মান্নাদা ৯৭: এক ফুটবল আত্মার জন্মদিনে কিছু স্মৃতিচারণ

শুভ্রাংশু রায়

শৈলেন মান্না। বেঁচে থাকলে মানুষটির আজ বয়স হত ৯৭। আর তিন বছর পরেই শতবর্ষ। শুভ জন্মদিন মান্নাদা। আজ থেকে এক দশকের একটু বেশি সময় আগে মান্নাদাকে কিছু কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম আমরা কয়েকজন মিলে। পারিনি মূলত আর্থিক কারণে। তবু সেই চেষ্টা করতে গিয়ে মান্নাদার অনেক কাছে পৌঁছেছিলাম। সেটাই বা কম প্রাপ্তি কীসের!

আরও পড়ুন: কলকাতায় প্রায় বিস্মৃত একটি খেলা এবং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

মান্নাদার সঙ্গে প্রথম দেখা খুব সম্ভবত কোনও একটি পাড়ার অ্যানুয়াল স্পোর্টসে। আমার দেশের বাড়ি ছিল হুগলি জেলায়। মান্নাদার আদি বাড়ি ছিল হুগলিতেই। হাওড়া ছিল মান্নাদার মামার বাড়ি। মামার বাড়িতেই মান্নাদার বড় হওয়া। তাই শৈলেন মান্নার নামের সঙ্গে হাওড়া ভীষণভাবে জুড়ে আছে। তা যা বলছিলাম, মান্নাদাকে প্রথম দেখেছিলাম হুগলি জেলার কোনও এক গ্রামে। আমার বয়স তখন তিন কী চার হবে। বাবার সঙ্গে সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম।

আরও পড়ুন: ১৯৭১-এর ২৪ আগস্ট: পঞ্চাশ বছর পরে ফিরে দেখা ভারতের এক অলৌকিক জয়

সে-স্মৃতি বড়ই দুর্বল। শুধু মনে আছে, মান্নাদা প্রবেশ করা মাত্র “আরে মান্নাদা এসে গেছেন মান্না দে এসে গেছেন’’ বলে কিছু মানুষ খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আর মনে আছে, মান্নাদা আমায় ফুল বা চকোলেট কিছু হাতে দিয়ে আদর করেছিলেন। বহু পরে মান্নাদাকে যখন এই কথা বলেছিলাম উনি হেসে বলেছিলেন, “আমি তো লক্ষ অনুষ্ঠানে গেছি। আমার কি আর সেই সব মনে আছে।” একটু বড়বেলায়, মনে হয় ক্লাস সেভেন বা সিক্স পড়ার সময় বাড়ির সামনে দিয়ে মান্নাদাকে হেঁটে পাড়ার ক্লাবে চিফ গেস্ট হওয়ার জন্য যেতে দেখেছি। সেটা আশির দশকের মাঝামাঝি সময়। তখনও শৈলেন মান্না মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব বা ভারতীয় ফুটবলে বড় ব্যক্তিত্ব। এমন একজন মানুষ নিছক হাওড়া থেকে ট্রেনে করে হরিপাল স্টেশনে নেমে দশ মিনিট হেঁটে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে যাচ্ছেন, নাহ আজকের দিন বাদ দিন, সেই সময় বড় তো নয়ই কলকাতার কোনও মাঝারি মাপের ফুটবল ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে এই ব্যবহার প্রত্যাশাই করা যেত না। পরে শুনেছিলাম, হরিপাল স্টেশনে নেমে মাত্র দশ মিনিটের পথ শুনে উদ্যোক্তাদের রিকশার ব্যবস্থা না করে ‘নিজেই হেঁটে চলে যাব’ বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই বাড়ির দরজার গেটে দাঁড়িয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে মান্নাদাকে দর্শন করার সুযোগ হয়েছিল। মোহনবাগান ক্লাবে তখনও কোনও বিদেশি খেলোয়াড় খেলানো হত না।

আরও পড়ুন: অনন্য অলিম্পিক দর্শন

শোনা যায়, মান্নাদা বিদেশি খেলোয়াড় খেলানোর সিদ্ধান্তকে মন থেকে মানতে না পেরে মিটিং শেষে কোনও কথা না বলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। পরে স্বর্গত বউদির মুখে শুনেছিলাম সেদিন রাতে মান্নাদা নাকি জলস্পর্শ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। মান্নাদাকে জানতে চেয়েছিলাম ওনার ফ্ল্যাটে বসেই। অনেক কিছুই বলেছিলেন। বউদিকে কথা দিয়েছিলাম এ নিয়ে কোনওদিন প্রকাশ্যে কিছু বলব না। মান্নাদার সম্মান যাতে কোনওভাবে হানি না হয়। আজও তাই বললাম না। বউদি বেশ দুঃখ করে বলেছিলেন, এক কলকাতার ক্রীড়া সাংবাদিককে উনি বেশ কিছু দুর্মূল্য ছবি দিয়েছিলেন, যেগুলি উনি আর ফেরত পাননি। এই জন্মদিনেও খারাপ লাগে যে, মানুষটি ২০১২ অবধি বেঁচে রইলেন তাঁকে নিয়ে কোনও পূর্ণাঙ্গ ভালো গবেষণা হল না। নেই তেমন মানের কোনও ডকুমেন্টরি। খালি পায়ে ফুটবলের শেষ কিংবদন্তিকে আমরা আরও ভালো করে ধরে রাখতে পারতাম। অনেক কিছুই আমরা আগামী প্রজন্মকে জানাতে পারতাম। যে সুযোগগুলো আমরা হারাতে চলেছি ক্রমশ। ভারতীয় ফুটবলে অলিম্পিক খেলা জীবিত ফুটবলারদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। আমরা কি সত্যিই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে বা সংরক্ষণ করতে সক্ষম? প্রশ্নটা মাঝেমাঝেই নিজের মনকে বড়ই ধাক্কা দেয়।

আরও পড়ুন: পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি, মোহনবাগান এবং বাঙালির প্রথম অলিম্পিকে অংশগ্রহণ: ১৫ আগস্ট, ১৯২০

মান্নাদাকে লিখতে বসলে ঠিক কোনখান থেকে শুরু করব আর কোথায় গিয়ে থামা উচিত অনেক সময়েই গুলিয়ে যায়। এই যেমন ধরুন, ছেলেবেলায় মান্নাদাকে প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন অনুষ্ঠানে তাঁকে নিজে কানে বলতে শুনেছি, “আমরা ১৯৪৮ অলিম্পিকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ভালো খেলেও হেরে গিয়েছিলাম। সেই জন্য আমিই মূলত দায়ী ছিলাম। দু’টি পেনাল্টির মিস করেছিলাম তো। তারপর শেষ মুহূর্তে গোল করে ফ্রান্স ম্যাচটা জিতে বেরিয়ে গেল।” জীবনের শুরুর দিকে আমিও সেটাই জানতাম। শৈলেন মান্না নিজে বলেছেন যখন। ওমা, পরে দেখি সেই ম্যাচে শৈলেন মান্না পেনাল্টি মিস করেছিলেন সত্য। কিন্তু দু’টি নয় একটি। দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস করেন মহাবীর প্রসাদ। পাছে লোকে মহাবীরকে খারাপ বলে বা ওর সামান্য চাকরিজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় মান্নাদা নিজেই দু’টি পেনাল্টি নষ্টের দায় নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে নিতেন। ’৪৮ অলিম্পিকের সেই খেলাটি হয়েছিল লন্ডন শহরে, তখন প্রিন্ট মিডিয়া এত শক্তিশালীও ছিল না, এতটা খুঁটিয়ে খবরও করত না বা অধিকাংশ মানুষের কাছে কাগজ পৌঁছনোর অবকাশ ছিল না। ফলে আমার মতো অনেকেই জানত মান্নাদাই দু’টি পেনাল্টি মিস করেছেন। ব্যস। তবু তো মান্নাদা, তাই তেমন কিছু বলার লোক ছিল না।

আরও পড়ুম: একশো বছর পূর্ণ প্রথম কলকাতা ডার্বির গোলের

ময়দানে কান পাতলেই শোনা যায়, মোহনবাগান ক্লাবের এক বিরাট সময় সর্বময় কর্তা ধীরেন দে সম্পর্কে। ক্লাবের প্রাক্তন ক্রিকেট খেলোয়াড় রাশভারী প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ধীরেনবাবুর কাছে অনেক খেলোয়াড়ের সরাসরি পৌঁছনোর উপায় অনেক সময় থাকত না। তাঁদের জন্য মুশকিল আসান ছিলেন মান্নাদা। তারকা থেকে উঠতি খেলোয়াড় কতজনের যে এই মুশকিল আসান করেছেন শৈলেন মান্না, তার মনে হয় ইয়ত্তা নেই। অনেক সময় গোটা  টিমকে নিয়ে হাজির হয়েছেন কোনও ফুটবলারের বিয়ের আসরে। সত্তর ও আশি এমনকী নব্বইয়ের শুরুর অন্য এক মোহনবাগানের ঘরের ছেলে অসমে গিয়ে খেলার মাঠে এক পদস্থ পুলিশ কর্তার সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছেন। দিল্লির উচ্চমহলে ফোন করে তাঁকে নিরাপদে কলকাতায় ফিরিয়ে এনেছেন শৈলেন মান্না। পঁচাত্তরের পাঁচ গোল খাওয়ার পরে দুই মোহনবাগানের সেদিন তরুণ ভবিষ্যতের তারকা ফুটবলারকে গভীর রাতে গঙ্গার ঘাট থেকে পুলিশ নিয়ে উদ্ধার করেছিলেন এই শৈলেন মান্নাই।

আরও পড়ুন: শৈশবের হিরো, কৈশোরের গুরু

১৯৪৮ লন্ডন অলিম্পিকে তাঁদের খালি পায়ের ফুটবলে মুগ্ধ হয়ে শৈলেন মান্নাকে ব্রিটেন সম্রাজ্ঞী জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর পা লোহা দিয়ে তৈরি কিনা। সেই ঘটনা ময়দানে গল্পের গরু গাছে ওঠার মতো রটে যায় রানি স্বয়ং মান্নার পা টিপে দেখতে চেয়েছেন যে, তাঁর পায়ে লোহা বসানো আছে কিনা। মান্নদাকেই জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিলাম আসল ঘটনাটি। লন্ডন অলিম্পিকে খেলতে যাওয়ার সময় জাহাজে তাঁদের প্র্যাকটিসের বেশ কিছু গল্প মান্নাদার মুখেই শোনা। সেই গল্প লিখতে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে। শুধু একটা কথা বলে নেওয়া ভালো ’৪৮ অলিম্পিক টিমে সবাই কিন্তু খালি পায়ের খেলোয়াড় ছিলেন না। সে টিমে তিনজন খেলোয়াড় বুট পরে খেলেছিলেন। কিন্তু খালি পায়ে খেলার বিষয়টি এতটাই চাউর হয়ে গিয়েছিল যে, অনেকে আজও ভেবে নেন সেবার অলিম্পিক দল সবাই বুট পরেই মাঠে নেমেছিল। কিছুটা যেন সেই এগারোর শিল্ড দলে বুট পরা অধ্যাপক সুধীর চ্যাটার্জি থাকা সত্ত্বেও খালি পায়ের অমর একাদশ জনপ্রিয় হয়ে পড়ার মতো ঘটনা। আদতে কোথায় যেন মনে হয়, ভারতীয় ফুটবলের খালি পায়ে খেলার উপাখ্যান ঔপনিবেশিক দল ইস্ট ইয়র্কশায়ারের দলকে হারিয়ে মোহনবাগানের মাধ্যমে সূত্রপাত ঘটেছিল সেই বৃত্তের সম্পূর্ণতা পেয়েছিল সদ্য প্রাক্তন হওয়া ঔপনিবেশিক শাসকের রাজধানী শহর লন্ডনেই। সেই কারণেই শৈলেন মান্না নিছক কলকাতা মাঠের সফল ফুটবল খেলোয়াড় এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তা নন, তিনি আদতে সেই ফুটবলের অন্তরাত্মার স্বর যা আদতে স্বদেশি ফিজিক্যাল কালচার বা শরীরচর্চা সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে।তাই শিবদাস ভাদুড়ী, গোষ্ঠ পালদের সময় থেকে ময়দানের সবুজ মেরুন ক্লাবে যে ধারার শুরু হয়েছিল, ২০১২ সালের ২৭ ফ্রেব্রুয়ারি শৈলেন মান্নার জীবনাবসানের মাধ্যমে যেন তার শেষ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

আরও পড়ুন: ক্রুশ্চেভ ভার্সেস টিটো: প্রথম ইউরো কাপ ফাইনাল ছিল ‘কমিউনিস্টদের লড়াই’

মোহনবাগান ক্লাবের হয়ে ১৯ বছর খেলা, দু’টি অলিম্পিকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা (১৯৫২ সালে তিনিই ছিলেন ক্যাপ্টেন) ১৯৫১ তাঁর অধিনায়কত্বে এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রথম সোনা জয়, ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ টানা কোয়ান্ডরাগুলার জয়ী ভারতীয় দলের সদস্য থাকা ইত্যাদি অনেক পরিসংখ্যান আজ অনেকটাই সহজলভ্য। এছাড়া ক্লাবস্তরে সাফল্য তো রয়েছে। কিন্তু এগুলি ছাপিয়ে আবার বলতে হয়, খেলোয়াড় শৈলেন মান্না বা কর্মকর্তা শৈলেন মান্নাকে কালের কষ্টিপাথরের বিচারে অনেক গুণ ছাপিয়ে গেছেন একজন প্রকৃত স্পোর্টসম্যান স্পিরিট সম্পন্ন মান্নাদা। যখন খেলতেন, তখন তিনি ছিলেন এস. মান্না। তারপর হলেন মি. মান্না। তারপর আবালবৃদ্ধবনিতার মান্নাদা। জন্মদিনে মান্নাদাকে নিয়ে লিখতে বসে প্রায় কিছুই লেখা হল না। মহাকাব্যের প্রধান চরিত্রকে নিয়ে কি সামান্য কিছু শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়? তবু কিছু শব্দের সাহায্যে হৃদয়ের শ্রদ্ধা জানালাম মাত্র। আর একদম শেষে শুরুর দিকে যে মান্না বউদিকে কথা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে যে নীরবতা পালনের উল্লেখ করেছিলাম, বিশেষ কিছু প্রসঙ্গে তা থেকে সামান্য বিচ্যুত হয়ে একটা ঘটনার উল্লেখ করেই শেষ করি। আশা করি মার্জনা করবেন তাঁরা। মান্নাদাকে জানতে চেয়েছিলাম, “আপনি কি বিদেশি খেলোয়াড়দের মোহনবাগানে খেলানোর বিরুদ্ধে?”

মান্নাদা তাঁর প্রিয় অরেঞ্জ-এ (মান্নাদা অরেঞ্জ-ই বলতেন, কোনও ব্র্যান্ডের নাম বলতেন না। মনে হয় জানাও ছিল না।) চুমুক মেরে বলেছিলেন, “দেখো আমরা যদি অন্য ক্লাবের মতো বিদেশি খেলোয়াড়ের জন্য জায়গা খুলে দিই, তাহলে আমাদের দেশের ছেলেরা কিন্তু চান্স পাবে না। তাহলে দেশের ফুটবলটা এগোবে কী করে। আমরা ঘরোয়া ট্রফি হয়তো জিতব, কিন্তু ভারতীয় ফুটবলকে আমরা নতুন প্রতিভা দেব কী করে!” এই নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি থাকতে পারে। তবে পদ্মশ্রী শৈলেন মান্নাকে সেদিন ক্লাবের ইন্টারেস্ট ছাপিয়ে দেশের কথা ভাবতে দেখেছি। উনি সেই দিক থেকে ভাগ্যবান ছয়জন বিদেশি-সম্বৃদ্ধ নিজের ক্লাব দলকে দেখতে হয়নি। মাঝেমাঝে তাই মনে হয়, ইতিহাসের হিসেব সম্ভবত ভুল হয় না। ভাগ্যিস আজ মান্নাদা নেই।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

4 comments

  • নাম করণ টি বেশ পছন্দের ।।

  • অনেক অজানা তথ্য জানা গেলো। খুব ঝরঝরে লেখা — ভালো লাগলো। নামকরণ টিও লেখার সঙ্গে সাযুজ্য পূর্ণ , অভিনব ।

  • Debashis Majumder

    Ashadharon Poribeshona. Lekhokke dhanyabad. Sailen Manna ke soshroddho Pronam.

  • মান্নাদার মতো মহান মানুষের চরণে প্রণাম জানাই।
    খুব ভালো লেখা । অনবদ‍্য স্মৃতিচারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *