সাহিত্যের ইয়ারবুক (ঠিকানাপঞ্জি): বাংলা সাহিত্য-প্রেমীদের এক মূল্যবান সম্পদ

ধীমান ব্রহ্মচারী

বাংলা ও বাংলা সাহিত্যের আলোচনা একটা কালক্রমিক আলোচনা-প্রবাহ। সময়ের ধারা অনুযায়ী এই আলোচনা বা চর্চা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে। একই পথে বারবার উঠে এসেছে ইতিহাস-সময়-সাহিত্য কর্ম। চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজকের প্রকাশিত বইসমূহ, সবই এক একটা দিক শুধু নয়, ভিন্ন সময়ের সাক্ষী ও দলিল। আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্ল্যাটফর্মে এসেছে অনেক কিছুই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রীরামপুর মিশনের অবদান আমরা সকলেই জানি। সেই মিশন থেকে প্রকাশিত ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’। সেই সময় থেকে আজ এই যে বিরাট পরিধি ও সময় প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে আমাদের বাংলার পাঠক সমৃদ্ধ হয়েছে বেশি। পূর্ব বঙ্কিমের যুগ থেকে প্রকাশিত আজকের এই একবিংশ শতাব্দীর সময়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা ছাপ ও স্থাপত্য আমাদের সম্পদ হিসেবেই থেকে গেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে যেকোনও প্রকাশ মাধ্যম অনেকটা সময়ের বা মহত্বের দাবি রাখে। বাংলা সাহিত্যের এই পর্বে একটি নাম ‘সাহিত্যের ইয়ার বুক (ঠিকানাপঞ্জি)’। বইটি একটা মূল্যবান দলিল। এই দলিল সাক্ষী দেয় আমাদের সময়ের। এবং এই সময়ে থেকে যাওয়া বা কাজে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সেইসব দিক্‌পাল-সংস্থা বা প্রকাশনা সবাইকে একই ছাদের তলায় নিয়ে আসাটা নেহাতই কম সময়সাপেক্ষ নয়। এটি এমন একটা বই, যা সমসাময়িক পাঠক থেকে লেখক-কবি-সম্পাদক ও অনুসন্ধিৎসু গবেষকের কাছে খুবই প্রয়োজনীয় এবং তাঁদের কাছে বহুমূল্যও।

আরও পড়ুন: তামিল পত্রিকা ‘বিবেকচিন্তামণি’

জাহিরুল হাসান। বাংলার পাঠক শুধুমাত্র বইমুখী হয়ে থাকবে তা কী করে হয়। একইসঙ্গে পাঠক ও কবি-লেখকের এক নিবিড় ও স্বাধীন যোগসূত্র স্থাপনের প্রয়াস এই সাহিত্যের ইয়ারবুক। যার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক জাহিরুলবাবু। হয়তো এই চিন্তা থেকেই তাঁর এই মহতী প্রয়াস। আমাদের বাংলা সাহিত্যপ্রেমী ও পাঠকদের কাছে একটা নাম শুধুমাত্র নয়, জাহিরুলবাবুর মতো একজন মহতী সম্পাদক আজ আমাদের কাছে বিরল। কেন-না এই ইয়ার বুক শুধুমাত্র একটা বই বা সংগ্রহ সম্পাদনা নয়। এতে আছে বড় সময় ধরে একটা দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি। তাতে আছে আমাদের বাংলার কবি-গল্পকার-শিল্পী-সম্পাদক থেকে নানান প্রকাশক ও প্রকাশনা, বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা, লেখক-কবি। এই বিরাট একটা তালিকা বছরের পর বছর ধরে সংরক্ষণ করাটাও অনেকটা কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা এবং সর্বোপরি সাধনা। যা থেকেই জন্মায় দ্বায়িত্ববোধ, যা তাঁর এখনও আছে। তিনি নিজেই সেই প্রমাণ রেখেছেন। ১৯৯৯ সাল থেকে বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ কর্মী ও প্রতিষ্ঠানকে একত্রিত করার দুঃসাহসিক কাজ সামলে এসেছে ইয়ারবুক।

আরও পড়ুন: স্ট্যান স্বামী নিজের সাক্ষাৎকারে যে সমস্ত কথাবার্তা বলেছেন, তা দেখলে মন একেবারে কষ্টে ভরে যায়: সমর বাগচী

আজকের পর্বে দাঁড়িয়ে এই গ্রন্থের গুরুত্ব বা আলোচনা অনেকটা দাবি রাখে বাংলার পাঠক সমাজে। এই প্রসঙ্গেই একটু আরও একটা কথা বলি, সেটা হল, “…বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে কে-কেমন আছে। তখন সাহিত্যের ইয়ারবুক আমার একমাত্র সম্বল হয়ে ওঠে। এই গ্রন্থের পাতা খুলে তাদের ফোন নম্বর খুঁজে ফোন করি। সুখ-দুঃখের কথা বলি। মনের ভার দূর হয়। নিঃসঙ্গ হয়ে থাকার কষ্ট আর থাকে না। আমি যেন আবার যৌবন ফিরে পাই। ফিরে পাই আমার অতীত। পাই আমার সুখ-দুঃখের দিনগুলো। ফলে এই গ্রন্থ আমার কাছে শুধু কাজের বই নয়, আমার কাছে আনন্দের উৎস। মাঝেমাঝে আবার দিল্লি থেকে, মুম্বই থেকে, বেঙ্গালুরু থেকে, ঢাকা থেকে ফোন আসে। সব অচেনা নম্বর। অচেনা মানুষ। আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করি, কোত্থেকে আমার নাম্বার পেলেন! সবাই একবাক্যে বলেন, ‘সাহিত্যের ইয়ারবুক থেকে’। এই গ্রন্থ এখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সাফল্য অভাবনীয়।” (অন্ত পৃষ্ঠা: রমানাথ রায়)

আরও পড়ুন: স্ট্যান স্বামী, জেসুইট পাদ্রি, লিবারেশন থিয়োলজিস্ট ও বাগাইচা বিষয়ক দু-চার কথা

আলোচ্য কথাটাই অনেক কিছু বলে দেয়। জাহিরুলবাবুর তৈরি স্বপ্ন আজ বাঙালি মননশীল পাঠকের কাছে সমাদৃত। একজন অন্যতম কথাকার এই মননঋদ্ধ স্মৃতির কথা লিখেছেন, এই কথা তো শুধুমাত্র তাঁর কথা নয়, এ আমাদের মনেরই কথা। একটা বই যার মধ্যে বড় একটা সংযোগ এসে মিশেছে পাতায় পাতায়। যদিও সময়ের সঙ্গে যেকোনও কাজের উত্তরসূরি এসে সেই কাজ ত্বরান্বিত করেন, এক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। জহিরুল হাসানের পর যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে কাজের দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন করেছেন বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য। আমি নিজেও জহিরুলবাবুর পর থেকে বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গে এই বই সূত্রেই যোগাযোগ বাড়িয়েছি।

আরও পড়ুন: সেইসব স্মৃতিধর

No photo description available.

নিজের কথা বলতে গেলে এই সাহিত্যের ইয়ারবুকের যাত্রার প্রায় একযুগ পর আমি ব্যক্তিগতভাবে জেনেছি। যুক্ত হয়েছি আরও পর। সাল ২০০৯। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত বাংলা লিটল ম্যাগাজিন মেলা। স্থান নন্দন চত্বর। আমি তখন সদ্য চারুপাঠ প্রকাশনীর আরও একটি পার্শ্ব মুদ্রণ বিভাগ (রূপকথা প্রকাশনী) থেকে ‘কবিতা বুলেটিন’ নামক একটা লিটল ম্যাগাজিন করি। ঠিক সেই সময় আমার পাশের টেবিলেই ছিল এই সাহিত্যের ইয়ারবুক। আজ থেকে প্রায় ১২ বছর আগের জহিরুল হাসান। কী সাংঘাতিক তাঁর কাজের প্রতি ভালোবাসা। আমার বুলেটিন ৫ টাকা। ওনার সম্পাদনায় আরও একটি বই (বাংলায় মুসলমানের ইতিহাস/স্মৃতি-তে যতটুকু মনে পড়ছে), একত্রে ১৫০ টাকায় পাঠকের হাতে তুলে দিচ্ছেন। আমি পাশের টেবিলে বসে ৫ টাকার একটা কাগজ বিক্রি করতে যে হীনম্মন্যতায় পিছিয়ে যাচ্ছি, সেখানে উনি আগত সব পাঠক বা মেলায় আসা মানুষকে বোঝাচ্ছেন, যে বই দু’টোর গুরুত্ব এমনকী আজকে আপনি দু’টো বই একত্রে একশো পঞ্চাশ টাকায় পাবেন।

আরও পড়ুন: পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম

তিনি ও বিশ্বনাথবাবু দু’জনেই আছেন। জাহিরুলবাবু আছেন, টেবিলের বাইরে মানুষজন যাঁরা আসছেন, তাঁদের সাদরে এই মেলায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। অন্যজন অর্থাৎ বিশ্বনাথবাবু বিল কাটছেন। কত বড় একটা শিক্ষা আমার চোখের সামনে ঘটছে। কত পরিচিত মানুষ, লেখক, কবি, সংগীত শিল্পী থেকে চিত্র শিল্পী সবাই তাঁদের এই কেমিস্ট্রিকে গ্রহণ করছেন। মুসলমান ইতিহাস নিয়ে লেখা বইটা নিয়ে একটা আলোচনা আরও কত সমালোচনা-ব্যাখ্যা হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি পাশের টেবিল থেকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছি। সেই পুরনো ছবি ও স্মৃতি। সেই থেকেই শুধুমাত্র লিটল ম্যাগাজিন মেলা নয়, প্রায় সব বইমেলায় আমি প্রায় দেখেছি তাঁদের প্রয়াস ও প্রচেষ্টা। শুধুমাত্র বইপ্রকাশ নয়, তাঁকে মানুষ ও পাঠকের হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত থেমে থাকা নয়, সার্থকতা নয়।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৮ম অংশ)

আজ এতগুলো বছর পার করে এই বই পাঠকের স্বাদ পূরণ করে যাচ্ছে। দুই সাধক তাঁদের কাজের পরিধিও আস্তে আস্তে বাড়িয়েছেন। আমাদের সঙ্গে থেকে যাওয়া ও লেগে থাকা সময় কখন এই বইয়ের পাতায় আমাদের অজান্তেই ঢুকে গেছে। পাতা উল্টে নিজেদের পত্র-পত্রিকায় নাম দেখলে চোখের কোণে জল আসে। মনে প্রশ্ন আসে, আমরা যেন এর যথোপযুক্ত সম্মান দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। এই বইটির পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি উৎসব পালিত হবে আমাদের বাংলার পাঠকের হাত ধরেই। এতেই সার্থকতা পূর্ণ হবে মহতী বইটার দুই বরেণ্য সম্পাদকের সম্পাদনায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • অসীম ভট্টাচার্য

    অমূল্য সন্ধান

  • Goutam Chattopadhyay

    খোঁজ করুন, ১৯৭০ এর দশকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হোতো সাহিত্যের বর্ষপঞ্জী বা ইয়ারবুক। এই মূহুর্তে লেখক নাম ও শিরোনাম স্মরণে আসছে না। তবে ছিল যে সে বিষয়ে নিশ্চিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *