঘাতিক উত্তেজনা। তবে কি এবছর পুজো আর হবে না? শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্পে সিনেমা জমে যায় পুজো নিয়ে ভাবনা-দুর্ভাবনায়। শেষে জানা যায় গন্ধর্বকুমার একজন অভিনেতা। তাকে সম্পত্তির দাবিদার সাজিয়ে রতনলালের বাড়ি পাঠিয়েছে ষড়যন্ত্রীরা। শেষ অবধি দুষ্টের দমন। গন্ধর্বকুমার ফিরে যায়। আর বেজে ওঠে পুজোর বাজনা।

‘উৎসব’ তো পুজোর দিন ঘিরেই। পুজোবাড়িতে মা ভগবতী (মাধবী মুখোপাধ্যায়)-র কাছে এসেছে ছেলেমেয়েরা। দুর্গার কার্তিক-গণেশ- লক্ষ্মী-সরস্বতীর মতো ভগবতীরও দুই ছেলে, দুই মেয়ে। অসিত (প্রদীপ মুখোপাধ্যায়)-নিশিত (বোধিসত্ত্ব মজুমদার) আর পারুল (মমতা শংকর)-কেয়া (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)। মায়ের কাছে এসেছে চার ছেলে-মেয়ে, আপাতভাবে পুনর্মিলন। তার সঙ্গেই নানান সম্পর্কের চাপা টেনশন। পারুলের সঙ্গে তুতো ভাই শিশিরের (দীপঙ্কর দে) পুরনো সম্পর্কের স্মৃতি ফিরে আসে। তখনকার গরিব তুতো ভাই শিশির এখন প্রতিষ্ঠিত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। এ-বাড়ি কি শিশির কিনে নেবে? সেই পুরনো সম্পর্ককে মনে রেখে পারুলকে উদ্যোগী হতে বলে অন্যরা।

আরও পড়ুন: ‘চলে গেছে দিন তবু আলো রয়ে গেছে’— চলে যাওয়ার ৩৪ বছর পরে আজও আলোকিত কিশোর কুমার

পারুলের মনখারাপ। একে তো অসফল সম্পর্কের স্মৃতি; তার সঙ্গে সারা জীবন ধরে বরের কাছে ‘ভাইয়া-সাঁইয়া’ শোনার যন্ত্রণা! তারপর পুজোর সময় এ কী বিড়ম্বনা! পারুলের ছেলে জয়ের (রাতুল) সঙ্গে অসিতের মেয়ে শম্পার (অর্পিতা) বন্ধুত্বে কি আবার ‘ভাইয়া-সাঁইয়া’র ফিরে আসা? একদিকে সম্পর্ক গড়ে ওঠার ইঙ্গিত অন্যদিকে কেয়া-অরুণের সম্পর্কের টানাপোড়েন কি ভাঙনের দিকে যাবে? অরুণের পুজোর মধ্যেই বাড়ি থেকে চলে যাওয়া, ফের ফিরে আসা— প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার অসামান্য অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। পুরো সিনেমাই পুজোর আবহে। দর্শক উৎসব দেখছেন ঋতুপর্ণর ক্যামেরায় আর উৎসববাড়ি ক্যামেরাবন্দি করছে পারুলের ছেলে জয়, যা পরে দেখছেন ভগবতী। দু’হাজারের মে মাসে মুক্তি পাওয়া এই ছবি শারদোৎসব নিয়ে এসেছিল গরমকালেই।

এর পাঁচ বছর পর ফের ঋতুপর্ণর ছবিতে দুর্গা। জমিদার ভুবন (জ্যাকি শ্রফ) দুর্গাপুজো করে তাক লাগিয়ে দেবে সকলকে। অন্য জমিদারদের টেক্কা তো দেবেই, পাশাপাশি রানি ভিক্টোরিয়ার মুখের আদলে তৈরি দুর্গা পুজো করে ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাবে রায়বাহাদুর খেতাব— এমনই আশা তার। আর সেজন্যই বাড়িতে আনা হয়েছে প্রতিমাশিল্পী বৃজভূষণকে (অভিষেক বচ্চন), যে গড়ে তুলছে দুর্গাপ্রতিমা। অত্যাচারী নিঃসন্তান জমিদার ভুবনের দুই বউ— অভিনয়ে রূপা গাঙ্গুলি আর সোহা আলি খান। যৌন-পীড়ন আর অত্যাচারই যেন ভুবন জমিদারের কাছে দাম্পত্যের স্বাভাবিকতা!

আরও পড়ুন: উলা বীরনগরের প্রাচীন বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস

ঠাকুর গড়তে আসা বৃজভূষণের সঙ্গে কি অন্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে জমিদারের অত্যাচারিতা ছোট বউ সোহার? তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রতিমা’ গল্পের সূত্র ধরে গড়ে ওঠা এ ছবি ক্ল্যাইম্যাক্সে পৌঁছয়, যখন দেখা যায় বৃজভূষণ নির্মিত দুর্গাপ্রতিমায় ভিক্টোরিয়া নয়, উপস্থিত ভুবন জমিদারের ছোট বউ সোহার মুখ!

উৎসবের ঋতুতে ঋতুর উৎসব যেন দেবী দুর্গা নয়, সম্পর্কের বোধন। উৎসব তো সম্পর্কেরও উদ্‌যাপন!

লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান। আগ্রহের বিষয় সমকালীন সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *